জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী

পয়ারে লুকানো কান্না

 

ফুল্লরা

ওলো রাকাচন্দ্রমুখী ষোড়শী বালা,
তুই কেন এলি হোগলাপাতায় ছাওয়া
এই নরম কুঁড়েঘরে এত সেজেগুজে?
ভাঙা চালের পরে যার একলা খঞ্জনী নাচে
এই জীর্ণ কুটির আমার সাতমহলা প্রাসাদ
ওই মাটিয়া পাথর আমার অসময়ের গুপ্তধন
ঘরের কোণায় আদ্যিকালের আঁধার তোরঙ্গে
গাদাগাদি করে কেমন রাখা আছে দেখ—
ঐরাবতের ওপড়ানো দাঁত, বারশিঙ্গার ন্যাজের সুতা,
মদ্দা মহিষের ভাঙা শিং, হারা বাঘিনীর ডোরাদার ছাল।

হাটে-বাটে, দোরে দোরে বাসী মাংস বেচতে গিয়ে
তোর সখীর বুকের নাগকেশরের ঘ্রাণ হারিয়ে গেছে
আমার গায়ের বুনো গন্ধ বীর সোয়ামির ভারী প্রিয়
কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর কোনও সুদীর্ঘ রাতে যখন
কালকেতু ব্যাধের সর্বাঙ্গ জ্বলে মদন অনলে
আমার তুচ্ছ খুঞার বসন খুলে নেয় আলগোছে
হরিণছড়ার শয্যায় যখন তার বজ্র আলিঙ্গনের
একমাত্র ভাগীদার হয় এই হতভাগিনী
তখনও মলিন কুপির ধোঁয়া ধোঁয়া আলোয়
পেছনের দেওয়ালের ওপর অতর্কিতে হানা দেয়
বরাহীর অবরুদ্ধ রতিইচ্ছা, বুড়ো ভল্লুকের বিলাপ,
সিংহরাজার হতাশ হাহাকার, সজারুর আশঙ্কার কাঁটা!

তোর থিরবিজুরি হাসি, ক্ষীণ কটি, উর্বশীসম রূপজাল
সব নিয়েথুয়ে তুই ফিরে যা আপন পতিগৃহে;
এই ফুল্লরার বারোমাসী দুঃখের ঝলমলে পসরা,
কিরাতকন্যার পয়ারে পয়ারে লুকানো কান্নার থেকে
বহু-বহু দূরে ভালোয় ভরা স্বর্ণালী কাননে
ও আমার প্রাণের সই, আমার কলমিলতা,
শেষবার বলছি, যা, ফিরে যা তোর নিঃসঙ্গ স্বর্গে!

 

বেহুলা

গড় করি মা মনসা তোমার পদ্ম দুটি পায়
কলার মান্দাসে মৃদুমন্দ ভেসে যাই জাতিস্মরা নারী
সায়বেনের ঝি বেহুলা আমি, আর-জন্মের বাণসুতা ঊষা
কোলে নিয়ে ভেসে যাই গয়না-গায়ে স্বামীর সুন্দর শব
বৃথা গেল যত লোহার বাসর, কঙ্ক-নেউল, ওঝা-ধন্বন্তরি
বিধির লিখনে হায়, বিয়ের রাতেই সিঁদুর মুছে হলাম রাঁড়ি
কালনাগের কামড়ে কালি হল হৃদয়ের হরিদ্রাসম গৌরবরণ
আর এখন তো বাতাসে পাঁচমাসের পচা মড়ার গন্ধ ঘনিয়ে আসে,
নকশিকাঁথার মতন মুড়ে রাখে জন্ম-অভাগিনীর সিক্ত শরীর
গাঙুরের গাঢ় জলে প্রতিপদ চাঁদের ছায়া নৌকা হয়ে ভাসে

