পাঁচটি কবিতা

অঞ্জন দাসের পাঁচটি কবিতা

অঞ্জন দাস

 

আগুন আনছি

রাত্রি নামলে তিরতির কাঁপা, বিষাদের থলি, আমরা কজন চিত হয়ে শুই, পাশে নদীজল ভ্যাকুমক্লিনার… সহজ পদ্যে নত বিশ্বাস, হাঁটুকাঁপা ভয়, পথের আলোয় মাড়িয়ে যাচ্ছি, কেরালা বিবশ, বাংলা ভাষার কফিন বইছি, শব্দ পাচ্ছ উচ্চগ্রামের? হাওয়াও এখন বারুদ-গন্ধী…

এবার পুজোয় থিম কেরালা, রেশন দোকানে লম্বা লাইন, হাতে বন্দুক, ইসলামপুর, অমর শহীদ বাংলা ভাষা; আমরা কেবল সেলাম ঠুকছি, শিরদাঁড়াতে টান ধরেছে, হাঁটার নিয়মে পেরিয়ে যাচ্ছি বসন্তদিন, লুকোছাপা ভয়, জোনাকির মতো, অহর্নিশিই জ্বলছে-নিভছে।

এসবই তো বাঁচছি বলেই! মৃত্যু কেবল সাটিফিকেট। সফেদ শস্যে রক্তের দাগ। একজোট হও। সহজাত শোক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ছুটে এসো আজ। আগুন আনছি, মশাল জ্বালাও।

 

মৈথুনরত

অন্তর্বাস, পেটিকোট। স্মৃতির পকেটে রাতজাগা ছবি।
বিশুদ্ধ চাদরে এই সমুদ্রমন্থন, বিভাষিত জিভ
ঘনিষ্ঠ দূরত্ব মানে কতটুকু? প্রলয় থামবে কি?
এসো এসো নটরাজ, সঙ্গমচিহ্ন পড়ে থাক খাটে।

যারা যারা ‘প্রেম’ আঁকে, লিখে রাখে বেজন্মা রাত
আহত প্রেমের পাশে এসে শোয় আত্মীয়ের মতো,
আমি তার পুরনো প্রেমিক অথবা ইতিহাস স্যার
হতে চেয়ে আর্জি জানাচ্ছি এই এতকাল পর।

গোপন পকেটে থাক ইচ্ছেঘুড়ি। সমবায়ী উত্তাপকাল
চাদরে লেগে আছে ভালোবাসা। মৈথুন বিশ্বাস,
প্রিয় সে নারীর নাম যদি হয়, ‘ভাষা’ অথবা ‘অক্ষর’
কবি শুধু কলম হাতে, শব্দ-তে শান দিয়ে নেয়।

 

গ্রামীণ সংবাদ

ব্রজবুলি। মোহধাম। তোমার তুলনা তুমি নিজে।
বর্ষায় আজন্ম যে কাদা মাড়িয়ে আসা।
আমাদের তাথৈ বৃষ্টি। শ্রাবণ আসে যদিও বা,
তারপর কিনারায় দাঁড়িয়ে টুপটাপ-ঝম্‌ঝম্‌…

কথকতা ভুলে যাই। শ্রীরাধিকার গল্পখানিটুকু
জ্বর হয়। ভুল বকি। জল এসে ঢুকে যায় ঘরে,
আলপথে হেঁটে যায়। একা একা। মাঝরাত। হিসাবরেখায়।
কুয়াশাদিনের কথা লিখে রাখি বাঁচার অজুহাতে।

জন্মদাগ মেলায়নি আজও। আমাদেরই ক্ষণিক বিভ্রম।
কালে কালে সব হয়। ক্রমে ক্রমে ইতিহাস ক্ষয়।
কথক পেরিয়ে আসে। ধীর লয়ে। স্মৃতিদাগ ফেলে।
বিচ্ছেদকালের কাছে এসে দেখি, সঙ্কল্প মরে যায় দ্রুত।

 

প্রাত্যহিক

মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরার রাস্তা ভুলে যায়। বাড়ি চিনে ফিরবার নির্দেশক, খুলে রাখি বর্মের মতো। সিজিন রোদ্দুর এসে আলো ফেলে গায়ে। আমাদের দারিদ্র উদ্ভাসিত হয়।

পাড়ার মুদির দোকান থেকে কিনে নিই মাসকাবরা। সুখ কিনি দুটাকার। দুঃখ ঝেড়ে ফেলবই গা থেকে। আঙুলের ফাঁকে নিভে আসে সুখ; ঝেড়ে ফেলি ছাই, কষ্ট নেমে আসে…

 

একটা না-হওয়া কবিতা

আমাদের যাপনের কাছাকাছি যারা থাকো, যাপনে লুকোনো মরা ইতিহাস তাদের কুড়ে-কুড়ে খায়। ছোট টিলা-বাড়ি, নিচু চালাঘর, শব্দ ডিঙিয়ে আসা জারজ গুল্ম এই তো আমার পথনির্দেশ। নিতান্ত অবেলায় সহজস্নান সেরে যে নারী তার চুল শুকোয় হাওয়ায়, তার মোহগন্ধে বাংলা অক্ষরেরা জেগে ওঠে প্রায়শই। আসলে নারীর জঠরেই তো শব্দ ভাঙে। কবিতা প্রসব হয় জনন-নিয়মে। জরায়ু থেকে উঠে আসে আদিম শব্দ, বিপন্নতার দিকে পিঠ করে নেমে আসে চিল এবং মাতৃভাষা; বর্ণমালা এঁকে দেয় প্রগাঢ় চুম্বন।

মুগ্ধ চরাচরে পাতা থাকে বালির বিষাদ। অবগাহনের শেষে এলোকেশী রমণী তার সমস্ত সঞ্চয় বিছিয়ে দেয় নদী-কিনারে। পাতার নিস্বণটুকু ভুলে যেতে চায় কবি। কেননা তারও কিছু গোপন ঋণ জমে আছে, অনাগত বর্ণমালার কাছে। তটভূমে বসে থাকা ক্লান্ত বকের ডানায় তখনও যতিচিহ্ন লুকোনোর প্রবল চেষ্টা, তখনও বাকি তার যোজন ক্রোশ পাড়ি… দূরাগত সূর্যাস্তের বিপরীতে এই এগিয়ে চলা, সার্থক হোক। শব্দ-বর্ণ মিলে যাক জঠরে অথবা ওষ্ঠে। প্রসব হোক আদিগন্ত বাকশস্য অথবা শব্দ-কথক; যারা আলো জ্বালাতে জানে…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2770 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...