হিন্দি বলয়ের গেরুয়া ঝড়ে বিপর্যস্ত কংগ্রেস

সোমনাথ গুহ

 


কংগ্রেসকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা হিন্দু কার্ড খেলবে, না রাহুল গান্ধি তাঁর ভারত জোড়ো যাত্রায় বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি যে ইস্যুগুলো তুলে এনেছিলেন সেগুলো প্রচার করবে। ইন্ডিয়া জোট সম্পর্কে তারা কি সত্যিই সিরিয়াস?

 

 

সমস্ত জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে চারটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হল। হিন্দি বলয়ের তিনটি রাজ্যে বিজেপি বিপুল ব্যবধানে জয়ী এবং প্রবল আশা জাগিয়েও কংগ্রেসের ঝুলিতে শুধুমাত্র তেলেঙ্গানা। ২০২৪-এর এপ্রিল-মে মাসে লোকসভা নির্বাচন। তার আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির শক্তি, প্রভাব বুঝে নেওয়ার জন্য এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। এই ফলাফল কিছু প্রবণতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, শুরুতে সেগুলো দেখে নেওয়া যেতে পারে।

প্রথমত জনগণ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছে। যে রাজ্যে যে দল জিতেছে, অন্তত আসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তারা পরিষ্কার ব্যবধানে জিতেছে। দ্বিতীয়ত এই নির্বাচন ছিল প্রতিযোগিতামূলক জনকল্যাণ অথবা দান-খয়রাতি অথবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-কথিত রেউড়ি রাজনীতির নির্বাচন। এই পর্বের মতদান ছিল কে জনগণকে কত বেশি দিতে পারবে তার প্রতিযোগিতা। দুটি দল প্রায় একইরকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছে: রান্নার গ্যাসের দাম ৪৫০-৫০০ টাকায় নেমে আসবে, কন্যাসন্তানের শিক্ষায়, বিবাহে টাকা পাওয়া যাবে, তাঁরা সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন, কৃষকরা অধিক সহায়ক মূল্য পাবেন, ফসল বিমা পাবেন, বরিষ্ঠ নাগরিকরা, গৃহবধূরা নানা মূল্যের ভাতা পাবেন, স্বাস্থ্যবিমা হবে, স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া যাবে, ২০০ ইউনিট অবধি মুফতে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তৃতীয়ত, কিন্তু এত করেও অর্থাৎ নানা জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করা সত্ত্বেও, সরকারের পতন ঘটেছে। বিআরএস সরকারের প্রকল্পগুলির দ্বারা সমাজের প্রায় প্রতিটি অংশ উপকৃত। বরিষ্ঠ নাগরিক, অবিবাহিত নারী, বিধবা নারী, তাঁতি প্রভৃতিদের জন্য তাদের পেনশন স্কিম আছে, তাদের রায়তবন্ধু, রায়ত বিমা প্রকল্প অত্যন্ত জনপ্রিয়। একইভাবে রাজস্থানে অশোক গেহলতের সরকারকে উত্তরভারতের সবচেয়ে জনমুখী সরকার বলে মনে করা হত। ভাবা হয়েছিল ৫০০ টাকায় রান্নার গ্যাস দিয়ে তারা গৃহবধূদের মন জয় করে নেবে। এছাড়া তারা গিগ কর্মীদের জন্য সুরক্ষা প্রকল্প, চিরঞ্জীবী স্বাস্থ্যবিমা, পুরনো পেনশন স্কিম চালু করে নতুন ধরনের পপুলিজম চালু করেছিল। কিন্তু দেখা গেল শুধুমাত্র দেদার বিতরণ করলেই নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া যায় না। মনমোহিনী স্কিম করেও প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা এড়ানো যায় না। চতুর্থত তিনটি রাজ্যে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার (অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি) ফলে রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস এবং তেলেঙ্গানায় বিআরএস, সরকারের পতন হয়েছে। মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিং চৌহান প্রায় আঠেরো বছর মসনদে থাকা সত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে বিজেপি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে, সেখানে কিন্তু প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা কোনও কাজে দেয়নি। পঞ্চমত দেখা গেল বিশেষ কাউকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তুলে না ধরেও নির্বাচন হেলায় জেতা যায়। ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার ছয় ঘন্টা পরেও ছত্তিশগড়, রাজস্থানে বিজেপির কে মুখ্যমন্ত্রী হবে এখনও সেটা পরিষ্কার নয়। মধ্যপ্রদেশে তো প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা এড়ানোর জন্য বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শিবরাজ চৌহানকে সামনেই আনেনি, সচেতনভাবে তাঁকে আড়ালে রেখেছে। এর জন্য তারা বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী, সাংসদকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধ্য করেছে, যাতে মানুষ ভাবে বিকল্প মুখ্যমন্ত্রী তৈরি আছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সভায় শিবরাজ চৌহানকে খোলাখুলি উপেক্ষা করেছেন। ষষ্ঠত আজকের ভারতে হিন্দি বলয়ে যে কোনও ভোটে হিন্দুত্ব একটা ফ্যাক্টর, তা সে সাম্প্রদায়িক প্রচার হোক বা না হোক। মধ্যপ্রদেশে ২০২২-এ খরগোনে যেভাবে দাঙ্গা করা হয়েছিল, এবং যেভাবে মুসলিমদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল, বিজেপি স্পষ্টতই সেই নৃশংস ঘটনাবলি দ্বারা উপকৃত হয়েছে। সপ্তমত বিজেপি দক্ষিণভারতে প্রায় নেই, অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট করে (কর্নাটকে জেডিএস, অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআর, তেলেঙ্গানায় বিএসআর, যে জোট হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র) তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে হবে। উত্তরভারতে কংগ্রেসের অবস্থা তো আরও খারাপ। এদের কোনও জোটসঙ্গী তো দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হবে! এই দলটার সমস্যা হচ্ছে এরা যেখানে শক্তিশালী সেখানে এরা ছোট দলগুলিকে পাত্তা দেয় না, আর যেখানে এদের শক্তি কম সেখানে এরা জোট করার জন্য লালায়িত হয়ে থাকে।

