সিএএ, এনআরসি এবং অসমের জাতিসত্তার বিচিত্র ব্যঞ্জন

সুদীপ চক্রবর্তী

 

মূল লেখাটি লাইভমিন্ট-এ ইংরাজিতে প্রকাশিত। লেখকের অনুমতিক্রমে বাংলায় অনুবাদ করে পুনর্মুদ্রণ করা হল।

পূর্ব প্রসঙ্গ: সিএবি আর এন আরসির আগুন যার তুলনায় নেহাত পোষ্য

এক তো এনআরসি, এবং তারপরে প্রায় দাঙ্গা লাগানোর মতো বিতর্কিত সিএএ। একজন যদি এই আইনের পক্ষে কিছু বলেন তো সঙ্গে সঙ্গেই আরেকজন তার বিরোধিতা করছেন। এবং এই দুইয়ের অনুশীলনে অসমের— বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বের বাঙালি-অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার পরিস্থিতি যে কী ভয়াবহ রকমের জটিল করে তুলতে পারে তা আমরা এই সপ্তাহে দেখলাম।

বিজেপি-শাসিত অসম প্রায় পুরোপুরিই এনআরসির পক্ষে ছিল গত আগস্ট পর্যন্ত। তারপর আগস্টে এনআরসির প্রাথমিক তালিকা বেরোল এবং দেখা গেল যে ১৯ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে তার একটা বিশাল অংশই অ-মুসলিম। এবার কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ করাল এবং সেটাকে আইনে পরিণত করল। যে আইনের মাধ্যমে দেশে পাঁচ বছর বসবাসের পর পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আগত অ-মুসলিমদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু এর ফলে ১৯৭০-এর অসম চুক্তি অনুসারে অসমে বসবাসকারীদের যে স্থিরীকৃত মানদণ্ড ছিল সেটাই নাকচ হয়ে গেল।

এখন তো এমনকি উগ্র এবং মোটাদাগের বিজেপি সমর্থকরাও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে অসমের বেশিরভাগ অংশই তীব্রভাবে এর বিরোধিতা করছে। ১১ই ডিসেম্বর সিএএ সংসদে পাশ হয়েছে এবং তার দুদিন পরে আইনে পরিণত হয়েছে। তখন থেকেই অসমে প্রতিবাদী এবং পথচারীরা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন, কার্ফু জারি হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ। আজকে অসম কাশ্মিরের এক ক্ষুদ্র সংস্করণে পরিণত।

গণরোষের যদি সাময়িক প্রশমনও ঘটে, তাকে যেন স্থানীয় এবং কেন্দ্র সরকার সিএএর প্রতি একটা সাধারণ সম্মতি হিসেবে ধরে না নেয়। মনে রাখতে হবে, অসমের বেশিরভাগ মানুষই এনআরসিকে বাংলাদেশ এবং ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে তাদের রাজ্যে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বের করতে পারার একটা হাতিয়ার হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। সেই তাঁরাই এখন সিএএকে দেখছেন সেই অবৈধ মানুষদের মধ্যে অ-মুসলিমদের বৈধতা দেওয়ার একটা যন্ত্র হিসেবে।

বিজেপি নেতৃত্ব গত সপ্তাহে বললেন, তারা এনআরসি এবং সিএএ প্রচলন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ঝাড়খণ্ডে নির্বাচন চলছে। আগামী বছর নির্বাচনে যাবে দিল্লি এবং বিহার। ফলে এই সময়ে দুর্বলতা দেখাতে স্বভাবতই বিজেপি চাইবে না। এর সঙ্গে সঙ্গেই অসমে মুখরক্ষারও বিষয় রয়েছে। অসমে বিজেপির জোটসঙ্গী অগপ-র অফিসগুলি প্রতিবাদী জনতা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অগপ এবং বিজেপির নেতা মন্ত্রীরা নিগৃহীতও হয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নটা হল, এই আপাত দৃঢ়তার প্রদর্শনেও কি অসমের সমস্যা লঘু করা যাবে?

