লেনিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ

লেনিনের সঙ্গে কিছুক্ষণ -- অশোক মুখোপাধ্যায়

অশোক মুখোপাধ্যায়

 

[১৪]

[১৫]

বেলা কুন (১৮৮৬-১৯৩৮)।

লেনিনের দ্বারা অনুপ্রাণিত আর একজন কমিউনিস্ট। লেনিনের শিক্ষার ভিত্তিতে হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট আন্দোলন ও পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। আজ ওনার খবর নেওয়া যাক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জারের রাশিয়ার হাতে সাইবেরিয়ার যুদ্ধবন্দি শিবির থেকে জারতন্ত্রের পতন ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত, ১৯১৭ সালের সম্ভবত ডিসেম্বরের এক প্রবল ঠান্ডার দিনে কমরেড ইয়াকভ স্বারদলভ (১৮৮৫-১৯১৯) প্রায় সমবয়সী যাকে সঙ্গে করে ক্রেমলিনে লেনিনের অফিসে এনে ঢুকলেন, তারও তখন তিরিশ বত্রিশ বছর বয়েস। জামাকাপড় নোংরা শতচ্ছিন্ন, যেমনটা শত্রুসৈন্যের হাতে বন্দি সেনাদের হয়ে থাকে। মাথার টুপিটা ছেঁড়া বলেই মাথায় আটকে গেছে, গায়ের কোট আকারে ছোট এবং সেই কারণে বুক খোলা। পুরনো এক জোড়া জুতোর ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল মোজার বদলি কাপড়ের ক্রেপ ব্যান্ডেজ পটি।

স্বারদলভ বললেন, কমরেড লেনিন, এ হচ্ছে হাঙ্গেরির যুদ্ধবন্দি। বেলা কুন। মার্ক্সবাদী। আমাদের বিপ্লবের সমর্থক। আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চায়। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। তাই নিয়ে এলাম।

লেনিন খুব উষ্ণতার সঙ্গে করমর্দন করলেন, চমৎকার। এরকমই চাই। কিন্তু ইয়াকভ, আমরা কী ভাষায় কথা বলব?

–রাশিয়ান, রাশিয়ান, কমরেড ইলিচ। স্বারদলভ তাড়াতাড়ি নিজের প্যাঁশনে নাকের উপরে খাড়া রাখার চেষ্টা চালাতে চালাতে বললেন, আমরা ইতিমধ্যেই একে তমস্ক জেলা কমিটিতে নিয়েছি। ওখানে “সাইবেরীয় শ্রমিক” পত্রিকায় এর কয়েক কিস্তি লেখাও বেরিয়েছে। আমাদের ভাষাটা এ খুব ভালো শিখে নিয়েছে।
–দারুণ একটা তথ্য, বসুন কমরেড। কফি পান করতে করতেই আমরা কথা বলি, যদি আপনার অসুবিধা না থাকে।

স্বভাবতই লেনিন খুব খুশি এবং উদ্দীপিত। আর স্বারদলভও লেনিনের মধ্যে গভীর উত্তেজনা লক্ষ করে ভেতরে ভেতরে একেবারে শিশুর মতো উচ্ছল হয়ে উঠলেন। একটা বেশ কাজের কাজ করা যাবে বলে মনে হচ্ছে।

বেলা কুনও দৃশ্যতই উত্তেজিত। তাঁর কথাটা বলার জন্য সোজা লেনিনের কাছে চলে আসতে পারবেন— এ তিনি কল্পনায় আনতে পারেননি। তবে এসে যখন পড়েছেন, কাজটা না করে তিনি উঠবেন না। সরাসরিই প্রস্তাবটা পাড়লেন, তমস্ক বন্দিশিবিরের সমস্ত যুদ্ধবন্দিদের পক্ষ থেকে আমাকে তারা আপনার কাছে এই বার্তা দিতে বলেছে, তারা সোভিয়েত বিপ্লব এবং রাষ্ট্রের পক্ষে একটা আন্তর্জাতিক ব্রিগেড তৈরি করে তাতে অংশগ্রহণ করতে চায়। আমরা সবাই স্বদেশ রক্ষার মতো করেই সোভিয়েত রাশিয়ার জন্য লড়াই করব। আমরা এই সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনার কাছে আর্জি জানাচ্ছি।

