কোটায় ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর ক্ষত প্রসঙ্গে

সৌভিক ঘোষাল

 


শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ চেহারা দেখিয়ে দিচ্ছে কোটা কোচিং সেন্টারের ঘটনাবলি। একদিকে যেমন বিভিন্ন রাজ্য বা কেন্দ্রের বোর্ড ও কাউন্সিলগুলির প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দিচ্ছে এই কোচিং-নির্ভর পড়াশুনো, তেমনি অন্যদিকে তা ইঙ্গিত করছে শিক্ষার পণ্যায়ণ ও বেসরকারিকরণের চূড়ান্ত চেহারাটির দিকে

 

মাধ্যমিকের পরই ভারতের লাখ-লাখ শিক্ষার্থী নানা ছোট-বড় স্টেশন থেকে কোটার টিকিট কাটে। রাজস্থানের এ শহর শিক্ষামহলের কাছে বেশ কয়েক দশক ধরেই বেশ পরিচিত নাম। ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যাল প্রবেশিকার প্রস্তুতির জন্য এই শহরে পা রাখেন লাখ-লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও প্রচুর।

কেন কোটার কোচিং সেন্টারগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের এর ভিড় সেটা দিয়ে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। পড়ুয়াদের কথায়, প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যে বিষয়গুলি প্রাসঙ্গিক তার পুরোটা স্কুলের সিলেবাসে থাকে না। সেইসঙ্গে গত কয়েক বছরে মাল্টিপল চয়েসের প্রশ্নপত্রে ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রবেশিক পরীক্ষা যেভাবে হয়, তাতে সেখানে সফল হতে হলে অতি দ্রুত অসংখ্য প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের পড়াশুনো পদ্ধতি আমাদের প্রচলিত স্কুলশিক্ষাব্যবস্থায় থাকে না। কোটার কোচিং সেন্টারগুলি এই ধরনের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ছাত্রছাত্রীদের অভ্যস্ত করে তোলে। মোটা টাকার বিনিময়ে ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত ক্লাস, মক টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট ইত্যাদির পর্যায়ক্রমিক চাপ প্রতিদিন চলতে থাকে।

কোটা শহরের রাস্তা ধরে হাঁটলে চোখে পড়বে নানা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় কোন কোচিং সেন্টারের কতজন ছাত্র সুযোগ পেয়েছে, কারা কত উঁচুতে র‍্যাঙ্ক করেছে, সেই সব বিজ্ঞাপনে ফলাও করে সেসব লেখা থাকে। নামকরা নানা সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলেও এই সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন আসে অসংখ্য। তবে বিজ্ঞাপন যতই আকর্ষণীয়ভাবে কয়েকজনের সাফল্যগাথা প্রচার করুক না কেন, বাস্তবে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এখানকার কোচিং সেন্টারগুলিতে প্রস্তুতি নিলেও তার মধ্যে থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পায়। প্রকৃতপক্ষে, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় আসনসংখ্যা অনেক কম। এ কারণেই একটানা প্রস্তুতির পরও সুযোগ না পেয়ে বহু শিক্ষার্থী হতাশ হয়। অবসাদে ভোগে। একদিকে পরীক্ষায় সফল হতে না পারার যন্ত্রণা, অন্যদিকে পরিবারের বহু কষ্টে ব্যয় করা লক্ষ লক্ষ টাকা নষ্টের গ্লানি তাদের বিদ্ধ করতে থাকে। এই গ্লানি সহ্য করতে না পেরে অনেকেই আত্মঘাতী হয়। অনেকে আবার ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রস্তুতিপর্ব চলাকালীন পড়াশুনোর যে প্রবল চাপ তা সহ্য করতে না পেরে চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেই নিজেকে শেষ করে দেয়।