দূরের তারার অশ্রু অঘ্রাণের রাতে শূন্য সিঁথিতে ঝরে পড়ে

বিজন ভেলায় চড়ে অলীক দম্পতি একযোগে পার করি ক্রমে—
কামুক নুলো বড়শিয়ার বাঁক, ক্ষুধার্ত গৃধিনী শকুনির ঝাঁক
উগ্র ব্যাঘ্রের সবুজ আস্তানা, বাদাবনে শ্বাসমূলে ভরা পাঁক
বটবৃক্ষের রুগ্ন গর্ভে পোড়ামাটির কঙ্কাল দেখলাম নদীর পাড়ে;
যেখানে দুটো মোটা জোঁক চুষে নিল বিবর্ণ মৃতের শেষ রক্তবিন্দু
কামট কুমিরের দল লেজের ঘা দিয়ে গেল সাজানো সোনার কলসে
রাঘববোয়াল মহানন্দে চিবিয়ে খেল আমার লখিন্দরের মালাইচাকি
জীর্ণ পতির শেষ কটা হাড় শক্ত করে বেঁধে নিয়েছি মলিন আঁচলে
এবার তবে দেবী, বলে দাও মোরে, কোথা গেলে পাই তব মহার্ঘ্য দর্শন
ঘাগরা ঘুঙুর পরে এক পায়ে নেচে গলাই তোমার মনের জমাট কাঁচপাথর
সাধের স্বামী, পূজ্য ভাসুর সব একে একে বাঁচিয়ে, সপ্ত মধুকরে দুলে দুলে ফিরি
চম্পক নগরী অবশেষে বিজয়িনী এক ডোমনীর বেশে।

 

খুল্লনা

কিরে দিলাম শুকপাখি তোকে, সারির মাথা খাস
খুল্লনার কান্না বয়ে এক্ষুনি উড়ে যা গৌড় নগরী
রূপ বদলিয়ে কোনও অতিকায় গতিচিল বেশে
সদাগর সোয়ামির ঘুম ভাঙা তোর সুমধুর গানে
তার সুরে যেন জেগে থাকে ছাগচারণের পটভূমি
আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিবি ঠিক আমার বনবাস দশা,
অভাগীর বৃক্ষমাসের লগ্নক্ষণ, ঝরা পাতাকুড়ানির পেশা;
গায়ের জীর্ণ খুঞার বসন, তাজা কালশিটে দাগ যত—
আপন চঞ্চে মায়া করে এনে নরের বাণী, শোনাবি সাধুকে
লহনা দিদির সব নিঠুর ব্যাভার, তার গালি লাথি কিল সহ!

পরিহাসছলে লুকিয়েছিলাম ধনপতির সাধের লোটন
নির্বোধ নারী, সেই দোষে বুঝি আজ ঢেঁকিশালে শয়ন
আলুনি খুদের জাউয়ে না জুড়োয় এ পাপী উদরদহন
গোবিন্দদাসের গীতে যেমন বাদলার রাতে লোকচক্ষু লুকিয়ে,
শত বাধা সয়ে, কালিয়ার অভিসারে যায় পাগলি রাধারানি
তেমনি দীর্ঘ দুপুরের আড়ালে নদীনালা ডিঙ্গোই বালা একাকিনী
কুশ কাঁটা বিঁধে আলতারাঙা পায়ের ছাপ পড়ে পাথুরে মাটিতে
ছাগলের পালের সাথে রোজ পার করি কত অলস গেরস্থপাড়া,
লক্ষ্মীমন্ত ধানের মড়াই, রুক্ষ টিলার টঙে মানিকপিরের মাজার,
অজয়ের চরের চারিপাশে জল দিয়ে আঁকা শৌখিন নকশিজাল।

জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে পাঁচশো বছরের বুড়ো বটের শীতল ছায়ায়
আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকি দুঃখমতী, যেন কুঞ্জবনে কলহান্তরিতা
যখন পানাপুকুরের পদ্মপাতায় ফোঁটা ফোঁটা আঁধার টলটল করে
ভেজা ভেজা রাত অল্প করে জমতে থাকে বকুলবনের মাথার ’পরে
ঘুমঘোরে পিঁপড়ের কামড়কে ভুলে ভাবি বুঝি মদনশরের মৃদু জ্বালা।

