ঘরে-বাইরে

চিরশ্রী দাশগুপ্ত

 

 






লেখক গদ্যকার, শিক্ষক

 

 

ভোর ৬টা, বেডরুম

তিতিরের কথা।।

রিইইইইইইং রিইইইইইইইইইং… শেষ চৈত্রের ভোরে রোদ ওঠার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলো তিতি। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে ঘুমন্ত মাকে দেখে মনে পড়ল আজও স্কুল যাওয়া নেই। অগত্যা আবার শুয়ে পড়তে গিয়েও খোলা জানলা দিয়ে চোখে পড়ল উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের পাঁচতলার কার্নিশে দুটো ফিঙে লেজ ঝুলিয়ে বসে। বাবা বলেছে, ফিঙে নাকি কাকের চেয়েও কালো আর লম্বা লেজ। আলতো পায়ে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় চলে এলো তিতি। যাহ্‌! একটা ফিঙে হু উ শ করে কোথায় যেন উড়ে গেল, আরেকটাও যাবে যাবে করছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে কী যেন খুঁজল তারপর শিস দিয়ে দুবার ডেকে সেও উড়ে গেল। বছর দশেকের পা দুটো উঁচু করেও ফিঙে দুটোর নাগাল পেল না… কী জানি কোথায় যে চলে গেল!

আজ কতদিন হয়ে গেল স্কুল যাই না… শ্রেয়া, অহনা, মহুল, দীপ্তকদের সঙ্গে দেখা হয় না। কী একটা ভাইরাসের জন্য এই ঝামেলা… ধুস! বাড়িতে বসে থেকে থেকে তো বোর হয়ে যাই রোজ। তাও যদি মনিদের মতো একটা বাড়ি হত, যেখানে বাগান আছে… গাছে ওঠা আছে… সকালে শিউলিতলায় ফুল কুড়নো… সঙ্গে মনির চিৎকার, “তিতির ওদিকে যাস না, শুঁয়োপোকা আছে”। থাকুক, তবু তো কিছু আছে, আর এখানে? সারাদিন এই ছোট্ট ফ্ল্যাটের মধ্যে বাবা-মা আর আমি। বাবা-মাও ব্যস্ত, আমার সঙ্গে তো কেউ গল্পই করে না। বাবার বড় ফোনটা এখন অবশ্য আমারই দখলে। সারাদিন গেম খেললেও বা টিভি দেখলেও এখন আর কেউ বকছে না, তাই মজাটাও নেই। হ্যারি পটার সিরিজ কাল শেষ হয়ে গেল। রাস্কিন বন্ড আছে এখনও। তারপর মা বলেছে, পাণ্ডব গোয়েন্দাটা নামিয়ে দেবে। নতুন ক্লাস, নতুন বন্ধু, নতুন বই… কিছু নেই। কোন সেকশন যে হবে এবার… অহনা আর শরণ্যার সঙ্গে একসঙ্গে থাকা হবে তো?  মার মেইলে ওয়ার্কশিট আসছে আর যাচ্ছে। আজ বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, এই পাখিদের লকডাউন নেই? ওরা যে যেখানে সেখানে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে, ওদের বুঝি ভয় নেই?

“তিতি! তিতি! ব্রাশ করেছ?” মা ডাকছে… যাই।

সকাল ৬.৪৫, লিভিংরুম।

রুপুর কথা।।

পায়েলদের ফ্ল্যাটের দেওয়ালে একটা হলুদ রঙের লম্বা রোদ এসে বসেছে, এই পাড়াটার এখনও তেমন ঘুম ভাঙেনি অথচ রোদের রং জানান দিচ্ছে অনেক আগেই সকাল হয়েছে। একটা-দুটো করে ফেরিওয়ালার হাঁক শোনা যাচ্ছে। সব্জি-সবজি-ই-ই… লাউ-মোচা-পালং… একদম টাটকা… দশ টাকায় চারটে লেবু… মাছ… নদীর ছোট মাছ… ফুল নেবেন, ফুল? একসঙ্গে এতরকম হাঁকডাকে হঠাৎ জেগে উঠল ঘুমের ভান করে মটকা মেরে পড়ে থাকা আমাদের গলিটা। সকাল সরগরম হল একটা দুটো বাইক-স্কুটির হুশ-হাশে। গ্যাস অন করে চায়ের জল চাপিয়ে চোখ পড়ল রান্নাঘরের সিঙ্কে… ইশশ! আরশোলা! বাসিঘর ঝাঁট দেওয়ার সময় ওটাকেও বিদায় করতে হবে মনে করে।

