ডন, তাকে (কেন) ভালো লাগে

সত্যব্রত ঘোষ

 

গত ১লা মে কলকাতার জ্ঞানমঞ্চে ‘চেতনা’ নাট্যগোষ্ঠী তাদের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘ডন, তাকে ভালো লাগে’ নাটকটি তৃতীয়বার জনসমক্ষে আনল। নব্বই দশকে অরুণ মুখার্জি রচিত ‘দুখিমুখী যোদ্ধা’র পরিমার্জন করে তা মঞ্চস্থ করলেন সুজন মুখার্জি। মুখ্য চরিত্রটির রূপদানে সুমন মুখার্জি। সঙ্গীতধর্মী এই নাটকের সুরারোপের দায়িত্বে আমরা সশরীরে প্রবুদ্ধ ব্যানার্জিকে পেয়েছি। নিবেদিতা মুখার্জি, সতীশ সাউ, অমিতাভ ঘোষ এবং অন্যান্যদের দক্ষ অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই নাটক।

কিন্তু কেন ভালো লাগে ডনকে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে স্থান ও কালের বেড়াজালকে নাকচ করে দিতে হবে আমাদের। এটাও মেনে নিতে হবে, মঞ্চের পরিসরে ইতিহাস, সাহিত্য, সাম্প্রতিক রাজনীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সঙ্গে মনোরঞ্জনী উপাদানগুলি মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে। ক্ষয়িষ্ণু এক সমাজে বেঁচে আছি বটে। তবে ক্ষয়কে নিয়তি বলে মেনে নিলে চলবে না আমাদের। রক্ত-ঘাম-অশ্রুতে ভেজা পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়াটা প্রয়োজন। অবিরত যন্ত্রণা সয়ে এই যাত্রা পলায়নপরতা না, অন্তর্মুখী এক খননই। সারল্য আর বিশ্বাসকে এভাবেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

চারশো বছর আগে সারভান্তিস যখন ‘ডন কিহোতে’ রচনা করেন, ইউরোপীয় ইতিহাসে নাইটরা তখনও হয়তো বীরবিক্রমে ঘোড়ায় চড়ে টহল দিত ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে। বর্মধারী সেইসব সশস্ত্র প্রহরীদের মারকুটে স্বভাবকে আড়াল করতে শিষ্টাচার এবং রোমাঞ্চকর প্রেমের কতই না নিশান রয়ে গেছে সুগন্ধী সাহিত্যের পাতায় পাতায়। কিন্ত সারভান্তিস-এর মন যে ডনের জন্ম দেয়, তার শৌর্য কল্পিত বটে, কিন্তু আরোপিত নয়। হাওয়াকলকে দানব ভেবে ডন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, কিন্তু পরাজয়ের মুহূর্তে সে দেখে তার শত্রু হাওয়াকলের রূপ নিয়েছে। বিধ্বস্ত ডনকে দেখে হাসি যেমন পায়, তেমনি একটি প্রশ্নও জাগে মনে। দুর্বলের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের নিরন্তর প্রচেষ্টাও কি ওইভাবে শাসনচক্রে বারবার পরাভূত হয়?

শুভময় দত্ত নামে এক নাট্যরচয়িতাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে গ্রেপ্তার করে জেলে আনে পুলিস। ব্যারিকেড রূপান্তরিত হয় জেলের গারদে। পশুদের মুখোশ পরে যারা ব্যারিকেডের ওপার থেকে প্রতিবাদে মুখর ছিল, গারদের আড়ালে পৌঁছে তারাই শুভময় দত্তর বিচারসভা আয়োজন করে। চিটফান্ডের কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত কাণ্ডারীকে আমরা এবার বিরোধী উকিলের ভূমিকায় দেখি। শুভময় দত্ত কয়েদি হবার উপযুক্ত কিনা তা নিয়ে সে সওয়াল করে। আত্মপক্ষ সমর্থনে শুভময় দত্ত গারদঘরটিকেই মঞ্চ বানায়। ‘প্রপস’ লেখা ট্রাঙ্ক থেকে পোশাক, পরচুলা আর অন্যান্য জিনিসপত্রগুলির সাহায্যে কয়েদিরা এবার শুভময় দত্তের রচিত নাটকের পাত্রপাত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। শুভময় দত্ত হয়ে যায় স্পেনের আলেন্সো কুইজানো, যে বিশ্বের কল্যাণের জন্য নিজেকে ডন কুইহোটে ভেবে অভিযানে বার হয় সাঞ্চো পাঞ্জা-কে নিয়ে। শুভময় দত্তের আন্দোলনের একনিষ্ঠ সঙ্গী সত্রাজিত রায়কেও কয়েদ করেছে পুলিশ। এখন সে ডনের অভিযানে সঙ্গী।

