দেবী

প্রতিভা সরকার

 

এখানে কেউ সমুদ্র টমুদ্র বলে জিভের আড় ভাঙে না, সোজাসাপটা বলে গাং। অথৈ গাং। গাং তাদের কাছে অন্নপূর্ণা, ভরা পেটের ভেতর থেকে উজার করে দেয় কতরকমের মাছ, খসা মাছ, শাটিং, দৈ চাকা, বাউল, কাঠুয়া ট্যাংরা, বান, লহরা মাছ, আরও কতরকম। গাং তাদের দেয় যেমন, নেবার সময় নেয়ও ঘাড় মুচড়ে। একে তো সারাদিনের ঘাম নুন হয়ে ঘাড়ে গর্দানে লেগে থাকে মাছুয়াদের, উপরন্তু ঝড়জলের রাতে উত্তাল ঢেউয়ের বিরুদ্ধে যুঝে তারা কজন ডাঙায় ফিরবে বলা মুশকিল। রেডিওতে আবহাওয়ার মেজাজ-মর্জির কথা কী বলে তাই শুনে হোগলা-ঘেরা হয়ে বসে থাকলে বেজায় ঠকে যেতে হয়। তাই ওসব পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে পড়াই দস্তুর। এক যদি না আম্পান কী বুলবুলের মতো বড় ঝড়ের কথা গলার রগ ফুলিয়ে বলতে থাকে সবাই।

গাঙের সঙ্গে এই দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক আর বিজন গাঙে রোজ মাছ ধরতে যাওয়া, মাছুয়াদের মধ্যে অনেক উপকথার জন্ম দিয়েছে। এখানে আসার আগেই গ্রামে বসে সক্কলে শুনেছে মাঝ গাঙে হঠাৎ মাথা তোলা সেই জলস্তম্ভের কথা। কী মোটা আর কী পাক তার চারদিকে। লোনা জল কিসের টানে কে জানে দশ হাতের বেড় পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরে ওঠে, সেই টানে আকাশে উঠে যায় মাছের ঝাঁক, এদিকপানে যা দেখা যায় না সেই মুখ ভোঁতা হাঙর আর বিশাল কালো তিমি। সবচেয়ে বড় ট্রলারকেও তোয়াক্কা করে না গাং। তাই নাকি ট্রলারে দূর দূর মাছ ধরতে যাবার আগে বৌয়ের সিঁথার সিঁদুর মুছে দিয়ে যেতে হয়। গাঙের দেবদেবীর করুণা হলে পাহারা দিয়ে ফিরিয়ে দেয় ট্রলার, বৌটির মাথায় আবার সিঁদুর চড়ে।

কাহিনি আরও আছে। মাঝ গাঙে গেলে নাকি দেখা যায়, অনেকেই দেখেছে, এক অপূর্ব নারীমূর্তি, যৌবনবতী, নিজের হাতে জালে ঠেলে তুলে দিচ্ছে রুপোলি মাছের ঝাঁক, অথবা তাড়িয়ে নিচ্ছে জালের দিকে। ডুবসাঁতার, চিৎসাঁতার— সবেতেই সে সমান দড়। চিৎসাঁতারের সময় পেছনে সাত হাত জল জুড়ে দেবীর কোঁকড়া চুলের ঢেউ, বুকের ওপর যেন দুটি মাটির মালসা, সাঁতারের হাঁপে সে দুটি দ্রুত ওঠে নামে। কিন্তু মাছুয়ারা বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকলেই কোথা হতে পাক খায় ঘন কুয়াশার ঢেউ। তারপর চুলের ঢেউ, জলের ঢেউ, বুকের ঢেউ, কুয়াশার ঢেউ সব মিলেমিশে চোখের সামনে ঝুলিয়ে দেয় এক ভারী পর্দা। আবছা ঠাহর হয় দেবীর শাঁখাপলা পরা সোনার বরণ লম্বা হাত দুখানি। যেন সোনালী দুই নধর আঁকশি। জলের পেটের ভেতর ঢোকায় আর তোলে। তোলে আর ঢোকায়। তোলার সময় মুঠিভরা কত না মাছ! কেউ খলবল করে না, ল্যাজ নাচায় না, লাফায় না যেন কেউ তাদের মন্ত্র পড়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে। শুধু মাছুয়ারা বোঝে তার জালে যত না মাছ উঠছে, খাপলায় জমছে তার চেয়ে ঢের বেশি।