বেল বাজল না? এত সকালে কে? গীতামাসিকে তো আসতে বারণ করে দেওয়া আছে। যদিও পরশুদিন এসে খুব কান্নাকাটি করে গিয়েছে, “কাজে আসব দিদি এ মাস থেকে? সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই লকডাউন চলবে শুনছি, আমাদের চলবে কী করে? এ মাসের বেতন হাতে দিয়ে আর তিন বাড়ি থেকে তো ‘না’ করে দিল। সব স্বাভাবিক হলে তবে আবার কাজে ডাকবে বলেছে। ততদিন খাব কী দিদি, ভেবে তো রাতে ঘুম আসছে না। খবরে বলছে, ফ্রিতে রেশন থেকে চালডাল দেওয়ার কথা, আমাদের তো টাকা দিয়েই নিতে হচ্ছে!” গতমাসের বেতন আর কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে আমি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও কতটা কী হল, জানি না। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে আমাদেরও। কাল কী হবে কেউ জানে না।

দরজা খুলতে গিয়েই পায়ের কাছে আজকের কাগজ, এই সপ্তাহ থেকেই আবার কাগজ দিচ্ছে। কদিন নিজেরাই বন্ধ রেখেছিল। দরজার ওপারে বিশু, গতমাসের দুধের বকেয়া টাকা নিতে এসেছে। সব মিটিয়ে চায়ের টেবিলে। সকালের এইটুকু ফাঁকা সময় নিজের মতো করেই কাটাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তো এখনই। এরপর একে একে সারা বাড়ি জেগে উঠবে। অরুণাভ হাসে আমার এই নিজের মতো করে সময় কাটানোর কথায়… “নিজের মতো করেই তো দিন কাটাও তুমি, তোমার তো সারাদিনই ‘মি-টাইম’ রুপু, এরপরেও আলাদা করে ফাঁকা সময় লাগে নিজের জন্য?” খুঁটিনাটি কাজের ভিড়ে হারিয়ে যায় অরুণাভর খোঁচাটা আর মায়ের খোঁজ নেওয়াই হয় না সারাদিনে। অভিমান জমতে দেওয়ার আগেই ডায়াল করি, চেনা নম্বরটা।

হ্যালো মা! রুপু বলছি…

সকাল ৯.০০, ড্রয়িংরুম।

নীলিমার কথা।।

বয়স বাড়লে বুঝি ঘুম উধাও হয়ে যায়। সেই কোন ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায় আজকাল। ওসব হেডফোন কানে নিয়ে শুনতে পারি না বাপু, তার চেয়ে ইউটিউবে গান শুনি। আলো ফুটলে জানলার পর্দা সরিয়ে মাথার পাশের সঙ্গীকে টেনে নিয়ে দিব্যি সকালের ঘণ্টা দুয়েক কেটে যায়। বহুবার পড়া শীর্ষেন্দুর ‘মানবজমিন’ আবার শুরু করেছি, আজ সত্যিই এই প্রিয় পৃথিবীর গভীর অসুখ। কবে যে সেরে উঠবে… যত দিন যাচ্ছে, এই দিন-দুনিয়ার জন্য মায়া বাড়ছেই। লাইক-শেয়ার-কমেন্টের দেখনদারির দুনিয়া ছাড়িয়ে আরেকটা পৃথিবী আছে আমাদের চারপাশে, যেটা বড্ড নিজের, অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি; সেই পৃথিবীটার জন্য মায়া হয় আজকাল। বেল বাজল, কাজের মেয়েটা এল। কাঁচা সবজির বাজারটা ওই করে আনে আবার কেটেকুটেও দিয়ে যাচ্ছে কদিন হল। রান্নার মেয়েটা অনেক দূর থেকে আসে বলে ছুটি দিয়ে দিয়েছি। পিঙ্কিদের বাড়িটা আমাদের গলির মুখেই তাই রক্ষা, নইলে এই বয়সে আমার একার পক্ষে এতসব সামলানো একরকম অসম্ভব। পিঙ্কির বরের চৌরাস্তার মোড়ে তেলেভাজার দোকান, সকালে ডালপুরি, বিকেলে চপ-ঘুগনি… সব বন্ধ।

