সিরিয়ালের অন্দরমহল

মানস নাথ  

 

মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আগে অবধি সিরিয়ালের শুটিং বেশ ক’দিন বন্ধ ছিল। চ্যানেলে চ্যানেলে প্রাইম টাইমে রিপিট টেলিকাস্ট। পথেঘাটে মন্দিরের চাতালে কাগজে টিভিতে ফেসবুকে সেই নিয়ে অনেক আলোচনা দোষারোপের কথা উড়ে বেড়াচ্ছিল। সকলেই মোটামুটি সিরিয়ালের ভালোমন্দ দোষগুণ সামাজিক প্রভাব সব মেনে নিয়েও সিরিয়াল বন্ধ হলে যে লাখো লাখো লোক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বে সেই নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। টেকনিশিয়ানদের জন্যও চিন্তিত।

এখানে মোদ্দা কথাটা বলে দিই, এইবারের সিরিয়াল ইন্ডাস্ট্রির যে স্ট্রাইক তার সাথে টেকনিশিয়ানদের কোনও সম্পর্ক নেই। কাজ বন্ধ রেখেছিলেন প্রযোজকরা। ফলে গরীব দিন-আনি-দিন-খাই টেকনিশিয়ানদের কাঁধে বন্দুক রেখে আর্টিস্ট ফোরাম সিমপ্যাথি কুড়ানোর চেষ্টা করলেও আসলে এবারের স্ট্রাইকে প্রযোজকদের অনড় অবস্থানের কারণ টেকনিশিয়ানরা নয়। তার মানে এই নয় যে টেকনিশিয়ানদের সব সমস্যা মিটে গেছে। তাদের ইস্যু নিয়ে মাসখানেক আগেই একটা স্ট্রাইক হয়েছিল, যদি খবর রাখেন তো জানবেন। সেখানে ওভারটাইম, সময়মতো ডিউজ ক্লিয়ার, মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে চেক এই সব ইস্যু নিয়ে চ্যানেল ও প্রযোজকদের সাথে একটা ঐকমত্য হয়েছিল এবং দু’পক্ষই সেটা মেনে কাজে যোগ দিয়েছিল। চ্যানেল সাধারণত টেলিকাস্ট হবার ৬০-৬৫ দিনের মধ্যে পেমেন্ট ক্লিয়ার করে। বিজ্ঞাপনদাতা বা স্পনসরদের থেকে টাকা পেতে সময় লাগে বলে এই গ্যাপ, এটা তাদের দাবি। প্রযোজকরাও তাই আর্টিস্ট পেমেন্ট করতে দু’মাসের গ্যাপ নেন। পুরোটাই মাছের তেলে মাছ ভাজার পুরনো ব্যবসায়ী চাল। এবার এই পেমেন্ট কন্ডিশন জেনেই সবাই কিন্তু প্রযোজকদের সাথে চুক্তি করেন। যে কোনও ইন্ডাস্ট্রিতেই মালিক কর্মচারীদের মধ্যে টানাপোড়ন থাকেই। সেই সব প্রেশার বের করার জন্য নানারকম সেফটি ভালভও থাকে। কিন্তু আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করেও প্রযোজকরা কাজ বন্ধ করে দিলেন কেন?

এবারের স্ট্রাইকে প্রযোজকদের অনড় মনোভাবের পিছনে আছে মূলত বক্স আর্টিস্টদের খেপ খেলা। এটা কী সেটা বুঝতে আপনাদের একটু গভীরে যেতে হবে। গোল গোল করে মোদ্দা কথাটা বোঝানোর একটা চেষ্টা করছি। সিরিয়ালে তিন ধরনের আর্টিস্ট থাকে। একদল নবাগত নবাগতা প্রটাগনিস্ট। যাদের নিয়ে গল্প আবর্তিত হয়। প্রযোজকরা তাদের সাথে সম্বৎসরের একটা চুক্তি করে নেন। মাসে এক, দুই থেকে পাঁচ লাখ অব্দি সেই চুক্তি হতে পারে। আগেকার হলিউডের সিনেমা কোম্পানিগুলির মতোই এই চুক্তি। এনারা অন্য কোথাও এই সময়ে কাজ করতে পারবেন না। পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্সও সেইভাবে হবে। মানে দুর্গাপূজার ফিতে কাটতে গেলেও সিরিয়ালের চরিত্র সেজে যেতে হবে। অনেকটাই চুক্তিভিত্তিক বন্ডেড লেবার গোছের। প্রযোজকরা নানাভাবে এদের এক্সপ্লয়েট করেন। ওভারটাইম করান।

এছাড়া আছে ডেলি-ভিত্তিতে কাজ করা জুনিয়ার আর্টিস্টরা। ভিড় বাড়ানো বা দু’একটা ডায়লগ থাকে এদের। প্রয়োজনমতো কাজ। দৈনিক পাঁচশ থেকে দু’তিন হাজার তাদের রোজ। এরা স্টুডিওপাড়ায় গিয়ে রোজ প্রোডাকশন ম্যানেজার, কাস্টিং ডিরেক্টরের কাছে ঘুরঘুর করেন। যদি একটা রোল মেলে।