ও মোর পরানপক্ষী, আমার স্বর্গশুক, তোকে গড়িয়ে দেব সোনার পিঞ্জর
বিরহী বসন্তের দোহাই দিই তোরে, ফিরিয়ে আন মিঠে গানের সুরে সুরে
দোজবরে স্বামীর সোহাগ, খ্যাঁকশিয়ালের কামড় হতে অক্ষত সর্বশী ছাগী
পুনরায় সতীনের হাতের সেবাযত্ন, হারানো কর্পূর-তাম্বুলের সুঘ্রাণ,
মা মঙ্গলচণ্ডীর মাটির ঘট আর বাকি যত মেয়েলি পাঁচালি-ব্রতকথা।

 

লহনা

ও আমার প্রাণের দোসর দাসী দুবলা
তোরে ভেট দিব চাঁপাকলার কাঁদি দুই
ঝলমলে কানপাশা, ধামাভরা মিহি খই
সাতকাহন কড়ি, দু-গালভরা গুয়াপান
ঝাঁট গিয়ে ধরে আন বামনি লীলাঠাকুরানি
তার বিদ্যেবুদ্ধি, পাঁজিপুঁথি পেঁটরা বোঝাই করে
অস্থান-কুস্থান হতে বারবেলায় গিয়ে জুগিয়ে আন
শ্বেতকাকের কাঁচা রক্ত, কালো কুকুরের পিত্ত
বুড়ি শকুনের হাড়গোড়, নাগিনীর শুকনো ছাল
কোনও তন্ত্রমন্ত্র পড়ে, যা-খুশি ওষুধবিষুধ করে
ফিরিয়ে দে শয়নঘরের অন্তরঙ্গে ধনপতি স্বামী
চতুর বেনিয়া পাটশাড়ি আর পাঁচ পল সোনা দিয়ে
কিনে নিল ভারি সস্তায় বাঁজা স্ত্রীলোকের সব সুখ
পায়রা উড়াতে উড়াতে সাধু ইছানি নগরে গিয়ে
উড়িয়ে আইল মনের শান্তি, রাত্তিরের যত নিদ্রা
ফের বিয়ের টোপর পরে, বিভা করে আনল ঘরে
নিদারুণ সতা, আমার খুড়ার কন্যা খুল্লনা
সদ্যগড়ানো খাটে শুই একা ন্যাকড়ার পুতুল জড়িয়ে
মহলা বাড়িতে চলতে ফিরতে হঠাৎ চোখে পড়ে যায়
সদাগরের নতুন সাজগোজ, যত পিছিলা পিরিতি
দ্বাদশী বহিনের বুকে বড় যত্নে বাড়তে থাকা
বাদল মাসের প্রথম কদমফুল

রন্ধনশালের অধিকারী সেজে সময় কাটাই অগত্যা
শোলমাছের ঝাল রাঁধি, ঘি জবজবে খাসির ঝোল
রাঁধতে রাঁধতে রুপোর রূপে পড়ল কালি
হঠাৎ ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় চক্ষে আইল জল
চুলার আলতো আঁচে চওড়া কপাল পোড়ে
ফুঁ দিতে গেলে দীর্ঘশ্বাসে ভিজে উনুন নেভে
ছাইপাঁশ দিয়ে চেপেচুপে রাখি মনের দাবানল
সন্ধ্যা ঘনালে জাফরিকাটা জানালা দিয়ে বাহিরপানে চাই
অন্নভরা থালার মতো গোল জেগে ওঠে শিবার স্যাঙাৎ চাঁদ
বাগানে আমড়াকাঠের দোলনায় দোল খায় বাসি টগরের শব
তিন্তিড়ির ডালে বসে নিমপ্যাঁচা নিচু স্বরে মরণ মরণ ডাকে
সতীনের চুলের মতো দীর্ঘ কালো রাত আমার পানে দু-হাত বাড়ায়
রেড়ির বাতির আবছা আলোয় অমঙ্গলের নরম ছায়া
ঘরের কোনায় ইকড়িমিকড়ি খেলতে চায়