পাশের ঘরে একজন নবাবপুত্তুর পিজি থাকে। ফিজিক্স অনার্স, সেকেন্ড ইয়ার। বেলা দশটার আগে তার ঘুম ভাঙে না আর এই লকডাউন পিরিয়ডে তো বারোটা। সারাবছর দুবেলা হোম ডেলিভারিই ভরসা। এই দুর্দিনে আমিই বলেছি, আমার কাছে খেয়ে নিতে। ঘুম ভেঙেই সোজা দুপুরের খাওয়া, তারপর সারাদুপুর-বিকেল গিটারের টুংটাং। বিকেলের চা-টা অবশ্য অর্ণবই করে। সঙ্গে গিটার কাঁধে গান। শুধু দর্শক বা শ্রোতার ভূমিকাতেই শেষ নয়, একেকদিন সেসব আবার আমায় ভিডিও রেকর্ডও করে দিতে হয়। তারপর সেসব আপলোড দেওয়ার পর্ব নিজের টাইমলাইনে, আর পরের গল্প তো সবার জানা… লাইক, শেয়ার, কমেন্ট। আর ডাইনিং টেবলে বসে যত বকবক… আমি নাকি তার ওল্ড লেডি ফ্রেন্ড! আশ্চর্য সব মানবজমিন দেখে যাচ্ছি! সবটাই যে মন্দ লাগে, এমনটা নয়। তবে, বেশিরভাগই তাল মেলাতে পারি না এই দু-তিন প্রজন্ম পরের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে। সেটাই স্বাভাবিক। লাইক বেচে এদের দিন কাটে আর যত শেয়ারিং নাকি ওই ভার্চুয়াল দুনিয়ায়।

বেলা ১২.০০, দোকানঘর

প্রবালের কথা।।

…দাদা, মুড়ি আছে?

…না বৌদি, মুড়ি তো শেষ। পরশু আসার কথা, রবিবার একবার আসুন দেখি।

…কাল রাত থেকে আবার ছেলেটার পেটখারাপ, সকাল থেকে বারকয়েক বমিও করেছে। দুপুরে জলমুড়ি দেওয়া ছাড়া তো কোনও উপায় নেই। ঘরে যেটুকু ছিল, তাই দিয়ে রাত থেকে চালিয়েছি, আর একটুও নেই। কী করি এখন?

…ওহ হো! দাঁড়ান দেখি, একজন হাফকেজির প্যাকেট করে রাখতে বলে গিয়েছে সকালে, এখনই আসার কথা। ওখান থেকেই আপনাকে দেওয়া যায় কী না খানিকটা দেখি। ছেলেকে সাবধানে রাখুন বৌদি, জ্বর নেই তো গায়ে?

…না, জ্বর নেই। তবে দুর্বল হয়ে পড়েছে খুব। একটা সাদা তেলের প্যাকেট, একটা থিন বিস্কিট, পাঁচফোড়ন, সাদা-কালো দুরকম সরষেই মিশিয়ে দেবেন আর চারটে গরমমশলার প্যাকেট।

…বাকিগুলো দিচ্ছি কিন্তু গরমমশলা দুটোই আছে, আপনি একটা পাবেন। কী করি বলুন, সবাইকেই তো দেখতে হবে। লকডাউনের বাজারে মালই তো আসছে না। দোকানে পুরনো স্টক করা যা ছিল, তাই দিয়েই চালাচ্ছি। কাল-পরশুর মধ্যে তাও শেষ হয়ে যাবে, এর মধ্যে নতুন স্টক না ঢুকলে আমরাও যে কী করব, জানি না। ডিস্ট্রিবিউটরের ঘরেও স্টক শেষ বলছে। আর কিছু লাগবে আপনার? নইলে সেই রোববার।

আজকের মতো ঝাঁপ বন্ধ করে এবেলাই বাড়ি। কতদিন যে চলবে এই ঝামেলা কে জানে। দোকানে স্টক শেষ, ঘরেও তো রসদ সীমিত। ডিস্ট্রিবিউটরকে আগাম দেওয়া আছে, নইলে তো মাল দেবে না এই বাজারে। পাড়ায় ভ্যানের সব্জিওয়ালারা তো দেড়গুণ দাম নিচ্ছে আনাজপাতির। কিচ্ছু করার নেই। তাই দিয়েই চালাতে হবে। একবেলা দোকান খুলছি বলে সকালে বাজারও যেতে পারছি না। হয়তো কিছু কমে পেতাম। এভাবেই চালাতে হবে, যা দেখছি।

দুপুর ৩.০০, ড্রয়িংরুম।

প্রিয়মের কথা।।

“টু’নাইট অ্যাট টেন লাইভ ফ্রম মাই পারসোন্যাল প্রোফাইল”

স্টেটাস দেখে পিং এল…

সায়ন্তিকা: আজ কি পুরোটাই?

