অনিবার্য আহ্বান কিংবা প্রাণের ইশারা

রুমা মোদক

 

শুরুর কথা

মুনিম বেকার হয়েছে বছর হয়নি। এক চৈত্রে আকাশ থেকে অগ্নিশলাকা ছুটে আসার মতো খবর নিয়ে মুনিম ঘরে ঢুকল, তার চাকরিটা নেই জানিয়ে। আমি তখন কুঁচো চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাক রান্না করছিলাম। মুনিম ঘরে প্রবেশ করল অপ্রত্যাশিত এক অগ্নিশলাকা নিয়ে। যে অগ্নিশলাকায় আমার যত্নে গড়া সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে যাবার উপক্রম। বাইরে দুপুরের ঠা ঠা রোদ, আগুনের হলকার মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাটি থেকে আকাশ, গাছের পাতা, পুকুরের পানি, খেলার মাঠ, ঘরের ভেতর ভবিষ্যতের আগাম অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনায় আমি কুঁচো চিংড়ির পুঁইশাক খুন্তি দিয়ে নাড়তে নাড়তে এমন ভাব করলাম, যেন কিছুই হয়নি। নিজের খুব অস্বাভাবিক স্বাভাবিক রকম নির্লিপ্ততায় আমি করে যেতে থাকলাম আমার নৈমিত্তিক কাজ।

এরপর থেকে দিন চলে যাবে, দিন এমন থাকবে না, নিশ্চই আরেকটা চাকরি হবে ইত্যাদি বহুবিধ সান্ত্বনা বাণীর ঝুড়ি নিয়ে প্রতিদিন আমার সকাল হয় দুপুরে হাড়িতে কী চড়াব চিন্তায় আর দুপুর হয় রাতে কী চড়াব চিন্তায়। সঞ্চয়ের ভাঁড়ার শেষ হতে থাকল বাচ্চাদের এটা ওটা আব্দার আমাদের অক্ষমতার অসহায়ত্বের অব্যক্ত যন্ত্রণার সামনে। যে যন্ত্রণা লুকানোর নিপুণ অভিনয়ে আমি অবাক হয়ে যাই।

একটা চাকরি চলে গেলে আরেকটা জুটবে, যেহেতু শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতা কোনও যোগ্যতার পাল্লাই খুব হাল্কা নয় এমনটাই স্বাভাবিক। মুনিমের না হোক আমারও কিছু একটা হয়ে যাবে এমন আশায় আশায় আমাদের দিনগুলো ক্রমশ দুরাশায় নিমজ্জিত হতে থাকে সকল সংগ্রাম আর দুর্বহ যাপন সমেত। আর খুব দ্রুতই সমাধানহীন এক সংকটের মধ্যসমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকি আমরা পুরো পরিবার। কোনওদিকে কোনওই খড়কুটো জোটে না আঁকড়ে ধরার।

রাতে বড় ছেলে জানিয়ে রাখে, আম্মু কাল স্কুলে পরীক্ষার ফি জমা দিতে হবে, এক হাজার টাকা। নগদ এক হাজার কেন, একশো টাকা বের করে দেয়ার সামর্থ নেই যখন, তখন কাকডাকা ভোরে ছুটি ভাইয়ের বাসায়। আসার সময় রিক্সা নিলেও যাবার সময় হেঁটেই যাই, বিশটি টাকা বাঁচানোর জন্য।

যথাসম্ভব দ্রুত ফেরত পাবার প্রতিশ্রুতিতে বড় ভাই যে খুব একটা ভরসা রাখে না টের পাই তার এক হাজার টাকার নোটটা ছুড়ে মারার ভঙ্গিতে। বড় ভাবী এই সাতসকালে এককাপ চা আর দুটো রুটি খাইয়ে দিলে সকালে আমার খাওয়ার প্রয়োজনটুকু মিটে যায়। কিন্তু এই আপ্যায়নটুকু না করে উপেক্ষা আর বিরক্তি আরও স্পষ্ট করে তুললে আমার বুকে অপমানের শেল বেঁধে। আমি বেমালুম অস্বীকার করি। যেন কিছুই হয়নি ভাব করে ভাবী আমার বাসায় যাবেন জাতীয় কুশলগুলো সেরে বাড়ির পথ ধরি।