ফলে এখন আমরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকব, অসমের রাজনীতিকরা এবং অসমিয়া জনগণ কীভাবে বরাক উপত্যকা, অর্থাৎ বাঙালি-অধ্যুষিত তিন জেলা কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং করিমগঞ্জের পরিস্থিতি সামাল দেন এবং সমস্যার মোকাবিলা করেন।

কাছাড় এনআরসি এবং সিএএর পক্ষে। কারণ এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু বাঙালি জনগণ ভাবছেন, যদি তাঁদের কেউ এনআরসিতে বাদও পড়েন, সিএএর মাধ্যমে তাঁরা বেঁচে যাবেন। এই চিন্তারই আমরা স্পষ্ট প্রমাণ দেখতে পেয়েছিলাম যখন ২০১৯-এর প্রথমেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রথম প্রস্তাবেই শিলচরের বিদায়ী কংগ্রেস সাংসদ সুস্মিতা দেব এতে তাঁর সমর্থন জানিয়েছিলেন। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে সুস্মিতা বিজেপি-র রাজদীপ রায়ের কাছে হারেন। তিনি এমন এক জায়গা থেকে লড়ছিলেন যেটা বিজেপির পক্ষে অনুকূল, এবং তাঁকে সহজেই যথেষ্ট যোগ্য নয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গেছিল।

এটাই অসমের চালচিত্র। এখানে একদিকে অহমিয়া, বোড়ো এবং অন্যান্য স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী; এবং অন্যদিকে অভিবাসীরা, যাদের মধ্যে আছেন দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বাঙালিরা, ঔপনিবেশিক সময়ে চা বাগানে কাজ করানোর জন্য ছোটনাগপুর থেকে নিয়ে আসা সাঁওতাল, ওঁরাও এবং অন্যান্য আদিবাসীরা, এবং বাংলাদেশ থেকে বেআইনি বা অন্যভাবে আগত মুসলিমরা। ১৯৮০-র দশকের জ্বলে ওঠা অসমিয়া জাতীয়তাবাদ, এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেগে ওঠা বোড়ো জাতীয়তাবাদ— সবই নির্ধারিত হয়েছে অসমের জাতিসত্তাগুলির এই জটিল সমীকরণের ওপর।

এই কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং করিমগঞ্জের ইতিহাসটাও জটিল। ১৮২৬ সালে প্রথমে অসম এবং তারপরে কাছাড় জয় করার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করেছিল। পরে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের সময় যখন প্রশাসনিক পুনর্গঠন হয়, তখন বঙ্গভাষী-অধ্যুষিত সিলেট, গোয়ালপাড়া এবং কাছাড়কে আরও কিছু পার্বত্য জেলার সঙ্গে নবগঠিত চিফ কমিশনার’স প্রভিন্স অফ অসম-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৪৭-এ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং সিলেটের পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ করিমগঞ্জ সাবডিভিশনে ঢোকানো হয়। কাছাড়ের মতো এটিও ভারতের অঙ্গীভূত হয়; কাছাড়ে করিমগঞ্জের ওই কর্তিত অংশটুকুও ঢোকে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটি বরাবরই বাঙালি-অধ্যুষিত, যেটি অসমের মধ্যে রয়েছে।

এবং এই অঞ্চলটিই অসমে ভাষাগত বিরোধিতার অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে সেই রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই এই অঞ্চল বাংলা ভাষাকে নিজেদের মৌলিক ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার অর্জন করে। এবং এই অঞ্চলই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের অঞ্চলও বটে। ১৯৮০-র দশকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গভাষী করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি কাছাড় থেকে বেরিয়ে পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

কাছাড় রয়ে গেল হিন্দু বাঙালিদের জেলা হিসেবে। ফলত এনআরসি এবং সিএএর অনুশীলনের মূল ঘাঁটি হিসেবেও। অসমে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার ভাবাবেগকে উস্কানি দেওয়ার রাজনীতির আঁতাত চলছে। এই অবস্থায়, একই রাজ্যের মধ্যে থেকেও, কাছাড়ের অবস্থান পৃথক। অন্তত এখনও পর্যন্ত।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...