ছ মাস এই গাং-অন্নপূর্ণার দোরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা। ভাদ্রমাস থেকে টানা মাঘ অব্দি। মাছের সিজন শেষ হলে মহাজনের পাওনাদেনা মিটিয়ে গ্রামে ফেরা।

এই ছ মাসের জন্য গাঙের ধারে সার সার হোগলার অস্থায়ী ঘর। গাঙের দিক থেকে আসা হাওয়ায় সারাদিন ঠেলা মারে, খচরমচর আওয়াজ ওঠে। সে শব্দ শোনার লোক অল্প। মাছুয়াদের সঙ্গে তমালীর মতো যে গুটিকয়েক ঘরের মেয়েরা আসে তারা ছাড়া সারা দিনমান গাঙের চর ফাঁকাই পড়ে থাকে। কাক কুকুর আর কয়েকটা বেড়াল জুটে কাড়াকাড়ি করে খায় মাছ বেছে নেবার পর পরে থাকা অবশিষ্টাংশ। রোদে জাল শুকোয়। আর হু হু হাওয়ায় বালি উড়ে এসে পড়ে ইতিউতি।

এখানে যেহেতু ট্রলার কম, মাছমারা নৌকা বেশি, মরদরা সব ভোর চারটে বাজতে না বাজতে আবছা অন্ধকারে নৌকা টেনে নিয়ে যায় বড় বড় গুণ্ডা ঢেউয়ের ওপর দিয়ে, হাত পায়ের পেশি শক্ত হয়ে ফুলে ওঠে। ঠান্ডা লোনা জল ঝাপটা মারে মুখে। অত ভোর ভোর খালি পেটে সে জল বেশি গিললে দু একবার ওয়াক ওঠে। কিন্তু ঐ অব্দিই। তারপর নৌকা গিয়ে পড়ে শান্ত সমুদ্রে। সেখানে ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় চিকচিক করে লালচে আভা। সেই আভা পুরোপুরি লাল থেকে সোনালি হতে হতে সূর্য গা থেকে জল ঝেড়ে লাফ মারে আকাশে। ট্রলার আর নৌকাও তখন অনেক এগিয়ে গেছে মাঝ গাঙের দিকে। নোনা জলে ভেজা, আঁশটে গন্ধযুক্ত জাল এবার মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে জলে ফেলবে নৌকার জেলে। ট্রলার নিজের সঙ্গে বাঁধা জাল টেনে নিয়ে যাবে আপন গতিতে। কপাল মন্দ হলে জলস্তম্ভ দেখা দেবে, ভালো হলে, গাঙের দেবী স্বয়ং। নৌকা ভর্তি তখন শুধু মাছ আর মাছ।

জেঠা বিধান থেকে শুরু করে জেঠতুতো দাদা বিমান, গ্রামের চেনা শম্ভুকাকা সবাইকেই এই দেবীবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করেছে তমালী। অনেকবার পুছ করতে জেঠা তো সেদিন রেগে উঠল,

–দিনরাতি দেবী দেবী কেনে কর। শতখানেক মাছুয়া। তার মাঝে গটেই লোক মিলবেনি যউ দেবী দরশন করিছে। মুই শুনিছ মোর বাপদাদার কাছে, তারা ভি শুনেছে তানকার বাপদাদার কাছে। খুবই পুন্যিবান না হিনে তার দেখা মিলিবে নাহি। আমরা নে মাছু ধরি, খাটি খাই, তর সাঙ্গে দেবীর গল্প করি পারবনি বাপু।

বিমান বাপের সামনে বিড়ি খায় না, তাই আঙুলগুলোকে শালপাতার মতো মুড়ে আলগোছে বিড়িটা নিয়ে হোগলার ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলে,

–গটেই দিন মোর সাঙ্গে মাছু ধরতে চাল। কপালে থাকনে দেবীর দেখা পাই যাবু। বলি পারমু নি? কালিয়া মাঈ হয়ত গোরা হি করি ঘুরি আইলা। গতরে ভি মাস লাগলা। বিয়া ভি হি গেলা। মাছ বাছাবাছি করি আর হাতে বাস লাগবেনি।