না না, প্রিল্যুড… দেন প্রথম লাইন… তুই ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে’, আমি নেক্সট… ইন্টারল্যুড… ‘দূর হয়ে যাক’ কোরাস… এন্ডিং নোট

সায়ন্তিকা: ওকে

কাল বাদে পরশু পয়লা বৈশাখ… ইশশ! ব্যান্ড ফেস্টটা পুরো মাঠে মারা গেল। সবে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। একটা-দুটো স্পনসরও আসতে শুরু করেছিল। বাবির সঙ্গে আজ বিকেলে একটা ভার্চুয়াল জ্যামিং আছে আর তারপর ঠিক দশটায় নিজের প্রোফাইল থেকে লাইভ। পয়লার প্রোমো আর কী! সায়ন্তিকাকেও বলা আছে, ও আসবে লাইভে সেম টাইম। বাকিটা শুভ দেখছে, আই মিন এডিট পার্টটা। আমাদের তো মোবাইল ভরসা, কত আর ভালো হয়। ওর ম্যাক আছে, দেখা যাক।

তিনটে বাজে, এখনও ঘণ্টা দুয়েক সময় আছে। পাঁচটার মধ্যে বাকিটা তুলে ফেলতে হবে। মা ঘুম থেকে ওঠার আগেই রেকর্ডিংটা শেষ করতে হবে। তারপরেই তো শুরু হবে রান্নাঘরে বিভিন্নরকম বাসনের শব্দ। রেকর্ডিং-এর তেরোটা বেজে যাবে। এত ছোট একটা বাড়ির মধ্যে এতসব হয় নাকি? জনিদের বেশ মজা, ডান্স তো। দিব্যি ছাদে গিয়ে ভিডিও করছে। আর ও? আজ তিনমাস তিনদিন… একটাও কথা নেই। একবারও কেউ কারও স্টেটাস চেক করিনি, যদিও লুকিয়ে প্রোফাইল ঘুরে এসেছি। দিব্যি তো আছে আমায় ছাড়াই। আমিই শুধু রোজ সকালে নিয়ম করে লাস্ট সিন… চেক করি আর ভাবি কত বদলে গেল মেয়েটা এই তিনমাসেই। আমার সঙ্গে কথা বলার সময় ১২টা না বাজতেই ঘুম পেয়ে যেত যার, এখন সে প্রায়দিনই মাঝরাত পর্যন্ত অনলাইন! কোথায় যে আছে এখন… কোথায় এখন বলে, ‘ভালোবাসি’… পৃথিবীর না হয় আজ অসুখের সময়, আমার অসুখ তো অনেক আগেই বাসা বেঁধেছে।

সন্ধ্যা ৭.০০, ড্রয়িংরুম।

শুভ্রর কথা।।

সারাদিন স্ক্রিনের সামনে টানা বসে থেকে চোখগুলো জ্বালা করছে, মাথাটাও দপদপ করছে। খোলা হাওয়া দরকার। ছাদে ঘুরে আসা যায় কিন্তু দরজা খুলে বেরোতে গেলেই পারমিতা কিছু না বলে এমন অদ্ভুতভাবে তাকাবে… শিওর ভাববে, রুনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আড়াল খুঁজতে যাচ্ছি। ওর সন্দেহটাও ভুল নয়, কিন্তু অন্যদিকে তো রুনার বাড়িতেও ওর বর আছে… শ্বশুর-শাশুড়ি… ভরা বাড়ি। দু-একবার ফোন করে দেখেছি, কীরকম যেন একগলা অস্বস্তি নিয়ে রুনা ফোন ধরে। তাই মেসেজই ভরসা। অফিসে যেদিন ইন্দ্রদার কাছে ধরা পড়েছিলাম, ইন্দ্রদা বলেছিল, “এই দু নৌকোয় পা রেখে নৌকো চালানো কিন্তু খুব কঠিন ভায়া। দাঁড় বাইতে পারলে পারাপার আর না পারলেই পরপার।” দিব্যি তো চলছিল সব ঠিকই, সেবার জন্মদিনে রুনাকে না ডাকলেই হয়তো পারমিতাও কিছু বুঝত না। আর এখন তো এই ওয়ার্ক ফ্রম হোম… সব শেষ করে দিল।

