জনগণ বলছেন…

আসিম সাজ্জাদ আখতার

 

সমস্ত তিক্ততাকে না ভুলে গিয়েও বোধহয় একবাক্যে বলা যায় গত বুধবারে আমাদের দেশে যা হল সেটাকেই সম্ভবত গণতন্ত্র বলে, যা সমস্ত মতবিরোধ-চাপানউতোর সত্ত্বেও অন্তত আমাদের দেশের জনগণের পক্ষেও মঙ্গল বলেই মনে হয়।

ইমরান এবং পিটিআই যেটাকে জনগণের রায় বলবেন, মূলধারার ইমরান বিরোধীরা তাকেই জনগণের কণ্ঠরোধ আখ্যা দেবেন এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দুপক্ষের কেউই বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মূল বিষয়ের ধারকাছ দিয়েও যান না। আমাদের দেশের আসল গণতন্ত্রের চেহারাটা আমরা যারা সামজিক পটপরিবর্তনের বিষয়ে অল্পবিস্তর আগ্রহী, তাদের একটু তলিয়ে দেখাই শ্রেয়।

প্রথমত অর্থবল ও ক্ষমতাই আসল এমভিপি– মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার। শুধু পাকিস্তানে নয়, মোটামুটি সমস্ত দেশেই নির্বাচন সহ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতা ও অর্থের দাস। আমআদমির কাছে প্রথাগত ভোটের লড়াইয়ের বাইরে থাকা দলগুলির মতাদর্শ যতই আকর্ষণীয় লাগুক না কেন, শেষমেশ তাঁরাও ভোটবাক্সের দেবতার পায়ে নৈবেদ্য চড়াতে বাধ্য হন, কারণ প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রক্ষমতা ও বাজারের দড়িটানাটানিতে জর্জরিত জনতার ক্ষমতার সাথে একাত্মীভূত হওয়ার একটা সাময়িক মোহ আছে।

তবে ব্যতিক্রমও আছে। গত বুধবারে উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের মানুষ যথাক্রমে আলি ওয়াজির ও মহসিন দাওয়ারকে নির্বাচিত করেছেন। ইদানীংকালে মেক্সিকো, নেপাল ও স্পেনের মতো দেশে বিরোধীরা (যাঁদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের উত্তরাধিকার দীর্ঘদিনের) নির্বাচিত হয়েছেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে মোটামুটি সবক্ষেত্রেই গ্রাসরুট লেভেলের আন্দোলন এই দলগুলিকে জনপ্রিয় করেছে আমআদমির কাছে। এবং তাঁরা অর্থ ও ক্ষমতার কবলে থাকা প্রচলিত কাঠামো বদলের একটা আশ্বাস পেয়েছেন এদের মারফত।

সংক্ষেপে বলতে গেলে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে, জাতি-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে মেহনতি মানুষকে এককাট্টা করা রাজনৈতিক লড়াইয়ের পক্ষে জনমত থাকবে– পাকিস্তানের জনগনের বার্তা এটাই। কিন্তু কোথায় পাব তারে, অগত্যা মূলধারার মধ্যে থেকেই প্রার্থী নির্বাচিত করতে হয়। বন্ধক থাকে বিশ্বাস, যে তাঁরা নিয়মে বাঁধা সমাজব্যবস্থার সাথে মানুষের দরকষাকষিতে আমাদের সহায় হবেন।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতা অনুযায়ী, বেশ কিছু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির “প্রো-পিপল” ভাবমূর্তি তুলে ধরে ভোটবাক্সে ফায়দা তোলার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। আমেরিকায় ট্রাম্পের বির্বাচিত হওয়া সম্ভবত এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন, জনদরদী মুখোশের আড়ালে জাতিবিদ্বেষী উগ্র দক্ষিণপন্থার জয়ের সবথেকে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তো বটেই।

পিটিআই এবং ট্রাম্পের মধ্যে মিলগুলোকে সত্যিই অবজ্ঞা করা যাচ্ছে না আর। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীল মানুষের তাদের মার্কিন সহযোদ্ধাদের থেকে বরং কিছু শেখা উচিত। ট্রাম্পের জয়ে তাঁরা যেভাবে নড়েচড়ে বসেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

দেখা গেছে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানের একটা পর্যবেক্ষণ হল স্বঘোষিত ত্রাতা তথা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বরূপ আবিষ্কারের পর আমআদমির নির্বাচনবিমুখতা। বুধবারের নির্বাচনের প্রেক্ষিতে বলতে পারি, একটা বড় অংশের ভোটাররা ইমরান এবং পিটিআইকে রাজনীতির আঙিনায় বহিরাগত ছাড়া কিছু ভাবেননি, এবং তাঁরা নিশ্চিত যে এই ‘পরিবর্তন’ স্রেফ কাগুজে। আকাঙ্খিত পরিবর্তনের স্বপ্ন– যদিও তা ভ্রূণাবস্থায়– দানা বাঁধতে পারে সেইজন্যই।

তৃতীয়ত, পরিবর্তনকামী মানুষের জোট বাঁধা এবং বাস্তবত অনুভূত হওয়া আবশ্যক। সোশ্যাল নেটোয়ার্কিং-এর যুগে আমরা সকলেই জানি বাড়ির ড্রয়িংরুমের আরামে বসেও নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রচার করা আর অবাস্তব নয়। এই পিটিআই-এর জয়ের পেছনেও তারা সোশাল মিডিয়ায় বিশেষত যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে যে সমর্থন জোটাতে পেরেছিল তার একটা ভূমিকা আছে। আমাদের প্রগতিকামী মানুষদেরও সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রচারের অভিনবত্ব লক্ষণীয়, কিন্তু ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ততটা আশাপ্রদ নয়। ফৈজাবাদের ধর্নার সময়ে আমি লিখেছিলাম– আমাদের দেশের প্রগতিশীলদের একটি সমস্যা হল তাঁরা সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক দলের মাঠে নিজেদের খেলাটা খেলতে পারেন না, অন্যদিকে গোঁড়া দক্ষিণপন্থীদের পেটোয়া রাজনৈতিক দলের (পড়ুন প্রতিক্রিয়াশীল পলিটিক্যাল “অল্টারনেটিভ”) সাথে সহাবস্থান কারও অজানা নয়।

এই নির্বাচনে খাদিম রিজভির টিএলপি সারা দেশে প্রায় দশ হাজার ভোট পেয়েছে, অথচ প্রগতিশীল জনতার সোশ্যাল মিডিয়াজাত ক্ষোভ ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হছে কোথায়? এই কলমচির মতে, আমাদের দেশে ভোটের বাক্সের রাজনীতিতে না নামলে, স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে প্রগতিশীল বিকল্প চিরকাল কাগুজে বাঘ হয়েই থেকে যাবে। গত বুধবারের ফল আমাদের সম্ভবত সেই শিক্ষাই দেয়।

শেষমেশ, ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের কব্জির জোর আমরা দেখলাম। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, সাম্যবাদী, ecologically sustainable সমাজব্যবস্থায় বিশ্বাসী হলে, এবং মানুষকে প্রকৃত বিকল্পের ধারণায় বিশ্বাস করাতে হলে গ্যালারি থেকে মাঠে নামতেই হবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

লেখক ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মূল ইংরাজি লেখাটি ডনপত্রিকায় ২৭শে জুলাই প্রকাশিত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4063 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...