মাঝখানে আছে যারা তাদের নিয়েই ঝামেলা। এনাদের ইন্ডাস্ট্রির পরিভাষায় নাম বক্স আর্টিস্ট। সব সিরিয়ালেই এরা পরিচিত মুখ। গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্র তাদের মাথায় রেখেই লেখা হয়। এক মাস আগেই থেকেই এনাদের ডেট নিয়ে রাখতে হয় প্রোগ্রামারদের। এবার মজা হল এনারা একই ডেট হয়ত তিন জন পরিচালককে দিয়ে বসে আছেন!! অবাক হচ্ছেন? কিন্তু এইটাই হল কঠোর বাস্তব। আটটায় কলটাইম হলে তারা হেলতে দুলতে দশটায় আসবেন। দু’ঘণ্টা ধরে মেক আপ করে বারোটায় ফ্লোরে পা দিয়েই বলবেন দুটোয় ছাড়তে হবে। অন্য এক ইউনিটকে দুটো থেকে টাইম দিয়ে রেখেছেন। সেখানে গিয়েও বলবেন সাতটার মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। অন্য স্টুডিওতে হয়ত সময় দিয়ে রেখেছেন।

এর মধ্যে যারা থিয়েটার করেন তাদের তো থিয়েটারের রিহার্সাল আর শো-এর জন্য ছাড়তেই হবে। শিল্পের দাবি সবার আগে। সিরিয়াল তো আর শিল্প নয় তাই গ্রুপ থিয়েটারের শোতে পঞ্চাশজন দর্শক হলেও (তাদের মধ্যে ৭০% আবার ফ্রি পাসে) শিল্পের দাবিতে তাদের আটকে রাখা যায় না।

তো প্রযোজক দশ ঘণ্টার জন্য পয়সা দিয়ে এই হ্যাপা নিচ্ছিলেন এতকাল, কিন্তু এখন দশ ঘণ্টার উপর কাজের জন্য টেকনিশিয়ানদের মতো আর্টিস্টদেরও ওভারটাইম দেওয়ার দাবিতে তারা বলছেন আমরা রাজি, কিন্তু খেপ চলবে না। পুরো টাকা দিয়ে ডেট বুকিং করলে পুরো সময়টাই দিতে হবে। কাটা ডেট-এর সিস্টেম তুলে দিতে হবে। সামনে পুজোর মরসুম আসছে। শীত পড়লেই মাচা বাঁধা শুরু হবে। বক্স আর্টিস্টরা প্যান্ডেলের ফিতে কাটতে বা মাচায় নাচতে যাবে আমাদের দেওয়া সময় থেকে, আর সেটা হবে না।

ছোট্ট করে বলে রাখি এই বক্স আর্টিস্টদের রেট এখন কেমন। নাম ধরে ধরেই বলতে পারতাম কিন্তু সেটা ঠিক হবে না। গড়ে এখন এনারা পার শিফটে সিরিয়াল থেকে দশ থেকে কুড়ি হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। তার বেশিও আছে। ২৫-৩০ও পান কয়েকজন। এবার একই ডেট দু’জনকে দিলে সেটা ডেলি চল্লিশ হাজার হয়ে যায়।

টেকনিশিয়ানদের মধ্যে সিনিয়রদের সাথে সবারই প্রায় মাসকাবারি চুক্তি থাকে। ডেলি পেমেন্টেও অনেক টেকনিশিয়ান থাকেন। তাদের পেমেন্ট এই বক্স আর্টিস্টদের আকাশছোঁয়া পেমেন্টের কাছে নস্যি। নামেই ইন্ডাস্ট্রি। কোনও সরকারি গাইডলাইন কিছু নেই। মুখের কথা আর চেনা পরিচিতিতেই সব কিছু। চূড়ান্ত ডিসক্রিমিনেশন রয়েছে পেমেন্ট স্ট্রাকচারে। ফলে প্রযোজকরা যেমন একদিকে হাতে মাথা কাটেন তেমনি স্টার আর্টিস্টরা চূড়ান্ত আনপ্রেফেশনাল, সব ট্যানট্রামস দেখান। এইভাবেই চলছে। পাঁচ ছ-দিন শুটিং বন্ধ হয়ে ইগোর লড়াইয়ের ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হলে জুনিয়ার আর্টিস্ট আর নিচুতলার টেকনিশিয়ানদেরই পেটে টান পড়ে। আর কারও কিছুই আসে যায় বলে তো মনে হয় না!

আর্টিস্ট ফোরাম আর প্রযোজক সংস্থা সবাই আজকের দিনে অরূপ স্বরূপ বিশ্বাসের ঘাটে জল খায়। খাদ্য খাদকের নিজস্ব ডায়নামিক্স আছে, কিন্তু জল এতটাই মাথার উপরে উঠে গেছিল যে ওরা পাঁচ দিনে বহুবার বসেও কেসটা কব্জা করতে পারেননি। তবে বিগ সিস্টার সবই ওয়াচে রেখেছিলেন। এটা সবাই জানে যে উনি কিন্তু কোনও সিরিয়ালই মিস করেন না। ওঁর উদ্যোগে আপাতত একটা সমাধানসূত্র মিলেছে। আর্টিস্ট ও প্রযোজকদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটা যৌথ তদারকি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ক’দিন এই সমঝোতা থাকে দেখা যাক। তবে এই নিয়ে আমাদের মতো আম আদমিদের চিন্তা করে লাভ নেই। এটা রুজিরুটির লড়াই নয়। ঘি মধুর লড়াই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...