শুনতে শুনতে তমালীর গাল ফুলে ওঠে কৎবেলের মতো। কোন দুঃখে সে বিমানের সঙ্গে সারাদিন গাঙে কাটাবে! সে রোগা কালো, সে কুচ্ছিত, গ্রামে তার বয়সী সব মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও সে এখনও আইবুড়ো, এই নিয়ে গোটা গ্রাম, তার আত্মীয়স্বজন তাকে খোঁটা দেয়। দূর থেকে বলে, ঐ যে বুড়ি গরুটা যাচ্ছে। সবই সে জানে।

কিন্তু সে তো কখনও বলেনি তার বিয়ের খুব ইচ্ছে বা দেবীর কাছে সে বিয়ের বর মাঙবে। সে যেমন আছে তেমনই তার ভালো। মায়ের হাতে হাতে কাজকাম করা, পরের খেতে খাটা, শম্ভুকাকার বাড়ির দুটো গরুকে দুইয়ে কিছু বাড়তি পয়সা, কুড়োনো, কলমি শাকের আঁটি নিয়ে হাটের দিন বসা, ফুটো খড়ের ছাউনি, ছেঁড়া শাড়িতে সে যেমন আছে, আছে। তবু তাকে নিয়ে লোকের এত কথা কেন!

সাধের মধ্যে সাধ, বছরের এই ছ মাস সে শুধু গাঙের ধারেই রইতে চায়। লোনা জলের আর হাওয়ার গন্ধ তার যে কী ভালো লাগে! যেন আর জনমে সে গাঙের ভিতর লোনা জলের মাছ ছিল গো! আর ঐ দেবীমূর্তি। গাঙের গন্ধ নাকে গেলেই তার নয়নে ভেসে উঠবেন সোনার বরণ দেবী— তাঁর রূপ, সাঁতারের হরেক কেরামতি আর মাছুয়াদের জন্য গাঙের মতোই বিশাল মমতা! ঝোঁক ধরে তমালী প্রত্যেক বছর জেঠার সঙ্গে আসবেই। কষ্টকে কষ্ট মনে করে না সে। বামিয়াজঙ্গল গ্রাম থেকে হেঁটে চার পাঁচ কিলোমিটার বড় রাস্তা। সেখান থেকে ট্রেকারে কাঁথি, তারপর বাসযাত্রা। বাস থেকে যে জায়গাটা নামতে হবে তার নাম দড়িবাংলা। এই সিজনে অনেক রিকশার প্যাঁকোরপ্যাঁক শোনা যায় বাস থেকে নামতে না নামতেই। তার একটাতে চেপে বসলে সোজা পৌঁছে যাবে জলদাখটি। অনেকে কাঁথি থেকেই হোগলা পালা কিনে বাসের মাথায় চাপায়। দশ হাত জায়গার জন্য গুনে গুনে দুটি হাজার টাকা ইজারাদারকে দিয়ে তবে সেই পালা খাটাতে হয়। রিকশায় পায়ের কাছে ডাঁই করা থাকে বাড়ি থেকে আনা হাঁড়ি-কড়া।

তমালীর কাজ মাছ বাছা। ট্রলার কী নৌকো থেকে নামানোর সময় জাল ঝোলানো হয় লম্বা বাঁশের মাঝখানে, দুই সাজোয়ান মাছুয়ারা কাঁধে সেই বাঁশ নিয়ে কোমর গতর বেঁকিয়ে বালির ওপর জাল খালাস করে। সদ্য ধরা তাজা রুপোলি রঙের স্তূপ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে নানা জাতের মাছ, তখনও বেশিটাই জ্যান্ত। চেরা ল্যাজের ডগা বালির ওপর মৃদু মৃদু আছড়ায়, কেউ কানকো ফাঁক করে প্রাণপণে হাওয়া টানে। কেউ গাঙের গন্ধে গন্ধেই বুকে হেঁটে খানিকদূর যায়।

