একমাত্র মিডিয়াই পারে গৈরিক দেশপ্রেমকে চ্যালেঞ্জ জানাতে, যদি তারা চায়

প্রশান্ত ভট্টাচার্য

 


লেখক পেশায় সাংবাদিক, কবি ও প্রবন্ধকার

 

 

 

মিডিয়াই ব্রহ্মা। ফলে, জানেন গোপন কম্মটি। মিডিয়া সব জানে। আমরা যারা পেশাদার সংবাদজীবী, তারা ঝালে-ঝোলে-অম্বলে সবেতেই দড়। প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী— রাজনীতিবিদদের কারণে-অকারণে গালমন্দ করি, পুলিশের মা-বাপ করি, বিচারবিভাগের অতিসক্রিয়তা নিয়ে সমালোচনা করি, সরকারি আমলাদের সিদ্ধান্তে গলদ বের করতে ডেঁয়ো পিঁপড়ের মতো পশ্চাদ্দেশ উঁচিয়ে থাকি, শিক্ষকদের নীতিহীনতা নিয়ে উত্তর-সম্পাদকীয় লিখি, কিন্তু নিজেদের ওপর কখনও আলো ফেলে দেখি না! দেখি না, আমরা কতটা পোঁ ধরা, কতটা চাটুকার!

একের পর এক ইস্যু নিয়ে মিডিয়ায় সম্প্রতি যে ন্যক্কারজনক একতরফা কাজির বিচার শুরু হয়ে গিয়েছে, তাকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বললে সম্ভবত কিছুই বলা হয় না৷ চিৎকারে পারঙ্গম অ্যাঙ্কর ভাবছেন, তাঁর এই গলা ফাটানোতেই বুঝি ভড়কে যাবেন বিরোধীরা, অতিসক্রিয় হবেন সরকারপক্ষীয়রা। কখনও দেশপ্রেমের নামে, কখনও আবার দুর্নীতি উন্মোচনের অছিলায় প্রভাবশালী টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ার বেশিরভাগ দৈনন্দিন যে ভৈরব নেত্য শুরু করে দিয়েছে, তাকে কেতাবি ভাষায় ‘বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থী’ বললেও কম বলা হয়। যা গণতন্ত্রের পক্ষেও বেজায় অশুভ৷

