শ্রাবণঝুলাতে, বাদলরাতে

কস্তুরী সেন  

 

বর্ষা নিয়ে ক্রোড়পত্র, তাতে লেখার প্রস্তাব এলে প্রথম চোটে বাঙালিমাত্রেই প্রবল উৎসাহে ঘাড় নাড়বেন। বাঙালির প্রথম চোট বিষম বস্তু। কিন্তু তা কেটে যাবার পর হাতে পড়ে থাকে রুমাল। বর্ষা নিয়ে লেখা কী হবে? মৌসুমি বায়ু? আষাঢ় শ্রাবণ এই দুই মাস নিয়ে বাংলাদেশে বর্ষাকাল? ‘স প্রত্যগ্রৈঃ কুটজকুসুমৈঃ কল্পিতার্ঘ্রায় তস্মৈ…’?, শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথের চিঠি ‘সমস্ত আকাশ অন্ধকার করে নিবিড় হয়ে জমে এসে বৃষ্টি আরম্ভ হল। আমার নীচের ঘরের শার্সি বন্ধ করে বসে বসে মেঘদূতের উপর প্রবন্ধ লিখছি।’?— এবং ইত্যাদি এই যা যা?

কিংবা বর্ষার ভূগোলপরিসংখ্যান। বাংলাদেশে বর্ষাসমাগমের আনুষ্ঠানিক সময় যেমন, নির্ধারিত জুনের পয়লা সপ্তাহ, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে বর্ষা ঢোকার দুটি ভিন্ন শাখা, বঙ্গোপসাগরের বায়ুপ্রবাহের উপর নির্ভর করে অন্ধ্রের এক অংশ, ওড়িশা ইত্যাদি হয়ে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে একটির প্রবেশ, অন্যটি মায়ানমার আন্দামান হয়ে উত্তরবঙ্গে ঢুকতে যে পূর্বমেঘ পথ আঁকে তার একটি নিটোল ব্ল্যাকবোর্ড ছক হল বর্ষাকাল?

নয় যদি, তো বর্ষা তবে কী! ভূগোল, আবহাওয়া, সাহিত্যের বাইরে, ‘যদি’ ‘কিন্তু’ ‘তবু’ ছেঁটে এই দুহাজার আঠেরো সালে দাঁড়িয়ে ঠিক কেমন সে ব্যাপার? এইখানে এসে ক্ষণকাল তিষ্ঠোলে দেখা যায়, বর্ষার কিছু রকমফের রয়েছে। কলকাতা শহরে, তার বাইরে এবং তদধিক বাইরে নানাবিধ দিগদিগন্ত তার।

জুন শেষ জুলাই শুরুর শহরে অ্যাসফল্ট ভিজিয়ে প্লাস্টিকের ঠোঙা উড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে হঠাৎ ধেয়ে আসা পুবে বাতাস আর সোঁদা গন্ধ সহযোগে যে বর্ষা নামে প্রথম, সে বর্ষা দক্ষিণ কলকাতার ছাদে বেল জুঁইয়ের টবের, সে বর্ষা রবীন্দ্রসরোবরফেরত অথবা মনিস্কয়্যারমুখী যুগলের, সে বর্ষা ইউটিউবে সলিল চৌধুরীর ‘শন শন শন বহে হাওয়া/মিছে গান গাওয়া’ কিংবা মানবেন্দ্র মুখার্জির ‘দেখেছ কি হায় বাদলধারায়, দিগন্ত আজ যায় ভাসি/বন্ধু হে পরবাসী’ জাতীয় পাঁচের দশকের জনপ্রিয় বর্ষাগানগুলির… এইবার এই সোঁদাগন্ধ বর্ষাবাতাস মধ্য কলকাতায় গিয়ে ম’ ম’ করছে শিককাবাব জুঁই আতরের বর্ষাখাস গন্ধে, সেখানে ‘শ্রাবণ প্রায় ভাদ্রমাস’, ব্যান্ডওয়ালা, যানবাহন, হইহট্টগোল, গহন বোরখায় একপাক খেয়ে শিয়ালদা স্টেশনের দিকে সন্ধের মুখে উড়ে গেল সেই সজল বাতাস, তখন তার গায়ে যুবক হিমসাগর নতুন কাঁঠালের রমরমে সুবাস, তখন তার গায়ে স্টেশনবাজার থেকে কেনা প্লাস্টিক বাঁটের ফুলছাপ লেডিজ ছাতার জৌলুস, সেই লেডিজ ছাতা যে লেডিজ ছাতা ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটে সাতটা পাঁচের বনগাঁ লোকাল ধরার আগে অফিসের রেক্সিন ব্যাগ থেকে দু’টাকার রেজগি ফেলে দিয়ে যাচ্ছে স্টেশনের, উড়ালপুলের, শপিংমলের সামনে, ট্রামরাস্তার গা লাগোয়া চিলতে ঘাসে ইটের উনুন পেতে বসা রমণীটির কাছে, মধ্যরাতে অলৌকিক তিলককামোদে শহর জুড়ে মেঘ ডেকে উঠলে যে সরাবে তার ত্রিপলসংসার, যে দেখবে হোঁচট খাচ্ছে, উঠছে পড়ছে, শালপাতা গুটখাপ্যাকেট, ছেঁড়া কাগজ, ড্রেনউপচোনো ফুটপাথের জলে ঘুরপাক খাচ্ছে, হেসে উঠছে তার এক, দুই, পাঁচ বছরের কোমরে ঘুনসিবাঁধা নবীন আষাঢ় সব।

