দ্বিতীয় পাঠ : নাটুকে বাবু এবং মন্দ স্ত্রীলোক

পূর্ণা চৌধুরী

 

১/ রাজারাম সম্বাদ

 

কদিন আগেই বাবুয়ানি নিয়ে দু’ চার কথা বলেছিলাম। তাতে এক জায়গায় লিখেছিলাম বাবুয়ানির তিন পুরুষ হল কেনারাম রাজারাম, বেচারাম। ১৮৫৭-র আশ পাশ হল রাজারামদের যুগ। তাঁরা বাপ পিতামহের দুই পয়সা পেলেন, হিন্দু কলেজে গিয়ে বাবু হলেন। এরই মধ্যে যাঁরা আলালের ঘরের দুলাল হয়ে উঠতে পারলেন না তাঁরা নাট্যশালায় further এনলাইটেনমেন্ট-এর উপায় খুঁজে পেলেন। ১৮৫৭ সালে দেখা গেল তিন বাবু নাট্যশালায় মজলেন। ১৮৫৭-তে লখনৌয়ের বাদশাহ যখন তাড়া খাচ্ছেন তখন একই সঙ্গে তিন তিনটে নাট্যশালা একসঙ্গে শুরু হতে দেখা গেল, সাতু বাবুর (আশুতোষ দেব) সিমলার বাড়িতে বাবু নন্দকুমার রায়ের অভিজ্ঞান শকুন্তলের অভিনয় ৩০শে জানুয়ারী। মার্চ মাসে বাবু রামজয় বসাকের বাড়ি রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’, এবং বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহের বিদ্যোৎসাহিনী সভার উদ্বোধনে ওই একই ‘নাটুকে রামনারায়ণ’-এর ‘বেণী সংহার’নামানো হয় ১১ই এপ্রিলে। তার আট বছরের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে মেট্রোপলিটন থিয়েটার (১৮৫৯), শোভাবাজার রাজাদের প্রাইভেট থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি (১৮ই জুলাই ১৮৬৫), বাবু যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের পাথুরিয়াঘাটা বঙ্গনাট্যালয় (৩০শে ডিসেম্বর ১৮৬৫) এবং যারে কয় last but not least, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাবুদের নাট্যশালা (জানুয়ারী ১৮৬৭) এবং বাবু বলদেব ধর ও চুনিলাল বসুর বহুবাজার বঙ্গ নাট্যালয় (১৮৬৮)।

শুরুরও শুরু থাকে। সর্বনাশের গোড়াপত্তন যে Hindoo এনলাইটেনমেন্ট-এ সে ব্যাপারটি পরিষ্কার। একটি পোকায় কাটা বইয়ের পাতা উল্টে দেখি ১৮৩৭-এর ২৯শে মার্চ গভর্নমেন্ট হাউসে হিন্দু কলেজের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে ছাত্র-বাবুরা শেক্সপিয়রের খানিক খানিক অভিনয় করেন। এরপর দেখছি ১৮৫১-র ৭ই অগাস্ট বটতলায় ডেভিড হেয়ার একাডেমী শুরু হয় হাটখোলার বাবু গুরুচরণ দত্তের উদ্যোগে। ১৮৫৩-তে সে একাডেমীর হিন্দু ছাত্রেরা শেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অফ ভেনিসের Act IV Scene One-এর আবৃত্তি করেন। সমাচার দর্পণ তার actor-দের তালিকা ছেপে বেশ ফলাও করে খবরটি ছাপিয়েছিল। অভিনেতার তালিকায় দেখলাম Portiar ভূমিকায় Obhoychurn Bose, Nerissa-র ভূমিকায় Rajendranarain Mitter আর Nelly Gray-র ভূমিকায় Gobinchunder Dutt।

