অস্থি-কলস যাত্রা : ভস্মের রাজনীতি ও রাজনীতির ভস্মীকরণ

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত  

 

আগস্ট ১৭, ২০১৮। বিকেল চারটে বেজে পঞ্চান্ন মিনিট। কাঁপাকাঁপা হাতে জ্বলন্ত কাঠ চিতাস্তূপের দিকে এগিয়ে দিলেন অটল-দুহিতা নমিতা ভট্টাচার্য। সাথে সাথেই দিল্লির রাষ্ট্রীয় স্মৃতিস্থলে জ্বলে উঠল লেলিহান আগুন, চন্দনকাঠের চিতায়। চিতাস্থল জুড়ে উঠল হাজার হাজার মানুষের মিলিত হুংকার — ‘অটলজি অমর রহে’। এভাবেই পঞ্চভূতে বিলীন হলেন অটলবিহারী। আর তার সাথেই শেষ হল ভারতীয় রাজনীতির এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের। বিশ্রুত নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর অন্তিমযাত্রায় চোখের জলে তাকে বিদায় জানাল রাষ্ট্র। উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন দেশবিদেশের প্রথমসারির রাষ্ট্রনায়ক, নেতা-নেতৃত্ব থেকে সাধারণ মানুষ। দিল্লির রাষ্ট্রীয় স্মৃতিস্থলে এভাবেই ইহজগতের মায়া কাটিয়ে অমৃতলোকের পথে পাড়ি দিলেন ‘যুগপুরুষ’ অটলবিহারী। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমে নিভে এলে এগিয়ে আসেন পুরোহিত, পরিবারবর্গ। ছাই ঘেটে অস্থিনাভি তুলে নেন একটি কলসে। একটু একটু করে সূর্য ঢলছে তখন যমুনার তীরে।

আগস্ট ২২, ২০১৮। সকাল সাড়ে ন’টা। দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে বিজেপির সদর দপ্তর। প্রশস্ত মঞ্চের একধারে অটলবিহারীর ছবি। মঞ্চের উপর তখন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাজনাথ সিং, সুষমা স্বরাজ সহ অটল-কন্যা নমিতা ভট্টাচার্য। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিজেপি প্রদেশ সভাপতিরা। এক এক করে ডাকা হচ্ছে নাম। মঞ্চে উঠে এসে লাইন করে বিজেপি সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বাজপেয়ীর ‘অস্থিকলস’ সংগ্রহ করছেন তাঁরা। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে কলস হাতে ফিরে যাচ্ছেন যে যার রাজ্যে। শুরু হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী ‘অজাতশত্রু’ বাজপেয়ীর ‘অস্থিকলস যাত্রা’। দু’দিন পর ২৪ অগস্ট গঙ্গাসাগরে বাজপেয়ীর অস্থিকলস বিসর্জন দিলেন প্রদেশ বিজেপির নেতৃত্বরা।

‘অস্থিকলস যাত্রা’। ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস ও দলগত সংস্কৃতির সাথে জড়িত একটি বিশেষ পর্ব। এই রীতির প্রচলন আজ থেকে নয়। স্বাধীনতার পর কমবেশি দেশের সব প্রথম সারির নেতানেত্রীর প্রয়াণকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই ধর্মীয় কম, আপাদমস্তক রাজনৈতিক আচার। গান্ধী থেকে নেহেরু, ইন্দিরা থেকে বাজপেয়ী — দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রনায়কেরা পেয়েছেন এই বিরল সম্মান। যদিও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে অস্থিকলসের মধ্যে দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের নেপথ্যে বরাবরই উঁকি মেরেছে রাজনৈতিক অভিসন্ধি, ভোটের জোয়ার আনতে সহানুভূতি আদায়ের ‘আবেগপ্রবণ’ কৌশল। কংগ্রেস হোক বা বিজেপি, ‘অস্থিকলসে’র আড়ালে মানুষের আবেগে সুড়সুড়ি দিতে পিছপা হননি কেউই। যদিও এই যুক্তি কোনওদিনই মানেনি রাজনৈতিক মহল। তবু রাজনীতির এটাই অলিখিত আদর্শ। মৃত্যু যেখানে মহার্ঘ্য, দলকে নতুন করে ‘কৃত্রিম’ উপায়ে অক্সিজেন দেয়া তার কাজ। দধীচিমুনি যেমন দেহত্যাগ না করলে, তার অস্থি দিয়ে বজ্র বানিয়ে স্বর্গোদ্ধার করা কোনওমতে সম্ভব ছিল না দেবতাদের। আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বনামধন্য নেতারা তাই দধীচির ভূমিকা পালন করে থাকেন। মৃত্যুর পরেও এইভাবেই দলকে দিয়ে যান ‘প্রতিষ্ঠা’। পান প্রাসঙ্গিকতা।