আর শহরতলির ট্রেন ধরেছিল সেই যে ঊর্ধ্বশ্বাস রঙিন ছাতা? বারাসাত, হাবড়া, বামনগাছি, ওদিকে বসিরহাট, সন্ডালিয়া হয়ে সে নামছে কোথায়? সেখানেও তো সন্ধের ঝোঁকে ঝুপুরঝুপ নামল একপশলা, রেলস্টেশনের গায়ে লাইন টেনে ইলেকট্রিক বাতি জ্বলে উঠল সিডির দোকানে, দোকানের সামনে ছপছপে জলে কোচিংফেরত সাইকেল, মঙ্গল বৃহস্পতি শনিবারের হাটে মেঘ করে এল মাঝদুপুরে, ইলিশ ধরার বড় ছন জাল সেলাই হয়ে রপ্তানি যাবে বর্ডারের দিকে এই ঘোর মরসুমে, বর্ষার ফনফনে কাঁচকলা, নটেশাক, বাতাবি, ধুঁদুল, এক বিঘতের উপর লম্বা লাউ— তারা রপ্তানি যাবে উল্টোমুখে ফের সদর কলকাতার দিকে, তাদের যাবার পথে পাকা রাস্তায় শুকোতে দেওয়া ধান, আচমকা বৃষ্টি এসে পড়লে রে রে করে ছুটে আসবে যে বালক, পঞ্চাশ বছর আগে সে স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে আষাঢ়ুর হাটে তামাকের দোকান দেবার। রাস্তা পেরিয়ে হাইওয়ে, হাইওয়ের দুধারে দিগন্তসীমা বেয়ে যতদূর চোখ যাবে বর্ষার জলে সটান দাঁড়ানো ধানগাছ, ছুটন্ত ট্রেকারের মাথায় মাথায় ঘনিয়ে আসা মেঘে অন্ধকারে অনাদি আষাঢ় অনন্ত শ্রাবণ মাস।

সীমান্তের এপারে যদি ঘনঘোর নামল আষাঢ়, সেই আষাঢ়ে ভিজে ভিজে গোপনে তবে ওই পারে চালান যাবে কী? জানা যাচ্ছে ১৯৭০ সাল নাগাদও নাকি দক্ষিণ কলকাতার বাঘাযতীন মোড় থেকে সোজা তাকালে চোখে পড়ত রেললাইন। অতঃপর টিনের ছাউনি, ছিটেবেড়া, চালের উপর ভরাবৃষ্টির জলে পুরন্ত কুমড়োলতার স্মৃতি তুলে এনে ওই রেললাইন কলোনির ওধারে নিছক অন্য দেশ। পূর্বপুরুষের সাতচল্লিশ, একাত্তর পার হয়ে এখন রাতের বাসে বরিশাল, যশোর, খুলনা, নড়াইল; বিশাল ফেরিতে মধ্যরাতের বর্ষার পদ্মা পেরিয়ে ‘ঝিককির ঝিককির মৈমনসিং/ঢাকা যাইতে কত্তদিন!’, এখন কাঁটাতারের ওপার থেকে বত্রিশ বছরের বিরহী যুবকের চিঠি নিয়ে আসা, সাজাদপুরের অবিশ্রান্ত আদিগন্ত মেঘসমারোহ বর্ষার ছবি এক, স্বপ্নময় এক দ্যাশের বর্ষার ছবি, সাতচল্লিশের বর্ষাকাল থেকেই তো যে দেশ তার মধুমতী, ধলেশ্বরী, আড়িয়াল খাঁ’র বুকের উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া পরিচিত মেঘের ছায়া সমেত নিতান্ত বিদেশ এক, যে বিদেশ আরও পঁচিশ বছর পর এক কালবৈশাখী বৃষ্টির মার্চেই হয়ত (মার্চ ২৬) দুপুর আড়াইটেয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে এম.এ হান্নানের কণ্ঠে শুনবে স্বরাজের প্রথম ঘোষণা।

বর্ষা, আদতে বোধহয় বৈপরীত্যই অতএব একরকম। পাওয়া এবং না পাওয়ার, বৃষ্টি এবং নীরব মেঘের, সুরের ও দৈন্যের, ফিরতে চাওয়া ও ছেড়ে থাকার, যক্ষবেদনা ও প্রিয়সম্মিলনের, আনন্দের ও সর্বাত্মক বিষাদের এক বৈপরীত্য। চিরবিরহ যেন এক এই মেঘ, বাতাস এবং সহস্রধার বৃষ্টি মিলে, শহিদ কাদরির কবিতায় বললে যা,

বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ
ভরা বর্ষায় পথঘাট হবে সাদা
ময়ূর দেখাবে ময়ূরীকে তার নাচ।
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই
তবুও শান্তি পাবে না, পাবে না পাবে না।

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3659 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...