সারা রাশিয়ায় তখন কয়েকশো বন্দিসেনা শিবির। তাতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জারিক রাশিয়ার সৈন্যবাহিনীর তরফে বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে বিগত তিন বছর ধরে আনা নানা দেশের লক্ষ লক্ষ সেনা এবং হাজার হাজার অফিসার কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। তাদের মধ্যে আছে জার্মান, অস্ট্রিয়ান, হাঙ্গেরীয়, চেক, স্লোভাক, ও অন্যান্য দেশীয় সৈনিক। এবার, নভেম্বর বিপ্লবের ফলস্বরূপ তারা সদ্য সকলেই সম্পূর্ণ নিঃশর্তে মুক্তি পেয়েছে, সোভিয়েত রাজের অধীনে পূর্ণ নাগরিক হিসাবে আপাতত রাশিয়ায় থাকতে চাইলে যেখানে ইচ্ছে বসবাসের অনুমতি পেয়েছে। ইচ্ছা করলে এবং যুদ্ধ থামার পর স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে তারা নিজের নিজের দেশেও ফিরে যেতে পারে। শিবিরগুলির দরজা এখন সারা দিন খোলা। সশস্ত্র প্রহরীরাও আর নেই।

–সবই ঠিক আছে, বুঝলেন কমরেড, বেলা কুন বলে চলেন, কিন্তু শিবিরগুলিতে চলছে চরম অনিশ্চয়তা এবং বিশৃঙ্খলা। কেউ তো আসলে জানে না, সে কোথায় যাবে এবং কী করবে। আপনাদের অনুমোদন পেলে আমরা যদি একটা আন্তর্জাতিক বাহিনী গড়ে তুলতে পারি, সকলেই একটা কাজের মতো কাজ পাবে। সেনারা তো যুদ্ধ করতেই চায়। আর আমাদের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। আপনারা সাহস করে আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেবেন কিনা ওরা ভরসা করতে পারছে না। যদিও আমার আশা…
–বুঝেছি বুঝেছি, আপনি কী বলতে চান, লেনিন টেবিলের উপর খানিকটা ঝুঁকে পড়েন, আপনাদের উপর ভরসা আমরা করি কিনা, যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি ঘোষণার একটা ডিক্রিতেই বুঝিয়ে দিয়েছি। এবার আপনাদের পালা এটা দেখানোর, আপনারা কীভাবে প্রতিদান দেবেন। আমাদের এখন অনেক লোকজন দরকার, কাজের লোক, বুঝলেন, কাজের লোক। কথা বলার, বিপ্লবের নামে হুররে ধ্বনি দেওয়ার প্রচুর লোক পাচ্ছি, কিন্তু কাজের কাজ করার মতো লোক বেশি নেই। আর যুদ্ধ করার মতো সেনাও আমাদের যথেষ্ট সংখ্যায় নেই। আপনাদের পেলে আমাদের বিরাট লাভ হবে।

ইয়াকভ স্বারদলভ তখন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি গোছের অঘোষিত পদে আসীন। কেন্দ্রীয় সোভিয়েতের কার্যনির্বাহী সচিব। তিনি ভালোই জানেন রুশ দেশের হাতে তখন রসদ কতটা আর কী কী আছে। তিনি মাঝখানে বলে ওঠেন, অস্ত্রশস্ত্র খাবারদাবার পোশাক কিছুই আমাদের হাতে এখন পর্যাপ্ত নেই। আপনারা যদি আশা করেন, লাল ফৌজের সঙ্গে যোগ দিলে আপনারা এখনকার তুলনায় বেশি বেশি করে পাবেন, আমি প্রথমেই বলে দিতে চাই, চূড়ান্ত হতাশ হবেন।