তমালী এই নানা জাতের মাছ বেছে আলাদা আলাদা স্তূপ করে। রাত দোপহর অব্দি হ্যাজাকের আলোয় মাছ বাছলে ৫০/১০০ টাকা। অনেক দূর দূর থেকে উড়ে আসা ডানাওয়ালা পোকামাকড় হ্যাজাকের গায়ে মাথা ঠোকে, মাছের স্তূপের ওপর খসে খসে পড়ে। তমালী ডানা ধরে যত্নে তাদেরও বেছে দূরে ছুড়ে ফেলে। বার বার হাত ঘসে নেয় বালির ওপর। বড় বান মাছ পেলে আলাদা করে চুপড়িতে রাখে। হলুদ লংকা দিয়ে মাখামাখা ঝোলের কথা ভাবে, রসা মতো রাখতে হবে। পাশে তাপরা মাছের স্তূপ থেকে চারটি মাছ চুপড়িতে ঢোকায়, এগুলি ভাজা খেতে ভাল। মাছের কাঁটা ফুঁড়ে হাত কেটে যায় জায়গায় জায়গায়, ভাতের পাতে বসে খুব যন্ত্রণা হয়। কিন্তু জলদাখটিতে তমালীর আসা চাই।

মাছ বাছা হয়ে গেলে সে রাত করে গা ধুতে যায়। না, গাঙে নয়, সে নোনা জলে মাথা ল্যাতর ল্যাতর চিটচিট করে। তাই খানিক দূরে স্থানীয় মাছমারাদের গ্রামে ঘোলা জলের পুকুরে সে স্নান সারতে যায়। সারা দিনমানের পর আঁধারে সাঁতরে এপার ওপার করতে ভারী ভালো লাগে তমালীর। কী ঠান্ডা এই জল! নিজের রোগা কালো হাত কানের পাশে ছুঁড়ে ছুঁড়ে সাঁতার কাটে সে, আর তার মনে ফিরে ফিরে আসেন গাঙের দেবী। তার চারদিক ঘিরে যেন ছোটাছুটি করে শাঁ শাঁ বাতাস, বড় বড় ঢেউ ওঠে, মাথায় তাদের সাদা সাদা গজর বা ফেনা। সেই ফেনার ফাঁকে কখনও ঝলসে ওঠে সোনা রঙের লম্বা হাত, ঢেউয়ে পিছলে যায় কার বিশাল বড় চক্ষু, জল ভেদ করে উঠে আসে গোল বড় সোনার নোলক পরা নাক। দেবীকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তমালী জল থেকে উঠে আসে, কাঁটাঝোপের আড়ালে সায়ার দড়ি দাঁতে চেপে ব্লাউজ পরে। শাড়িতে কুঁচি দেয়।

জেঠতুতো বোন ময়না ভাতের হাঁড়ি বসালে সেই আগুনেও অবিকল ঢেউয়ের ওঠানামা দেখতে পায় তমালী, ছিটকে ওঠা আগুনের কণা যেন জাল পালানো মাছের ঝাঁক। দেখতে দেখতে ঘুম জড়িয়ে আসে চোখে। বিমানের মুখের ভয়ে চোখ বড় বড় করে জেগে থাকার চেষ্টা করে তমালী, হাতের যন্ত্রণা টাটানো ক্ষতগুলো আগুনে সেঁকে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করে।

আজ সার সার নৌকা বেরিয়ে গেলে গাঙের এক কোণ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এল একফালি কালো মেঘ। তমালীর অলস চোখে তাকে মনে হচ্ছিল গ্রামের বাড়ির কালো বেড়ালটা। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলে যেমন গররর আওয়াজ উঠে আসে পেটের ভেতর থেকে, তেমনি গুর গুর আওয়াজে ছোট ছোট বিদ্যুতের টুকরো ছুঁড়তে থাকল সেই মেঘ। তবে তখন সেটা আর বেড়াল নেই, হয়ে গেছে মত্ত দামাল হাতি। তাও আবার একটা নয়, এক দল।