আলোকপ্রাপ্ত রাজারামরা যে ঐ সময় থেকেই নাট্যরঙ্গে মজেছেন তা জানা গেল। তবে কি না নারী চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে যে ব্যাটাছেলে ছাড়া গতি নেই তা জলবৎ তরলম্। নব্য বাবুরা তাতেই খুশি। মেয়েমানুষ যে পাড়ায় গেলে পাওয়া যায় সে পাড়ায় যায়ই বা কে, তাদের স্কুলের বাবুদের সঙ্গে অভিনয় করতে দেওয়ার মতো নিঘিন্নে কাজই বা করে কে। অতএব, Obhoychurn বিনে গতি নেই। ছোটবেলায় শোনা মায়ের ছোটবেলার গল্প মনে পড়ে গেল, সেটা এই ফাঁকে বলে নিই। মায়েদের ছোটবেলাতে পাড়ায় পাড়ায় যাত্রার পালার চল ছিল। সেটা প্রাক-স্বাধীনতা যুগ। মায়ের কাছেই শুনেছি দুর্গাবাড়িতে যাত্রা হলে বড় দাদা-কাকাদের সঙ্গে বাড়ির ছোট মেয়েদের যাত্রা দেখতে যাওয়ার অনুমতি মিলত। যত না উৎসাহ ছিল যাত্রা দেখার, তার চেয়ে অনেক বেশি রোমাঞ্চ ছিল চট দিয়ে ঢাকা গ্রীনরুমে উঁকি দেওয়াতে। “ওই দ্যাখ, সীতা বিড়ি খাচ্ছে”বলে অধিকারী মশাইয়ের তাড়া খাওয়ার গল্পও মায়ের মুখেই শোনা। পালার নাম ছিল ‘সীতার বনবাস’। যাকগে, কথাটা এই জন্যে বলা যে বালক নটীদের দেখে মায়ের দেখা ধূমপানরত সীতাকে মনে পড়ে গেছিল। এবার আসল কথায় ফিরি।

সায়েবদের থেকে মদ ছাড়াও বাবুরা পেয়েছিলেন শেক্সপীয়ার। সে বেশ সকাল-সকালই পেয়েছিলেন দেখা যাচ্ছে। তাঁরা ইংরিজি নাটক দেখতে বেশ যেতেন, এমনকি অভিনয়ও যে করতেন এক-আধটু সে-ও শুনলাম। দুই চার পত্রিকাতে সে সবের রিভিউও বেরোত। কিন্তু আমার ওসব উচ্চ বিষয়ে মন নেই। আমি খালি বাজে জিনিস খুঁজে বেড়াই। ১৮৪৮ সালে Sans Souci থিয়েটারে ‘ওথেলো’-র অভিনয় হয়। ২১শে অগাস্ট ‘সংবাদ প্রভাকর’ লেখে–

“গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সানশশি (Sans Souci) নামক থিয়েটারে বেশ সমারোহ হইয়াছিল, বহুদিবস হইল ঐরূপ সমারোহ হয় নাই, কলিকাতা ও অন্যান্য স্থানের সাহেব ও বিবি এবং এতদ্দেশীয় বাবু ও রাজাদিগের সমাগম দ্বারা নৃত্যাগারের শোভা অতি মনোরম হইয়াছিল […] এতদ্দেশীয় নর্তক বাবু বৈষ্ণবচাঁদ আঢ্য ওথেলোর ভঙ্গি ও বক্তৃতার দ্বারা সকলকে সন্তুষ্ট করিয়াছেন, তিনি কোনো রূপে ভীত অথবা কোনো ভঙ্গির অবহেলন করেন নাই, তিনি চতুর্দিগ হইতে ধন্য ২ শব্দ শ্রবণ করিয়াছেন এবং তাঁহার উৎসাহ ও সাহস বদ্ধমূল হইয়াছে, যে বিবি ডেসডিমোনা হইয়াছিলেন তিনিও বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠিতা হইয়াছেন..”।