তার চেয়ে ঢের ভালো হয় সখী, আয় মোরা তিনজনে মিলে
মঙ্গলকাব্যে উপেক্ষিতা করুণ ডাইনি হয়ে আগুনের স্তব করি
মিথ্যে বিলোই অকাতরে, স্পষ্টাক্ষরে লিখি কোনও জালে ভরা চিঠি
যাতে লহনা মেচেতায় মলিন মুখ, অর্ধপক্ক রুক্ষ কেশ আর
বাতাসে ঝোলা বুক নিয়েও জিতে নেয় সোয়ামির আদর
ছোটবউ এই ফাঁকে মাঠে-বনে খুঞা পরে চড়াক ছাগল।

 

সনকা

বুকফাটা শাপমন্যি করি তোরে কঠিন কালনাগিনী
ভরসন্ধেয় ঘরের চালের বাতায় লুকায়ে রইলি পাপী
নিদালি ঘুমালির মন্তর পড়ে ভাতের হাঁড়িতে মিশালি কী?
বড় যত্নে সুবর্ণথালে মৃত্যু বাড়িয়া দিলাম ব্যঞ্জন সহকারে
বৈশাখী ঝড় যেমন হেলায় খেলায় ভাঙে বুলবুলির বাসা
দৈবদোষে মরিল তেমনি পরান পুত্তলি সব সুজন কুমার
বিষম বিষের জ্বালা জুড়োই বাছার শরীরে লেপে চন্দনচূর্ণ
মনসার মায়াজালে পাটনে গেলা প্রাণনাথ ভাসিয়ে মধুকর

এই জন্ম অভাগিনী দিনদুপুরের মন্দ স্বপনে দেখতে পাই

ধবল হিজল গাছের মগডালে প্রিয় পুত্রবধূ ঝুলে আছে
শোকজলে শাপলাফুলের মতন মৃদু ভেলায় ভেসে যায়
ছয় পুত্রের শ্বেত শবদেহ; আধোতন্দ্রায় বাতাসে ক্ষীণ জাগে
নিশাকরের কোটরে বন্দি রাতকানা নিশিবকের ডাক
বাৎসল্যের যত চুনোমাছ উদবেড়ালে এঁটো করে যায়
স্বপ্নের ভিতর উঠে বসে দেখি কালিদহে সপ্তডিঙা ডুবিয়ে
কটিতে কানি-জড়ানো চাঁদোরাজার সোনাবাঁধানো হাসি

ওহে পদ্মাবতীর সেবাদাসী, কুটিল সর্পিণী গন্ধজয়কালি
তোমায় দিব দাড়িম্বগাছের তলে পুঁতে রাখা খণ্ডিত নাড়ি,
চিনি আর কলা দিয়ে মেখে দিব কুমারী মায়ের বুকের দুধ
দিব সনকা সুন্দরীর সব হাহাকার, সর্পাঘাতের শোকগাথা
জাগরণের পালায় ত্রিপদী ছন্দে বন্দিব তোমায় গীতিবাদ্যে
হেমঘটে ধানদুব্বো দিয়ে, গন্ধপুষ্পে পূজিব দেবী বিষহরি
দয়া করি অসহায়া নারীকে, আসিও না কভু চম্পক নগরে
পঞ্চম মাসের গর্ভে ধরেছি যে সর্বাঙ্গসুন্দর সর্বগুণী সন্তান
আসিও না সরু ছিদ্রপথে সেই লখিন্দরের লোহার বাসরে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. Hey, rumislots is pretty sweet! Been spinning those virtual reels and landed some nice payouts. The game selection is awesome, and it keeps me entertained for hours. Give it a shot, you might get lucky rumislots!

Leave a Reply to lodibetcom Cancel reply