মিডিয়ার এই রাহুর দশার পিছনে যতগুলো কারণ আছে, তার বেশিরভাগই পুরনো। অনেক প্রবীণ সাংবাদিকের কাছে এসম্পর্কে নানা প্রসঙ্গে নানান কথা শুনেছি। কিন্তু অতীতে যে ব্যাপারগুলোর মধ্যে একটু রাখঢাক ছিল, তা এখন একেবারে প্রকাশ্য, নগ্ন হয়ে গিয়েছে। আমরাই তো এই পেশায় আসার গোড়ার দিকে শুনেছিলাম, “খবর করে খবরের কাগজ চলে না, খবর না-করে খবরের কাগজের পয়সা,” কিংবা “উনি তো খবর করেও রোজগার করেন, খবর না-করেও রোজগার করেন।” প্রথমদিকে এগুলো হজম করতে, সত্যি বলছি, বেশ অসুবিধা হত। তারপরে, ক্রমে-ক্রমে বিষয়গুলো ধরতে পারি। বুঝি, নিছক সাংবাদিকতা করে গাড়ি-বাড়ি করা যায় না। আর স্রেফ খবর ছেপে বা দেখিয়ে ‘মিডিয়া-ব্যারন’ও হওয়া যায় না। বিশেষ করে আমাদের মতো একটা কলোনির রক্তমাংসে গড়া দেশে, যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। যেখানে সবকিছুতেই ভক্তি আর ঘৃণার বাইনারি। তার ওপরে রাজনৈতিক সহিংসতা। শাসকদলের চোখরাঙানি। ডান, বাম সব শাসকেরই এক ধারা।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা দিয়েই শুরু করি। তখন সিঙ্গুর আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে। একটি বাংলা টিভি চ্যানেলে আমরা পুলিশের নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে খুব জোরদার লাইভ করছি। খুলে দেওয়া হয়েছে এসএমএস লাইন। সাধারণ মানুষের এসএমএস-এ কমেন্টের ঢেউ আছড়ে পড়ছে পিসিআর-এ। সিঙ্গুরের সেই ফুটেজ বাকি সব চ্যানেলের কাছেই ছিল, যদিও আমরা ছাড়া আর মাত্র একটিই বাংলা চ্যানেল সেই ফুটেজ চালানোর হিম্মত দেখিয়েছিল। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হতে না-হতেই আমাদের বেলুন চুপসে গেল। মালিকের হুকুম তাঁর খাসপেয়াদা মারফৎ তুরন্ত পৌঁছে গেল স্টুডিওয়— এই প্রোগ্রাম বন্ধ করতে হবে। পিসিআর থেকে টক-ব্যাক মারফৎ সে খবর আমরা চালান করে দিলাম অ্যাঙ্করকে। সে তো অবাক! “সারাদিন ধরে যা বলছিলাম, এখন সে সব থুতু গিলতে হবে? আমি তো খবরের মুখ, রাস্তায় বেরোলে লোকে তো আমায় ধরে পেটাবে!” চিফ প্রোডিউসরবাবু বিচক্ষণ মানুষ, তিনি অন্য এক অ্যাঙ্করকে চটজলদি রেডি হতে বললেন। আমরা লম্বা একটা ব্রেক নিয়ে বিজ্ঞাপন চালিয়ে বসে রইলাম, তার মধ্যে নয়া অ্যাঙ্কর এসে স্টুডিওয় মোতায়েন হয়ে গেলেন, ব্রেক থেকে ফিরে এসে আমরা ‘যারপরনাই মিষ্টি’ করে খবর করা শুরু করে দিলাম। গোটা ব্যাপারটা এক বাক্যে বলতে গেলে, সেদিন আমরা ছোট চাকরেরা বাধ্য হলাম খবর ‘টোন ডাউন’ করতে, যেটাকে আপনারা স্বচ্ছন্দে খবর ‘আড়াল করাও’ বলতে পারেন। হঠাৎ কী এমন ঘটল যার জন্য এই তৎকাল সুরবদল! কারণটা খুব সহজ, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর খাস দফতর থেকে ফোনে মুখঝামটা খেয়েছেন ইয়াং অঁত্রপ্রেনর চ্যানেল-মালিক। ব্যস, দম শেষ। শুধু লাইভ বন্ধ করাই নয়, খানিক পরে সিপিএমের এক সেজ নেতাকে গাড়ি পাঠিয়ে স্টুডিওতে এনে ‘উল্টো শো’-ও করতে হল!

এই প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সে ২০০৬ সালের কথা। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে সিপিএমের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্বাচনকেন্দ্রের প্রধান পর্যবেক্ষক একটা গরম বাইট দিলেন আমাদের এক রিপোর্টারকে। সেই বাইটে ছিল ওই কেন্দ্রের প্রার্থী কীভাবে ভোট ম্যানিপুলেটিং করবেন তা নিয়ে সবিস্তার ব্যাখ্যা, এবং তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। আমাদের রিপোর্টার লক্ষ্মী ছেলের মতো এসে ক্যাসেটটা ইনজেস্ট-এ বসিয়ে দিয়ে কানে-কানে বলে গেল, “একপিস বোমা দিয়ে গেলাম। নাও, এবার সারারাত ধরে নেচে খাও।” ব্যস, আমাদের আর পায় কে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই বাইট পিসিআর-এর টাইমলাইনে নেমে গেল, আমরা রাত নটার খবরে হইহই করে সেটা আদ্যোপান্ত চালিয়েও দিলাম। শুধু চালালামই না, রাতে জরুরি সম্পাদকীয় বৈঠকে ঠিক হল, পরের দিন সকাল ছটার বুলেটিন খোলা হবে ওই বাইট দিয়ে, আর লাইভ করা হবে ওই মন্ত্রীর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। আমিই সেদিন প্রোডিউসর। গভীর উত্তেজনায় সারারাত ধরে সহকর্মীদের সঙ্গে বসে প্রোগ্রামটার ডিজাইন করলাম। ঠিক ভোর চারটেয় ঠান্ডা গলায় বসের ফোন, “কোনও লাইভ হবে না। এমনকী, ওই বাইট-টাও আর চালানো হবে না। নর্মাল বুলেটিন হবে।” অতএব আমাদের সারারাতের পরিশ্রম সব জলে গেল। সেবারও শুনেছিলাম, সরকারি দলের গভীর রাতের ফোনে নাকি প্রোগ্রামের খোলনলচে পালটাতে হয়েছে।