মাছমারাদের সঙ্গে মেয়েরা, যাদের মাছমারাদের জবানে বলা হয় মাইজি, তারা কখনও মাঝগাঙে যায় না। যদিও তমালীর খুব সাধ। বিমানের সঙ্গে না হলেও একদিন জেঠার নৌকায় লুকিয়ে চলে যাবার কথা ভাবে। বিরাট গাঙের আসল রূপটা যদি একবার দেখা যেত! বা দেবীর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত! কিন্তু মাছধরা নৌকাগুলি এত ছোট আর কোনও ছৈ বা আড়াল না থাকায় তার সে সাধ পূর্ণ হয়নি। ট্রলারে কেইই বা তাকে তুলতে যাচ্ছে। ঢুলু ঢুলু চোখে হোগলা ছাউনির দোরের সামনে বসে সে জেঠার নৌকা কদ্দুর গেল ভাবছিল, হঠাৎ আকাশে দলমার দাঁতালদের মাতামাতি দেখে সে ঘুমন্ত বোনকে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ডাকতে থাকে,

–ওই ময়না, অতবা কাঁথায় রহিতে তর ভালা লাগে? আকাশ বাটি চাহি দেখ্ যেমনি হাতিগুলান ঝগড়া লাগিছে।

সারাদিন সেই মেঘ ভেঙে বৃষ্টি হল সত্যিই হাতির শুঁড়ের মতো। ভাগ্যিস দুবোনে মিলে বালির গর্তে ঠাসা এপাশে দুটো, ওপাশে দুটো, চারটে আড়াআড়ি বাঁশের মাঝে খাটানো দড়ি থেকে সবগুলো শুঁটকি খুলতে পেরেছিল। নাহলে বিমানের জঘন্য মুখ শুনতে হত,

–দুই সাঁঝি অতগা করি ভাত খাও কাঁহি? সবু শুঁটকি ভিজি গেলা দেখি পাওনি!

যেন দুই সন্ধ্যা স্তূপীকৃত ভাত তারা দু বোনেই খালি পেটে ঢোকায়। আর বিমান চেয়ে বসে থাকে।

আজ আর সন্ধে করে নয়, শেলেটরঙা আকাশের নীচে শেলেটরঙা গাঙের বুকে দুপুর ফুরনোর আগেই দেখা যেতে লাগল কালো কালো ফুটকি। ঝড়জলে আজ আর বেশিদূর যেতে পারেনি নৌকার দল। জেঠার নৌকোও তার মধ্যে ছিল। ছোট ছুরিটাকে গাছকোমরে গুঁজে তমালী ময়না দুজনে হনহনিয়ে হাঁটা দিল মাছ বাছার জায়গায়।

মাছুয়ারা একের পর এক জাল উবুড় করছে, ইলিশের মতো দেখতে, সাইজে ছোট একধরনের মাছ প্রচুর পড়ছে বালির ওপর। ময়না বলে এগুলো নোনা ইলিশ। তার সঙ্গেই দেখতে না দেখতে মিশে গেল দাতনে মাছ বা কাঠ কৈ। একটা লালচে রঙের মাছ, ভুল হবে বোধহয় রূপচান্দা, সেও প্রচুর। মাছুয়ারা তাড়াতাড়ি ফিরেছে, কিন্তু মাছ সেই তুলনায় কম নয়। বরং বেশি। বাতাস জল আর মেঘ মিলে কী ষড়যন্ত্র করেছিল আজ, জাল ভর্তি মাছ উঠে এল! কাউকে জিজ্ঞাসা করবে বলেই যেন বালি থেকে চোখ তোলে তমালী, আর তার নজর আটকে যায় শম্ভুকাকার বড় ছেলেটার নজরের সঙ্গে। কী যেন নাম এটার, তমালী মনে করতে পারে না, গোবিন্দ না গোকুল। সারা বছর কাঁথিতে মহাজনের গদিতে থাকে, মাঝে মধ্যে গ্রামে ফেরে আর বৌটাকে বেদম মারে। গ্রামে খুব বদনাম আছে এটার নানা কারণে। সে এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তমালীকে দেখছে আর ফিচেল হাসছে। চোখাচুখি হতে গোবিন্দ না গোকুল বলে,

–আরে তুই মোদের গাই-দুহানি লাগিছে ত। এঠি কী করিছু?