–লাগবে না। কিছুই এখন আমাদের লাগবে না। আপনারা ইতিমধ্যেই বিদেশি বলে আমাদের অনেক দিয়েছেন। বেলা যেন আহত স্বরেই বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আমাদের রেশন বরাদ্দ লাল সেনাদের তুলনায় কিঞ্চিত বেশিই। জামা ফ্রক কোট জ্যাকেট জুতো মোজা টুপি আপনাদেরই নেই, আমাদের দেবেন কোত্থেকে? আমরা কিন্তু কমরেড হিসাবেই এই প্রচেষ্টায় যোগ দিতে চাই।
–যাক, বাঁচালেন, লেনিন হাসলেন, আমাদের অভাবী সংসারে আপনারা স্বাগত। তারপরই তিনি একটু হালকা স্বরে প্রশ্ন করলেন, আপনার তো বয়স কম। বিয়ে করেছেন?

বেলা কুন মাথা নেড়ে জানালেন, হ্যাঁ। তারপর জামার পকেট থেকে একটা মলিন ফটো বের করে এনে দেখালেন, তাতে স্ত্রী ও কন্যা সহ কর্পোরালের সৈনিক পোশাকে বাড়ির বাগানে এক বেঞ্চিতে বেলা কুন বসে আছেন। ছবিতে স্পষ্টই মালুম, যুদ্ধে যাত্রার আগে বিদায় বেলার তথ্যচিত্র সেটা।

–এটা কি বুদাপেস্তের কাছের কোনো জায়গা?
–না, কোলৎস্বর।
–ও, যাকে আমরা বিদেশিরা ক্লুজ বলে থাকি। আপনাদের দেশে যাওয়ার আমার অনেক দিনের ইচ্ছা। দেখা যাক, এবার যদি আপনার সুবাদে সেটা হয়ে ওঠে।

সেদিন সেই আলোচনা চলেছিল চার ঘন্টার উপরে। এক সময় বেলা স্মরণ করলেন ১৯০০ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় ইস্ক্রায় প্রকাশিত লেনিনের এক নিবন্ধ, The War in China, যাতে তিনি চিনে গিয়ে আগ্রাসন চালানোর জন্য জারতন্ত্রকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেন এবং প্রসঙ্গত হাঙ্গেরির প্রতিক্রিয়াশীল শাসকদের সঙ্গে জারের সখ্যতারও নিন্দা করেছিলেন। ১৮৪৯ সালের বিদ্রোহে জারের সেনা প্রেরণকেও আপনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন।

স্বারদলভ অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, আপনার সেই নিবন্ধের কথা এখনও মনে আছে? অদ্ভুত স্মৃতিশক্তি আপনার!

–আমাদের মনে থাকবে না? আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কথা কে বলে বলুন? কমরেড লেনিন, আপনি যে ১৯১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সোৎশ্যাল দেমোক্রাত পত্রিকায় On the National Pride of the Great Russians নামে এক প্রবন্ধে আবারও আমাদের কথা ভেবেছিলেন, আমরা এগুলো কখনও ভুলতে পারি না।

লেনিন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী করতেন যুদ্ধের আগে?

–আমি সাংবাদিক ছিলাম। সংবাদ লেখার সঙ্গে এদিকওদিক কিছু প্রবন্ধও লিখেছি।
–বেশ, তাহলে আমাদের প্রাভদার জন্যও লিখুন। কলমকে আঁকড়ে ধরুন। আমাদের লেখা চাই নানা দিক থেকে।

শুরু হল লেখা।

প্রাভদার আন্তর্জাতিক অনুভাগে তিনি নিয়মিত ইউরোপের নানা ঘটনা নিয়ে লিখতে লাগলেন। হাঙ্গেরি সম্পর্কেও। প্রাভদার সেই সব সংখ্যা চলে যেত যুদ্ধবন্দিদের কাছে। তারা আবার সেই সমস্ত লেখা নিয়ে যেত নিজের নিজের দেশে। সঙ্গে নিয়ে যেত বেলা কুনের রচিত দুটি পুস্তিকা— “কমিউনিস্টরা কী চায়?” এবং “সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র কী?”

শুধুই কি লেখা? কলমের পেশা?

