মারাদোনা মারাদোনা …

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 


লেখক গদ্যকার ও কবি

 

 

 

এক একদিন এমন হয়। সন্ধের পর রাত আসে। অন্য একটা দেশে তখন সন্ধ্যা। আলো আঁধারি লাতিন আমেরিকান শহর। একটা লোক ডিভানে বসে বসে হঠাৎ করে বুকে হাত দেয়। অনেক দূরে কলকাতা শহরের লোকজনেরা খবর পায়। ভাবে ফেক নিউজ। মানে অন্য কিছু। চোখ মিলিয়ে নেয়। খবর মেলায়। এই চ্যানেল ওই চ্যানেল। তারপর বাস্তবে আসে। একটা ঠান্ডা স্রোত নামতে দেখে মেরুদণ্ড বরাবর। স্থাণু হয়ে থাকে। স্মৃতি। মেমরি লেন। স্রোতের সঙ্গে প্যারালালি নামে। সিনেমা প্যারাডাইসো। রিলগুলো জোড়া দেয়। কিছু লাগে, কিছু লাগে না। ল্যান্ডলাইন টেলিফোন নেই। কী করে পাওয়া যাবে সেসব? কুলুঙ্গি, মশারি, কাঁসার থালা, দেওয়ালে তেলের দাগ, নাইন্টিয়ানা আর গ্যালারিতে সাদা কালোর টিভির সাদা-নীল। কৈশোরের ইংরেজি নাম। ‘ম্যারাডোনা’…

Beyond everything else, no ball ever had a better experience than when it was at his left foot.
–Jorge Valdano

বেটার এক্সপেরিয়েন্স। একটা নাইন্টিজ, একটা শহরতলি, একটা ফুটবল পাড়া, একটা বনেদিয়ানা। সামনের রোয়াকটার ভেতরে পাড়ার কারও ঢুকিয়ে দেওয়া একটা বোমায় ফেটে একটা আধা খাপছাড়া লাতিন আমেরিকান টিমের মতো পড়ে থাকা। তবু, ওতেই বসতে হবে। কারণ রাস্তা দেখার, শহর চেনার আর কোনও উপায় নেই। ছাদ থেকে মুখ বোঝা যেত না যে। দাদু একটা সময়ে বসত। তারপর দুদুটো স্ট্রোকের পর পারল না খুব বেশি। ঠাকুমা বাকিটা সময়ে। রোয়াক-জাহাজের কোচ। যেন গ্যালারি থেকে কথা, নির্দেশ। আমাদের মেনোত্তির মতো। বিলার্দোর মতো। আর তিরাশির কপিল দেব না দেখা, ছিয়াশিকে সরাসরি টিভি না দেখা, কৃশানুর শুরুটা না দেখা আমি, আমরা বিরাশির লাল কার্ডের মতো অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিলাম। তফাত একটাই, আমরা বুঝতেই পারিনি কার্ডটা কেন? ফাউলটা কখন করেছিলাম, কাকে? অবশ্য জ্ঞানটুকু হওয়ার পর থেকে ওই চার অক্ষরের উচ্চারণটা শুনেছি। কেমন ছান্দিক। রিদমিক। সুরেলা ছিল কেমন। যেন ম্যারাডোনা ডাকলেই বন্ধুরা এর ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গোলপোস্টের কাছে এসে মিশত। দেখা হত। বা দুটো ইট। উইকেট। ব্যাট। কোন খেলা বড় কথা না। বড় কথা ওই মেলাটা। ডাকটা। ওই নামটা সব মিলিয়ে দিত। ‘বিয়ন্ড এভরিথিং এলস’ …

