ঝিমন সর্দার বাপের ব্যাটা

ঝিমন সর্দার বাপের ব্যাটা -- সঞ্জীব দেবলস্কর

সঞ্জীব দেবলস্কর

 

“সর্দারের ব্যাটা হলেই যে সর্দার হোতে হোবে ইমন কুন বান্ধাধরা কানুন তো লাই। হামার বাপ সর্দারি করত বটেক, কিন্তু এখুন তো লাই করে। তো তুরা হামকে সর্দার বলছিস ক্যানে? হামি তো সিরেফ ঝিমন।” গোড়াতে ঝিমন এসব কথা বলত তার ছোটবেলার স্যাঙাতদের। কিন্তু কে শুনে কার বাত! খাতা-কলম নিয়ে ইশকুল যাওয়া ঝিমনকে স্কুলছুটরা বলত “ঝিমন সর্দার বাপের ব্যাটা।” ঝিমন এসব গায়ে মাখত না। মনে মনে বলত ‘তুদের সর্দারির নিকুচি করি! হামার যেন আর কুন কাম নাই কে!” তার চোখে তখন অন্য স্বপ্ন। হ্যাঁ, তার বাপ তো সর্দার বটে, তার বাপের বাপও নাকি সর্দার ছিল। তবে নামে সর্দার হলেও ঝিমনের বাপের ছিল অন্য ধান্দা। গোড়াতে লোকটি ছিল ফকিরটিলার সর্দার, সঙ্গে কিছু কবরেজিও ছিল। ক্রমে ওদিকের পাল্লা ভারী হয়ে গেল। এখন সারা দিনমান তার এন্দার-পেন্দার। দুটো বারান্দাতে মানুষ বসে আছে তো বসেই আছে— “লে হালুয়া! তুমহার আবার কী হল?”

“লাই বাপ, হামার বিটির সাদি সাব্যস্ত হল। তু বাপ হামকে এট্টা তাবিজ দিবি, উ লেড়কা হামার লিজের লেড়কা হয়ে থাকবেক।”

কারও ঘরে চুরি হয়ে যাচ্ছে সব কিছু, কারও পেরেম পিরিতের লটঘট, কারও বা মা শিত্‌লার লজর, কারও চোখে আন্ধিয়ার— ইত্যাকার হাজারটা ঝামেলা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব ঝিমনের বাপের। কী করে যে সব কুচু সামাল দেবে সে বুঝতে পারে না। ইদিকে কোবরেজি হাঙ্গামা বাড়তে থাকলে বুটাই সর্দার খোদ সাহাবকেই বলল— “সাব, হামকে তু পেন্সিল দে কেনে।” তো কী জানি কী মর্জি হল আংরেজ সাহেবের। বলল, “যা তু তোর ঘরকে। হপ্তায় রেশন লিয়ে যাবি, ওই তুর ঔরৎকে পাঠাবি মেমসাহেবের ওখানে দুপুরবেলা। কুন কাম লাই, সিরেফ সঙ্গে থাকবেক। ঔর তুর লেড়কা পড়হেকে না যায়?”

সেই থেকেই ঝিমনের বাপ বুটাই সর্দার ফুলটাইম ওঝা। ব্যাটা তার এখন সদরে যায় পড়া করতে। সাঁঝের বেলা আবার পান্ডেজি সঙ্গে তার তুলসীদাসি রামায়ণ— জয় সিয়াবর রামচন্দ্র কি জয়, পবনপুত হনুমান কি জয়।

এই ঝিমন, মানে সর্দারের ব্যাটা যে একদিন বাপ কি ব্যাটা বা তার চাইতেও বড় একজন কেউকেটা হবে তা বাগিচার সবাই জানত। ছেলেটা ইশকুল পাশ দিয়ে সিলেটের এমসি কলেজে পড়তে গেলে কুলি রমণীর প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আংরেজ মানিজর সাহাব ওর সমস্ত খরচা নিজের উপর লিয়ে লিল। বিলিতি সাব বুলে কথা।

