অণু গদ্যগুচ্ছ

অণু গদ্যগুচ্ছ : কুশান গুপ্ত

কুশান গুপ্ত

 

অন্বেষণ

নীলাভ নির্জনে আছ সারাদিন, শ্যামলে, জঙ্গলে; ততোধিক রয়ে গেছ মৃত্তিকার অন্ধকারে, আদ্যন্ত খননরত, ফসিলে পেয়েছ ঢুঁড়ে চুম্বনের দাগ― লুপ্ত করোটির চিহ্ন নিয়ে একাকী উন্মার্গগামী অন্যদিন, লিপ্সা তোমার। তুমুল সমুদ্র-স্পৃহা স্থির ঢেউ সনাক্ত করেছে একদিন গন্ডোয়ানা-শিঙে, যেখানে মেঘ দেখে কুয়াশার ভ্রম হলে তুমি তবু পর্যটক-ঔদাসীন্য অর্জন করোনি। কে মাথার অভ্যন্তর কুরে খায়? তোমার নিষ্কৃতি নেই, প্রশ্নে, সংলাপে, একা, আপনরহিত ঘোরে, পলক পড়ে না, আছে এক নিশিডাক, আলেয়ার দহ আর নিষিদ্ধ সূচির পাঠ, মোমবাতি, উদ্বেগ… রাত্রি শেষ হলে কারা যাবে প্রার্থনায়― তখন তুমি কি ক্লান্ত, নাকি তুমি তখনও ধোঁয়ায় চাইছ প্রিয় তামাকের কটু স্বাদ, আসলে আরব্ধ, তবু, কাঙ্খিত সেই জড়তাবিহীন, লিখনযোগ্য একটি তোমা-অনপেক্ষ সূত্র? তাহলে একদিন, বালির ওপরে দাগকাটা তোমার নিবিষ্ট আঙুল দেখবে না― কখন তোমার চিন্তান্বিত মাথা ও অপলক চক্ষুদ্বয় কেটে নেবে― নির্বিকার তরবারি, অশ্বারোহী-হাত।

 

অন্যদিন

সেদিন বিকেলে, আজ ভ্রম হয়, তাও বলি, ছিল নিরন্তর অবকাশ। সেদিন তোমাদের জন্য ছিল অনায়াস হাসি, সামান্য ছুতো, গীতবিতানের খোলা পাতার উদ্যম, জ্যোৎস্নার ন্যাড়া ছাদে ঝুঁকে পড়া অবাধ্য নারিকেলশাখা। মাদুরে অতিবাহিত সেইসব বারণহীন সন্ধেয় অদূরের দারোগাপুকুরের শায়িত জলে তোমাদের আলোকিত ও বোবা দ্বিতলবাড়ি কাঁপতে দেখেছি মৃদু মৃদু। তুমি ও তোমার দিদি, তোমাদের উদযাপিত সেইসব অবিকল জন্মদিনের মরশুম, অর্থাৎ, মার্চ এসেছিল। অধুনাবিলীন, যেসব উদ্বিগ্ন চিঠি লিখেছিলে, বাক্যগুলি মনে নেই, গোটা অক্ষরের আলতো শ্রীছাঁদ শুধু রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তোমার বিংশতি মুখের মামুলি আদল। মধ্যরাত্রির মালদা স্টেশনে কখনও ট্রেন থেমেছিল ও তুমি অযথাই হেসেছিলে। তারপর কখন ভোর… দার্জিলিং মেল থেকে তুমি নেমে জানালার থেকে ক্রমে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছ… বর্ধমান জংশনে, সম্ভবত এইসব ঘটেছিল।

 