একহাজার টাকায় বড় ছেলের স্কুল ফি মিটে গেলে ছোট ছেলের তরমুজ খাবার বায়না, স্কুলের ক্যাডস ছোট হয়ে গেছে ইত্যাদি বায়না মেটানোর সামর্থ থাকে না বলে না শোনার ভান করে থাকি। যখন না শোনার ভানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আবশ্যকীয় প্রয়োজনের কাছে, খুঁজে পেতে বের করতে থাকি কার কাছে হাত পাতার বাকি আছে। দু চারশ থেকে দু চার হাজার প্রয়োজনগুলো আপাত মিটে যায়।

এভাবে প্রয়োজনগুলো নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে নিতে একসময় আমি লক্ষ করি, এই আপাত প্রয়োজনগুলো মিটে যাওয়া কেমন মুনিমকে দায়িত্বহীন গা ছাড়া করে তুলছে। সকালে সময়মতো নাস্তার টেবিলে ডিম না পেলে কেমন  জানতে চাইছে, ডিম রাখোনি? যেন সব আগের মতোই যথারীতি নিয়মমতো ঠিকঠাক চলছে। আহা বেচারা, ভেবে প্রথমদিকটায় ছাড় দেই, মেনে নেই। মুখে হাসি এনে পুরনো সম্পন্ন ঘরের ব্যস্তসমস্ত ভাব নিয়ে বলি, নাগো ডিমঅলা আসেনি। রাখা হয়নি। ও তেমন কিছু না বলে খেয়ে নেয় যদিও, কিন্তু একসময় দেখি ও আর সকাল সকাল সিভি নিয়ে দৌড়াচ্ছে না অফিসপাড়া, রাত করে খুঁজে খুঁজে জব ওয়ান্টিং পোস্টে সিভি ড্রপ করছে না। কেমন কূলহীন মধ্যসমুদ্রে হাল ছেড়ে দেয়া নাবিক হয়ে নির্বিকার খাচ্ছে দাচ্ছে ঘুমোচ্ছে। মধ্যসমুদ্রে কূল হারিয়ে ফেলা নাবিকেরা কী এমন নির্বিকার থাকে? জাহাজডুবির আশঙ্কা কী আতঙ্কিত করে না তার হাল ছেড়ে দেয়া হতাশ ক্ষণসমূহে?

আমি মুনিমের মাঝে কোনও আতঙ্ক উৎকণ্ঠা না দেখে, আর চেয়েচিন্তে দিন গুজরান করার সমস্ত সম্ভাবনাগুলো একে একে শেষ হয়ে এলে মুখ খুলতে বাধ্য হই। বাচ্চারা স্কুলে চলে গেলে আমি জানতে চাই, তুমি যে চাকরি বাকরির কোনও চেষ্টাই করছ না! সংসারটা চলবে কী করে? বলতেই অনাকাঙ্ক্ষিত রূপ দেখিয়ে ক্ষেপে ওঠে সে, কম তো ঘুরলাম না দরজায় দরজায়, চাকরি না হলে কী করব আমি? সংসারটা তো আমার একলার নয়, তাই না?