না, লেনিনের চিন্তায় উদ্বুদ্ধ বেলা কুন সদ্য গঠিত আন্তর্জাতিক ব্রিগেড নিয়ে লাল ফৌজের পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন গোলাবারুদের আখ্যায়িকার মাঝখানটায়। ট্রেঞ্চ থেকে ট্রেঞ্চে। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে সেখানে ফারাক প্রায় নেই বললেই চলে। এরকমই এক আন্তর্জাতিক বাহিনীর কম্যান্ডার ফেরেঙ্ক মিউন্নিখ বলেছিলেন, বেলা কুন এসে লাল ফৌজের নৈতিক শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, বিজয় অর্জনে তাদের আস্থাও বেড়ে গিয়েছিল।

রাশিয়ায় প্রবাসী বিদেশি এবং মুক্ত যুদ্ধবন্দিদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে মস্কোতে। ১৯১৮ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দায়িত্বে আছেন সেই স্বারদলভ। বিদেশিদের পক্ষ থেকে কে থাকবেন?

বেলা কুন। বিকল্পহীন পছন্দ। নামটি উঠে এল বিনা দ্বিধায়, স্বচ্ছন্দে।

আবার তাঁরা দুজন চললেন লেনিনের দরবারে। “কোথা থেকে শুরু করতে হবে?”“কী করিতে হইবে?”

লেনিন বললেন, কমরেড কুন, আপনিই দায়িত্ব নিন। ঠিক আছে। কিন্তু আপনি সবার আগে বন্দি সেনাদের মধ্য থেকে ঝাড়াই বাছাই করে হাঙ্গেরির কমিউনিস্টদের একটা কোর গ্রুপ তৈরি করুন।

–আমরা এখানে রাজনৈতিক কাজ করব কীভাবে, কমরেড ইলিচ? রাশিয়ায় বসে হাঙ্গেরীয় গ্রুপ নিয়ে কাজ করতে গেলে পদে পদে ঝামেলা হবে। তাই না?
–ঝামেলা নেই, এরকম কাজ হয় নাকি কমরেড? লেনিন মৃদু তিরস্কার করলেন এই বিদেশি সহকর্মীকে, আপনারা কাজ করবেন রুশ কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-র কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে। তাতেই বেশিরভাগ ঝামেলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। তারপর আপনার কাজ শুরু করলে আমি তো আছি। যেমন যেমন যখন দরকার হবে, আমিও আপনাদের সঙ্গে বসব। তবে আমার ধারণা, কিছুদিন কাজ করতে পারলে অনেক ভুলবোঝাবুঝি কেটে যাবে। রাশিয়ানরা একেবারে তাচ্ছিল্য করার মতো খুব খারাপ লোক নয়। দেখে নেবেন।
–উঃ আপনি কী যে বলেন! আচ্ছা তাই হবে।

সেই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সাফল্য দেখেই তৃতীয় আন্তর্জাতিক মঞ্চের পরিকল্পনা আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। খুব শিগ্‌গিরই এক ঘোষণাপত্র ও সাংগঠনিক কমিটি তৈরি হল। স্বাক্ষর করলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, কার্ল লিবনেখট, রোজা লুক্সেমবুর্গ, এবং— হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন— বেলা কুন।

বেলা কুন এর কিছু দিন পরে নিজের দেশে গোপনে ফিরে গেলেন। ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসেই গড়ে তুললেন নতুন কমিউনিস্ট পার্টি। হাঙ্গেরিতে ছিল বহু রুশ সৈন্য যুদ্ধবন্দি হিসাবে, যাদের অনেকেই ছিল বলশেভিক মন্ত্রে দীক্ষিত। ১৯১৯ সালের শুরু থেকেই হাঙ্গেরিতে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে ব্যাপক আকারে বিক্ষোভ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে, ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি তা এক বিপ্লবাত্মক শ্রমিক অভ্যুত্থানের চেহারা নেয়।