তোর চোদ্দ গুষ্টির গাইগরুর দুধ-দোয়ানি, মনে মনে তমালী বলে।

ছেলেটার বিশাল মোটা শরীর আর ওল্টানো পুরু ঠোঁট দেখে তার ভ্যাদা মাছের কথা মনে হয়। ইচ্ছে হয় না ওর কথার উত্তর দেয়। তাও বুকের কাপড় ঠিক করে বিড়বিড় করে,

–দেখি পাও না, মাছু বাছিঠি।

সে ছেলের কানে সেকথা পৌঁছায় কী পৌঁছায় না কে জানে, তবে সে নড়ে না। বালির ওপর থ্যাবড়া মেরে বসে বিড়ি ধরায়। ভ্যালা আপদ। যতোবার চোখ তোলো, সে তোমার দিকে চেয়েই আছে। বার বার কাঁটার খোঁচা খেয়ে হাত ঝাঁকায় তমালী, আর বার বার তার কানে আসে খিক খিক হাসি। নিজের ওপরেই রাগ হয় তমালীর। আজ যেন সে একটু বেশিই খোঁচা খাচ্ছে। এইরকমই হয়। কেউ উঠতে বসতে নজর বিঁধিয়ে যদি বসে থাকে, রাগ রাগ মুখে হাত নাড়ালে, ঠ্যাং নাচালেও যদি দৃষ্টি না সরায়, তাহলে এইরকমই হয়। এই ছেলেটা আচমকা এল কোত্থেকে! এ কি গাঙে যায় ট্রলারে, নাকি মহাজনের হয়ে টাকা তোলে! দ্যাখেনি তো কখনও আগে।

তারপর এক সময় মাছুয়ারা সবাই গাং থেকে ফিরে আসে। তাদের নিজেদের মধ্যে টুকরো টুকরো কথায় ভেসে আসে ঝড়বৃষ্টির কথা, দমচাপা বাতাসে জালে প্রচুর মাছ ওঠার কথা। যেন গাং অন্নপূর্ণা আজ স্বয়ং মাছ ধরার তদারকি করছিলেন। এইসব কথাবার্তার মাঝে তমালীর সামনের বালিতে মাছের উপর মাছ পড়তে থাকে। আর কাজের বিপুল চাপে সে একেবারেই ভুলে যায় দূরে বসা গোবিন্দ না গোকুলের কথা।

এই যে এত লোক গাঙে লোনা মেখে ফিরে এল এই ঝড়বাদলার দিনে, নৌকা ডাঙায় ওঠাতে গিয়ে দাঁতে অব্দি কিচকিচ করছে বালি, এরা জলদাখটির সবগুলো পুকুর দাপাবে এবার। সন্ধে পেরিয়ে রাত আটটা বেজে যাবে সে দাপাদাপি শেষ হতে। তারপর সুযোগ পাবে মাছবাছুনি মেয়েরা। তমালী এই ভিড় এড়াতে কাঁটা ঝোপে ঘেরা সবচেয়ে দূরের পুকুরটিতে যায়, লোক কম থাকে, আবার ঝোপঝাড় আব্রু রক্ষার কাজে সাহায্য করে।  আজ মাছের পাহাড় সে যখন প্লাস্টিকের ঝুড়িগুলিতে গুছিয়ে তুলতে পারল, তখন বোধহয় বেবাক লোকের স্নান সারা হয়ে গেছে। ময়না হোগলা ছাউনির বাইরে এসে চুল ঝাড়ছিল, তমালীকে দেখে অবাক হয়ে বলল,

–অতগা আন্ধারে যাইবু, দিদি?

তার কথার উত্তর না দিয়ে গামছাটা দড়ি থেকে নেয় তমালী, সঙ্গে শুকনো শাড়ি জামা সায়া। তারপর হনহনিয়ে ছোটে পুকুরঘাটের দিকে। যেতে যেতে বাঁ হাতের খাবলার নারকেল তেল ঘষে চাঁদির ওপরে। যদিও চুল তার যেমন কালো, তেমন ঘন, তবুও তেলের একটি ফোঁটা গড়িয়ে আসে নাকের দিকে। আঙুলে চেঁছে তুলতে গিয়ে সদ্য ঘাঁটা মাছের স্তূপের আঁশটে গন্ধ পায় সে।

