দেবরাজ গোস্বামীর ফেবুদেওয়াল থেকে

মগনলাল হাসছে 

 

আমার কাছে তো এটাই সত্যি। আচ্ছা লালমোহনবাবু, ধরুন যদি দেখেন আমি চোখ বুজে আছি, আর কেউ একজন খোলা ক্ষুর হাতে আমার গলার দিকে এগিয়ে আসছে তাহলে আপনি কি করবেন?

ফেলুদার প্রশ্নটা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেলেন জটায়ু। তারপর বেশ জোরের সঙ্গেই বললেন-–

কি করব মানে? হাতের কাছে যা পাব জপযন্ত্র বা প্যাকিংকেস, তুলে নিয়ে সোজা বসিয়ে দেব ব্যাটার মাথায়, তারপর যা হয় হবে।

তারপর যদি দেখেন যে লোকটা আসলে ইয়াসিন, আর আমি স্বেচ্ছায় চোখ বুজে ওর খোলা ক্ষুরের সামনে গলা বাড়িয়ে দিয়ে বসে আছি তখন কী করবেন?

‘যাচ্চলে’… এবার জটায়ুকে বেশ বিভ্রান্ত দেখায়। আপনি যে কখন কি বলেন বুঝি না মশাই, মাথা গুলিয়ে যায়।

‘একদম সঠিক বলেছেন।’ বলল ফেলুদা। ‘এই মাথাটা গুলিয়ে দেওয়াই হচ্ছে আসল খেলা। ধরুন ইয়াসিন আমার চুল কাটছে গত বিশ বছর ধরে। ওর খোলা ক্ষুরের সামনে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে বসে থাকা আমার অভ্যাস এবং বিশ্বাস। যেমন চায়ের সঙ্গে কলিমুদ্দির ডালমুট না হলে আমাদের তিনজনেরই চলে না। কিন্তু প্রতিবার ডালমুটের গরম ঠোঙাটা হাতে দেওয়ার সময় যদি কলিমুদ্দিকে বলতে হয় ‘উ ডালমুটে বিষ নাই, বিষ খুব খারাপ জিনিস আমি মনে করি’ তাহলে কি সেটা ভাল হবে? বা ধরুন আমার মাথায় যদি ঢোকে আমি চোখ বুজে থাকলেই ইয়াসিন আমার গলায় ক্ষুর বসিয়ে দেবে তাহলে কি মারাত্মক ব্যাপার হবে বলুন তো! প্রতিদিনের এই সহজ সরল সহাবস্থানের মধ্যে যদি একবার অমূলক সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ক্রমশই আমরা এক একজন মানসিক রুগীতে পরিণত হব। তখন দেখা যাবে কোনও যুক্তি বুদ্ধির তোয়াক্কা না রেখেই আমি ইয়াসিনের দিকে তেড়ে যাচ্ছি বা কলিমুদ্দি আমাকে দেখতে পেলে ডাণ্ডা নিয়ে মারতে আসছে।’

‘সে তো খুব বিশ্রী ব্যাপার হবে মশাই।’

‘শুধু তাইই নয়, ফেলু মিত্তিররা যখন ইয়াসিন বা কলিমুদ্দিদের নিজের সব থেকে বড় শত্রু বলে ভাবতে আরম্ভ করবে ঠিক তখনই আসবে মগনলাল মেঘরাজের পৌষমাস। কারণ সে তখন অবাধে চালিয়ে যেতে পারবে তার অপরাধমূলক কাজকর্ম। খোদ ফেলু মিত্তিরের নাকের ডগায় বসে। কিন্তু ফেলু মিত্তিরের এইসব চোখে পড়বে না। সে তখন অন্ধ। সে ফন্দি আঁটছে কী করে ইয়াসিন বা কলিমুদ্দিকে জব্দ করা যায়, যারা কিনা আসলে কোনও কালেই তার শত্রু ছিল না। আর লালমোহনবাবু এই যে আপনি আমার বন্ধু হিসেবে ইয়াসিনের মাথায় জপযন্ত্রের বাড়ি মারার কথা ভাবছিলেন সেটাও তো আমার ভালোর জন্যই। আসলে আপনিও ভালো লোক আর ইয়াসিনও ভালো লোক। কিন্তু আপনাদের এই ভালোত্বের সুযোগ নিয়ে একজন তৃতীয় ব্যক্তি আপনাদেরকে লড়িয়ে দিচ্ছে, যে খুব ভালো করেই জানে আমরা নিজেদের মধ্যে লড়ে মরলে তারই লাভ সবথেকে বেশি। সে মজা নিতে নিতে বলছে ‘নিজেদের মধ্যে লড়াই করে আপনাদের হাড্ডি চুর চুর হয়ে যাবে, দেখে আমার মনমেজাজ খুশ হয়ে যাবে, পয়সা ভি লাগবে না।’

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3165 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...