‘জাতির জনক’কে দিয়েই শুরু করা যাক। ৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮। দিল্লির বিড়লা হাউসে প্রার্থনা করতে যাওয়ার সময় নাথুরাম বিনায়ক গডসের বেরাট্টা এম ১৯৩৪ সেমি অটোমেটিক পিস্তলের তিনটি বুলেট লিখে দেয় অন্য ইতিহাস। গান্ধীর মৃত্যুর পরে যমুনার পাড়ে অন্ত্যেষ্টির শেষে তাঁর অস্থিকলস ভাসানো হয় সারাদেশ জুড়ে। UPI-র James Michaels লিখেছেন (৩১ জানুয়ারি ১৯৪৮) “The body of sainted Mohandas K. Gandhi today was committed to the flames of the burning ghat as violence touched off by his assassination flared anew in Bombay. The ancient Hindu ceremonial was carried out on the banks of the Jumna, one of the five sacred rivers of India, in a demonstration of national grief.” মহাত্মার অস্থিভস্ম শুধুমাত্র যমুনাতেই নয়, সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন নদীতে ভাসানো হয়। মূল উদ্যোগী ছিলেন জওহরলাল নেহেরু।

অস্থিকলসের আতিশয্যে বাদ পড়েননি খোদ নেহেরুও। অবশ্য জওহরলাল আগেই তার উইলে তার মরণোত্তর প্রক্রিয়ার যাবতীয় দিগনির্দেশ দিয়ে গেছিলেন। নির্বাচিত সেই অংশটুকুই তুলে দেয়া হল এখানে।

20. I wish to declare with all earnestness that I do not want any religious ceremonies performed for me after my death. I do not believe in any such ceremonies and to submit to them, even as a matter of form, would be hypocrisy and an attempt to delude ourselves and others.

21. When I die, I should like my body to be cremated. If I die in a foreign country, my body should be cremated there and my ashes sent to Allahabad. A small handful of these ashes should be thrown in the Ganga and the major portion of them disposed of in the manner indicated below. No part of these ashes should be retained or preserved.

22. My desire to have a handful of my ashes thrown in the Ganga at Allahabad has no religious significance, so far as I am concerned. I have no religious sentiment in the matter. I have been attached to the Ganga and the Jumna rivers in Allahabad ever since my childhood and, as i have grown older, this attachment has also grown. I have watched their varying moods as the seasons changed, and have often thought of the history and myth and tradition and song and story that have become attached to them through the long ages and become part of the flowing waters. The Ganga, especially, is the river of India, beloved of her people, round which are intertwined her racial memories, her hopes and fears, her songs of triumph, her victories and her defeats. She has been a symbol of India’s age-long culture and civilization, ever-changing, ever-flowing and ever the same Ganga. She reminds me of the snow-covered peaks and the deep valleys of the Himalayas, which i have loved so much, and of the rich and vast plains below, where my life and work have been cast. Smiling and dancing in the morning sunlight, and dark and gloomy and full of mystery as the evening shadows fall; a narrow, slow and graceful stream in winter, and a vast roaring thing during the monsoon, broad-bosomed almost as the sea, and with something of the sea’s power to destroy, the Ganga has been to me a symbol and a memory of the past of India, running into the present, and flowing on to the great ocean of the future. and though I have discarded much of past tradition and custom, and am anxious that India should rid herself of all shackles that bind and constrain her and divide her people, and suppress vast numbers of them, and prevent the free development of the body and the spirit; though I seek all this, yet I do not wish to cut myself off from that past completely. I am proud of that great inheritance that has been, and is, ours, and I am conscious that I too, like all of us, am a link in that unbroken chain which goes back in the dawn of history in the immemorial past of India. That chain I would not break, for I treasure it and seek inspiration from it. And, as witness of this desire of mine and as my last homage to the great ocean that washes India’s shores.