ইতিহাসে একথা সর্বজনসমক্ষে লিখে রাখা আছে, সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছিল। বেলা কুন সহ কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় সমস্ত নেতাকেই গ্রেপ্তার করা হয়। যেটা লেখা থাকলেও অজানা থেকে গেছে তা হল, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ কারাকক্ষ থেকে বেলাকে খোলা উদ্যানে টেনে নিয়ে গিয়ে কয়েক ঘন্টা ধরে হাঙ্গেরীয় পুলিশ মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে লাথি মেরে, মোটা লাঠি এবং রাইফেলের কুদোর আঘাত দিয়ে বীভৎসভাবে মারধোর করে। রুশ বিপ্লব প্রসারের অনাবিল আতঙ্কে জার্মানিতে যেরকম ভাবে কার্ল লিবনেখট এবং রোজা লুক্সেমবুর্গকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, সেইভাবেই বেলাকেও মেরে ফেলারই হয়ত মতলব ছিল। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, সে আর হয়ে ওঠেনি। অথবা লোকটা মরেই গেছে ভেবে তারা ফেলে রেখে খুশি মনে চলে যায়। ভাঙাচোরা রক্তাক্ত বেহুঁশ শরীরের অবস্থা এমন ছিল যে কারারক্ষীরা তাঁকে জেলের হাসপাতালেও তুলে নিয়ে যেতে সাহস পায়নি।

তাঁর স্ত্রী ইরিনা কুন তৃতীয় দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পান। সারা শরীর ব্যান্ডেজ বাঁধা। ব্যান্ডেজের উপরেও রক্তের জমাট ছাপ। একটা চোখ আর মুখের খানিকটা শুধু ব্যান্ডেজের বাইরে দেখা যাচ্ছে। অনেক কষ্টে সামান্য হাসির ভাব আনার চেষ্টা করে কুন জিগ্যেস করলেন, আন্দোলনের কী খবর?

ইরিনা বললেন, সব শেষ। পার্টির একজনও বাইরে নেই।

–না ইরিনা, সব শেষ হয়ে যায়নি। কুন অস্ফুট স্বরে জবাব দিলেন, আপাতত ধামাচাপা পড়েছে। অচিরেই আবার মজুর কিসানরা ঝাঁপিয়ে পড়বে। কটা দিন দেখো শুধু।

এক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বিপ্লবের পক্ষে অনুকূল হয়ে উঠল। সোস্যাল ডেমোক্রেটিক দলের বামপন্থী অংশ এবং কমিউনিস্ট পার্টির জোট সরকারি ক্ষমতা দখল করে হাঙ্গেরিতে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রিপাব্লিক ঘোষণা করল।

২২ মার্চ ১৯১৯।

মস্কোতে তখন রুশ কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-র অষ্টম কংগ্রেসের অধিবেশন চলছিল। চেপেল বেতার কেন্দ্রের ঘোষণা শুনে যখন সেই বার্তা একজন কমরেড কংগ্রেসের মঞ্চে নিয়ে এলেন, লেনিন আক্ষরিক অর্থেই লাফ দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে ক্রেমলিনের টেলিগ্রাফ কক্ষে ছুটে গেলেন এবং দায়িত্বশীল কর্মচারীকে বললেন বুদাপেস্তে একটা ফোন কল ধরে দিতে। তিনি তখন প্রবল উত্তেজিত। তাঁর থিসিস অন্তত আর একটা দেশে সফল হতে চলেছে।

প্রবীণ পাঠকরা জানেন, সেই সময় আন্তর্জাতিক ফোন সংযোগ বেশ সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন ব্যাপার ছিল। সংযোগ যখন হল, ওপাশে ফোন ধরলেন— না, বেলা কুন নয়, কেন্দ্রীয় কমিটির আর একজন সদস্য, এরনো পোয়ের। দুই পক্ষে বার্তা ও শুভেচ্ছা বিনিময় হল। লেনিন বেলা কুনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। পোয়ের বললেন, তিনি কুনকে জানাবেন, যখনই সম্ভব হবে, লেনিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

ক্‌র্‌র্‌র্‌রৃং ক্‌র্‌র্‌র্‌রৃং ক্‌র্‌র্‌র্‌রৃং। ক্‌র্‌র্‌র্‌রৃং ক্‌র্‌র্‌র্‌রৃং ক্‌র্‌র্‌র্‌রৃং।