নিষিদ্ধ অক্ষরেখায়

উন্মুখ ও প্রবর আত্মা, ভুল করে নিষিদ্ধ অক্ষরেখায় যদি চলে এলে, জেনে রেখো, এখানে শস্যের কাঙাল কেউ আজ আর বেঁচে নেই; তোমাকে অভ্যর্থনা দেওয়া হবে কিঞ্চিৎ রেকাবি ফুলে, বাচাল সওদাগর যার সঠিক ক্রেতা। যারা যারা ঠিকঠাক বেঁচে নিতে চেয়েছিল, তারা আজ দ্বীপান্তরী। বাকি যারা দেশাত্মবোধের রম্য ভাষ্য প্রাজ্ঞতায় শিখেছিল, প্রেক্ষাপট বুঝেছিল অনুমানে, তারা খুব বেঁচেবর্তে আছে। এসো, স্বাস্থ্য পান করো, এসো, বিক্রয় করো― উপলব্ধ শুষ্ক ফল, বিকিরণক্ষম ধাতু, প্ৰকৃত সুগন্ধী ও বিরল-প্রজাতি-মাছ। অন্য কিছু বিনিময়প্রথায়, যদি বলো, পাবে, ওষ্ঠযোগ্য চুম্বন, উপাদেয় তরল ও পাঠযোগ্য কবিতা, যদি শিরোধার্য করো। শুধু বলি, অকারণে বিষণ্ন হয়ো না, আর, কাউকে খুঁজো না যেন― সহাস্য, ঝুঁকে পড়া, করমর্দন-কালে।

 

প্রথমাকে

প্রথমা, তোমাকে একদিন দেখে ফেলে সে। রাজার পরিত্যক্ত আস্তাবলে সমান্তর সাদা গোল থামের মধ্যবর্তিতায়, রোদ এসে পড়েছিল তোমাদের দ্বিতলবর্তী দীঘল বারান্দায়, লেগে ছিল তোমার ও ধ্রুপদী-মুখে। এলানো চুলের বিদিশায় ও কোমল পূরবী চোখে রোদ দেখে স্থির হয়ে গিয়েছিল একাকী কিশোর। ক্রমে আরও একাকিত্ব একদিন ডেকে নেবে তাকে, তোমাকে লুকিয়ে চিঠি লিখবে সে প্রত্যহ, দুপুর ও বিকেল তাকে ডেকে নেবে অবলীলায়। সেই অবুঝ স্কন্ধকাটা কিশোরের রুগ্নতার দিনলিপি তাকে অবাধ দিবাস্বপ্ন দিয়েছিল। এমনভাবে ডাক পাঠায় কেউ? যে পাঠায় সে নিজেও জানে না, তবুও, প্রথমা, তোমাদের রাজকীয় খাঁ খাঁ দালানের পাশ দিয়ে ছুটে গেছে সে, অবুঝ, বারবার। একদিনই ডেকেছিলে, কেন? অন্যদিন দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে তুমি ও সে, একাকী, দূরে গো অ্যাজ ইউ লাইকে থুৎনিতে দাড়ি সেঁটে দরবেশ সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাঠে তোমার বোন। তোমার পায়ের কাছে লুটিয়ে আছে যে অবাধ্য শিশু, সে তোমার সম্পর্কভাই। কী বলেছিলে সেদিন? কেন বলেছিলে? যদি না বলতে এমন অসমীচীন, তাহলে আজ আর তাকে দোষারোপ করতে না এমন সূর্যাস্তে এসে। প্রথমা, হাতছানি দিয়ে পরে হাত ছাড়িয়ে চলে গেছ, একদিন, নিয়মানুগ। তাই সে বারবার ফিরে গেছে, ব্যর্থ হয়েছে তার সমস্ত পরিক্রমা। এখন রাত্রির কাছে নিমীলিত তার অপরাধ, তোমার ক্রন্দনের কাছে এসে মার্জনারত, নতজানু, একদা যার ছিল অখণ্ড শহরতলি, রচিত কৈশোর।

 