এখন বুঝি, এগুলো আসলে কোনও ব্যাপার নয়। এখন যেমন শুনছি, পিএমও অফিস থেকে মিডিয়া হাউসগুলোকে নাকি অলিখিত চাপ দেওয়া হয়েছে। তাই কোনও হাউস-ই সেভাবে কৃষক আন্দোলন সম্প্রচার করেনি। তাছাড়া, বেশিরভাগ হাউসে মোটা মাসোহারা যায় কর্পোরেট ও দলীয় বিজ্ঞাপন হিসেবে। বেশি দূরের কথা নয়, শোনা যায়, হাতের নাগালে বাংলার সীমানা-পেরনো সাংবাদিকরাই নাকি তাদের গুজরাতি চ্যানেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা খয়রাতি পাচ্ছে, আজ নয়, সেই ২০১৬ সাল থেকেই। এখানেই শেষ নয়, গত ২৬ জানুয়ারির পর একেবারে ওপরমহল থেকে নাকি হুকুম এসেছে, প্রচার করতে হবে, কৃষকদের অবস্থানস্থলের চারপাশের এলাকার জনগণ কৃষকদের পাশে নেই। কৃষকদের বিরুদ্ধে সরকার নাকি এবার ‘যুদ্ধ’ শুরু করবে। তার জমি তৈরি হচ্ছে। মিডিয়া, তফাত যাও। সত্যি-মিথ্যে জানি না, কিন্তু মিডিয়ার বাজারে কান পাতলেই এসব কথা শোনা যাচ্ছে। এবং ২৬ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের ‘ক্রোনোলজি’ যদি মাথায় রাখেন, পাঠক, খুব কি অবিশ্বাসযোগ্য শোনাচ্ছে এসব দ্রাক্ষালতার খবর?

এ তো গেল রাজনীতির কথা। এরও পরে আছে কর্পোরেট। ছবির সঙ্গে তার ফ্রেমের যেমন সম্পর্ক, রাজনীতির সঙ্গে কর্পোরেটেরও তেমনই— পেশাদার রাজনীতিক কদ্দূর অবধি যেতে পারবেন, তার সীমা নির্দেশ করে দেয় কর্পোরেট। মিডিয়ার লোকরা জানেন, কত খবর চেপে যেতে হয় কর্পোরেট হাউসের বিজ্ঞাপন সুনিশ্চিত করার দায়ে। খুবই সরল এই সমীকরণ— বিজ্ঞাপন = টাকা = মাইনে। ওরে পাগলা, নইলে খাবি কী! পেটে গামছা বেঁধে সাংবাদিকতা করবি? ঘটনাচক্রে, আমি এমন নামডাকওলা অডিও-ভিজ্যুয়াল হাউসে চাকরি করেছি যেখানে মালিক নিজেই রিপোর্টিং টিম পাঠাতেন খবর করে আনার জন্য। তারপর সেই ক্যাসেটের আনএডিটেড রাশ গোটাটাই চলে যেত মালিকের ঘরে, তিনি তাঁর বিশেষ এডিটরকে দিয়ে সেই ফুটেজ এডিট করিয়ে তার একটা কপি পাঠিয়ে দিতেন অদৃশ্য কিছু মানুষের কাছে। তারপর চলত দরকষাকষি। ক্যাশে বা কাইন্ড-এ বনিবনা না হলে মালিক সেই ক্যাসেট ব্যক্তিগত লকারে পাঠিয়ে দিতেন। তারপর শুরু হত সংশ্লিষ্ট নানা ব্যক্তিকে খুশি করার বন্দোবস্ত। বিভিন্ন ঠাকুরের পায়ে বিভিন্ন ফুল ও নৈবেদ্য চড়িয়ে তারপর সে ক্যাসেট বাজারে, থুড়ি, এমসিআর-এ পৌঁছতেন এয়ার হওয়ার জন্য।