শুভময় দত্ত থেকে ডন কুইহোটে-তে অনায়াস বিচরণ আমরা মঞ্চে দেখি, তার কৃতিত্ব অবশ্যই সঙ্গীতায়োজক প্রবুদ্ধ ব্যানার্জির। দেশের মাটি থেকে বিদেশে পৌঁছে যাবার যে স্বাভাবিক এবং দৃশ্যমান নাট্যপদ্ধতি পরিচালক এখানে ব্যবহার করেছেন, তাতে চমক দেবার কোনও প্রচেষ্টা নেই। আছে ঘটমান বর্তমানের অস্থির প্রেক্ষিতকে সুদূর অতীতের এক স্বপ্নপুরণের বৃত্তে খুঁজে পাবার ইচ্ছা। দক্ষ অভিনয়ের গুণে যা বাস্তব ও স্বপ্নের বিভেদ মুছে দিয়ে কল্যাণময় এক ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে।

ডন এসে পৌঁছায় এক দুর্গে, যা আদতে এক সরাইখানা। সেই সরাইখানায় অতিথি হয়ে যারা আছে, তাদের হাস্যোল্লাস দুর্গে অপেক্ষমাণ সৈন্যদের মতোই। আলটিসিদোরা এবং অন্যান্য পরিচারিকারা সেখানে তাদের মনোরঞ্জনে সদা সক্রিয়। আলটিসিদোরার মধ্যে ডন খুঁজে পায় তার নায়িকা দুলসিনিয়াকে। দুলসিনিয়ার সম্মান রক্ষার্থে ডনকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। এই লড়াইতে জিতে ডন তার আকাঙ্ক্ষিত নাইটহুড পেলেও আলটিসিদোরা কিছুতেই দুলসিনিয়া হতে চায় না। মেলে না। ডনের গৌরবও ইতিমধ্যে ধূলিসাৎ। জিপসিরা তাকে সর্বস্বান্ত করেছে। অবসন্ন ডন আবার সরাইখানায় পৌঁছালে জানতে পারে আলটিসিদোরাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে প্রতিশোধ নিয়ে গেছে পেদ্রো এবং তার অনুচরবৃন্দ।

আলেন্সো কুইজানোর নিজের গ্রামে স্যামুয়েল কারাস্কো যুক্তিজাল বিস্তার করে ডন কুইহোটের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে পাগলের প্রলাপ বলে। সেই যুক্তিগুলির সঙ্গে কয়েদপ্রাপ্ত চিটফান্ডের মালিকের ধুরন্ধর সওয়াল লক্ষণীয়ভাবে এক হয়ে যায়। শুভময় দত্তের বিপ্লব তার চোখে কল্পনার মায়াজাল ছাড়া আর কিছুই নয়।

অবসন্ন কুইজানো যখন মৃত্যু প্রতীক্ষায় বিছানায় শুয়ে, আলটিসিদোরা তার কাছে আসে। কুইজানো নয়, সে দুলসিনিয়া হয়ে তার ডন কুইহোটের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। চিরলাঞ্ছিতা সে। তবু ডন যে তাকে সর্বদা ‘মহীয়সী নারী’ বলে সম্বোধন করে। তার সম্মান বাঁচাতে দশজনের সঙ্গে লড়াই করে। শিষ্টাচার মেনে প্রেম নিবেদন করে তার কাছে। কুইজানো যখন স্বয়ং ডনকে ভুলতে বসেছে, আলটিসিদোরা তখনই দুলসিনিয়া রূপে এসে সবাইকে জানিয়ে যায়, নিছক যুক্তির জালেতে ডন কুইহোটেকে আটকে রাখা যাবে না। শুভময় দত্তদের মতো অপ্রতিরোধ্য যোদ্ধাদের মধ্যেই ডন কুইহোটে যুগযুগান্তে বেঁচে থাকবে। এই আশাটুকু জিইয়ে রাখবার জন্যেই ডনকে ভালো লাগে৷

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.