হত্যা

বিদিশা, তুমি পশ্চিমে। যেদিকে সূর্য হেলে আপাতত। ওদিকে এখন যারা ঝুঁকে ক্যামেরায় তৎপর, তারা চলে গেলে টিলাও একাকী। তারপরে, দূরে জ্বলে উঠবে টিমটিমে আলো। এসময়ে কেউ আসবে না। নিভৃতে চুমুর জন্য তথাপি অপেক্ষারত, কে ও? কে সেই কলঙ্কিনী? পা টিপে আসে কেউ। দেগে দেবে ব্যথার ছোবল।

আর তারও পরে আসবে, যার অন্ধকারে আসার কথা। প্ৰকৃত ঘাতক।

নিথর কারও দেহ তারও পরে টেনে নেবে তুমি হে নিরভিযোগ, অক্লান্ত সলিলা।

 

ড্যাফোডিল

আসন্ন বৃষ্টির কথা আজও শুভেচ্ছাবহ। মধ্যরাত, এখন প্লাবন কি এনে দেবে তোমার সবুজ ছবিগুলি? যার জন্মদিন মনে করে পুঁতেছ ফুলের স্মারক চারা, তাকে কতটা বা চেনো? লেখো তবে স্পষ্ট অস্বীকার: জড়োয়ার অক্ষরসমূহ। আজও বুঝি দুর্বিষহ জেগে আছ অন্য গোলার্ধে? তবে কি খবর দেবে কীরকম নীল জলতল থেকে অকস্মাৎ উড়ে যায় মরা বিকেলের মায়াবী হাঁসের ঝাঁক? কীভাবে পথের দুদিকে ফুটে থাকে অগোছালো অভ্যর্থনা, ব্লু-বনেট? ট্রিনিটি নদীর ধারে ঘাসে হেঁটে যায় একাকী উদাসী আরমাডিলো? নাকি তুমিও আমারই মতন আছো জঙ্গলের থেকে দূরে, সমূহ অসুখের দিনে, অন্তরীণ? আমি তো চিনি না কিছু ভিন গোলার্ধের, তাই প্রত্যাহার রচি, গোপনে কঁকিয়ে উঠি ঘুমে, অর্ধ-বিস্মরণে।

 

জলপিপি

তথায় জলের কুশলী পিপি অদম্য স্পৃহায় বুঝি হাঁড়িকুড়ির সংসার পেতেছিল? তথায় রন্ধনশিল্প, তুমুল গুঁড়াকুস্বাদ, আনোখা জাজিম; প্রাচীন পিলসুজ, শুদ্ধ তামা, রৌদ্রমজানো কাঠ, বৌদ্ধ পাথর। একদিন সেই প্রসিদ্ধ সোপান টেনেছিল মগ্ন দ্বিপ্রহর। গ্রীষ্মঘুমের ভিতরে তার পিপাসু আঙুলগুলি পিয়ানোর রিডের মত জামার বোতামগুলি মৃদু ছুঁয়েছিল। অন্যদিন তার ঘুমন্ত মাথা অকাতর রাখা ছিল এই কাঁধে, অনন্ত যাত্রায়, শীতার্ত অচেনা পথে। তথাপি, ক্রন্দনরত… ভোরঘুম থেকে তুলে নিয়ে গেছে তার ক্ষুব্ধ যত মরমিয়া অনুনয়। ক্রমশ জলের দেশে, একান্ত প্রস্তরযুগে নিয়ে গেছে একদিন তার একটানা কান্না, হিক্কা, উষ্ণ মখমল।

 