এর পরে আরও খানিক নাট্য সমালোচনা আছে বৈষ্ণবচাঁদ আঢ্যর অভিনয় নিয়ে, কিন্তু ওই যে বললাম আমি খালি বাজে খবর খুঁজে মরি, আমার নজর পড়ল ‘বিবি’ ডেসডিমোনার ওপর। খানিক চিন্তা করলাম এই বিবি কোনও ইহুদি বিবি কিনা, কারণ তাঁদের সৌন্দর্য বিষয়ে দু-চার কথা ‘সধবার একাদশী’তে নিমচাঁদের মুখে শুনেছিলাম বটে। কিন্তু পরে দস্তুরমতো চিন্তা করে দেখলাম সেইসময় কিছু ইংরেজ বিবির কলকাতায় গতায়াত হয়েছিল। বামাবোধিনী বিবি শিক্ষয়িত্রী রেকমেন্ড করছে, সে কথা আগেই বলেছি। নাট্যজগতেও দুই বিবির খোঁজ পেলাম; মিস এলিস আর মিসেস গ্রেগ। মিস এলিস-এর খবরটি বেশ চমকপ্রদ । ১৮৫৩ ৬ই অগাস্ট ‘সংবাদ প্রভাকর’ বলছে–

“অবগতি হইল ওরিয়েন্টালি ছাত্ররা এক প্রকাণ্ড ভাণ্ড কাণ্ড ফাঁদিয়াছেন, এতদিন মেন্ Clinger সাহেব একাকী অধিকারী হইয়া বিলিতি যাত্রার উপদেশ দিতেছিলেন। এইক্ষণে এক শ্বেতাঙ্গী শ্ৰীমতী তাহার অধিকারিণী হইয়াছেন, ইহার নাম ইলিস, যিনি আসিয়া ভাব ভঙ্গির শিক্ষা প্রদান করিলে নাটকের আরও চটক পড়িবেক্।”

এই বিবি এলিসের গড়ের মাঠে ‘নৃত্যাগার’ ছিল এবং ১৮৫১-র ২৬শে এপ্রিল সংবাদ প্রভাকর জানাচ্ছে যে সেই নৃত্যাগার ‘পবন ঠাকুরের কৃপায় পতিত হইয়াছে’।

যাই হোক, চটক কতটা পড়িয়াছিল বলা যায় না তবে বিলিতি বিবিদের যে প্রথম যুগের নাট্যশালায় যাতায়াত ছিল তা দেখাই যাচ্ছে। ১৮৫৪-র ১৭ই মার্চ ওরিয়েন্টাল থিয়েটার, ২৬৮ গরানহাটা, চিৎপুরে রোডে মার্চেন্ট অফ ভেনিস আবার পেশ করা হয়। এবার Portia-র ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে মিসেস গ্রেগ-কে। The Bengal Harkaru জানাচ্ছে “that will be her last performance and indeed the close of her last day’s sojourn in Bengal.” এই সব বিবিদের সুখ-দুঃখের কথা লিখব কোনও একসময়। এনারা ছিলেন মহারানীর আমলের ‘Cargo’…। জাহাজ ভর্তি হয়ে এঁরা এদেশে আসতেন ভাগ্য খুঁজতে। কেউ বা গরিব বাপের মেয়ে, বর জোটেনি, তাই চলেছেন বিদেশে বরের খোঁজে। কারও স্বামী ছেড়ে গেছে অথবা কোনও লম্পট বদমাইশের হাত থেকে পালিয়ে তাঁরা নতুন দেশে নতুন জীবন খুঁজছেন। যাঁদের ভাগ্যদেবী নতুন দেশেও মুখ ফিরিয়ে নিতেন, তাঁরা আবার ‘Returned Cargo’ হয়ে ফিরে যেতেন নিজেদের দেশে। মিসেস গ্রেগ তেমনি কেউ ছিলেন কিনা কে জানে…

***

বাবুদের নাট্যশালায় ফিরি। ১৮৫৭-র জুলাই মাসে সাতুবাবুর প্রাসাদে ‘অভিজ্ঞান শকুন্তল’-এর অভিনয়ে নারীচরিত্রে তখনও বাবুদের রবরবা। Cast list-টি দেখলাম-–

