নির্বাচনী তামাশা, মানুষের বিপুল জয়, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য কেচ্ছা

বিষাণ বসু

 

যদি আমাকে ভালো বলো,
আমি বলব ঠিক বলেছ।

আমি ডুগডুগি বাজাই
তুমি তার সঙ্গে নাচো।

সেই তো বাঁদর হলে,
ভালো বলে লাভ কী হল।

আমাকে ভালো বোলো না
আমাকে ভালো বোলো না।

–চন্দ্রবিন্দুর গান থেকে

দেখুন, হেব্বি কনফিউশন। টেনিদা হলে বলতেন, বুঝলি প্যালা, ব্যাপার পুঁদিচ্চেরি, অর্থাৎ পরিস্থিতি খুবই ঘোরালো।

এই ধরুন, সদ্যসমাপ্ত ভোটে, কাদের গরু জিতল? মধ্যপ্রদেশের ভোটাররাও ধন্দে রয়েছেন, আমি তো কোন ছার!!

নরম না কড়া? না, স্যার, আমি রোজ সকালের অবশ্যকৃত্য বা সন্দেশের পাক নিয়ে কথা বলছি না, বলতে চাইছি আমাদের সনাতন হিন্দুধর্ম, থুড়ি হিন্দুত্বের কথা। নরম, নাকি কড়া হিন্দুত্ব? জিতল কারা?

অবশ্য, চারপাশে চেয়ে দেখে এটুকু নিশ্চিত বুঝলাম, যে, এই জয় মা-মাটি-মানুষের। রাজস্থানে ফাঁকতালে কংগ্রেস বেরিয়ে গ্যাছে, কেননা, আমরা জানি, ঘাসফুলের বীর যোদ্ধারা রাজপুতানায় রাজ্যবিস্তারের লড়াইয়ে নামেননি। কিন্তু, স্রেফ শুভেচ্ছাতেই ভাজপা ফরসা।

কিন্তু, বাস্তবে, এছাড়া, জিতল কারা?

যাঁরা বলছেন, এই জয় মানুষের জয়, তাঁদের জন্যে রইল বুকভরা ভালোবাসা। ক্লিশেটি আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন। প্রত্যেক ভোটের শেষেই মানুষের ইচ্ছে যেমন করে প্রতিফলিত হচ্ছে, বা সব জয় যেমন করে মানুষের জয় হয়ে যাচ্ছে, ঘাবড়ে যাচ্ছি। প্রত্যেক বছর এতবার করে মানুষের জয় হচ্ছে, তারপরেও দেশের এতগুলো লোক খেতে পাচ্ছেন না দুবেলা, এইটাই ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার।

আপনিই বলুন, কখনও শুনেছেন, কেউ এমন দাবি করছেন, যে, কোনও বিশেষ দল, যেমন ধরুন এইবারের বিজেপি, জিতলে ভিনগ্রহের আগন্তুকদের জয় হত? এ মা!! আগে বলবেন তো? তাইলে তো যে করেই হোক………. ইশশশ….. ছেলেবেলা থেকেই বঙ্কুবাবুর বন্ধুর সাথে মোলাকাতের বড্ড শখ যে আমার!!

তবে হ্যাঁ, শাহ-সাহেবের দক্ষতায় আস্থা আছে তো? তাহলে, পাকিস্তানের শত্তুরেরা হাল ছাড়বেন না। মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থান তো বটেই, ছত্তিসগড়েও আগলে বার, থুড়ি ইস বার, ভাজপা সরকারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেবেন না। আর, ইয়েস, তেলেঙ্গানাতেও খাতা যখন খোলা আছে, অসুবিধে কীসের? মানে, মানুষ কী চাইছেন, তা আমার বা আপনার চাইতে রাজ্যপাল যে বেটার বুঝবেন, সেই নিয়ে সন্দেহ আছে কি?

তবে, যা বুঝলাম, মানুষ মাইরি হেব্বি হারামি। ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি চাপড়ে একজন যখন বলেছিলেন, ইস লাইন হর লাইন কো খতম করনে কি লাইন, ইসি লাইন জিন্দেগি কি আখরি লাইন ইত্যাদি ইত্যাদি, তখন কি কেউ বোঝেইনি, যে, আর ভোটটোট দিতে হবে না, মানে দেওয়ারই দরকার পড়বে না, এমনই বলা হচ্ছিল!! তা, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর অভ্যেস আর লোকজনের গ্যালো না!!