23. The major portion of my ashes should, however, be disposed of otherwise. I want these to be carried high up into the air in an aeroplane and scattered from that height over the fields where the peasants of India toil, so that they might mingle with the dust and soil of India and become an indistinguishable part of India.

I have written this will and testament in New Delhi on the twenty-first day of June in the year nineteen hundred and fifty-four.

Signed: Jawaharlal Nehru 21 June, 1954. Attestor 1: Kailashnath Katju Attestor 2: N.R. Pillai.

বলাবাহুল্য, এসবই অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছিল। কন্যা ইন্দিরা গান্ধী দাঁড়িয়ে থেকে তার তদারকি করেছিলেন। উল্লেখ্য, ২৭ মে ১৯৬৪-তে পরলোকগমন করেন নেহেরু। একদিন আগেই ছুটি কাটিয়ে ফিরেছিলেন দেরাদুন থেকে। ভোররাতে বাথরুম থেকে ফিরে হৃদরোগে তিনি আক্রান্ত হন। তার চিকিৎসকরা কোনও কিছু করার সময় পাননি। ২৮ মে তার মরদেহ নিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে শান্তিবনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। পরে ইন্দিরার তত্ত্বাবধানে, দুই নাতি রাজীব ও সঞ্জয় গান্ধীর উপস্থিতিতে শেষ হয় অন্ত্যেষ্টি। এরপরেই শুরু হয় নেহেরুর সেই অস্থি-কলস যাত্রা। বায়ুসেনার বিমানে উত্তর কাশী, গঙ্গোত্রী হিমবাহের উপর ছড়িয়ে দেয়া হয় তার চিতাভস্ম। এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে নৌকা থেকে ভাসানো হয় নেহেরুর অস্থিকলস। পরে সারাদেশ জুড়ে বিভিন্ন নদীতে নেহেরুর চিতাভস্ম ভাসিয়েছিল কংগ্রেস। হেলিকপ্টার থেকে সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তেও তা ছড়ানো হয়।

৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ আবারও দিল্লিতে গর্জে ওঠে বন্দুক। এবার লক্ষ্য — ইন্দিরা গান্ধী। ৩১টি বুলেট দেহরক্ষীদের বন্দুক থেকে বেরিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। আবারও সেই অবিস্মরণীয় শেষকৃত্য ও অস্থিকলস যাত্রার আয়োজন। পরবর্তীকালে ইন্দিরাপুত্র রাজীব গান্ধীর ক্ষেত্রেও চোখে পড়ে একই আয়োজন। যদিও সে অর্থে চন্দ্রশেখর বা নরসিংহ রাওয়ের মতো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীরা কিন্তু বঞ্চিত থেকেছেন এই ‘প্রাপ্য সম্মান’ থেকে। লালবাহাদুর শাস্ত্রীও পেয়েছেন অস্থিকলসের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে যাওয়ার শেষ সুযোগ। সম্প্রতি অটলবিহারী বাজপেয়ী আবারও উঠে এলেন এই অস্থিকলস যাত্রার মাধ্যমে প্রচারের শীর্ষে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কেন তবে এই ব্যক্তিবিশেষে বৈষম্য। তবে কি অস্থি-বিসর্জন দেশীয় রাজনৈতিক মহলে ধর্মীয় আচার-আচরণের ঊর্ধ্বে শুধুই রাজনৈতিক মুনাফাবাদের প্রতীক। শ্রদ্ধা বা সম্মানজ্ঞাপনের দিকটি অস্বীকার না করলেও, কারও মৃত্যুর পর একশোটি কলসে সারাদেশের একশোটি নদীতে অস্থি তর্পণের যৌক্তিকতাই বা কী? অতীতের প্রতিটি দৃষ্টান্তই সাক্ষী থেকেছে নির্বাচনে বিপুল জয়ের। এক প্রবীণ বাম নেতা এই নিয়ে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, একটি দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেলে, তাতে কতটুকুই অবশিষ্ট থাকে যা দিয়ে একশো নদীতে তর্পণ করা যায়? আসলে রাজনীতিতে কোনও কিছুই ফেলনা নয়। প্রথমত, এখানে কেউ অবসর নেন না। যদি না তার মৃত্যু হয় বা কেউ তাকে হত্যা না করে। তাই মৃত্যুর পরেও তার অস্তিত্ব সমান প্রাসঙ্গিক। কিন্তু যখন ছত্তিশগড় বা অন্য কোনও রাজ্যে প্রয়াতের স্মৃতিতে শুধুই অসম্মান চোখে পড়ে, তখন এই ধারণা আরও বেশি করে বদ্ধমূল হয়।

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে এর পরেও বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব আসবেন ও ‘যাবেন’। কিন্তু সেই ‘যাওয়া’ নিয়ে এই শ্রদ্ধা বা ধর্মাচরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ‘অশ্রুত’ সুবিধেবাদীদের ঢক্কানিনাদ দৃষ্টি এড়াবে না। তাই আজও যেমন কোনও প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় সভাপতি ‘প্রাক্তনে’র অন্তিমযাত্রার সাথে ৬ কিমি পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করেন, তেমনই কোনও একটি রাজ্যে অস্থিকলস বিসর্জনের পর মৃতের পরিবারের লোকদের অটো ভাড়া করে বাড়ি ফিরতে হয়। অভিযোগ ওঠে, রাজনৈতিক সুবিধে নেয়ার জন্যই এই অনির্বচনীয় আয়োজন। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন বা সৌজন্যপ্রদর্শন বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ সেখানে এক চূড়ান্ত প্রহসনমাত্র।

আমরা জানি, এটাই আমাদের সংস্কৃতি। ঠিক যেমন তাকে অস্বীকার করা বা ব্যঙ্গ করাও। তাই অস্থিকলস যাত্রার পিছনে নীতিগত ও ভাবগত স্বচ্ছতা কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন এখনও উঠছে, পরেও উঠবে। শুধু একটা জিনিসই রয়ে যাবে ‘ধ্রুবক’। হাজার হাজার রাজনৈতিক রঙ চড়ানো কলসের মধ্যে রয়ে যাওয়া — গঙ্গাজল, ফুল-বেলপাতা ও থাকা না থাকা চিতাভস্মের ধুয়ে যাওয়া ‘নিশান’টুকু। এটিই আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষ। ১২৫ কোটির দৈনন্দিনতার রক্তঘাম, অস্থিমজ্জার ‘বিশ্রুত’ ইতিহাস।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. দুর্দান্ত পোস্ট। অস্থি-কলসের রাজনীতিটা বুঝার জন্য এ নিবন্ধ পাঠ জরুরি। ধর্মীয় আচার যতটা না তারচেয়ে বেশি যে রাজনীতি তা দেখা যাচ্ছে সংবাদপত্রে উৎসবমুখর মিছিল দেখেই। নেহরুর অন্ত্যেষ্টি ইচ্ছে অংশটা প্রথমবার পড়লাম। ধন্যবাদ এ জন্যেও।

আপনার মতামত...