এইরকম নানা পুজোপার্বণের সঙ্গে দিনের পর দিন ঘর করতে করতে আদর্শবান এক সাংবাদিক যে কখন পাক্কা ‘চোথা’ হয়ে উঠেছে, তা নিজেই টের পায় না। একসঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে এমন অন্তত জনাছয়েক জেলা করেসপন্ডেন্টকে জানি, যাঁরা মাসের শেষে মাইনে চান না, প্রেস কার্ডটা চান শুধু। আর টেলিভিশন হলে, স্রেফ একটা লোগো লাগানো বুম, ব্যস। ‘লোগোমোহন’ সাংবাদিকটি তা হলেই খুশি। জানি, এ পর্যন্ত পড়ে অনেকেই বলবেন, কাক কাকের মাংস খায় না, কিংবা শকুনের চোখ তো ভাগাড়েই থাকে। কিন্তু, বন্ধু, সবিনয়ে জানাই, আমার এ সব লিখতে একটুও সম্মানহানি হচ্ছে না। আমি বিশ্বাস করি, মিডিয়া চালাতে বহু টাকা লাগে। আর তার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে লোন পেতে বড় মাপের নেতা-মন্ত্রীর সাহায্য প্রয়োজন হয়। আপনারাও নিশ্চয় জানেন, কত মিডিয়া সংস্থা কয়েকশো কোটি, এমনকী হাজার হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি থেকে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিয়ে উঠতে পারেনি। কোনও এক বিষন্ন গোধুলিতে এঁদের ঝাঁপে লাঠি পড়েছে, কিংবা ছপ্পড় অন্য কোনও মাতব্বরকে বেচে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর এই কাজ হাসিল করতে আরও বড় নেতা-মন্ত্রীর সাহায্য লেগেছে।

আমার মতো যাঁরা দীর্ঘদিন এই পেশায় আছেন, তাঁরা এসব বিলক্ষণ জানেন। আমার চেয়েও অনেক বেশি করে জানেন। এবং, সব জেনেশুনেও ভাজা মাছটি উলটে খেতে না-জানা বেড়ালের মতো চুপ করে মোটা মাইনের পোষ্য হয়ে রয়ে যান। পেল্লায় সম্পাদক থেকে পাতি রিপোর্টার— সবার যত বিক্রম সব নিউজরুমে, আর আসল জায়গায় গিয়ে “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে”!

এইই যখন মোটের ওপর মিডিয়ার অবস্থা, সে প্রতিষ্ঠানের থেকে আমরা কোন নিরপেক্ষতা আশা করতে পারি! আশা করতে পারি কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা! অথচ এইসব প্রতিষ্ঠানের মালিক-কাম-এডিটর বিজয় মাল্য বা নীরব মোদির পগার পেরনোর ঘটনা নিয়ে যখন চিৎকৃত চ্যাট শো-র আয়োজন করে, তখন মনে হয় মাল্যকে সামনে পেলে দেশপ্রাণ অ্যাঙ্কর বুঝি বা নিজেই নাটা মল্লিকের রোল প্লে করতেন! এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে জ্যোতি দত্তর একটি মন্তব্য। পুলিশের একটি সংগঠনের স্যুভেনির-এ জ্যোতিদা লিখেছিলেন, “আমি যতজন সৎ পুলিশ অফিসার দেখেছি, ততজন সৎ সাংবাদিক দেখিনি।” সেদিন পড়ে অবাক হয়েছিলাম, আজ বুঝি, যাঁর দর্শন আছে, তিনি অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পান।