স্বাধীনতার পর ভারতের জনপ্রিয়তম নেতা, দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রাইম মিনিস্টার, ভারতমাতা কি শ্রেষ্ঠ সন্তান (দাদা, আমার কল্পনাশক্তি এতদূর নয়, আমি শুধু ন্যাশনাল মিডিয়া থেকে উদ্ধৃত করেছি)— তার ওপর এতটুকু ভরসা রাখতে নেই!!

এই দেখুন, নোটবাতিলের কথা বলতেই বেয়াড়া প্রশ্ন জাগল, অন্যতম কারিগর উর্জিতবাবু হঠাৎ এমন করে বাক্সপ্যাঁটরা গোটালেন কেন?

শুনেছি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম খবর মানুষ না পেলেও মনুষ্যেতর প্রাণী পেয়ে যায়। যেমন, মুরগি ইত্যাদি। কিন্তু, সেই প্রশ্ন এইখানে অবান্তর।

যা-ই হোক, আমরা কিন্তু জানি, যে, পদত্যাগ করা মানেই লোকটার হেব্বি গাটস— একেবারে সিধে মেরুদণ্ডের মানুষ।

ঘরের পাশে পচনন্দাসাহেব যখন কালীঘাটে কার একটা বাড়ির পুজোয় খালি পায়ে প্রসাদ বিলোচ্ছিলেন, তখন কারও খেয়ালই হয়নি। অবশ্য, সেই বাড়ির প্রসাদ না পেলে আজকাল আর কেউ বুদ্ধিজীবী হতেই পারছেন না, কাজেই পচনন্দাজি সমজসেবা করছিলেন এবং বুদ্ধিজীবিত্বের বেঞ্চমার্ক স্থির করছিলেন, এমনটি ভাবা যেতেই পারে। কিন্তু, মোদ্দা কথাটা হল, যেই পদ ছাড়লেন, অমনি আমরা জানলাম, যে, পচনন্দাজি মস্ত মেরুদণ্ডের অধিকারী।

যেমন, আমরা তো এই সবেমাত্র জানতে পেরেছি, উর্জিত প্যাটেলেরও মেরুদণ্ড রয়েছে। অনেকে তো হাহাকার করছেন, এমন যোগ্য মানুষটি পদ ছেড়ে দিলেন!! আশ্চর্য!! সত্যিই তো, তাঁর গভর্নরশিপে দেশ আর্থিক উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে উঠেছিল, এদিকে আপনি খবরটুকুও রাখেননি!!

এই দেখুন, হ্যাজানোর এমন ডেঞ্জারাস অভ্যেস, যে, ভোটের রেজাল্ট নিয়ে কথা বলতে বসে কোথা থেকে কোথায় চলে যাচ্ছি।

ভাগ্যিস আপনি মুচকে হাসলেন, নয়তো এখুনি উর্জিত প্যাটেল ছেড়ে শবরীমালা পৌঁছে যাচ্ছিলাম। আর, আট্টু হলেই ফেঁদে বসছিলাম, ঠিক কেমন দৃপ্ত ভঙ্গিতে অমিতজি তাঁর বাহাত্তর ইঞ্চি ছাতিটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু, বুঝেছি, বুঝেছি, এসব প্রশ্ন এইখানে অবান্তর।

হ্যাঁ, মানছি, একটি বিশেষ ধর্মীয় অভ্যাস, বা বলা ভালো একটি বিশেষ ভাবধারাকে হিন্দুধর্মের নামে দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার অত্যাচার থেকে সাময়িক দম ফেলা সম্ভব হল, কিন্তু দম ফেলা শব্দবন্ধ নয়, জোরটা দিন ওই সাময়িক শব্দটার উপরেই।

হ্যাঁ, এও বুঝেছি, যে, আপনি বলছেন, না খেতে পাওয়া কৃষকের মিছিলের পিঠোপিঠি এই জয় প্রমাণ করল, লড়াইটা ধর্মের নয়, লড়াইটা খিদের। সত্যি করে বলুন তো, এই যে অ্যাতো খিল্লির বন্যায় সোশ্যাল মিডিয়া ধুয়ে যাচ্ছে, এই কনসার্নের এক শতাংশও দেখতে পেয়েছিলেন, কৃষকদের ঐতিহাসিক মিছিলের দিন, বা দিল্লিতে চাষিদের সমাবেশে পুলিশের ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তে?