আলি আমজাদের ঘড়ি, আজাদ আলির দাড়ি আর চাঁদনিঘাটের সিঁড়ি যে শহরে প্রসিদ্ধ, সেখানে বিলাসিতা আর সাহেবিয়ানায় উৎসন্নে যাওয়ার কিংবা স্বদেশিয়ানায় আর কমিউনিস্টবানায় বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, সেখানে ঝিমন, মানে সর্দারের ব্যাটা, এখন যার পোশাকি নাম অবধেশ শর্মা, সে নিবিষ্টচিত্তে পাঠ নিচ্ছে সংস্কৃত-পণ্ডিতের কাছে, কীর্তন শুনছে মহাপ্রভুর আখড়ায়, পীর শাহজালালের দরগায় যাচ্ছে সুফি সাধকের দর্শন কামনায়। দিনের বেলা কলেজের অধ্যাপকদের প্রিয় পাত্র অবধেশ শর্মার মধ্যে ফকিরটিলার দেই ঝিমন ব্যাটাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কলেজে বাংলা ও সংস্কৃত ভাষাসাহিত্যের অধ্যাপক এস এন চক্রবর্তী প্রাচ্যবিদ্যাবাচস্পতি মহাশয়, ইংরেজির অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী, দিগিন দত্ত তাকে খুবই স্নেহের চোখে দেখেন। ইতিহাসের মুনিম চৌধুরী তাকে নিয়ে গেলেন অসম থেকে আসা নতুন যুবক অধ্যাপক হেরম্বকান্ত বড়পূজারির কাছে। সিলেটে গৌহাটি, ডিব্রুগড়, শিলচর সবই অসম। ওরা ভুলেই যেতেন সিলেটও যে অসম। তবে ওই অসমিয়া স্যারের কাছেই অবধেশ শুনেছে ইতিহাস মানে কেবল হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো, কিংবা পানিপথের যুদ্ধ, দিল্লি-লাহোর, মুঘল-পাঠান আর পলাশীর প্রান্তরই নয়, “ইতিহাস তোমার ঘরের কাছেই আছে। এমনকি তোমার কাছাড়েও ইতিহাস আছে।” পণ্ডিত বিদ্যাবিনোদ, অচ্যুৎ তত্ত্বনিধি আর উপেন গুহর নামও এ স্যারের মুখে শুনেছে অবধেশ। আরও চমকিত হয়েছে নিধনপুর তাম্রফলক, কামরূপরাজ ভাস্কর বর্মনের প্রপিতামহর সিলেটে ভূমিদানের কথা শুনে। ইতিমধ্যে অবধেশ তার নিষ্ঠায় আর অমায়িক ব্যবহারে কলেজের একজন কেউকেটা হয়েই গেছে। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ধুতিপাঞ্জাবি পরিহিত সুপুরুষ অবধেশ শর্মার উপস্থিতি অবধারিত। বন্ধুরা তার সুর করে তুলসিদাসী রামায়ণ পাঠ, আর তৎসম শব্দে ঠাসা বাংলা ভাষ্য শুনে তার নামই দিয়ে দিল তুলসিদাস। সেয়ানারা বলে—

ইয়েমেনের শাহজালাল, ঢাকাদক্ষিণের নিমাই,
সুনামগঞ্জের হাসনরাজা আর কাছাড় জিলার তুলসিদাস
এ নিয়েই সিলেট খাস।

এরপর সুরমা-বরাকের ওপর দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেল। একদিকে স্বদেশি আন্দোলন, ইংরেজ বিতাড়ন, হিন্দু-মুসলিম সংঘাত, সাহেবদের দেশত্যাগ— হাজারটা ঘটনার আকস্মিকতায় সমস্ত কিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেল। অবধেশ শর্মাকেও বিএ পাশ না দিয়েই ফিরে আসতে হল কাছাড় জিলায়। ইতিমধ্যে তার বাপও বিগত। দয়ালু উইলিয়াম সাহেবও দেশে ফিরে গেছে। দিনকাল সব কেমন কেমন হয়ে গেল। কোথাও আর আগের মতো শান্তি নাই। বাগানে অবধেশকে ঝিমন বলে ডাকারও লোক নাই। শর্মাজি বিএ সার্টিফিকেট আনতে লাই পারলেও সিলেটিদের দেওয়া খেতাবটি তার আগমনের পূর্বেই কাছাড়ে পৌঁছে গেছে— ‘তুলসিদাসজি’।