ওর উত্তরে ভ্যাবাচেকা না খেয়ে চ্যাকাভ্যাবা খেয়ে যাই। অকাট্য যুক্তি। হালছাড়া নাবিকের কাছে যে যুক্তি তার পাল্টা যুক্তি দেখানো কতটা অযৌক্তিক আন্দাজ করে আমিও হাল ছেড়ে দেই। সংসারের হাল তো ছাড়লে চলে না, তার উপর আশার হাল ছেড়ে দিই, নয়তো সংসারটাই ছাড়তে হবে। সংসারটা ছেড়েই বা লাভ কী! ছাড়বই বা কেন! পরকীয়া, নির্যাতন ইত্যাদি যেসব সংকট সংসার ছাড়ার ভিত্তি পোক্ত করে কোনওটাই আমার সংসারে নেই। মুনিম চাকরি করছে না, চাকরি খুঁজছে না ইত্যাদি অভিযোগ তুলে সংসার ছেড়েছে নারী এমন অভিযোগ কোথায় কে কবে শুনেছে! কে এসব অভিযোগ শুনে ভ্রূ না কুঁচকে তাকাবে? নারীবাদী, পুরুষবাদী, সুশীল কে! আমি দায়িত্বটা নিজের ঘাড়ে নিই, তবে আমি না হয় খোঁজখবর করি একটু। সার্টিফিকেটগুলো কাগজের টুকরো হয়ে পড়ে আছে নেহাৎ। তেমন আপত্তি দেখি না ওর নিশ্চুপ বসে থাকায়।

আমি চাকরি খুঁজতে শুরু করি। খোঁজার প্রাথমিক প্রবেশপথে আমি চিহ্নিত করি যে উৎসস্থলগুলো, এরা সবাই একদা আমার প্রতি আকর্ষিত ছিল। এ খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে একটা সময় মেয়েরা বিচিত্র মোহনীয় রং কিংবা  গন্ধে আকর্ষিত প্রজাপতির মতো। সবই পরাগায়নের প্রাকৃতিক বাস্তবতা। সময়হীন সময়ে আমি ঝাঁপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। যাবার আগে স্থির জেনে যাই তখন যদিও বা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রাকৃতিক আকর্ষণের উপর প্রেম ভালোবাসা মুগ্ধতার মোড়ক ছিল, এখন তা আর থাকবে না। এ বড় কঠিন চ্যালেঞ্জ। হিরোইন থেকে নিজের জিরোইন মেনে নেয়া। অতীতের রূপরস, ঠাঁটবাট ঝেড়ে এক প্রয়োজনের মলিন আমিত্ব নিয়ে সামনে দাঁড়ানো। যথাযথ নিজেকে প্রস্তুত করেই দাঁড়াই। যেন আমি বেহুলা এক, লখীন্দরের ভেলা ভাসিয়েছি জলে….।

প্রথম নোঙর

বিভাস চমকে যায় আমাকে দেখে, চোখমুখ থেকে অতীত মুগ্ধতার রেশ নিমেষে উধাও হয়ে কর্পূরের মতো মিশে যায় হাওয়ায়। ধাক্কা খাওয়া দৃষ্টি নিয়ে বলে, কেমন বুড়িয়ে গেছ তৃষা। যেন তার একথার অর্থ এই যে আমি এখন অর্থহীন। তবু বসতে বলা, কফি খাইয়ে আপ্যায়ন করা, প্রয়োজনটুকু শোনা সবকিছুর মধ্যে এক পানসে আগ্রহের জমানো ঝুল। যতই নিপুণতার ভান আমি ঠিক টের পাই, বিভাসের পরিকল্পনামাফিক সাজানো এস্টাব্লিশমেন্টের থৈহীন হ্রদে ফোঁটা পানি পতনের ঢেউও জাগে না। আমি আমার আর স্বামী সন্তান সমেত তীব্র বেঁচে থাকার প্রয়োজনের কথা বলি, বিভাস অন্য আরেকদিন দেখা করতে বলে। অফিসে নয়, অন্য কোথাও। কোনও এক নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে।