এরপর আমরা রাজ্য অনুযায়ী এই ফলাফল বোঝার চেষ্টা করব।

 

তেলেঙ্গানা

প্রায় দশ বছর আগে এই রাজ্য গঠিত হওয়ার পর থেকে বিআরএস এখানে ক্ষমতায় আসীন। মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও রাজ্যে পুলিশরাজ কায়েম করেছেন। সর্বত্র মানুষের ওপর নজরদারি, শুধু হায়দ্রাবাদ শহরেই দশ লক্ষ সিসিটিভি লাগান আছে। কোনও ধরনের প্রতিবাদ আন্দোলন বরদাস্ত করা হয় না। গত অক্টোবর মাসে এনআইএ রাজ্যজুড়ে তল্লাশি চালিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের চরম হেনস্থা করে। কর্নাটকে মে মাসে জয়ী হওয়ার পর কংগ্রেস রাজ্যে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বিআরএসের কিছু নেতা কংগ্রেসে যোগদান করেন। মানুষ মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাওয়ের স্বৈরতন্ত্রী শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। কিন্তু এখন অবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভোটের হারের নিরিখে দুটি দলের মধ্যে পার্থক্য সামান্য— কংগ্রেস ৩৯.৭৪ শতাংশ, বিআরএস ৩৭.৯ শতাংশ। যেটা লক্ষ্যণীয় সেটা হল যে বিজেপি এই রাজ্যেও শক্তি বৃদ্ধি করেছে। ২০১৮-তে তাদের একটা আসন ছিল, এবার সেটা বেড়ে হয়েছে আট, ভোটের হার ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

 

ছত্তিশগড়

কংগ্রেসের ভোটের হার মাত্র এক শতাংশ খানেক কমেছে, কিন্তু আসন কমেছে ৩৩টা। দুটি ছোট দল অজিত যোগির জনতা কংগ্রেস ও বিএসপি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের প্রায় ১২ শতাংশ ভোট বিজেপির ঝুলিতে গেছে, তাদের আসন সংখ্যা ১৫ থেকে বেড়ে ৫৪ হয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী আদিবাসী অঞ্চলে কংগ্রেসের সিট কমেছে, গতবার তারা ২৫টি তফসিলি উপজাতি আসন পেয়েছিল, এবার সেটা কমে হয়েছে ১০। আদিবাসীদের যে মূল অভিযোগ বন কেটে রাস্তা, সিআরপিএফ ক্যাম্প করা কংগ্রেস সেটাকে কখনওই গুরুত্ব দেয়নি। উলটে যারা প্রতিবাদ করেছেন তাঁদের মাওবাদী বলে গ্রেফতার করেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার বন সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ বনাঞ্চলকে অরক্ষিত করে দিয়েছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক আদিবাসী মানুষ রাতারাতি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। কংগ্রেস কোনও রাজ্যেই এই আইনের বিরুদ্ধে প্রচার করেনি।