এত দারুণের দিনেও মানুষ তুলসিদাসের রসে আকুল। সাঁঝের বেলা এখানে-ওখানে প্রায়ই যেতে হয়। ওদিকে অরুণাবন্দে পুলিশের হাঙ্গামা, দেওয়ানেও কানাঘুষা, বড়খলায় কমিনিস্টদের মিটিং, পুলিশের গুলি, এখানে-ওখানে জনসভা, মিছিল, চারিদিকে হাহাকার— কেবল নাই নাই, কেরোসিন নাই, চাল নাই, এমনকি পেহেনবার কাপড় ভি রেশনে লিতে হোবে। তবুও এর মাঝে সন্ধেবেলা এখানে-ওখানে শোনা যায়—

মঙ্গলভওন অমঙ্গলহারী
দ্রবহু সু দশরথ অজিরবিহারি।।

তবে এমনি করে তো আর দিন যাবে না। তুলসিদাসজিকেও স্থায়ী জীবিকার সন্ধানে ঘুরতে হয়। অবশেষে মিলেও গেল এক হেডমাস্টারের চাকরি। সেই হাইলাকান্দি, আলেকজান্ডারপুর পেরিয়ে গভীর জঙ্গলের ধারে শুকনা বস্তি। ওখানে কুলি কামিন, হিন্দু, মুসলমান ছেলেপুলের জন্য ইশকুল হবেক। –“শর্মাজি, আপনাকেই সব কিছু বানাতে হবেক। হামদের ঘরের লাউ কুমড়া চাল সবজি সব দিব। তাকবার ঠাঁই ভি দিব বানায়ে…”

জঙ্গলের ইকড়, ছন, বাঁশ কেটে তৈরি হল ইশকুলবাড়ি, পণ্ডিত স্যারের কোয়ার্টার। সদরের এসআই স্যার রাঘব ভট পাঠালেন আশীর্বাদ। আউর তাজ্জব কি বাত, সাইকেল মেরে ওই ছোট্টখাট্টো ব্যক্তিটি শুকনাবস্তি পৌঁছে গেলেন ওই দিন যেদিন হামদের সর্দারের ব্যাটা ঝিমন, সিলেটের অবধেশ শর্মা, সম্প্রতি তুলসিদাস পণ্ডিতজি ইশকুলঘরের প্রবেশ পথে নারকেল ভেঙে পড়াশুনার শুরুয়াত করে দিলেন। শিলচর থেকে আসা রাঘব ভট পাক্কা এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে সেই বাউরি, ভৌমিজ, তাঁতি, ইসলাম, কৈরি, সাও, নমশূদ্র ছেলেবুড়োদের সামনে দিলেন লেকচার। নীরবে সবাই শুনল গান্ধি মহারাজজির বাত, গুরদেব রবীন্দ্রনাথের কবিতা, আরও কত কী সব! সভা সমাপনান্তে সবাই মৌনতার ভাষায় জানিয়ে দিল এ ইশকুল চলছে চলবে।

… এই কাহিনিকে একেবারে কল্পনার ছোঁয়া না লাগিয়ে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু যে এর মূল কথক সেই অধ্যাপককে তো বোঝাতে হবে, এ লেখক একেবারে সাদা মিথ্যার বেসাতি করে না, তাই পরবর্তী পর্বটি সম্মানজনকভাবে সংক্ষিপ্ত করে নিতে হচ্ছে। সুতরাং কিছুটা দিন এগিয়েই আসা যাক…