হিউম্যান রিসোর্সের হেডকে ডেকে ধরিয়ে দেয় সিভি, দেখুন তো ওকে কোথায় সেট করা যায়। বিভাসের নির্দেশেই নির্দেশ অমান্য করার ইশারা। তবু নির্দিষ্ট দিনে একটু বেমানান বেশি সাজগোজ করে আমি দাঁড়িয়ে থাকি লালমাটিয়া আড়ংয়ের সামনে। বিভাসের হিমশীতল গাড়িতে স্ত্রীর সাথে হিমশীতল সম্পর্কের গল্প শুনে শুনে আমি কৃত্রিম আফসোসে ভাসতে থাকি, ডুবতে থাকি। বিভাস বলে, আহা যদি তুমি আমার জীবনে আসতে কত সুন্দরই না হত আমাদের জীবনটা। ভেতরে অনুশোচনা জাগে কিনা উপলব্ধির সমুদ্র সাঁতরে সেই ঝিনুক খুঁজে দেখার পর্যাপ্ত ধৈর্য আমার নেই, তবে আমিও খুব অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছি এমন ছায়া মুখাবয়বে ফুটিয়ে রাখা কঠিন হয় না। কে জানে হয়তো বিভাস সেই কৃত্রিম অনুশোচনার ছায়া ঠিকঠাক চিনতে পারে কিনা! আমাদের পরবর্তী দেখা হওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হয়। বিভাস বলে, এমন জায়গায় যাব তুমি চমকে যাবে, আর জানায় কেমন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় সে ফিরে যাচ্ছে বছর পনেরো বিশ আগে। আমি ফিরতে পারি না, বাড়িতে রাতে রান্নার কিচ্ছু নেই। দু মাস বাড়ি ভাড়া বাকি। পাড়ার দোকানে তেল মরিচ নুনের বাকি পড়েছে হাজার দশেক টাকা। বিশ বছর আগে ফিরে যাবার বিভাসের এই নিখুঁত অভিনয় আমার মাঝে ফেরার কোনওই তাগাদাই জাগায় না। তবু এই আবেগময় বক্তব্যকে সামান্য চাকরির কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়ে যে খেলো করা যায় না, সেই সেন্স কাজ করে ঠিক। আমার টিকে থাকার সংগ্রামের ক্লান্তি গোপন করে আমিও প্রাক্তন প্রেমিকার জৌলুস মুখে মেখে বাড়ি ফিরি।

যথাসময়ে আবার আমাকে চমকে দেয়ার জন্য গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে লালমাটিয়া আড়ংয়ের সামনে দাঁড়ায় বিভাস। যেখানে নিয়ে যায়, সত্যি চমকে যাই বটে। জ্যামের বিরক্তিকর ফসিল জীবনে, নগরবাসীর পরিত্যক্ত আবর্জনার স্তুপে নাক চেপে ধরে রাখা জীবনে, স্বার্থের জন্য কেউ কাঊকে পরোয়া না করা জীবনে এমন জায়গা আছে দেখে সত্যি আমি বিস্মিত হই। গুলশানের চোখধাঁধানো ফ্ল্যাট, অতি দামী আসবাব আর সব ছাপিয়ে বিস্ময় পেছনের লেক আর বারান্দায় কয়েক শ প্রজাতির ফুল পাতাবাহার। সত্যি আমি চমকে যাই। বাস্তবিক চমকে যাই। আমি বারান্দায় ঝুলানো দোলনায় বসে দোল খাই। শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ কী আকাশে? তবু কী মোহময় প্রতিচ্ছবি এর লেকের জলে পরীদের ভঙ্গিমায় নাচে। দেখতে দেখতে প্রথমবার আমার মনে হয়, আহা যদি আমার এই চুলায় হাড়ি চাপানো, আর দোকান থেকে বাকিতে তেল নুন আনার পিছুটান না থাকত জীবনে! এই মোহময় চাঁদের হাসিটাও উপভোগ করতে পারি না আমি কাল সকালে ছোট বাচ্চার ওষুধের টাকা কোথা থেকে যোগাড় হবে ভেবে।

