আয় তবে সহচরী, মুখে মুখে মাস্ক পরি

সাগ্নিক রায়

 
“আয় তবে সহচরী মুখে মুখে মাস্ক পরি”…. ১৪২৭ বঙ্গাব্দে কবিকে লিখতে হলে কবি কি এভাবেই ভাবতেন? হাতে হাত ধরা, ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে চুমু, বকরি ঈদের কোলাকুলি, ঘাড়ে হাত রেখে প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে হেঁটে চলা— এসব আমরা কতদিন ভুলে গেছি। দুর্ভাগ্যবশত গুরুদেবের কোনও মাস্ক পরা ছবি আমাদের কাছে নেই। থাকলে সেটা হোয়াটস্যাপে এই কয়েকমাসে সবচেয়ে বেশি শেয়ার হত। কিন্তু গুরুদেবকেও ফটোশপ-শিল্পী মাস্ক পরিয়েছেন। যেরকম মোনালিসা মাস্ক পরে স্যামসাং গ্যালাক্সি থেকে রেড-মি নোট ফোরে চলে যায়। আবার মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর “দ্যা ক্রিয়েশন অফ্ আদম”-কে ফটোশপে সমকালীন করে তোলা হয়েছে। ভগবান হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড ওয়াশ স্প্রে করছে আদমকে। শুদ্ধিকরণ। পৃথিবীর শুদ্ধিকরণ চলছে। কমলালেবুর মতো দেখতে আমার পৃথিবীটা মুখ ঢেকে আছে।
এই মুখচোরা মুখোশের প্রাদুর্ভাব নিয়ে মতবিরোধ আছে। শোনা যায় উত্তর-পূর্ব চিনে ১৯১০-১১ নাগাদ মাঞ্চুরিয়ান প্লেগ বা নিউমোনিক প্লেগ কোপ বসিয়েছিল। এর প্রতিরোধে উ লিয়েন থে তৈরি করলেন একটি কাপড়ের মুখাচ্ছাদন। ন ইঞ্চি চওড়া একটি সার্জিক্যাল গজের টুকরোর মধ্যিখানে ঢুকিয়ে দিলেন ছয়-চার ইঞ্চির একটি তুলোর টুকরো। তারপর সেলাই করে দুপাশে দড়ি বাঁধলেন। আবার ড পল বার্জার (১৮৪৫-১৯০৮) ক্লিনিক্যাল সার্জারির সময় জীবাণুমুক্ত স্বচ্ছতা নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি লক্ষ করেন সার্জারির সময় তার মুখ থেকে ড্রপলেট রোগীর শরীরে যাচ্ছে ও চারপাশে ছড়াচ্ছে। যার ফলে বড় ইনফেকশান তৈরি হচ্ছে। তিনি নাক ও মুখের নিরাপত্তার কথা ভেবে একটি ছয় স্তরীয় আয়তাকার গজ কাপড়ের টুকরো নিয়ে পরীক্ষা করলেন। এর চারপাশে ছিল লিনেন কাপড়ের অংশ। অনেকের মতে এটাই পৃথিবীর প্রথম সার্জিক্যাল মাস্ক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাস মাস্ক তৈরি হয়েছিল। খনির মজুররা এই মাস্ক ব্যাবহার করেছিল।

এইভাবে ক্রমে ক্রমে একদিন মাস্ক-মশাই ম্যাকমোহন লাইন ডিঙিয়ে ভারতবর্ষে ঢুকলেন। মাস্ক আর মার্ক্সের সূক্ষ্ম বানানগত ফাঁক নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া রসিকতার অট্টহাস্য হাসে। এক কমরেড আরেক কমরেডকে বলল, “কার্ল মার্ক্স পড়ে আসবি”। এই সাঙ্কেতিক উপমার অর্থ “কাল মাস্ক পরে আসবি”।

এইসময় রামকিঙ্কর বেঁচে থাকলে, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম করতেন। বাল্মীকি রাবণকে পাঁচজোড়া মাস্ক পরিয়ে লঙ্কায় নামাতেন। রামের জন্য আরএসএস ১০০% সিকিওর স্যানিটাইজড তীরধনুক পাঠিয়ে দিত যুদ্ধক্ষেত্রে। হুসেন নিশ্চয় খালি পায়ে হাঁটতেন না। যে বাঙালি এত আদুরে স্পর্শকাতর ছিল, সে হঠাৎ এত চিন্তকে পরিণত হল, তিন মিটার দূরত্ব মাথায় নিয়ে চলছে। কোভিড ১৯ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে “রণে, বনে, জঙ্গলে, যাহা কিছু স্পর্শ করিবে, তাহাতেই আমাকে পাইবে, আমি তোমায় বেলেঘাটা আইডি পাঠাইব।” কান্তিবাবু আর মাছের বাজারে গিয়ে কানকো দেখে ফ্রেশ মাছ বেছে নেয় না। শাকসবজিও আদর করতে ভয় পায়। দূর থেকে বলে দেয়, “হ্যাঁ রে, একটু বেছেবুছে তিন কিলো আলু ওজন কর।”

অধিকাংশ পাড়াই এখন আপাদমস্তক বাজারে পরিণত হয়েছে। শোভাযাত্রার মতো এই বাজার সকাল সাতটা-আটটা থেকে রবীন্দ্রপল্লী, সুকান্ত সরণী, নেতাজীনগরের গলিতে গলিতে হাঁক দিচ্ছে। টুং টুং করে সাইকেল ঘন্টির আওয়াজ হয়। মাছ, সবজি, ডিম থেকে শুরু করে বিস্কফার্ম মারি আর টপ বিষ্কুটের প্যাকেট-ও আমার পাড়া দিয়ে গেছে। ভ্যান রিক্সা দাঁড়ায়। চার পাঁচটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে ম্যাক্সি পরে কাকিমারা, হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো কিংবা লুঙ্গি-গামছা পরে প্রতিবেশী কাকুরা। বাসি মুখে মাস্ক পরে দর কষেন। 