ততদিনে তুলসিদাসজির স্কুল একেবারে ফুল-ফ্লেজেড এমই হয়ে গেছে। অবশ্য পণ্ডিতজি এখন আর শুকনাবস্তিতে নেই, মহাকুমা সদরে সরকারি হাইস্কুলের পণ্ডিত। গৌহাটি থেকে বিএ পাশ করে এখন বাংলায় এমএ করার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সংসার একটা করলেও ধ্যানজ্ঞান তো পুঁথিপত্র, শাস্ত্র আলোচনা আর তুলসিদাসী রামায়ণ ভাষ্যে। আর সংসার কী করেই বা হবে তাঁর, সংসার যে কী কণ্টকময় তা তো তিনি পদে পদে বুঝছেন। তবে এ হল তাঁর একান্ত পেরাইভেট ব্যাপার, এখানে এসব কেচ্ছা বলে আমাদের কী কাম! মাঝেমাঝে মানুষটি কেমন উন্মনা হয়ে যান। পারিবারিক কারণে মানুষ এরকম উদ্ভ্রান্ত হয় এ তো সবারই জানা। তখন কোথা থেকে কোথায় চলে যান কেউ হদিস পায় না। তাঁকে দেখা যায় ধলেশ্বরী পেরিয়ে সেই পাঁচপীরের মোকামে, কখনও বারইগ্রামের গোঁসাইয়ের পদতলে, কখনও বা বড়খলায় যতীবাবু জমিদারের কাছে। শাস্ত্রালোচনা, শাক্ত বৈষ্ণব পদাবলির রসে মজে কেঁদেকুটে একশেষ অবধেশ আবার ফিরেও আসেন নতুন উদ্যমে। এরকম সময়েই সাক্ষাৎ পেলেন সিলেটি পণ্ডিত যতীন ভটের। পড়াশোনা পুথিপত্র ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছু আছে তিনি যেন জানেন না। কটন কলেজ ছেড়ে পৌঁছে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অবধেশের মধ্যে পেয়েছেন এক সুযোগ্য অনুগামী। তাঁকে তিনি নিরন্তর অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছেন। গ্রাম কাছাড়ের এখানে-ওখানে পাঠাচ্ছেন লোকপ্রবাদ, লোককথা, হস্তলিখিত পুথির সন্ধানে। কোথায় রয়েছে কাছারি রাজার তর্পণের তালিকা, হেরম্বদণ্ডবিধির হারিয়ে যাওয়া ছেঁড়া পাতা, সিলেটি নাগরি লিপিতে ইউসুফ-জুলেখা, হালতুন্নবির পুথি, দশভূজার পূজাবিধি! ওদিকে আবার বছর দুই ঘুরতে না ঘুরতেই ভাইস-চ্যান্সেলর খোদ টেলর সাহেবের স্বাক্ষর সম্বলিত এমএ কনভোকেশন সার্টিফিকেট হাতে অবধেশ শর্মা এখন স্থায়ী হেডমাস্টার।

গল্পটা যদি এখানেই শেষ হত, তবে এত কথা বলার প্রয়োজনই ছিল না। তাই একটু এগিয়ে যেতে হচ্ছে। অবধেশ শর্মা ওরফে সর্দারের ব্যাটা ঝিমনের এখনকার সমস্যা হল ওই তাঁর বাপকে নিয়েই। ই কি তাজ্জব কি বাত— বাপ তো তাঁর কবেই মরে গিয়ে হেজে গেছে। কিন্তু হায়, মরে গেলেই তো মানুষের মৃত্যু হয় না। আত্মা যেমন ন হন্যতে হন্যমান শরীরে, তেমনি জীবনের কর্মও তো অঙ্গারের মতো— শত ধৌতেন মলিনত্বং ন মুঞ্চতে। আর সে কর্মটি যদি হয় জাদুটোনা, মারণ, বশীকরণ, উচাটন, বাটিচালান, জিবকড়া, জলপড়া, কোবরেজি ইত্যাদি সুকর্ম এবং কুকর্মের সমাহার, তবে এর বিনাশ এত সহজ নয়। ফকিরটিলা, বাউরিঘাট, চন্নিঘাট ছেড়ে মহকুমা সদরে এসে আস্তানা গাড়লেও সেই কুলি সর্দারের কথকতা এসে পৌঁছে যায় সরকারি বাসভবনের চারিধারে। হেডমাস্টারজি রামচরিত মানসের হাজারটা দোঁহার মর্মোদ্ধার করতে সক্ষম হলেও এ সমস্যার কোনও সুরাহা খুঁজে পান না। মনে মনে স্থির করেন ‘নতুন করে বাপের জনমই দিতে হোবে। বাপ তাঁর সর্দার ছিল, কোবরেজ ভি ছিল বটে, বাকিন দেশে তাঁর খানদান ছিল পণ্ডিতি, ই বাত তামাম মুলুককে জানাতে হবেক।’

শুরু হল তাঁর অনুসন্ধান। বৃদ্ধা মাকে জিজ্ঞেস করে কিছুই বের করা সম্ভব না। স্মৃতিবিভ্রমের বিড়ম্বিত জিবন তাঁর। মাঝে মাঝে কার উদ্দেশে বলে ওঠেন “হঠ যাও”, কখনও বলেন “হাও সুইট”! মাঝে মাঝে চেঁচায় ‘মা বিষহরি’ ‘মাতঙ্গী’ ‘ধূমাবতী’ আরও কত কী! ফাগুয়ার কাঠির শব্দে আসমান পানে চেয়ে থাকে, আচমকা চেঁচিয়ে ওঠে “টুসু কাঁহা গেলি রে…?” পলাশে রঙ্গনে যখন মাতন লাগে বুড়ি গেয়ে ওঠে, “গগনে উড়িল ওই টুসুর মাথার চুল।” কখনও সারা দিনমান গুম মেরে থাকে। জীবনের ভার বড় দুঃসহ। কী জানি বাবা কেঁচো খুঁড়তে সাপই বেরিয়ে আসে কার মনের ভেতর থেকে।