বিভাস পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে, কোথায় বিশ বছর আগের সলজ্জ জড়তা! হাত ধরে দোলনা থেকে নামিয়ে বিছানায় নিয়ে আসে…..। পরনের পোশাক খুলতে খুলতে, অন্তর্বাস ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বলে, আমরা এখন যথেষ্ট ম্যাচিউর। ইমম্যাচিউর সময়ের সামান্য স্পর্শের জড়তা এখন ঝড়ের তুলোর মতো উড়ে যায়। আটকানোর কিংবা উপভোগের কোনও চেষ্টাই করি না আমি। আপত্তিও নয় সমর্পণও নয়। দশ বছরের দাম্পত্যের অভ্যস্ত গন্ধের বিপরীতে সম্পূর্ণ অপরিচিত গন্ধে আমি দমবন্ধ মুহূর্ত যাপন করি। কেবল শরীর থেকে আত্মার সম্পর্কহীন শরীর ছেঁকে নেয়ার ওর অভ্যাস আমাকে নিশ্চিত করে বিছানায় কতটা পেশাদার বিভাস। নিশ্চয়ই এই নাক-মুখ চেপে সহ্য করার বিনিময়ে একটা ব্যবস্থা হবে, নিজ থেকে না ওঠালে নিজেই প্রসঙ্গটা ওঠাব এসব প্রেমের বাহানা তুচ্ছ করে। দুঃসহ যাপন আমাকে এই নির্লজ্জ প্রয়োজন প্রকাশের প্রয়োজন শিখিয়েছে। ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে হতে ভাবনাগুলো গুছিয়ে নেই।

সিগারেটে শেষ টান দিয়ে এশট্রেতে চেপে নেভাতে নেভাতে উঠে আসে বিভাস। পকেট থেকে কতগুলো হাজার টাকার নোট দেয় আমাকে। আমি হাত পেতে নিই। বিভাস কৈফিয়ত দেয়, আসলে এই মুহূর্তে অফিসে ঠিক উপযুক্ত ভেকেন্সি নেই। মাথায় থাকল। সুযোগ হলেই ডেকে নেব।

বেশ নির্ভার নিশ্চিন্ত লাগে, যদিও জানি এই সমাধান আপাতই। তবু নিত্য যার হাড়িতে ভাত নাই, নিত্য আবেশী তার কাছে এই কয় হাজার অতর্কিতে পাওয়া টাকা রাজসম্পদ বলে বোধ হয়। হোক তা ভিক্ষা কিংবা খেপের পারিশ্রমিক। সে বিবেচনা আমার খাটে না।

দ্বিতীয় নোঙর

মাহমুদ খুব স্মার্টলি হ্যান্ডেল করে। আমাকে দেখেই পিএ-কে নির্দেশ দেয়, কেউ যেন আপাতত অফিস ঘরে প্রবেশ না করে। তারপর এসি বাড়িয়ে দিয়ে জানতে চায়, কোল্ড অর হট? আমি প্রচণ্ড গরমে খানিক হেঁটে খানিক রিক্সায় ঘেমে নেয়ে ভিজে এসেছি। কোল্ডই চাই। তারপর বলো, এই অধমকে এতদিন পর কেন স্মরণ করলে বলে মাহমুদ আমার অধমত্বকে স্পষ্ট করে দেয়। মাহমুদের অভিজ্ঞ চোখ আঁচ করে সময়ে নার্সিসাসের মতো নিজেতে ডুবে থাকা আমার আজ নতজানু হতেই তার কাছে আসা। যে আকর্ষণ আমাকে ঘিরে তার ছিল এক সময়ে তা আজ রং চটে বর্ণহীন। এর মাঝে সামান্যতম মোহের রং খুঁজে ফেরা অযৌক্তিক নয় কেবল, বোকামিও।