এই জ্বালাময়ী ভূখণ্ডে করোনা আমাদের দুটো প্রধান ইংরেজি শব্দের শিক্ষা দিল। উপোসী বাংলার দেশে ‘কোয়ারেন্টিন’, ‘স্যানিটাইজার’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা তৈরি হল দিনভিখারি, রিক্সাচালক থেকে কেরানি, সাফাইকর্মীদেরও। ফুচকাওয়ালা কোনওকালে ভাবেনি তেঁতুল জলের পাশে ১০০% বিশুদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল রাখতে হবে। সেলুনে মাস্ক পরে চুল কাটতে বসছে কয়েকজন। সর্বত্র স্যানিটাইজ হচ্ছে। যিনি চপ বিক্রি করতেন আগে তিনি এখন স্যানিটাইজার, মাস্ক বিক্রি করছেন। কদিন আগেই শুনলাম, সোনাগাছির যৌনকর্মীরা বিপন্নতার স্বীকার। বাঁধা বাবু, ছাড়া বাবা কেউই এখন ওদিকে খুব একটা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় ৮০ শতাংশ যৌনকর্মী চিৎপুর ছেড়ে অন্য কাজের সন্ধানে বেরিয়েছে। দালাল বলা হয়ে থাকে যাদের, তাদের মূল অর্থ উপার্জনের কেন্দ্রবিন্দুই এখন মাস্ক এবং স্যানিটাইজার।

দ্বিস্তরীয়, ত্রিস্তরীয় আদতে কোনস্তরীয় মুখাচ্ছদন নিরাপদে কাম্য, তা ওবামা থেকে মাস্কোদাগামা কেউই জানে না। বরং ফ্যাশানে ইহা কেতা হইয়া উঠিল। লাল, নীল, সবুজের মেলা বসেছে। মনপসন্দ প্রিন্টেড মাস্কের বাহারে স্তরীয়-টরীয় চুলোয় যাক। ইস্টবেঙ্গলের মাস্ক দেখলাম। মোহনবাগানের মাস্ক দেখলাম। এছাড়া নকশা করা সালোয়ার কামিজ, শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং মাস্ক রয়েছে বাজারে। মাস্কে শাপলা ফুল, মল্লিকা, গোলাপের ছবি থাকে না। পদ্মফুল থাকে। এই মাস্কের রং গেরুয়া। স্মোকাররা পথেঘাটে একটু দুর্বিপাকে পড়ছে। বিড়ি, সিগারেট খাওয়া লোকেদের সমস্যা। তারা বারবার মাস্ক নামিয়ে সুখটানে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু করতে হচ্ছে। কাউন্টার কালচার কিছুদিনের জন্য বন্ধ। থুথু ফেলার মতো বদভ্যাস যাদের তাদের ক্ষেত্রে এ মাস্ক পীড়াদায়ক। পান, গুটখা চিবোনো ওয়াক্-থুঃ সম্প্রদায়ের জন্য উচিত শাস্তি।

কোথায় বেশ দেখলাম একটা ৬০ এমএল-এর স্যানিটাইজার কিনলে সাথে একটি কাপড়ের মাস্ক ফ্রি দিচ্ছে। ১০০ এমএল-এর কিনলে মাস্ক এবং গ্লাভস দুটোই। ফুটপাথে মাস্ক গড়াগড়ি খাচ্ছে। বইয়ের দোকান, দশকর্মা, মুদি, ওষুধ, কসমেটিক্স, রিচার্জের দোকান, সর্বত্র সবখানে ঝুলছে প্যাকেট প্যাকেট মাস্ক। আমার বাড়ির উঠোনের নিমডালে মাস্ক ঝুলে আছে কদিন ধরে। দখিনা বাতাসে দোলে সেই মাস্ক। কাকে মুখে করে নিয়ে ওখানে টাঙিয়ে দিয়েছে।

মাস্ক খুব সহজলভ্য এখন। স্যানিটাইজারও তাই হয়ে উঠছে। আমার প্রত্যন্ত অজ পাড়াগাঁয়ের চাষাভুষো প্রান্তিক মানুষগুলোকে পঞ্চায়েত প্রধানেরা সপ্তাহে-সপ্তাহে মাস্ক বিতরণ করে খুশি করছে। পেটের দানাপানি কই? দু বেলা মুখে দু মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করা যেতে পারত। হয়ত কিছু ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে। কিন্তু এত মাস্ক বিলোনোর পরিবর্তে ভাতের ব্যবস্থা হোক। 

তবু আমি চাই এই পৃথিবী এখন মাস্ক পরুক। থুতনিতে না। নাক ঢেকে পরা থাক। কিন্তু মনেপ্রাণে চাই, ভবিষ্যতে ডিকশনারি থেকে এই শব্দ দুটো মুছে যাক। ‘মাস্ক’ আর ‘স্যানিটাইজার’। আট মাসের ছোঁয়াছুঁয়ির সংযত অভ্যেসে পাক খাওয়া বাঙালির নতুন সূর্য উঠুক। করোনা দেহত্যাগ করুক। মাস্ক খুলে ফেলে দিয়ে মানুষ জড়িয়ে ধরুক একজন আরেকজনকে। রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় নিক। “সেইক্ষণে বাতায়নে নীরব নির্জন/আমাদের দুজনের প্রথম চুম্বন।” স্যানিটাইজার সর্বত্রই ভেসে যাক গঙ্গায়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2769 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...