গত এক বছরে কোটা শহরে ২৭ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে রাজস্থানের সদ্যপ্রাক্তন অশোক গেহলট সরকার কমিটি গঠন করেছিল। সে-কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা করেছে। ছাত্র আত্মহত্যার প্রধান ছয়টি কারণ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে রিপোর্টে বলা হয়েছে যে কোটায়, শিক্ষার্থীরা জেইই এবং নিট-এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ দুটি পরীক্ষার সিলেবাস বড় এবং কঠিন। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের ওপর পড়াশোনার অনেক চাপ থাকে। এ চাপের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর অভিভাবকদের প্রত্যাশার বোঝাও থাকে। যা শিক্ষার্থীদের জন্য বিপজ্জনক। আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ এটি। কমিটি বলেছে, শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারের থেকে অনেকটা সময় দূরে থাকে। এটাও আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ। এ-ছাড়া সঠিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পড়ুয়ারা মানসিক চাপ সামাল দিতে পারে না। তাদের আচরণে কোনও পরিবর্তন হলেও নজরে পড়ে না। আর এ কারণেই অনেক সময় শিক্ষার্থীরা এ পদক্ষেপ নেয়। কোচিংয়ে নেওয়া পরীক্ষা এবং সেসব পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাচ নির্ধারণ করা হয়। কমিটির মতে, এ কারণে শিশুদের ওপর মানসিক চাপ থাকে এবং অনেক সময় তারা ভুল পদক্ষেপ নেয়। কমিটি প্রতিবেদনে যথার্থভাবেই জানিয়েছে যে, কোচিং ইনস্টিটিউটের ব্যস্ত ক্লাস শিডিউল এবং তাদের বিশাল সিলেবাসও শিশুদের আত্মহত্যার কারণ হচ্ছে। কোচিং ক্লাসগুলোতে ছুটি নেই। এ-কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি চাপ পড়ছে। আর সেটাই আত্মহত্যার বড় কারণ বলে দাবি করা হয়েছে কমিটির রিপোর্টে। কমিটির মতে, পড়াশোনার চাপের মাঝে ছুটি না থাকায় মানসিক চাপের মধ্যে থাকে শিক্ষার্থীরা। এর ফলেই বছরভর চলতে থাকে আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনাগুলো।

পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে কোটায় ছাত্রমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৫। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ২০, ২০১৭-তে ছিল ৭, ২০১৬ সালে ১৭ এবং ২০১৫-তে ১৮ জন। চলতি বছরের আগস্ট মাসে সেই সংখ্যা ২৪ ছুঁয়েছে। ২০২১ সালে কোটায় পড়তে আসা পড়ুয়ার সংখ্যা ছিল ১ লাখের বেশি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সেই সংখ্যাটাও। ২০২৩ সালে হিসেব দেখলে বলা যায়, সংখ্যাটা ২ লাখ ছাড়িয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কোটায় আসা পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আত্মহত্যার সংখ্যাও। আত্মহননের ঘটনায় লাগাম টানতে জেলা প্রশাসনের তরফে হস্টেলে সিলিং ফ্যান, স্প্রিং লাগানো এবং বারান্দায় জাল লাগানোর নির্দেশ দিয়েছিল হস্টেল কর্তৃপক্ষকে। সেইমতো ব্যবস্থাও নেন হস্টেল কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের নিয়মিত কাউন্সেলিং করানোর ব্যবস্থাও নিয়েছেন তাঁরা। তারপরেও রাশ টানা যাচ্ছে না আত্মহত্যার প্রবণতায়।

শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ চেহারা দেখিয়ে দিচ্ছে কোটা কোচিং সেন্টারের ঘটনাবলি। একদিকে যেমন বিভিন্ন রাজ্য বা কেন্দ্রের বোর্ড ও কাউন্সিলগুলির প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দিচ্ছে এই কোচিং-নির্ভর পড়াশুনো, তেমনি অন্যদিকে তা ইঙ্গিত করছে শিক্ষার পণ্যায়ণ ও বেসরকারিকরণের চূড়ান্ত চেহারাটির দিকে। প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ের বাস্তবতা ও যান্ত্রিকতাও কোটা কোচিং সেন্টারগুলি প্রতিফলিত করে চলেছে।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...