If anyone inspired me, it was undoubtedly (Maradona)
–Lionel Messi

বই বলতে শুকতারা। গল্পদাদু, বিলির বুট, হাঁদার চুলের সামনের দিকটা আর গা ছমছমে কিছু ভূত। ছোটকাকা বুকের উপর ছুড়ে দেওয়ার পর মা, লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, হলুদ আলো, লাল মেঝে আর ক্যাঁচক্যাঁচ খাট পেরিয়ে আমার একার পৃথিবী। সামনে গোল। আমার ছোটকাকার নাম মাঝমাঠ থেকে পাস দেওয়া টিমমেট হেক্টর এনরিক। মা, মেঝে, সিঁড়ি, খাট যেন এক একজন পিটার বার্ডসলি, পিটার রেইড, টেরি বুচার, টেরি ফেনউইক। আর পাতার গন্ধ নিয়ে ভেতরে ঢোকার মুহূর্তটুকুর নাম শিলটন। পিটার শিলটন। এগুলো জোর করে বলছি না। আসলে সবকিছুর মধ্যে মারাদোনা ছিল। জনি সোকোর রোবটটার অমন করে হাত ঘোরানো, আগুন বের করা আর্জেন্টিনার অনুশীলনগুলো মনে করাত। মনে করাত বল নিয়ে এক পা দু পা, পৃথুল অথচ যাদুকরী উরুর উপর দিয়ে সাপের মতো বলের শরীরী চলাফেরা, তারপর হঠাৎ একটা আগুনে শট। জনি সোকো রোজ সাড়ে সাতটায় আসত। মারাদোনা, কেবল টেবল না থাকা সাদা কালো টিভিটায়, মাঝে মাঝে। উঠোনের লোহার ঘোরানো সিঁড়িটা দিয়ে নামতাম। পায়ের নিচে মানুষ গলে যাওয়ার মতো অনেকটা জায়গা। ব্রিটিশ ডিফেন্ডারের চোখ। একবার বাঁদিকে, একবার ডানদিকে, তারপর আবার বাঁয়ে ঘুরে নামতাম। ওই হাত দিয়ে বাজে গোলটার ঠিক আগে লোকটা যেভাবে চারজনকে কাটাল, সেরকম। লোকে গোলটা বলে। হাতটার কথা বলে। ওই কেটে বেরিয়ে যাওয়াটার কথা বলে না। ওটাই আসল। ওটাই অনেক। আমাদের যদি কেউ বড় করে, ইন্সপায়ার করে, তাহলে সংশয়াতীতভাবে একজনই। ‘ইট অয়াজ আনডাউটেডলি’ …

Did he scared defenders? He scared absolutely everybody! You couldn’t play against him.
–John Barnes

ভয় পেতাম। সন্ধেবেলার অঙ্ক। দাদুর সুন্দর, প্রশান্ত মুখে ভুল খোঁজার বলিরেখা। অনেকগুলো খারাপ খারাপ কথা শিখেছিলাম। বে-লাগাম প্রয়োগ। সবেমাত্র তৈরি হওয়া যৌনতাবোধ। না বলতে পারা আস্বাদ। এইসব পেরিয়ে, অনেক অনেকটা পরে বুলগেরিয়া ম্যাচ। সেদিন কেন খেলেনি লোকটা? এফিড্রিন কী? জোর করে ফাঁসিয়েছে। হতেই পারে না, যাহ্‌। তারপর সবকিছু মেনে নেওয়ার বয়সটা আসতে এইসব আবেগ কিছুটা বড় হয়েছিল। যৌনতাবোধ লুকোনো কিছু ম্যাগাজিন পেয়ে, খোলা মাঠের মতো জায়গা পেয়ে একটু যেন শান্ত, জড়োসড়ো, অতটা উদ্দাম না। ভাষাগুলো লাগাম পেয়েছিল। পরীক্ষার নম্বর, অভ্যেসমতো কমতে কমতে একটা সময়ে আশার আলোগুলো অল্প অল্প নিভে যেতে থাকল। স্ট্রোকের আগে অবধি দাদুর মুখ তখন অনেকটা ক্লান্ত। তবু মর্বিড কিছু সন্ধে, লোডশেডিং, বাবার বদলির চাকরির সংশয়ের মধ্যে মারাদোনা আবার প্লট টুইস্ট করে খেলতে নামল চুরানব্বইয়ে। আমার ভয় করল। এই শেষ না তো? ফুটবল, যৌথতা— সবকিছুর? রোমানিয়া ম্যাচ দেখিনি। তবে ছোটবেলা থেকে বনেদিয়ানা থেকে নব্বইয়ের শেষদিকে এক এক করে ছিটকে যাওয়াকে আমি জনান্তিকে নাম দিয়েছিলাম বুলগেরিয়া, রোমানিয়া। আর দুঃখগুলো, হিংসেগুলো, কষ্টগুলোর নাম স্টোইচকভ, হাজি, লোথার ম্যাথেউজ। সেই ‘ম্যারাডোনা’। ‘হি স্কেয়ার্ড এভরিবডি’ …

As you saw in the World Cup quarter-final in 1986, I just couldn’t get near him – all I ever saw was his number 10!
–Terry Butcher

When Diego scored that second goal against us, I felt like applauding. I’d never felt like that before, but it’s true … and not just because it was such an important game. It was impossible to score such a beautiful goal.
–Gary Linekar

