লন্ডন ব্রিজ ইস ফলিং ডাউন

তাপস দাস

 

কষ্ট ও ক্রোধ ছাপিয়ে গ্রাস করে ভয়। পোড়া ডিজেল মেশানো নর্দমার ক্বাথের মতো গ্লানিময় আতঙ্কের তরঙ্গ তাড়া করে আসে — চেতনা অবশ। কংক্রিটের স্ল্যাবের তলা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে ছোট্ট হাত সন্তানের আমার। পাঁচ আঙুল ফুলের পাঁপড়ির মতো ছড়িয়ে আছে, আহা যেন পঞ্চমুখী জবা — কচি শরীরের নিষ্পাপ রক্ত এত গভীর লাল হয় জানত কি কেউ! আমাকে ডাকছিলি হাত নেড়ে নেড়ে স্ল্যাবটা যখন ভেঙ্গে পড়ছিল মাথার ওপরে — পৌঁছতে পারিনি।

আমার হাত ধরেই সর্বত্র যেতিস, শুধু এই যাওয়াটা হাত না ধরেই চলে গেলি — আঙুলে আঙুলে ফাঁক রয়ে গেল দুজনের। একটুও চামড়ায় ঘষা লাগলেও কখনও, দৌড়ে আসতিস — ছাল ওঠা জায়গাটার ওপরে আমি চুমু খেয়ে না দেওয়া অবধি কোনও ওষুধেই যে ব্যথা কমত না তোর তা কি জানি না আমি? আজ যখন একটু আগে আস্তে আস্তে বুকের ওপর চেপে বসছিল কংক্রিটের চাঙ্গড় — ছোট্ট মাথাটা পিষে ফেলতে ফেলতে অমোঘভাবে নিচে নেমে আসছিল নির্বিকার ইস্পাতের বিমগুলো — ছোট্ট বুকের খাঁচাটা একটু হাওয়ার অভাবে ফুলে উঠেছিল হাঁপড়ের মতো — হাতটা বাড়িয়ে দিতে গিয়েছিলি আমার হাত ধরবি বলে। তার আগেই চোখের মণি দুটো প্রবল চাপে গলে গিয়ে অক্ষি কোটরের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসে পিচের রাস্তায় বয়ে গিয়েছিল তরল হয়ে। কোথায় চুমু খেতাম বল? মাথা বুক পেট পা কোমর — কিছু তো আলাদা করতে পারিনি তোর — কিছু চিনতে পারিনি। কংক্রিটের ক্যানভাসে বিকেলের সূর্যাস্তের মতো মেখে গেলি তুই। শুধু হাতটুকু রয়ে গিয়েছিল — সে’টুকু বাড়িয়ে রাখা।

সেই হাত ধরি। এক এক করে জানলা বন্ধ হয়ে আসে। দরজা বন্ধ হয়। বাতাস চলে না। অন্ধকার এত ঘন যে তোর কোঁকড়া চুলের মতো — ঘিলু আর রক্তের ছিটে আবিল করে তাকে। শক্ত করে হাত ধরে থাকি — তোকে নিয়ে যেতে এসেছে! বন্ধ হয়ে আসে শ্বাস, গা গুলিয়ে ওঠে — বমি উঠে আসে হড়হড় করে। মেঝে ভাসিয়ে পেচ্ছাপ করে ফেলি। বমি পেচ্ছাপে মাখামাখি শরীর হেঁচড়ে হেঁচড়ে তাল তাল অন্ধকারে মাথা ঠুকতে থাকি ডাইনে বাঁয়ে — কেড়ে নিও না! কেড়ে নিও না! কেড়ে নিও না! মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা ওঠে আমার — কষ বেয়ে নাল গড়াতে থাকে। মোটা সুতোর মতো ঝুলতে থাকে লালা আর বমির অবশেষ।

এই তবে সন্তানের পরিচয় আমার — কয়েকজনের মধ্যে এক মৃতদেহ মাত্র? হে মহান রাষ্ট্র — শুধুই সংখ্যামাত্র তবে সাধারণ নাগরিকগণ যত? ওই কারা সবুজ লাল গেরুয়া বস্ত্রখণ্ডে মাথামুড়ে এসে গুনে যায় শরীর সন্তানের আমার আর বুক চাপড়ে কেঁদে ওঠে — সামনে নির্বাচন। কুন্দলিয়ার বাড়ি ভেঙে পড়ে, গড়িয়ে নাবে বিবেকানন্দ উড়ালপুলের ইস্পাতের বিম। আমার সন্তানের জমাট বাঁধা রক্ত ধুয়ে দেয় নির্বাচন মহোৎসব। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভোট উৎসবে মেতে ওঠে কোটি সংখ্যা নিয়ে — কী আসে যায় তার এক শিশুর থ্যাঁতলানো শরীরে — যেখানে মৃতেরা অতি ক্ষুদ্র সংখ্যামাত্র ভোটদাতার তালিকা প্রস্তুতিতে?

হে মহান রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তাগণ — অন্ন দাও নিরাপত্তা দাও বাঁচতে দাও — এই-ই তো বাসনা আমাদের শুধু? অযৌক্তিক চাহিদা তো ছিল না কখনও? আমরা সাধারণ লোক, নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, সাধ্য কি অলীক স্বপ্ন দেখি! আত্মজা সংখ্যামাত্র না হোক — এ কি খুব অশালীন চাহিদা, হে পালকপিতা রাষ্ট্র আমার?

জবাবে প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যাই। ছোট বড় মাঝারি নোট উড়তে থাকে হেমন্তের ঝরা পাতার মতো — মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে, কুড়িয়ে নেয়, গোনে — এক, দুই, তিন, চার… এক সংখ্যার প্রাপ্তিতে আরেক সংখ্যার বিস্মৃতি। আমিও নোট পাকড়াতে দৌড়ে বেরিয়ে পড়ি, নেবে পড়ি কোমর বেঁধে, ভিড়ে। ধাক্কাধাক্কি করি, ল্যাং মারি, গুঁতিয়ে দিতে থাকি। এবং ইত্যাকার প্রাণপন প্রক্রিয়ায় গেঁজেতে সংখ্যা বাড়িয়ে তুলি। মাথা থেকে বিবেকানন্দ উড়ালপুল মুছে যেতে অনধিক দু’বছর মাত্র লাগে। কুন্দলিয়া কবেই পূর্ণ বিস্মৃত।

কংক্রিটের চাঙ্গড় থেকে বেরিয়ে থাকা পঞ্চমুখী জবার লাল পাঁপড়িগুলো গুটিয়ে উঠে মুষ্টিবদ্ধ হয়। ধিক সভ্যতা! ধিক রাষ্ট্র! ধিক রাজনীতি! ধিক! ধিক! ধিক! আমার সন্তানের কঠিন ধিক্কারে চরাচর কাঁপতে থাকে। অন্ধ আমি — বধির আমি, নতশির বক্র মেরুদণ্ড অক্ষম আমার কানে সে শব্দ কি পৌঁছয়?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...