শকুন্তলার ভূমিকায় ছাতুবাবুর পৌত্র বাবু শরৎ চন্দ্র দেব।

অনসূয়া: অবিনাশ চন্দ্র ঘোষ।

প্রিয়ম্বদা: ভুবনমোহন ঘোষ।

অভিনয়ের পরে এক বাবু জানালেন: “যখন বিশ হাজার টাকার অলংকারে মণ্ডিত হইয়া শরৎবাবু দীপ্তিময়ী শকুন্তলার রানিবেশ দেখাইয়াছিলেন তখন দর্শকবৃন্দ চমৎকৃত হইয়াছিলেন।”

মনে মনে ভাবলাম, হইবেনই। আশ্রমবাসিনী শকুন্তলার বিশহাজারী ঠমক দেখে দর্শককুল ভিরমি যে খাননি সেটা শরৎবাবুর কপালগুণ। এ ধারে আমি নিরন্তর কাস্ট লিস্ট খুঁজে চলেছি আর বাবুদের অবলোকন করছি। বাবু যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের পাথুরিয়াঘাটা বঙ্গ নাট্যালয়ে ১৮৬৬-তে ‘বিদ্যাসুন্দর’ নাটকের অভিনয় হয়। তার কাস্ট লিস্টটিও দেখলাম:

বিদ্যা: মদনমোহন বর্মন (খোট্টা)

হিরে মালিনী: শ্রী কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়

সুলোচনা চপলা (রাজকন্যার দাসী): শ্রী ষষ্ঠীদাস মুখোপাধ্যায়, শ্রী যদুনাথ ঘোষ, শ্রী হরকুমার গঙ্গোপাধ্যায়

বিমলা: শ্রী নারায়ণ চন্দ্র বসাক।

 

২/ অভিনয়ে পূর্ণ হল কলিকাতা ধাম

 

 

পিছিয়ে এলাম ১৮৫৯-এ। তার একটি বিশেষ কারণ আছে। ১৮৫৯ সালে বঙ্গরঙ্গমঞ্চ জমজমাট। জনৈক রামদাস সেন ১০ই মে সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়ে ছড়া কাটলেন:

নিত্য নিত্য শুনতে পাই অভিনয় নাম।

অভিনয়ে পূর্ণ হলো কলিকাতা ধাম।।

হায় কি সুখের দিন হইলো প্রকাশ।

দুঃখের হইলো অন্ত সুখ বারোমাস।।

দিন দিন বৃদ্ধি হয় সভ্যতা সোপান।

দিন দিন বৃদ্ধি হইলো বাংলার মান।।

হায় কি সুখের দিন হইলো উদয়।

এদেশে প্রচার হলো নাট্য অভিনয়।।

এবার পাইকপাড়ার রাজাদের কথা পৃথকভাবে না লিখলে অপরাধ হবে। তাঁদের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ির নাট্যশালায় বড় বড় মানুষের পায়ের ধুলো পড়ত। রাজা গজারা ছাড়াও তাঁদের বেলগাছিয়া নাট্যশালায় যাঁরা যেতেন তাদের মধ্যে ছিলেন বাবু প্যারীচাঁদ মিত্র, শ্রীযুত পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন। বাংলাদেশের ছোট গবের্নের শ্রীযুক্ত মান্যবর হেলিডে সায়েবেরও নাম পাওয়া গেল। কিন্তু আর একটি গুরুতর কারণে এই নাট্যশালা বিশিষ্ট। এই মঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্নর ‘রত্নাবলী’ নামে যে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়, তা দেখে মোহিত হয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত নামধারী একজন বিলেত ফেরত বয়ে যাওয়া বাবু। তিনি তখন সদ্য সদ্য মাদ্রাজ থেকে কলকাতা এসেছেন এবং কলকাতা পুলিশ আদালতে কেরাণীর চাকরি নিয়েছেন। তাঁর আর্থিক অবস্থা যে কী ছিল সে বাংলাদেশের তাবৎ মানুষ জানেন, ও নিয়ে বেশি বলার প্রয়োজন দেখি না। তা সেই অবস্থা থেকে তাঁর উদ্ধার পরিকল্পে তাঁর বন্ধু বাবু গৌরমোহন বসাক তাঁর সঙ্গে এইসব বড়মানুষদের পরিচয় করিয়ে দেন। রত্নাবলী নাটক দেখতে যে সব সায়েব সুবো আসতেন, তাঁদের জন্যে একখানি ইংরিজি অনুবাদ প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, পাইকপাড়ার রাজা শ্রীযুত প্রতাপ চন্দ্র সিংহ বাহাদুর সেই অনুবাদটির বরাত তাঁকেই দেন। পাওনা ধার্য্য হয়েছিল ৫০০ টাকা।