রাত দুটোয় সেই ফোন এল। ক্রেমলিনের রাতের কর্মচারী পড়লেন বেশ দ্বিধায়। এখন কি লেনিনকে ডাকতে যাওয়া ঠিক হবে? তিনি হয়ত ঘুমাচ্ছেন। তার বদলে তিনি লেনিনের অফিসে ফোন করলেন: কমরেড ইলিচকে বুদাপেস্ত থেকে চাইছে, হাঙ্গেরির কমরেড বেলা কুন ফোন করেছেন।

–আমিই ইলিচ। লাইনটা ধরে রাখুন। বলুন, আমি আসছি। অর্থাৎ লেনিন তখনও জেগেই ছিলেন। এই ফোনের প্রতীক্ষায়। বেলা কুনের সঙ্গে কথা বলার জন্য অধীর উদ্বেগে।
–ভ্লাদিমির ইলিচ বলছি। আপনি কুন বলছেন?
–হ্যাঁ, বলছি কমরেড।
–কী করে বুঝব আপনিই বেলা? কিছু প্রমাণ দিন।
–প্রমাণ দেব? ফোনে? কীভাবে? আপনি বুঝতে…

লেনিন বললেন, খুব সহজ। আপনি শুধু বলুন, শেষ বার সাক্ষাতের সময় আমরা কী নিয়ে কথা বলেছিলাম?

–কত কথা বলেছি আপনার সঙ্গে। আলাদা করে কোনটা বলব? আমার ঠিক মনে পড়ছে না।
–সে কি? আমার সঙ্গে কথা বলে ক্রেমলিন থেকে শেষ যখন আপনি বেরিয়ে গে—
–ও হ্যাঁ, মনে পড়ে গেছে কমরেড লেনিন। আমরা তখন আমাদের দুই দেশের কৃষক সমস্যা নিয়ে কথা বলছিলাম।
–ব্যস, খুশি হলেন লেনিন। নিশ্চিন্তও হলেন। আর তারপর যা হয়। দুই বিপ্লবী কমরেড মিলে দুই প্রান্তের আন্তর্দেশীয় ফোন ধরে এমন জমিয়ে তিন চার ঘন্টা ধরে কথা বলতে লাগলেন, রাতের অন্ধকার চলে গিয়ে বাইরে ভোরের আলো জেগে উঠল।

শেষ করার আগে লেনিন আর একবার মনে করিয়ে দিলেন, আমাদের হুবহু অনুকরণ করতে যাবেন না কমরেড। অনেক কিছুই আমরা বাধ্য হয়ে করেছি। আপনাদের তা করতে নাও হতে পারে। কৃষকদেরও সংগঠিত করুন। স্তরে স্তরে শ্রমিক এবং কৃষকদের হাতে ক্ষমতা ভাগ করে দিন। আর যাই করুন, আপনাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রয়োজন হলে যখন দরকার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।

–অবশ্যই কমরেড। ধন্যবাদ!
–আর খুব সাবধানে পা ফেলবেন। শুধু মাত্র সরকার আপনারা হাতে পেয়েছেন। পুলিশ মিলিটারি এখনও আপনাদের হাতে নেই, এটা ভুলে যাবেন না!
–নিশ্চয়ই না। কমরেড লেনিন, আমি আপনার ছাত্র হিসাবে খুব গর্ব বোধ করি। আপনিই আমাকে বিপ্লবের সমস্ত কিছু হাতে ধরে শিখিয়েছেন। তবে— বেলা কুন ফোন ছাড়ার আগে জানালেন, আমি এই একটা জায়গায় আপনাকেও ছাড়িয়ে গেছি কমরেড ইলিচ। একেবারে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার দখল নিয়েছি। একটা গোলাও নিক্ষেপ করতে হয়নি শত্রুদের দিকে।

লেনিন সৌজন্যমাফিক হেসেছিলেন, বিপ্লবী অভিনন্দন কমরেড, এগিয়ে যান। কিন্তু মনে মনে উদ্বেগ বোধ করেছিলেন, এই ক্ষমতা এরা সত্যিই কত দিন ধরে রাখতে পারবে।

না, শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরিতে সেই সোভিয়েত সরকার টেকেনি। টেকার কথাও নয়। বিপ্লব মানে যে কোনওরকম ক্যু নয়, সরকার বদল মানেই যে রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নয়, বুর্জোয়া আইনসভার দখল নিয়ে তাকে সোভিয়েত বলে ঘোষণা করলেই যে তা বাস্তবিক অর্থে সোভিয়েত ব্যবস্থা হয়ে ওঠে না— অনেক কঠিন মূল্য দিয়ে ইতিহাসে তা আর একবার প্রমাণ হল। লেনিনের শিক্ষাকে ছাড়িয়ে যেতে চাইলেও এক্ষেত্রে আর তা সম্ভব হল না। সাড়ে চার মাস বাদে, সঠিক হিসাবে ১৩৩ দিন পরে, তার পতন হয়েছিল। বেলা কুন অনেক ঘাটের জল খেয়ে আবার সেই সোভিয়েত ইউনিয়নেই এসে ওঠেন।

লেনিনকে বোঝার জন্যই আমরা হাঙ্গেরির সেই সময়ের ইতিহাস একটু সবিস্তার পাঠ করে নিলাম।

লেনিন তারপর যখন তৃতীয় আন্তর্জাতিক বা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশন্যাল গঠনের উদ্যোগ নিলেন, জিনোভিয়েভের পাশাপাশি বেলা কুনকেও অনেক দায়িত্ব দিলেন।

তবে কুনের শেষ পরিণতি ভালো হয়নি। নানা রকম অতি-বাম প্রবণতা থেকে তিনি নিজেকে আর মুক্ত করতে পারেননি। লেনিনের অকালমৃত্যুর ফলে তাঁকে সামলানোর মতো দাপুটে বিচক্ষণ এবং দরদী নেতাও কেউ ছিলেন না। ১৯৩৫ সালে কমিন্টার্ন যখন সময়ের সাপেক্ষে পুরনো সঙ্কীর্ণতাবাদী রাজনীতি থেকে সরে এসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সার্বিক গণতান্ত্রিক ঐক্য এবং গণফ্রন্ট গঠনের ডাক দিল, কুন তার বিরোধিতা করে আগেকার লাইনের সপক্ষেই প্রচার চালাতে থাকেন। তার ফলে ১৯৩৮ সালে কুখ্যাত মস্কো ট্রায়ালের তৃতীয় পর্বে জিনোভিয়েভের সঙ্গী এবং “ত্রৎস্কিপন্থী ষড়যন্ত্রী” হিসাবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সংক্ষিপ্ত “বিচার” শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয় রায় প্রদানের বিকেলেই।

আর তারপর আর একটি কাজও সুসম্পন্ন হয়। লেনিনের হাতে তৈরি একজন ভালো কমিউনিস্টকে তাঁর কিছু (মারাত্মক) ভুলত্রুটির জন্য দালাল, চর, বিশ্বাসঘাতক, সোভিয়েত বিরোধী ষড়যন্ত্রকারী, ইত্যাদি নানারকম (তখনকার পক্ষে) ভয়ানক তক্‌মা লাগিয়ে দেবার ফলে কমরেড বেলা কুন কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। কেন না, ভালোমন্দ, ভুল-ঠিক— ইত্যাদি শেখার জন্যও যে এরকম চরিত্রকে জানা দরকার সেই বোধ আমাদের মার্ক্সবাদীদের সুগঠিত সুবিবেচিত সিলেবাস থেকে সম্পূর্ণ বহিষ্কৃত!

অথচ লেনিনকে জানতে হলে তাঁর ছাত্রদেরও জানতে হবে। কেন না, তাঁদের নিয়েই লেনিন। তাঁদের বাদ দিয়ে লেনিন মানে একটা ফ্রেমাবদ্ধ ছবি বই কিছু নয়।


ছবি পরিচিতি: ১। কমরেড বেলা কুন, ২। বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মাঝে বেলা কুন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...