ইদানীং পারমিতাকে আর নেওয়াই যায় না। এত ব্লান্ট লাগে, সারাদিন কী সব সিরিয়াল দেখে আর ছাইপাঁশ বই পড়ে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পর যে ইন্ডিয়ান মিউজিক কোথায় চলে গিয়েছে, কোনও খোঁজই রাখে না; ব্যাকডেটেড! ওয়েবসিরিজগুলো তো দেখলেও পারে। কোনওদিন ওয়েভলেংথই ম্যাচ করল না। আজকাল ভাবলে কেমন অবাক লাগে, পারমিতা আর আমি নিজেরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম! কী যে ভাবে সারাদিন কে জানে! সবসময় একটা ঘোরের মধ্যে থাকে মনে হয়। জাস্ট সাফোকেটিং… দমবন্ধ লাগে এই বাড়িটায়। মিসিং দ্যাট সোম থেকে শুক্র নাইন টু সেভেন… অথচ কী করিনি আমি! বাড়ি-গাড়ি-শাড়ি-গয়না… কোনওটারই তো কোনও অভাব রাখিনি। আমার দিকে তো কোনওদিন মনই দেয়নি, আজকাল বাচ্চাটার সঙ্গেও কেমন যেন ছাড়া ছাড়া থাকে… কার সঙ্গে থাকে সারাদিন মনে মনে ওই জানে। একবার ধরতে পারলে শালা, সলিড একটা গ্রাউন্ড পেয়ে যাব। বাচ্চাটার কাস্টডি নিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।

নাহ! যেতেই হবে ছাদে, রাতে ঘুম আসবে না নইলে…

রাত ১১.৩০, বেডরুম।

অবন্তীর কথা।।

সেই কোন ভোরে বিছানা ছেড়েছি, তারপর থেকেই সারাদিন টইটই এই ৮০০ স্কোয়ার ফুটের চৌহদ্দিতে। সারাদিন পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে নিয়মমাফিক নাইটক্রিম ঘষতে ঘষতে বুঝলাম হাঁটু, কোমর, ঘাড়-পিঠ জানান দিচ্ছে, বয়স হচ্ছে। পায়ে পায়ে এই ন তলার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। লকডাউনের জেরে আপাতশান্ত শহরটা সারাদিন ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলে শেষে ঘুমিয়েই পড়েছে। কেমন যেন একটা উদাস উদাস হাওয়া আর আকাশে সুপারমুন। এসব ছাপিয়ে পাশের ঘরে জানলা গলে ঠিকরে আসা অয়নের মোবাইলের নীলচে আলোয় বুঝলাম, এখনও ঘুমোয়নি। সম্পর্ক ঘুমিয়েছে কারণ আমাদের রিলেশনশিপের লকডাউন তো বহুদিন আগেই হয়েছে।

আমাদের মানে আমরা যারা সোশ্যাল মিডিয়ার নিরাপদ দূরত্বে বসে ফেসবুক-ইন্সটাতে স্টেটাস আপলোড করছি, তাদের একটা মাথার উপরে নিশ্চিন্ত ছাদ আছে; পায়ের তলায় সলিড ফ্লোরিং আছে, যা মপ করে স্যানিটাইজ হয় রোজ; বেসিন আছে যাতে ডেটল আর নরম তোয়ালে রাখা; কিচেনে অনেক অনেক চাল, ডাল, মশলা, মাংস, সসেজ রাখা। আমার এখনো ঘর পোড়েনি, মজুত করেছি নব্বইভাগ আনাজ। আমরা বেঁচে যাব। কিন্তু সেই মানুষগুলো? যাদের মাথার উপরে ছাদ বলতে একটাই ঘর, সেখানে গাদাগাদি করে বুড়ো মা-বাবা, বৌ-বাচ্চা… ভিনরাজ্য থেকে এসে হোম কোয়ারেন্টিনের আওতায় পড়ে খোলা আকাশের নীচে গাছের উপরেই আজ বারোদিন হল আছে! একটাই ঘর আর ছটা মানুষ; ওদের মুখ চেয়েই তো এই সেলফ কোয়ারেন্টিন।

খবরে দেখছিলাম, চিনের একটা প্রদেশে লকডাউন ওঠার পর রেকর্ড সংখ্যক ডিভোর্স পিটিশন জমা পড়েছে; কোমায় চলে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে বুঝি কোনও কোয়ারেন্টাইনই বাঁচাতে পারে না। একই ছাদের নীচে তিনটে মানুষ তিনটে ঘরে সেলফ কোয়ারেন্টিনে। এও যে এই পৃথিবীর গভীরতম অসুখ… টালমাটাল এই সম্পর্কগুলোর গায়ে যে কেন কোনও সতর্কীকরণ দেওয়া থাকে না! ঘরেতে তাদের নিত্য আসাযাওয়া কিন্তু মনেতে???

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2770 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...