এই রত্নাবলী নাটক দেখেই পুলিশ কোর্টের কেরাণীর নাটক লিখতে সাধ গিয়েছিল। ফলশ্রুতি স্বরূপ ‘শর্মিষ্ঠা’ এবং বঙ্গসাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ’র তোলপাড়।

কিন্তু আমরা এখানে মাইকেল গাথা রচনা করতে বসিনি। পাঠক যদি এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ চান তবে পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ বইটি পড়বেন। আরাম পাবেন। যাইহোক, শর্মিষ্ঠার অভিনয় হল এবং কশ্চিৎ রাজা ঈশ্বর চন্দ্র সিংহ বন্ধু গৌরদাস বসাককে যে Dramatis Personae-খানি পাঠালেন তাতে দেখা গেল:

Debjani: Hemchunder Mookerjee

Sharmista: Krishtodhon Banerjea (a new comer)

Purnika: Kally Das Sandel (formerly our dancing girl)

Dabika: Aghor Chunder Dhagria

Notee: Chunilal Bose (as before)

Maid Servant: Kally Prasanna Mookerjee

Dancing Girls: Same as before plus Bankim chunder Mookerjee.

একটি ব্যাপার দেখে বড় আশ্চর্য হলাম। ১৮৫৯-১৮৬৬ নাক উঁচু উচ্চবর্ণের বাবুরা ‘মেড়ো’ আর ‘খোট্টা’দের সঙ্গে অবলীলায় নাট্য কর্ম করেছেন, কোথাও বাধেনি। বোধ করি এই সব মেড়ো ও খোট্টা পথ ভুলে হিন্দু কলেজ বা সমগোত্রীয় কোনও কলেজে মনোভুলে ঢুকে পড়েছিলেন, তাতেই ভাগ্যক্রমে এঁদের কুলীন সংসর্গ হয়েছিল…। লিখতে লিখতে আমার দিদিমার কথা মনে পড়ে গেল। তিনি তাঁর এক বৈবাহিককে আজীবন ‘স্যান্ডেল মশাই’ বলে সম্বোধন করতেন, ছোটবেলায় এ নিয়ে তাবৎ মজা পেতাম। উটি যে আদতে বিলিতি লব্জ তা জেনেছিলাম বহু দিন পরে।

 

 

৩/ কুম্ভদাসী, পরিচারিকা, কুলটা, স্বৈরিণী, নটী, শিল্পকারিকা প্রকাশবিনষ্টা রূপাজীবা গণিকাচেতি বেশ্যাবিশেষাঃ

–কামসূত্র

এখন আমি যে কথাটি বলতে চাইছি তা হল থিয়েটার-এ ১৮৫৫-৫৭-র আগে স্ত্রীলোকের আমদানি হয়েছিল কিন্তু তাঁরা ধোপে টেকেননি। দাড়ি-চাঁছাদের দিয়েই নাট্যমোদীদের সন্তুষ্ট রাখা হচ্ছিল তার কারণ সুশীলারা দুষ্প্রাপ্য এবং দুঃশীলাদের ছোঁয়াচ বঙ্গ সমাজের ন্যায়বাগীশরা তেমন ভালো চোখে দেখেননি।