জামাকাপড় গামছা সব কাঁটাঝোপের ওপর রেখে আঁচল কোমরে পেঁচায় তমালী। মেঘ কেটে গিয়ে এখন গোল চাঁদ উঠেছে। গড়ানো তেলের ফোঁটার মতো আলো গড়িয়ে গড়িয়ে চকচকে করে তুলছে ঝোপঝাড়, একটু দূরের নারকেল গাছগুলিকে। ঝিঁঝিঁর ডাক ছাপিয়ে কানে আসছে গাঙের গর্জন। যেন প্রবল দুঃখের কথা কেউ ঘুমের মধ্যে বলতে চাইছে, কিন্তু বোবায় ধরা মানুষটি দুর্বোধ্য আঁউ আঁউ ধ্বনিতে ভরিয়ে দিচ্ছে চরাচর।

জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে তমালি। ডাটনে মাছের মতোই জলের ভেতর অনেক দূরে ঢুকে যায় সে, তারপর উঠে আসে ওপরে, হাঁ করে মাথা জাগিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে জল ঝাড়ে, দুহাতে রগড়ে নেয় চোখমুখ। তারপর শুরু হয় গোটা পুকুর জুড়ে তার অবাধ সঞ্চরণ। কখনও ঘাটলায়, কখনও মাঝপুকুরে সাঁতরে বেড়ায় তমালী, তার লম্বা চুল খুলে যায় আর কচুরিপানার ঝাঁকের মতো তার পেছন পেছনই সাঁতরায় সারা পুকুর জুড়ে। নিজেকে তার মনে হয় সাক্ষাৎ গাং-অন্নপূর্ণা। জ্যোৎস্নায় নিজের হাতগুলোকে সোনালি লাগতে থাকে, চোখ যেন বড় হতে হতে কান অব্দি চলে যায়। চিৎসাঁতারের সময় নিজের বুকদুটোর তাকিয়ে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায় তমালী। ঠিক যেন দুটো ভেজা পদ্মকুঁড়ি জলের ওপর জেগে রয়েছে। তমালীর গা থেকে সমস্ত আঁশগন্ধ উবে যায়। গাঙের অন্নপূর্ণা ভর করায় নিজের দেবীত্ব, নিজের সৌন্দর্যে সে নিজেই মোহিত হয়ে যায়। এতখানি বয়স অব্দি গায়ের রঙের কারণে সে আইবুড়ো, কেউ তাকে ভালোবাসেনি কখনও, এমনকি  কাছে ডেকে দুটো মিষ্টি কথা বলার লোক নেই বুড়ি মা ছাড়া, এসব বেবাকই সে ভুলে মেরে দেয়।

শুধু এই বিভোর হয়ে থেকে সে লক্ষ করতে ভুলে যায়, ঘাটলার কাছের কাঁটাঝোপ একবার নড়ে উঠেই স্থির হয়ে গেল। একটি স্থূল পুরুষশরীর সেখানে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল কখন শেষ হবে বিরাট মেয়েমাছটির পুকুরজোড়া দাপাদাপি। তাদের ঘরের গরীব কুচ্ছিত দুধদোয়ানি কী করে জোছনায় এত সুন্দর, এত মনকাঁপানো হয়ে উঠল তা সে কিছুতেই বুঝতে পারে না। চাঁদের আলোয় তার চোখ চকচক করতে থাকে। হঠাত কেউ দেখলে ভাববে বিশাল এক ভোঁদড় সামনের থাবায় মুখ রেখে জিভ চাটছে।

যে কুয়াশার পরত চিৎসাঁতার দেওয়া দেবীর লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে বলে শোনা যায় মাছুয়াদের মুখে, সেদিন সেই কুয়াশাও চাঁদের আলোয় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে যায়। ফলে আরও উজ্জ্বল হয় চারিধার, আরও পরিষ্কার হয়ে কানে আসে বোবায় পাওয়া গাঙের স্বপ্নস্বর। সেই ফুটফুটে আলোয় সারা পুকুর জুড়ে অনন্ত স্নানে ব্যস্ত থাকে গাং অন্নপূর্ণা। লম্বা সোনার হাতে জল ছিটকে আকাশে ওঠে, মনে হয় সে যেন কারও জালে মাছের ঢের  ছুঁড়ে দিচ্ছে অনায়াসে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2763 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. ইশশ – কেমন যেন হয়ে যাই এই গল্পগুলো পড়লে। আর ভীষণ হিংসে পাই তোমাকে দিদি

আপনার মতামত...