মুশার পৃথিবী

অলোকপর্ণা

 

 

মুশার মাঝে মাঝে মনে পড়ে মা বলত, মাথামোটা মানুষ ভালো প্রেমিক হয়। মুশা জানে সে মাথামোটা নয়। খবরের কাগজের দ্বিতীয় পাতার সুদোকু সমাধান করতে মুশা ঘণ্টাদুয়েক সময় নেয়, — অতএব তার বুদ্ধি যে ক্ষুরধার, — তাও বলা চলে না। মুশা জানে, প্রেমিক হিসেবে ও গড়পরতা। মুশার সামনে ঘরের দরজা হাট করে খোলা সকাল থেকে। একটা বিড়াল ঝিমোচ্ছে দরজার ওপারের পাঁচিলে বসে। মুশা ভাবে বিড়ালরা কেমন প্রেমিক? টম এন্ড জেরির কথা মনে পড়ে, — টম গিটার বাজাচ্ছে প্রেয়সীকে মুগ্ধ করার জন্য। এক পা এক পা করে বাইরের ঠা ঠা রোদে এসে দাঁড়ায় সে। পাঁচিলের বিড়ালটা ভ্রূ কুঁচকে মুশাকে মাপছে। মুশাও ভ্রূ কুঁচকে বিড়ালটাকে দেখে স্থির চোখে। তারপর দুম করে এক ধাক্কা দিয়ে পাঁচিলের ওপাশে ফেলে দেয়। ওপাশ থেকে বিড়ালটার রাগী গর্জন শোনা যায় কিছুক্ষণ। গর গর আওয়াজটা শুনতে শুনতে রোদে দাঁড়িয়ে থাকে মুশা। রোদে দাঁড়াতে তার ভালো লাগে। মনে হয় সব জ্বলেপুড়ে গেল। মনে হয় মুশা ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এই মুশার পা দুটো উবে গেল! জ্বলন্ত রৌদ্রে ভাসতে থাকে মুশা। ওর পায়ের গোড়ালি অবধি হাওয়া হয়ে গেছে এখন। ভাসতে ভাসতে মুশা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। মনে পড়ে, মা বলত বেশিক্ষণ রোদ খেলে মানুষের মাথা খারাপ হয়ে যায়।

মাঝে মাঝে মুশা নিজেকে কষ্ট দেয়। ইচ্ছে করেই। ইচ্ছে করে অনেকবেলা খায় না। ইচ্ছে করে শীতকালে খালিগায়ে ফুটপাথে গিয়ে শুয়ে থাকে। ভরা বর্ষায় রেইনকোট ছাড়া বাইরে বেরিয়ে পড়ে। ভিজতে থাকে। ইচ্ছে করে রাতের পর রাত জেগে থাকে। তারপর দিনের বেলা হ্যালুসিনেশন হয়। মুশা দেখে রোদ্দুরে মাটি থেকে ইঞ্চি পাঁচেক উপরে ভেসে ভেসে চলেছে সে। নিজেকে কষ্ট দিতে পারলে কেমন যেন হালকা লাগে মুশার। একটা তিরতিরে আনন্দে বুক ভরে ওঠে। গলার কাছটা ব্যথায় টনটন করে। মনে পড়ে, মা বলত, কষ্ট না করলে বড় হওয়া যায় না। মুশা জানে, একদিন ও অনেক বড় হবে। সামনের অর্জুন গাছটার থেকেও বড়। দৌড়ে এসে অর্জুন গাছকে জড়িয়ে ধরল মুশা। চোখ বুজে অর্জুন গাছের গুঁড়িতে কান পাতল, ধক্‌ ধক্‌ শব্দটা ঠিক শোনা যাচ্ছে। সেই কোন ছোটবেলা থেকে অর্জুন গাছের বুক শুধু মুশার জন্য ধক্‌ ধক্‌ করে। অন্য কেউ কান পাতলে সে আওয়াজ শোনা যায় না। সেই কোন ছোট থেকে অর্জুনগাছ মুশার প্রেমিক। মনে পড়ে মা বলেছিল, গাছেরও মন আছে। মুশা এসে জড়িয়ে ধরলে অর্জুনগাছের মন ভালো হয়ে যায়।