বিষয়টাকে অনেকটা এভাবে দেখা যায়। ওই সময়গুলো, বাড়িগুলো, দেওয়ালগুলো ঠিক এমন না যে হারিয়ে গেছে বলে ভালো ছিল, ওগুলো এমনিই ভালো ছিল। যখন ছিলাম, যখন কোনওকিছু হারায়নি, হারানোর ভয় পাইনি, তখনও ভালো ছিল। আর ভালোর সিনোনিম ১০। ওই দশ নম্বর থেকে বেরোনো মুশকিল। ঠাকুমার সংস্কারী মন জপের মালা বুনত। হাতের কর গুনত। বনেদিয়ানায় পুজো আর্চা লেগেই থাকত। লৌকিকতার বীজ আমার ভেতর কতটা কী পুঁতেছিল জানি না, তবে আমি ওই দশ নম্বরী হয়েই ওপরের কারওর দিকে তাকিয়ে হাত তুলে বলতাম কিছু। বুকে ক্রস আঁকতাম। ধর্মীয় সীমান্ত পেরোতাম। ঈশ্বর-বিশ্বাস শুরুতে অনেকটা ওইভাবে আসে। চলে যায় এমনিই। যেন ঈশ্বর খেলতেন, ছিলেন, বিশ্বাস করতাম। এখন খেলেন না, চলে গেছেন, তাই করি না। মাঝের মারগুলো, চোরাগোপ্তা লাথিগুলো, ব্যথায় কাতরে উঠে ছিটকে পড়াগুলো কোল্যাটেরাল ড্যামেজ। তাকে তুমি পরিজন বা বন্ধুমৃত্যু ডাকতে পারো, ডাকতে পারো ইস্কুল বদল, অথবা বনেদিয়ানা থেকে একদম একা একঘরে স্থানান্তরণ। যাকে বড়রা ট্রান্সফার বলে। আমরা বলি ফাউল। আনফেয়ার প্লে। যতদিন ফুটবল থাকবে, চলবে। তোমাকে, ওই দশ নম্বরের লোকটার মতো উঠে, কখনও আধশোয়া হয়ে ওই অবস্থাতেই পাস বাড়াতে হবে। যতক্ষণ না একটা অবিশ্বাস্য মুভ। একটা ইমপসিবল গোল। একটা ‘নেভার ফেল্ট লাইক দ্যাট বিফোর’ …

He was the brother of my soul
–Claudio Cannigia

আত্মার ভেতর একটা লোক। আসলে অনেকগুলো লোক। আজহারউদ্দিনের গ্ল্যান্স, কাম্বলির স্কোয়ার কাট, শচীনের একা সামলানো নকল বুঁদিগড়, মনিকার পিঠ, বরিস বেকারের গোলাপি রং, স্টেফির চিৎকার— এইসব ছুঁয়েও সবকিছুর উপরে থেকে যাওয়া ফুটবল। ভালোবাসা। যাকে তুমি স্থানীয়ভাবে কৃশানু-বিকাশ, শেষ বয়সের সুব্রত, সবেমাত্র ওঠা চিমা-বাইচুং-বিজয়ন যে নামেই ডাকো, একটা সময়ে ডিসলভ করে সবকিছুই দশ নম্বর হয়ে যাবে। আমাদের সাদা কালো টিভিতে মাঠের রং দেখা যাবে না। মনে হবে ওটা বেশি কালো, ওটা কম কালো। আর কম বেশি কালোর আয়তাকার ওইসব দাবার বোর্ডের মতো মাঠে আমরা ঘোড়া হয়ে আড়াই কদম এগোতে চাইব। মাসের মাইনেটুকু ঠিক সময়ে পেতে চাইব। চাইব কার্ফু হলেও শেষমেশ বাড়ির লোকগুলো তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক। লোডশেডিং কমুক। ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ে নির্বিঘ্নে কাটুক। আমরা সন্ধ্যেবেলা, সারা দিনের সন্ধেবেলা, জীবনের সন্ধ্যেবেলা একটা রোয়াকে বসে যেন বলতে পারি, আঃ স্বপ্ন। সেইসব স্বপ্নগুলো, ইচ্ছেগুলোই যেন মারাদোনা হয়ে অনেকগুলো বছর বেঁচে ছিল। তারপর একটা সময়ে আকাশে দেখা হয়ে গেল সবার। মনে হয় দাদু এখনও ওখানে সুস্বাস্থ্য দেখার ফাঁকে খটখট করে শব্দ করে চ্যানেল পাল্টে পুরনো সাদা কালো টিভির ফুটবল ক্লিপিং দেখছে। ঠাকুমার চিত্রহার, রোববারের বইয়ের ফাঁকে আড়ালে সলিলোকি, ‘বাঃ বেশ দেখতে রে ছেলেটাকে, কোঁকড়ানো চুল, একমাথা’। এই দুজনের মাঝে, আদরে আবদারে খেলতে খেলতে আমার নায়ক, আমার হিরো, আমার আত্মার দোসর, ‘ব্রাদার অফ মাই সোল’, কাটাচ্ছে তো কাটাচ্ছেই …

One day I hope we can play ball together in the sky.
– Pele

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2955 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...