বাবু নবীন চন্দ্র বসুর এমনি বুকের পাটা যে ১৮৩৫-এ তাঁর নাট্যশালার বিদ্যাসুন্দর অভিনয়ে চার চারটি মন্দ স্ত্রীলোককে তিনি মঞ্চে ঠেলে তুললেন। তাঁদের প্রমোশন হল। তাঁদের তিনজনের খবরের কাগজ পঞ্চমুখে প্রশংসা করল। আমরা অভিনেত্রীদের নাম জানলাম– রাধারাণী, জয়দুর্গা, রাজকুমারী ও বৌহরো ম্যাথরাণী। আরও জানলাম যে, এঁদের সবাইকে পতিতালয় থেকেই অভিনয়ের জন্য আনা হয়েছিল। গুণীজন রাধারাণী, জয়দুর্গা, রাজকুমারীর গুণগান গাইলেন কিন্তু বৌহরো ম্যাথরাণীর প্রসঙ্গ উঠতে দেখলাম না কোথাও। বোধ করি নামখানি তাঁদের জিভে বেঁধেছিল। ম্যাথরাণী তলিয়ে গেলেন। রক্ষণশীল সমাজ চুপ করে রইল না। সুলভ সমাচার পত্রিকায় লেখা হল–

সিমলার কতগুলি ভদ্রসন্তান বেঙ্গল থিয়েটার নাম দিয়া আর একটি থিয়েটার খুলিতেছে। ….যে যে স্থানে পুরুষদের মেয়ে সাজাইয়া অভিনয় করতে হয়, সেই স্থানে আসল একেবারে সত্যিকারের মেয়েমানুষ আনিয়া নাটক করিলে অনেক টাকা হইবে-– এই লোভে পড়িয়া তাঁহারা কতগুলি নটীর অনুসন্ধানে আছেন।… মেয়ে নটী আনিতে গেলে মন্দ স্ত্রীলোক আনিতেই হইবে, সুতরাং তাহা হইলে শ্রাদ্ধ অনেক দূর গড়াইবে। কিন্তু দেশের পক্ষে তাহা নিতান্ত অনিষ্টের হেতু হইবে।

বাবু নবীন চন্দ্র বসুর নাট্যশালা বেঙ্গল থিয়েটরের দরজা বন্ধ হলে কিছুদিন বঙ্গসমাজ ভরাডুবির হাত হতে রক্ষে পেলেন। এর পরবর্তী সময়ে Kally Prasanna Mookerjee, Chunilal Bose আদিরা দাড়ি কামিয়ে রং মেখে শাড়িটি পরে স্টেজ আলো করতে থাকলেন। সে বৃত্তান্ত প্রথম অনুচ্ছেদে বলেছি।

১৮৭৩ সালে ছাতুবাবুর নাতি তাঁর দালানের সামনে মাঠে ন্যাশনাল থিয়েটার দিলেন। এই হল প্রথম পেশাদারি থিয়েটার। বাবুদের দালান থেকে নাট্যকলা পথে নামলে। আর ছাতুবাবুকে মাইকেলবাবু উজোতে লাগলেন: “তোমরা স্ত্রীলোক লইয়া থিয়েটার খোলো, স্ত্রীলোক না লইলে কছুতেই ভালো হইবে না” …so on and so forth। কথায় আছেই ‘সঙ্গদোষে শিলা ভাসে’। তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে নাচতে লাগলেন শরৎবাবুর (ছাতুবাবুর নাতি) ভগ্নিপতি Mr. O.C Dutt., বিহারীলাল চট্টোপাধ্যায় (এঁর কথা পূর্বে বলা হয়েছে), ন্যাদাড়ু গিরিশ, অর্থাৎ বাবু শ্রীযুত গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, বটুবাবু, বাবু প্রিয়নাথ বসু, ছাতুবাবু স্বয়ং এবং আরও তিন চার immoral ভদ্রসন্তান। এইবার ষোলো কলা পূর্ণ হল। মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক স্টেজে উঠল, বাবুরা আবারও জাতে তুললেন চার বেশ্যাকে। তাঁরা হলেন: গোলাপসুন্দরী, এলোকেশী, জগত্তারিণী, শ্যামাসুন্দরী।

খবরের পাতায় ইংরিজি বাংলায় সোরগোল পড়ে গল। মহা হাঙ্গামা। ১৮৭৩-এর ১৮ই অগাস্ট, হিন্দু প্যাট্রিয়ট বললেন–

…Mr Michael Modhusudan Datta’s classic drama of Sarmistha was selected for the first performance. The actors performed their parts very creditably, the two actresses, who are professional women, we are informed, were most successful. We wish this dramatic corps had done without the actresses. It is true that professional women join the jattras and natches, but we had hoped that the managers of the Bengali Theatres would not bring themselves down to the level of Jattrawallas.