প্রয়োজনের কথাটুকু শুনে আমাকে নিয়ে বের হয়ে আসে মাহমুদ। ড্রাইভার যেন জানে কোথায় যেতে হবে। লিফট ডিঙিয়ে যেখানে পৌছই আমরা, সেখানে দিনের বেলাতেও যেন গভীরতর রাত। মৃদু আলো আর মিউজিক। টেবিলে টেবিলে ফিসফিস। ওয়েটারও সম্ভবত সব জানে, কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিলে আসে ফ্রাই করা ব্রয়লার মুরগির ঠ্যাং, ট্রেতে করে বোতল গ্লাস বরফকুচি…। অভ্যাস আছে?, জানতে চেয়ে নিজের গ্লাস তৈরি করতে থাকে মাহমুদ। অভ্যাস আমার সত্যি নেই। মুনিমের সাথে আমার খুব সাদামাটা একটা সংসার। মিডলক্লাস নিয়মের বাইরে সেখানে কোনওই বিচিত্র বর্ণ নেই। আমি এসব বলার প্রয়োজন বোধ করি না, মূলত মাহমুদের শোনার প্রয়োজন নেই বলে। তবে মাহমুদ বলে, স্ত্রী তার নিয়ন্ত্রণহীন, অবাধ। চাহিদার শেষ নেই। অসহ্য অশান্তি ঘরে। মূলত তার কোনও ঘর নেই। সে আর তার স্ত্রী দুজনের কাছেই বাইরের জগৎটাই আশ্রয়। যেখানে দিনশেষে ফেরার তাড়া থাকে তাকেই তো ঘর বলে? না দুজনের কারও ফেরার তাড়া নেই। রাত গভীর হলেও না। বাচ্চাটা বুয়া আয়াদের কাছেই বড় হচ্ছে। মাহমুদ বলে, বলতে থাকে ততখানি যতখানি বললে আমার মায়া জন্মায়। আমার মায়া জন্মায় কী জন্মায় না বুঝি না, আমি মায়াময়ী চোখে তার ঠোঁটে ঘূর্ণায়মান সিগারেটের ধোয়া দেখি, গ্লাসের বাইরে জমা কুয়াশার আস্তরণ দেখি।

ঘোলাটে চোখে মাহমুদ প্রস্তাব দেয় চলো কোথাও ঘুরে আসি একদিন। মাহমুদের প্রবল প্রতিপত্তি আর বিত্ত বৈভবের বর্ণিল সমস্যার সামনে নিজের হাভাতে সমস্যাকে বড়ই ক্লিশে আর পানসে লাগে। ব্যক্ত করার কোনওই যুক্তি খুঁজে না পেয়ে মাহমুদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। মনে মনে যদিও ভাবি, সত্য হোক কিংবা মিথ্যা নিজের হাড়ির খবরটুকু অবলীলায় বলে গেলেও মাহমুদ তো মুহূর্তের জন্য আমার হাড়ির কোনও খবরই জানতে চাইল না। আমার পোশাক-আশাক, চেহারায় কি অভাবী দীনতার ছাপ স্পষ্ট?

দিন-তারিখ সব ঠিকঠাক হবার পর একদিন হঠাৎ চমকে দিয়ে আমার বাসার সামনে মাহমুদের গাড়ি থামে অনেক চকলেট আর মিষ্টি নিয়ে। ক্ষয়ে যাওয়া আর্থিক অবস্থান না বুঝাতে ভদ্রতার তবু কমতি করি না। কিছু খাবে খাবে না করলেও দোকান থেকে কিনে আনি ফেনা তোলা কফি, দামি কেক, আমার কাছে যা আপ্যায়নের সর্বোচ্চ সীমা। মুনিম আমার এরকম বিত্তবান বন্ধু আছে দেখে বর্তে যায়, কেমন বসের সামনে বসা কেরানির মতো আচরণ করে। হাত কচলায়, জ্বী জ্বী করে। বিব্রত হলেও আমি জানি নিরুপায় আমার মুনিমের এই নতজানুতা সহ্য করাই নিয়তি এখন। মাহমুদ হয়তো মুনিমের অসহ্য নতজানুতা কিংবা আমার বাচ্চাদের কাঙাল দৃষ্টি দেখে কিছু অথবা সবকিছুই বুঝতে পারে। যাবার সময় ছোট বাচ্চার হাতে কড়াকড়া পাঁচটি হাজার টাকার নোট গুঁজে দেয়।