অবান্তর

তবে ভীরুতায় লিখি, সম্ভাব্য বিলাপ। তুমুল পথের দিকে ছুটে গেছে যে অবর্ণিল তরুণ বালক, তার তরে, মায়া? মনে আছে, তার অযত্ননখ কবে হাতে নিয়ে কেটেছিলে প্রিয় মমতায়? সহসা সাঁঝের বেলা প্রকাশিত গোল টিপ, কার চুল এরকম অবুঝ ও চুড়ো করে বাঁধা? অসম্ভব সান্ধ্য পথ, সমস্ত মুলতুবি, মিটিংয়ের শেষে তবে যাওয়া হয়েছিল, কথাহীন, দুইজনা। আজ অবান্তর বলে, আর কিছু নয়, শুধু আলগোছে লিখে ফেলা সম্ভব― সেইদিন দুজনে অহেতুক সন্ত্রস্ত কেঁপেছ, এক রাত্রির ভুল ঘোরে। আজ আর কিছু নেই, না ছায়া, না বিষাদ, না কোনও মনমরা লেভেল ক্রসিং… শুধু ঘুম ভেঙে বোঝো, সারারাত এখানেও বৃষ্টি হয়েছিল।

 

পরিযায়ী

পরিযায়ী, তোমাদের ডানা নেই, তাই টানা পথ হাঁটো, সন্তর্পণ। এই অভিশপ্ত দেশের প্রতিটি উড্ডীন গম্বুজে তোমাদের মিশে থাকা অশ্রুর ফোঁটা, রক্ত ও স্বেদ আমরা, তৎপর, মুছে নিই, নাগরিক বিবমিষা, জড়ো করা মৃত সব পাখির পালকে। পরিযায়ী, তোমাদের উদ্যত সন্তাপে কোনকালে অন্তর্লীন ভুখা ভারতের অখণ্ডম্যাপ, অরণ্য, জলা, পাহাড়, ত্রস্ত কাশ্মির। আর কত অপেক্ষায় কোনখানে মগ্ন রাত জাগে ওগো তোমাদের গৃহকাতরতা? আমাদের স্বস্তি আছে, ন্যায়, বিনোদন, প্রিয় নির্বাচিত পানীয়ের খোঁজ। এই লুণ্ঠিত অন্ধ পথ শুধু তোমাদের, ফেরার নগণ্য দাবি, ঘুমন্ত ও স্থগিত দেশগ্রাম ক হাজার মাইল দূরে? পরিযায়ী, দগ্ধ ডানা, ভ্রষ্ট পথদেবতার দল, এখন অন্ধকার, এখন আহ্বান,  মিশে যাও, জারি রাখো নাছোড় রাত্রিটহল, ক্ষুধার্ত পথচারিতা।

 

করোনার দিনে

অরণ্য-আবৃত দিনে যবে ছিনু, ছায়া ছায়া অন্ধকার, খড়-গবাদির দ্বীপে, যেখানে সমর্পিত কিছু সচেতন পিপীলিকার শ্রম-নিবাস। সেসব বিলুপ্ত গাছ, যার গন্ধ শুধুই জেনেছে রঙিন ডোরাকাটা কেন্নোর দল, কেঁচোর একান্ত― ঝুরো মূল ও আপ্রাণ মাটি। অধুনা এ-শিকড়হীন বেঁচে আছি, ম্রিয়মাণ, অবলুপ্ত পতঙ্গকুলের অভিশাপ নিয়ে। বেঁচে আছি, কুলাঙ্গার, রোদ এসে পুনরায় ফিরে যাবে কারফিউ-রাস্তায় কাউকে না দেখে। কল্পনাতীত সন্ধে নেমে যাবে তাই আজ এরকম, চিরন্তন দৃশ্য দিয়ে যাবে আজ অন্যান্য আকাশ। আদিম কুটিরে রুক্ষ ও কর্কশ আঙুল দিয়ে আজও যারা বুনে যাবে নিপুণ চাটাই, তাদের জন্য এখনও অর্জিত ভাতের নুন বিনা অন্য বিকল্প নেই। রম্য তামাশায় একা আছি, মশগুল, সামাজিক পুনর্বাসনে। আমাদের দরোজা একদিন বন্ধ দেখে সেই কবে ফিরে গেছে গ্রীষ্মের আচমকা সুখবর, বিহ্বল রৌদ্রের সব ডাকহরকরা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...