১২৮০-র ১৪ই ভাদ্র ‘মধ্যস্থ’ পত্রিকায় মনমোহন বসু ব্যঙ্গ করে লিখলেন–

…বিলাতে রঙ্গভূমিতে স্ত্রীর প্রকৃতি স্ত্রীর দ্বারাই প্রদর্শিত হয়। বঙ্গদেশে দাড়ি গোঁপ ধারী (হাজার কামাক) জ্যেঠা ছেলেরা মেয়ে সাজিয়া কর্কশ স্বরে সুমধুর বামা স্বরের কার্য করিতেছে। ইহা কি তাঁহাদের ন্যায় সমাজ সংস্কারক সম্প্রদায়ের সহ্য হয়? […] অতএব ‘আন্ স্ত্রী!’ […] বাঁচিয়া থাকিলে আরও কত কি দেখিতে পাইবো। কিন্তু এত সভ্যতার তেজ সহ্য করিয়া বাঁচিয়া থাকা দায়।

১৫ই জানুয়ারী ১৮৭৪ দেখলাম অমৃতবাজার সমাজ পরিত্যক্ত ধর্ম বহির্ভূত স্ত্রীলোকদের নিয়ে নাটক করানোয় আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে এই করতে গিয়ে যদি সমাজের একজন লোককেও পরিহার করতে হয় তবে সে বড় দুঃখের বিষয় হইবেক। অমৃতবাজারের আশঙ্কা একেবারে যে ননসেন্স তা বলতে পারা গেল না। শ্রীযুত পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর শর্মা প্রতিবাদে পাপ থিয়েটার সংসর্গ ত্যাগ করলেন। ১৮৭৩-এর ২৯শে জুন দত্তোকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন দেহ রাখলেন। Dear Vid-এর কার্যকলাপ তাঁকে দেখে যেতে হল না।

পাঠক, এইবার কামসূত্রের ৫৮ নম্বর সূত্র, যেটি এই অংশের মাথায় লটকেছি, সেটি দেখুন। নটী এবং শিল্পকারিকা যে আদতে বেশ্যা যেহেতু তাঁরা নিজেদের expose করে থাকেন (প্রকাশ বিনষ্টা) সে তো বাৎস্যায়ন কোন মান্ধাতার আমলে বলেই গেছেন। এঁদের দিয়ে কাম প্রশমন হয়। উচ্চ সংস্কৃতি হয় কি? তার ওপর যখন তারা আসে খোদ বেশ্যাপাড়া থেকে তখন সোনায় সোহাগা। আদর্শ হিন্দু বংশোদ্ভূতরা করেন কী? ১৮৭৪-এর জানুয়ারী মাসে যখন মাইকেল-এর হতভাগ্য ছেলেপুলেদের সাহায্যার্থে আবার ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক মঞ্চস্থ হয়, দুটি অসমসাহসিনী ব্রাহ্মিকা সেই বেশ্যাদোষ দুষ্ট নাটক দেখতে গেছিলেন। প্রকারান্তরে তাঁদের সাবধান করে দেওয়া হয়, এটুকু জানি। সেই অজানা দুই স্ত্রীলোকের দুঃসাহসের পায়ে আমি গড় করি।

Epilogue

নাট্যজগতে বেশ্যা-দৌরাত্ম ঠেকিয়ে রাখা গেল না। ১৮৭৪ থেকে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার-এর যুগ। সতী কি কলঙ্কিনী নাটকে এলেন রাজকুমারী, হরিদাসী, যাদুমণি, কাদম্বিনী, বিনোদিনী, পাঁচ পাঁচটি বেশ্যা।

এবার এইসব কুলভ্রষ্টাদের কথা বলার সময় হল।

Featured Image:

A Man Playing a Tambura Kalighat Painting

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...