অথবা, এই ধরুন, মধ্যপ্রদেশের নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় দলটি কৃষকের অধিকার নাকি গো-সেবা কোনটি নিয়ে বেশি সরব ছিল?

কাজেই, শেষ হিসেবে টেক হোম মেসেজ, আজ খিল্লি করতে ভরপুর ফূর্তি হলেও, যদি এই সময় নিয়ে সত্যিই ভাবিত না হন, যদি সত্যিই উদ্বিগ্ন না হন, তাহলে স্রোতে গা ভাসিয়ে ফালতু উচ্ছ্বাসের ভান না করাই ভালো।

এই যে একখানা সামান্য ইলেকশন নিয়ে, আপনি যেমন আর্বান নকশালের মতো ফেসবুকে ফরফর করছেন, পেছনে হুড়কো পড়লে কোন পাপ্পু আপনাকে বাঁচাবেন শুনি?? জানেন না, চাড্ডি আছেন, আইটি আছেন, আছেন ধীরুভাইয়ের ছেলে, সবাই মিলে কামড়ে দেবে মিথ্যে এমন তড়পালে??

জানি, জানি, যেই ধীরুভাইয়ের ছেলের কথাটা তুলেছি, অমনি আপনার চোখ চকচক করে উঠেছে বিয়ন্সের কথা ভেবে। এই বয়সে অত নোলা ভালো নয় দাদা। এট্টু রয়েসয়ে ধরে খেলুন।

এই দেখুন, আম্বানি-আদানিদের কথা তুলব, আর একটু শেয়ারবাজারের কথা বলব না, তা-ও কী হয়!! কিন্তু, বলি, হচ্ছেটা কী? এক্সিট পোলের ফল শুনে বাজারে ধস নামল, উর্জিতবাবুর বিদায়ে আবার ধস নামল— অথচ ভাজপা ফর্সা হতেই বাজার ঘুরে দাঁড়াল!!!!

না, আমি জানি, যে, আপনি মানেন যে, এই জয় মানুষের জয়। তবুও, ঠিক কাজ-না-পাওয়া যুবক বা কাজ-হারানো বেকার শ্রমিক বা ঋণগ্রস্ত চাষি সবাই মিলে সেলিব্রেট করে শেয়ারবাজার চাঙ্গা করে দিলেন, এমনটি ভাবা কি কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না? তাহলে কি, এই ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে, যে-ই জিতুক, আর্থিকভাবে লাভবান শ্রেণিটি একইভাবে উপকৃত হচ্ছেন?

তাহলে?

দেখুন, কোন সিদ্ধান্তের লাভের গুড় কার বাড়ির পায়েস মিষ্টি করছে, সেই খবর শেয়ারবাজারের মতো করে, আন্তরিকতার সাথে, আপনাকে কেউই গল্প করবে না। যেমন ধরুন, বাজেটের দিন, জেটলি সাহেব যখন আয়ুষ্মান ভারতের গল্প করছিলেন, তখন আপনি ঢপের আনন্দ ছেড়ে যদি বিজনেস চ্যানেলে চোখ রাখতেন, তাহলেই দেখতে পেতেন, কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর শেয়ার দাম কেমন চড়চড় করে বেড়ে চলেছে। আর, আয়ুষ্মান ভারতের ব্যাপারটা নিয়ে দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যেত আপনার চোখে।

তাহলে? এই যে হারের খবরে মার্কেট চাঙ্গা হয়ে উঠল, তবে কি কর্পোরেট দুনিয়া, হাওয়ামোরগ হয়ে, শিবির বদল করছে? প্লিজ, এমন করে বলবেন না। একেই পাপ্পুর কাছে হারের দুঃখে মোদিজি মুষড়ে পড়েছেন, আর তার উপর এই খবর সত্যি হলে তো কয়েক লাখ টাকার শেরওয়ানিখানাও গায়ে রাখা দস্তুরমতো মুশকিল হয়ে যাবে!!

নাকি, গল্পটা আরও জটিল?

নোটবন্দির সময় প্রভুভক্ত ন্যাজ-নাড়ানো শক্তিনাথবাবুকে মনে আছে তো? সেই শক্তিনাথবাবুর হাতেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাবি পৌঁছানোয় কি ব্যবসাজগৎ এতখানি আশ্বস্ত?