অর্জুনগাছকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় মুশা দেখে একটা কালো মোটা পিঁপড়ে ঘুর ঘুর করছে গাছটার গায়ে মুশার চোখের সামনে। মুশা মন দিয়ে পিঁপড়ে দেখে। এদিক ওদিক করছে পিঁপড়েটা। মুখটা পিঁপড়ের কাছে নিয়ে গিয়ে জোরে ফুঁ দেয় মুশা। পিঁপড়েটা কোথায় ঝরে পড়ে। মুশা আবার নতুন আনন্দে অর্জুনগাছকে জড়িয়ে ধরে। অর্জুনগাছ শুধুই মুশার। জোরে হাওয়া দিচ্ছে। উপরের ডালপালা সব নড়ছে। অর্জুনগাছকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় মুশা মুখ তুলে উপরে তাকায়। দেখে একটা ইয়াব্বড় মৌচাক ঝুলে আছে একটা ডাল থেকে। মুশার চোখ চকচক করে ওঠে, জিভ ভিজে যায় লালায়। এক পা এক পা করে অর্জুনগাছ থেকে দূরে সরে আসে মুশা। মৌচাকে মৌমাছি ভনভন করছে। মাটি থেকে একটা ঢিল তুলে নেয় মুশা। অনেকক্ষণ ধরে মৌচাকে তাক করে, তারপর সজোরে ছুঁড়ে মারে। ঢিলটা মৌচাকের নিচের দিকে গিয়ে লাগে। মুশার এখন পালানোর কথা। মুশার এখন পালানো উচিৎ। কিন্তু মুশা দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে মৌমাছিরা চাক ভাঙছে। মৌমাছিরা মুশাকে খুঁজছে। একজন দুজন মুশাকে পেয়েও যায়। মুশার হাতে একজন মৌমাছি হুল ফুটিয়ে দেয়। মুশার গালে আরেকজন। মুশা চোখ বুজে থাকে। এই যে মুশার গাল জ্বলছে, হাত জ্বলছে দাউ দাউ করে, মুশা এই দহন মন দিয়ে অনুভব করে। মনে পড়ে একবার খবরের কাগজে ধ্যানমগ্ন জ্বলন্ত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দেখেছিল সে। মুশার গাল ফুলে গেছে, হাতটাও। নিজেকে সন্ন্যাসীদের মতো পবিত্র লাগে মুশার। মন ভরে যায়। মৌচাকের প্রতি টান থাকে না। মুশা ধীরে ধীরে আবার হাঁটতে শুরু করে। রোদ কমে গেছে এখন। মুশার পা মাটিতে নেমে এসেছে। সকালের বাজার ভেঙেছে সবে। মানুষজন যে যার বাড়ি ফিরছে। বাজারের বাইরে ঝনা ভিখারির পাশে বসে পড়ে মুশা। ঝনার হয়ে লোক ডেকে ডেকে ভিক্ষা চায়। মনে পড়ে মা বলত কোনও কাজই ছোট নয়। ঝনা ভিখারির জিভ নেই। মুখের ভিতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। মুশা খেয়াল করে দেখেছে ঝনা কিভাবে রুটি খায়, — জলে খুব করে চটকে মেখে নিয়ে মুখে পুরেই গিলে ফেলে। মুশা এলে ঝনা ভিখারি খুশি হয়। ঝনা ভিখারির কথা মুশা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। দুপুর হলে বাজার ফাঁকা হয়ে যায়, ভিক্ষা সেরে ঝনা খুশি হয়ে মুশার হাতে দুটাকা ফেলে। একটু উঁচু থেকে। মুশাকে ছোঁয় না। ঝনা বামুন। মুশা বামুন নয়।