অবধেশ খবর পেয়েছেন এক আংরেজ সাহেব এনেছিল তাঁর বাপের বাপকে শোন নদীর তীর থেকে। চাঁদপানা মুখ আর দশাসই চেহারা দেখে বামুনের ব্যাটাকে সর্দার বানিয়ে মাথায় পিন্ধিয়ে দিয়েছিল বিরাট পাগড়ি। হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল ইয়া মোটা লাঠি। সেই বুডঢা আবার নিজের ব্যাটাকে এখানে রেখে পাড়ি দিল চোদ্দ মাদলের দেশে। ওখানে বিক্রম বাহাদুর রাজ জমি ইজারা দিচ্ছে সাহেবদের। চায়ের খেতি হবেক। সেই হল ম্যাগর অ্যান্ড ম্যাগর এস্টেটের শুরুয়াত। তো কুলিকামিনের মুখে ই নাম নাই ফুটে। সবকাই বলে মহাবীর ঔর মহাবীর কোম্পানি। সাহাবের কুনো আপত্তি লাই। হামার কাম হলেই হল, লাম দিয়ে কী হবেক?

কী করে ত্রিপুরার মহারাজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চা বাগিচার পত্তন হল, কী করে সিলেটের জমিদার চৌধুরী সাব ই বাগানের মালিক হয়ে বসলেন এই ইতিহাসের চুলচেরা বিচারে হামদের কাম নাইকে। অবধেশজির কাছে একটাই সংবাদ— ওই বাগানের সাহেবের ঘরে রয়েছে একটা বিশাল ফটো। একেবারে খোদ সাহেবের খিচা ফটো। এতে পাগড়ি পিন্ধা লম্বি মুচোয়ালি সর্দারই হল অবধেশের বাপের বাপ— ঠাকুরদাদা। দেখতে একেবারে অবধেশের মতোই, একেবারে বামুন পণ্ডিতজি। কেবল একটু চন্দন-সিঁদুরের কেরামতি করে নিলেই হয়। ঝিমন ওরফে সর্দারের ব্যাটা, ওরফে তুলসিদাস, ওরফে অবধেশ পণ্ডিতজির সিদ্ধান্ত পাক্কা— এ থেকেই একটা ছবি করিয়ে নিতে হবে। তাঁর আসলি বাপের ছবি, বুটাই সর্দারের লয়, ঝিমনের বাপেরও লয়, অবধেশ শর্মার বাপের ছবি।

ইংরেজ সাহেব থাকলে কী বলতেন জানি না, তবে এখানকার ইংরেজির বাঘা অধ্যাপক বলেন, “ইটস আ রেস্টোরেশন কমেডি।” সত্যিই তো ঝিমনের বাপ বললে তো আর চলবে না, সর্দারের একটা ভালো নামও ছিল বটে।

অবশেষে দীর্ঘ মনস্তাপ, আন্তরবিলাপ লিজের বিবেকের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপনান্তে অবধেশ শর্মা ওরফে তুলসিদাসজি ওরফে ঝিমন হেডমাস্টারজির ঘরে শোভা পেল সুদৃশ্য একখানি তৈলচিত্র। এর পেছনে রয়েছে সিলেট জিন্দাবাজারের ফটোগ্রাফারের কেরামতি, করিমগঞ্জের চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়, আর শিলচরের কারিগরের ফটোফ্রেমিং। এতে নিত্য চড়ে ফুলের মালা— কুন্দ, কুসুম, বেলি চামেলি।

অন্ধকার রাতে ছায়াপিণ্ড এসে শুধায়, “হেই ঝিমনে, ই কে বটে?” উত্তর হয়, “হামার বাপ, বুটাই সর্দার লয়, পরমবীর শর্মা। হামি উয়াকে জনম দিলাম বটে। হামি, এই তুর ঝিমন, সর্দারের ব্যাটা, অবধেশ শর্মা ওরফে তুলসিদাস, হেডমাস্টারজি…”

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3165 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

আপনার মতামত...