হ্যাঁ, আমরা তো জানিই, মোদিজি বলেছেন, হামেঁ হার্ভার্ড নহি, হার্ডওয়ার্ক চাহিয়ে। সত্যিই, আমি সহমত। আপনিও নিশ্চয়ই তেমনই চান। পেটে একটু-আধটু বিদ্যে থাকলে আদানি-আম্বানিদের সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার জন্যে নিরন্তর হার্ডওয়ার্কটি বাধাপ্রাপ্ত হয়, মানেন নিশ্চয়ই? তাই, দেখুন, দেশের অর্থনীতির মাথায় এসে বসেছেন এমন একজন, যিনি কিনা, হাসবেন না আবার, অর্থনীতি নয়, প্রাথমিকভাবে ইতিহাসের ছাত্র। পরবর্তীতে ফিনান্স নিয়ে কিছু পড়াশোনার পরে আমলাগিরিতেই হাত পাকান। অর্থাৎ, রাজনীতিকদের হুকুম তামিল করা এনার মজ্জাগত। এরপরেও কর্পোরেট দুনিয়া খুশি না হয়ে পারেন!!! রামমন্দির না হোক, অন্তত ধান্দাবাজির মন্দিরটি তো রিজার্ভ ব্যাঙ্কেই স্থাপিত হতে পারল!!!

চিন্তা করছেন কেন?

যোগীজি বা মোদিজি, দুজনেই তো বলেছেন, মন্দির য়হিঁ বানায়েঙ্গে।

প্রতিশ্রুতি নয়, দেশজুড়ে অশিক্ষার মন্দিরটি তো তৈরি হয়েই গিয়েছে। তবেই না এমন চমৎকার লড়াইটি হতে পেরেছে। একপক্ষে গেরুয়াবস্ত্রে ধর্মের জিগির তোলা সন্ন্যাসীনেতা, সাথে লাখ টাকার জামা পরে তথাকথিত চাওয়ালা— তো, আরেকপক্ষে নিজের ব্রাহ্মণত্ব প্রমাণে উদগ্রীব এক দিশেহারা, যিনি কিনা মন্দির থেকে মন্দিরে ঘুরে ধর্মের উসকানিটা হাল্কা করে ভাসিয়ে বেড়ান। আর, আপনার মন পাওয়ার জন্যে দুজনের বাকযুদ্ধ, কে জিতলে আপনার পোষা গরুখানা বেশি যত্নআত্তি পাবে।

এই জমজমাট চিত্রনাট্যে হারিয়ে গিয়েছে চাষাভুষা-মিলশ্রমিক-জমিজঙ্গল থেকে উৎপাটিত উপজাতি— হারিয়ে যাবে কি দেশজোড়া কৃষকদের নজিরবিহীন মিছিলও?

এটুকু নিশ্চিত, নিজের গা-বাঁচানোর এই তাড়নায়, হারিয়ে যাচ্ছেন আপনিও। হারিয়ে ফেলছেন আপনার কাজের অধিকার, ভাবার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার।

ফেসবুকে বিপ্লবের ঝড় তুলতে অভ্যস্ত আপনাকে, বন্ধুরা দেশ জুড়ে কৃষকদের নজিরবিহীন মিছিলের ছবি তুলে ট্যাগ করলে, আপনি সন্তর্পণে লাইক দিয়ে দায় সারেন। ব্যাপমে মৃত্যুর মিছিলের গল্পও আপনাকে স্পর্শ করে না। শস্যবীমা নিয়ে ব্যাপক আর্থিক নয়ছয় বা রাফাল কেলেঙ্কারি নিয়ে কথা বললে, আপনি টুজি বা কয়লার কথা তুলে বলেন, ওর’ম তো কতই হয়। চাষিদের নিয়ে মাঠেময়দানে লড়াই করে বামপন্থীরা তিনটে আসন জিতলেও, আপনি শ্লেষের সুরে বলেন, এতগুলোর মধ্যে তিনটে জিতেই লাফাচ্ছে।

মোটের উপর, আগুনের আশপাশ এড়িয়ে হাল্কা উত্তেজনার সেঁকটুকু নেওয়া। এমনি করেই যায় যদি দিন, যাক না!!

আমাদের চারপাশে এক দেওয়াল তোলা, নতুন রকমের ছিন্নমূল বিস্মৃতির, বেঁচে থাকার নির্মাণ ঘটে চলেছে। এরকমই কি চলবে, চলতে পারে?