নির্দিষ্ট দিনে শ্রীমঙ্গলের এক নীরব রিসর্টে আমরা একত্রিত হই। নেশায় চুরচুর মাহমুদ উন্মাদের মতো আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমার উপর, যেন দীর্ঘ অনাহারী ক্ষুধার্ত বাঘ। কামড়ে আঁচড়ে নিজেকে ঢেলে দিয়ে নেশার ঘোরে বেহুঁশ ঘুমায়। আমি এপাশ ওপাশ করি, বাচ্চাদের মুখগুলো চোখের পাতা বন্ধ করতে দেয় না। এই প্রথম বাচ্চাদের রেখে আমার বাইরে রাত যাপন। ছোট বাচ্চাটা আমার বুকের ওমে মুখ লুকিয়ে ঘুমের গন্ধ খুঁজতে অভ্যস্ত। বড় বাচ্চাটা এসব শুকনো আলুভর্তা সবজি খেতে না পেরে কতদিন বায়না করে, মা চিকেন রাঁধো না কেন? চিকেন খাব। ভুলিয়ে ভালিয়ে খাওয়াতে হয়। গভীর লেবুবনে চারদিকে লেবুর ভরাপেট ডালভাতের গন্ধ, কিন্তু মোবাইলের নেট নেই। বাচ্চারা মোবাইলে পাবে না। গাজীপুর ফ্যাক্টরিতে ইন্টার্ভিউয়ের কথা বলে বেরিয়েছি, কী কী মিথ্যা সাজাতে হবে ঠিকমতো গুছাতে পারি না নির্ঘুম রাতে। বাচ্চাদের পিছুটান আর প্রথম অভিজ্ঞতার অনভ্যস্ততা একটা গোটা রাত কাটানো দুঃসহ নিঃসঙ্গতা আর অস্থির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পীড়িত করে তোলে আমাকে।

গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়ার সময় বিশ হাজার টাকার চেক ধরিয়ে দেয় মাহমুদ, এই দিয়ে আপাতত চলো, দেখি কী করা যায় তোমার জন্য।

এই দেখি কী করা যায়, ভেকেন্সি হলে ডাকব ইত্যাকার প্রতিশ্রুতিগুলি বেমালুম ভুলে আমি বিভাস আর মাহমুদে অভ্যস্ত হয়ে যেতে থাকি। ওদের কাছে প্রয়োজনে চাইতে আর মোটেই বাঁধে না। কিন্তু এই চাওয়া পাওয়া বড়ই অনিশ্চিত আর অনিয়মিত। চাওয়ার জড়তাটুকু বাদই দিলাম, প্রয়োজনে মিলবে কী মিলবে না এই আশঙ্কার দুরুদুরু বিপর্যস্ত করে রাখত দিন।

নিজের ভেতরের দুরুদুরুকে বৈধতা দিতে বাঁধে না যখন তখন বিছানা ভাগাভাগি করতেও। সংসার চলে সংসারের নিয়মে, আমি মাঝে মাঝেই খাবার টেবিলে বিস্ময়াভিভূত মুনিমকে দেখি, ও কী ভাবে, ও কী ভাবে না এই যোগানের উৎস কী! ঠিক নিয়ম করে উপগত হয় আমাতে, কোনও দ্বিধা, জড়তাহীন। এক ছাদের নিচে আমার বোধ হতে থাকে কত কাছাকাছি থেকে কত কম চিনতে পারে মানুষ মানুষকে। অথবা চিনেও না চেনার ভান করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে!