 

রাজস্থান

‘ইন্ডিয়া’ নামে যে জোট কয়েক মাস আগে তৈরি হয়েছিল সেটাকে যে ভোটের ময়দানে কার্যকারী করা প্রয়োজন সেটা আশা করা যায় কংগ্রেস এবার উপলব্ধি করবে। রাজস্থানে বিজেপির প্রাপ্ত ভোট ৪১.৬৯ শতাংশ, কংগ্রেসের ৩৯.৮০ শতাংশ। ছোট দল আরএলপি এবং ভারত আদিবাসী পার্টির প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৪ শতাংশ। আবেদন করা সত্ত্বেও কংগ্রেস জোট করার কোনও আগ্রহ দেখায়নি। প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দলের ক্ষতি করেছে। সচিন পাইলটের অনুগামী গুর্জররা কংগ্রেসের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত জনকল্যাণমূলক কাজ করে প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু এই ‘ডোল’ রাজনীতির নানা বিপত্তিও আছে। বিক্ষুব্ধ মানুষের একটা বড় অংশ গড়ে ওঠে যাঁরা এই প্রকল্পগুলির সুবিধা পাচ্ছেন না। আর আছে দুর্নীতি। প্রতি প্রকল্পের টাকার একটা বড় অংশ নেতামন্ত্রীদের পকেটে যায়। যোগেন্দ্র যাদবের একটি মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলছেন গেহলতের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া ছিল না, বহু বিধায়কের বিরুদ্ধে ছিল। দান-খয়রাতির ওপর নির্ভর করে যারা সরকার চালায় তাদের জন্য গেহলতের পরাজয় একটি অশনিসঙ্কেত।

 

মধ্যপ্রদেশ

এই রাজ্যের ফলাফল শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বহু বিশেষজ্ঞকেও বিস্মিত করেছে। বিজেপির আসন সংখ্যা ১৬৩, কংগ্রেসের ৬৬, ভোটের হার বিজেপির ৮ শতাংশ বেশি! ল্যান্ডস্লাইড! অথচ পনেরো দিন আগেও সবাই নিশ্চিত ছিল শিবরাজ চৌহান ওরফে বুলডোজার মামার সরকারের পতন নিশ্চিত। দলের ভিতরেও একই খবর ছিল তাই জন্য মরিয়া হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য অন্য ব্যক্তিদের খাড়া করার চেষ্টা হয়েছে। এই ফলাফলে বিজেপি নিজেরাই বিস্মিত। খরগোন দাঙ্গার কারণে মেরুকরণ বিপুলভাবে দলের পক্ষে গেছে। তবে প্রধান কারণ হচ্ছে কমল নাথ বাস্তবে বিজেপির থেকে আলাদা কিছু প্রচার করেননি। তিনিও নিয়মিত মঠ, মন্দির গেছেন, বাবাদের দর্শন দিয়েছেন, ভিডিওওয়ালাদের ডাকিয়ে এনে ঘটা করে পূজাপাঠ করেছেন। আরএসএস নাকি বলেছে যে কমল নাথ জিতলেও আমাদের অসুবিধা কিছু নেই। রামনবমীর সময় এত বড় দাঙ্গা হল, কত মুসলিমদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হল, কংগ্রেসের কোনও নেতা গেছেন সেখানে? ভয়! যদি হিন্দু ভোট চলে যায়!

কংগ্রেসকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা হিন্দু কার্ড খেলবে, না রাহুল গান্ধি তাঁর ভারত জোড়ো যাত্রায় বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি যে ইস্যুগুলো তুলে এনেছিলেন সেগুলো প্রচার করবে। ইন্ডিয়া জোট সম্পর্কে তারা কি সত্যিই সিরিয়াস? মনে করা হচ্ছে উত্তরের তিনটি রাজ্যেই ওবিসি ভোটের বিরাট অংশ বিজেপির ঝুলিতে গেছে। সেক্ষেত্রে জাতগণনার রাজনীতি কি হিন্দুত্বের বিজয়রথকে আদৌ আটকাতে পারবে?

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...