এই আপনি আর কপনি নিয়ে বেঁচে থাকার জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার লক্ষ্যে, আমাদের কাজ, আপাতত, কোনও এক পক্ষে জুটে গিয়ে তালি বাজানো।

হয় এইদিক, নয় ওই পক্ষে।

তাহলে, আসুন, গা ভাসাই। যদি শান্তি চাও বাপু, কখনও ভিন্নপথে ভেব না, গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসাও, শান্তি ওইখানেই। অতএব, বেস্ট অপশন, সাধারণ মানুষের এই বিরাট জয় নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসি। এ এক আশ্চর্য বিজয়, যাতে আমি-আপনি-সবহারা ক্ষুধার্ত মানুষ-শেয়ারবাজার সবাই সব্বাই খুশি।

এরকমভাবেই চলছে। চলে এসেছে।

যদি এরকমই ভুলে থাকতে চান, যদি এর বদল না চান, এমনটাই চলতে থাকবে।

নাকি, আর ঘুমোতে ভালো লাগছে না? একটু গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলে কেমন হয়?

মোদিজি তো বলেছিলেন, সব কা সাথ, সব কা বিকাশ। আর কিছু না হোক, ঘৃণা আর বিদ্বেষের বিকাশটি তিনি অল্প সময়েই যেমন দক্ষতার সাথে করতে পেরেছেন, তার তুলনা মেলা ভার।

এই অবিশ্বাস আর ঘেন্না থেকে আপাতত কি একটু দম ফেলার সুযোগ এল, নাকি হাটেমাঠে আমাদের চোখে না পড়া মানুষগুলো আপনাকে আরেকবার দম নেওয়ার সুযোগ করে দিল?

বুঝতে কি পারছেন না এখনও, যে, ছোট্ট বিরতির পর, ছায়াছবির শেষাংশ হবে আরও ধুন্ধুমার, আরও জমজমাট? আর, ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে ধর্মীয় উন্মত্ততার মোকাবিলা কিন্তু একটা বিপজ্জনক খেলা, এইটা না ভোলাই ভালো।

সচেতন থাকুন। থাকতেই হবে।

একটি রাজ্যে, তিনদশকের তথাকথিত বাম শাসনের শেষেও, যেমন চটজলদি ছড়িয়ে পড়েছে বিদ্বেষের বীজ, বা বলা ভালো যে, যেমন সহজেই ছড়ানো গিয়েছে বিদ্বেষের বীজ— তাতে এটুকু পরিষ্কার, যে, সামান্য আত্মতুষ্টিতেই অসাম্প্রদায়িকতার গর্বের কেল্লাটি মাটিতে মিশে যেতে পারে। একটুখানি চোখ লেগে আসায় লোহার বাসরের ছিদ্র দিয়ে কালসর্প প্রবেশ করেছিল, সে তো জানা-ই কথা। কাজেই, বাসর ছিদ্রহীন রাখা এবং সদাজাগ্রত থাকা, দুইই সমান জরুরি।

অতএব, অন্তত, আজকের দিনটির জন্যে, ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস… বলুন, ইয়াক, ইয়াক!!! আপাতত, কয়েকটা দিন, হাম্বা না বললেও চলবে।

কিন্তু, ওই কয়েকটা দিনই, তার বেশি নয়। গা ঢিলে দিলে চলবে না আর।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পুরো কবিতাটাই রইল আপনাদের জন্যে—

লেনিনকে আমরা দাঁড় করিয়ে রেখেছি ধর্মতলায়
ট্রামের গুমটির পাশে।

আঁস্তাকুড়ের ভাত একদল খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে
ডাস্টবিনে হাত চালিয়ে দিয়ে।
লেনিন দেখছেন।

গ্রামের এক লোক শহরে ডাক্তার দেখিয়ে সর্বস্বান্ত হতে এসেছিল
তার আগেই তাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়ে গেল
এক পকেটমার।
লেনিন দেখছেন।

সন্ধের মুখে যে মেয়েটাকে একটা ট্যাক্সি এসে
তুলে নিয়ে গিয়েছিল,
সন্ধে গড়িয়ে গেলে, হাই তুলতে তুলতে
সে আবার এসে দাঁড়িয়েছে গাছতলায়।
লেনিন দেখছেন।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে লেনিনেরও খুব হাই পাচ্ছিল।
হঠাৎ দেখলাম একটু নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
যেদিকে তাঁর নজর, সেইদিকে তাকিয়ে দেখলাম
লাল নিশান নিয়ে একদল মজুরের এক বিশাল মিছিল আসছে।
আমার মনে হল, লেনিন যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,
শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে—
একটু পা চালিয়ে, ভাই, একটু পা চালিয়ে।।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...