নটে গাছটি মুড়োয় না

তখনই ঘটনাটা ঘটে। প্রথমটায় এক অনিশ্চিত খাদে পতিত হবার আশঙ্কায় নিজেকে দিগভ্রান্ত লাগে। নিশ্চিত হবার সাথে সাথেই নার্সিং হোমের ঠিকানা সন্ধান করার চিন্তা মাথায় আসে, যেন মুহূর্ত দেরিতে সাংঘাতিক ক্ষতি হয়ে যাবে। এমনই বুক ধড়ফড় উৎকণ্ঠিত সময়ে হঠাৎ ইশারা পাই এক অনাগত প্রাণের। যেন বা এক দেবদূত দেখায় পথ..। বুক ধড়ফড় করা উৎকণ্ঠা আমার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। নিশ্চিন্ত আখের গোছাবার ইশারা পাই আমি দৈব প্রাপ্তির মতো!

পিরিয়ডের নির্দিষ্ট দিন, মাস এমনকি দুটি সার্কেল পার হয়ে গেলে, ওয়াশরুমে প্রেগন্যান্সি টেস্ট স্ট্রিপে পরপর লাল দাগ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলে আমি সেই ইশারার অর্থ বুঝতে পারি। আমি প্রথমে বিভ্রান্ত হই, দুজনকে একইসাথে ব্ল্যাকমেইল করা কী নৈতিক হবে? পরক্ষণেই ঝেড়ে ফেলি যে সম্পর্কের অলীক জালে নিজেকে জড়াচ্ছি শুধু বেঁচে থাকার অনিবার্য প্রয়োজনে তাই বা কতটা নৈতিক! যদি শেষটুকু রক্ষা না হয়, দুজনের কাছেই ধরা পড়ে যায় আমার দুধসাদা পায়ের কালো কালো ছাপ! দিন যায়, ক্ষণ যায়, আকাশ-পাতাল ভাবনার অতলে নিজেকে বুঝানোর মতো সান্ত্বনার থৈ পাই। নিশ্চয়ই এই প্রকাশে আমার চেয়ে সামাজিক অবস্থানগত কারণে দুজনের ভাবমূর্তির সংকটটাই বেশি…। অতপর বিভ্রান্তি ঝেড়ে হিসাব করতে বসি। ঠিক কত টাকা আদায় করা গেলে মুনিমকে একটা নির্দিষ্ট পেশায় স্থিত করা যায়, হোক একটা মুদি দোকান, চায়ের টং তবু একটা নিশ্চিত উপার্জন। কত লাগতে পারে কত চাইতে পারি?

শুধু অস্তিত্বের অনিবার্য প্রয়োজনে অথবা যেন বা নিয়তির ডাকে আমার এই যে আলুথালু ঝাঁপ, পরিণতি না ভেবে ঘাটে ঘাটে নোঙর! জীবনের এক বিরাট কণ্টকময় ঝোপ হয়ে পথ আটকে দাঁড়ানো যেমন এক অনিবার্য নিয়তি, দুয়ারে দুয়ারে নোঙর ফেলার নিয়তিও অনিবার্য আর অনিবার্য নিয়তি এই ভ্রূণ। মুনিম, বিভাস নাকি মাহমুদ কার ঔরস নিশ্চিত হবার প্রয়োজন থেকে আমার কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায় এই পুঁজি। ইশারা আমাকে বলে দেয় একে পুঁজি করেই পাড়ি দিতে হবে অতীতের সংকট আর লড়াইয়ের মহাসমুদ্র। গুছিয়ে নিতে হবে অনাগত ভবিষ্যৎ। আমি পারব তো শেষ পর্যন্ত?!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3047 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...