মুশা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝনার চলে যাওয়া দেখে। মুশা বরাবর কারও চলে যাওয়া খুব খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে। চলে যাওয়া দেখতে মুশার ভালো লাগে। ট্রেন, বাস, পশু-পাখি, মানুষ। সবারই একটা চলে যাওয়া থাকে, — শুধু গাছ বাদে। অর্জুনগাছ। মুশা চোখ বুজে একবার অর্জুনগাছকে দেখে নেয়। চোখ খোলার পরে ঝনা ভিখারিকে সে আর দেখতে পায় না, — কোন গলিতে সে অদৃশ্য হল কে জানে। হাতে ঝনঝন করা পয়সার থলি নিয়ে ঝনা ভিখারি ঘরে ফেরে। মুশার মনে পড়ে মা বলত আল্লা যাদের থেকে কিছু নিয়ে নেন তাদেরকে খুব করে বল দেন, হয় দেহের নয় মনের। ঝনা ভিখারির জিভ আল্লা নিয়ে নিয়েছেন, ঝনা ভিখারির তাই ছিনতাইয়ের ভয় করে না। মুশা নিশ্চিন্ত মনে ফেরার পথ ধরে।

বাড়ি ফেরার আগে মুশা অর্জুনগাছের কাছে আসে। দুহাতে জড়িয়ে ধরে অর্জুনগাছকে। অর্জুনগাছ খুশি হয়। অর্জুনগাছের দেহ ধক্‌ ধক্‌ করে। অর্জুনগাছকে জড়িয়ে থেকে মুখ তুলে উপরে তাকায় মুশা। গাল ফুলে থাকায় একটা চোখ বুজে এসেছে তার। আরেক চোখে মুশা দেখে মৌচাকটা আর নেই। অর্জুনগাছের থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে আসে মুশা। অবাক হয়ে দেখে মৌচাকটা হাওয়া হয়ে গেছে কোথায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে মুশা টের পায় হাওয়ায় কেরোসিন তেলের গন্ধ। মুশার রাগ হয়। প্রবল রাগ হয়। রাগে ঝনা ভিখারির দেওয়া দু টাকার কয়েনটা মুশা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তীব্র চিৎকারে আস্ফালন করে মুশা। অর্জুনগাছ স্থির হয়ে থাকে। রাগে মাথা দপদপ করতে থাকলে মুশা ধীর পায়ে এসে অর্জুনগাছের নিচে বসে। কিছুক্ষণ পরে দেখে সেই পিঁপড়েটা মাটিতে ঘুর ঘুর করছে। মন দিয়ে পিঁপড়ের চলন দেখে মুশা। তারপর খুব যত্ন করে পিঁপড়েটাকে হাতের তালুতে তুলে নেয়। মুশার হাতের তালুতে এখন পিঁপড়েটার সমস্ত পৃথিবী, পিঁপড়ের উপগ্রহ। বিভিন্ন আঙুলে খেলিয়ে খেলিয়ে পিঁপড়েটাকে মুশা আবার অর্জুনগাছের গায়ে ছেড়ে দেয়। পিঁপড়েটা গাছ বেয়ে বেয়ে মুশার থেকে উপরে উঠতে থাকে। একটা সময় পিঁপড়েটা এত উপরে উঠে যায় যে মুশা তাকে আলাদা করে দেখতে পায় না আর। তবে কি মুশা ভাল প্রেমিক হতে পারল? না গড়পরতা? দূর থেকে দেখে বলে লোকেরা ভাবে রোদ লেগে লেগে মুশারফের মাথাটা খারাপ হয়েছে সাত বছর হল। কাছ থেকে জানলে লোকে বুঝত রোদ লেগে লেগে বছর সাতেক হল মুশা একটা রোদ্দুরখেকো পরিপূর্ণ অ-শোক-তরু হয়ে উঠেছে, অর্জুনগাছ যার প্রেমিক। অর্জুনগাছের পায়ের কাছে বসে মুশা মাটি ঘাটতে থাকে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3049 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...