এ তো গেল বিড়ালতপস্বী মিডিয়া হাউসের গল্প। কিন্তু, একটু অন্যদিক থেকেও বিষয়টা দেখা যেতে পারে। দেখা উচিত। আমরা এখন এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন আমাদের মধ্যকার ‘রিজ্‌ন’টাকে নানাভাবে, প্রতিনিয়ত মেরে ফেলা হচ্ছে। আমি দুটো অ্যাঙ্গল থেকে বিষয়টাকে বলতে চাইছি। ১) কোনও কমেডিয়ান একটা জোক শোনালে জেল, আর কোনও সাংবাদিক একটা সঠিক খবর করলে শ্রীঘরবাস। শুধু কোনও একজন মনের কথার নামে যা খুশি তাই বকে গেলে তা বাকস্বাধীনতা, আর সাংবাদিক একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে সত্যি কথা বলতে চাইলেই দেশদ্রোহী। আর, ২) সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা যদি অবাধ না-হয়, সংবিধানের প্রশ্রয়েই যদি ‘রিজনেবল রেস্ট্রিকশন’ চলতে পারে, তবে টেলিভিশনের লাইভ চ্যাট-এর স্বঘোষিত দেশনেতাদের মুখে লাগাম পরানো যাবে না কোন যুক্তিতে? কেন তাঁদের ক্ষেত্রে ‘রিজনেবল রেস্ট্রিকশন’ কাজ করবে না? কোন মাস্তানিতে একজন চিৎকৃত সাংবাদিক কাফিল খানকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দেবেন, বা জেএনইউ-এর ছাত্রদের নাম করে-করে তাঁদের গায়ে অ্যান্টিন্যাশনাল-এর তকমা লাগিয়ে দেবেন? কার নির্দেশে দেশের অন্নদাতা কৃষকদের আন্দোলনকে মিডিয়ায় বয়কট করে, নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তান বা খলিস্তান-যোগ প্রমাণ করতে লেগে যাবেন? অথচ প্রতিবাদরত বৃদ্ধ কৃষক কিন্তু অক্লেশে রাজদীপ সরদেশাইয়ের প্রশ্নের জবাবে বলতে পারেন, “হো কউন আপ? গোদি মিডিয়া?” নিয়তির এমনই পরিহাস, সেই রাজদীপ সরদেশাই-সহ ছ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা করেছে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের পুলিশ।

আসলে সাংবাদিকতা করতে করতে আমরা বেমালুম ভুলে গেলেও ওই বৃদ্ধ কৃষক কিন্তু ঠিক মনে রেখেছেন,  প্রতিটি প্রত্যাখ্যানই আসলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি। আমরা এটা ভুলে গেছি বলেই, অতি সহজে গেরুয়া শিবিরের তৈরি গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ-এর অংশভাক হয়ে পড়ছি। সেই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ মিডিয়াকে যেটা খাওয়াচ্ছে (নাকি তাসের ভাষায় বলব ‘পাশাচ্ছে’?), সত্যাসত্য বিচার না-করে মিডিয়া সেটাই গোগ্রাসে খাচ্ছে। চিৎকৃত সাংবাদিকতায় সেই ইস্যুটাকে সামনে আনছে। গৈরিক ন্যারেটিভ যাকে ভিলেন বানাচ্ছে, গোদি মিডিয়া তাকেই পত্রপাঠ পেড়ে ফেলছে। গোটা দেশ সেটা নিয়েই হইহই করছে৷

এই ডিক্টেটেড জার্নালিজম-এরই সর্বশেষ উদাহরণ দিল্লির কৃষকবিক্ষোভ। শুরুতে চোখে ঠুলি পরে বসেছিল গোদি মিডিয়া। টানা দু মাস ধরে দিল্লির ওই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় যে ঠায় পড়ে রয়েছেন কৃষকরা, তা নিয়ে কোনও হেলদোল ছিল না। কিন্তু যেই লালকেল্লার কোন খাম্বায় কে উঠে পড়ল, অমনি গেল গেল রব শুরু হল। মনে রাখতে হবে, যে উঠেছিল তার সরকার-যোগ নিয়ে খবর করতে গেলে মিডিয়ার কপালে অশেষ দুঃখ ছিল, তাই সেদিকে না-গিয়ে গোটা আন্দোলনটাকেই বদনাম করার সুচারু (এবং অবশ্যই সরকারনির্দেশিত) কৌশল নেওয়া হল। টানা দু মাস ধরে কৃষকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে ব্ল্যাক আউট করে রেখেছিল যারা, তারাই হঠাৎ জেগে উঠে চোখ কচলে আন্দোলনরত কৃষকদের বিরুদ্ধে হুক্কাহুয়া শুরু করে দিল। কৃষকরা কত নৃশংস, কীভাবে জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছে, তা প্রমাণ করতে তাদের মুখে যেন গ্রাস উঠছে না! এই পয়সাখেকো সংবাদজীবীরা কি জানেন না, কোনও আন্দোলনই ‘মন কি বাত’-এর মতো স্ক্রিপ্টেড নয়?

এখন তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে চলে এসেছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটারের মতো কতরকম সামাজিক মাধ্যম। কিন্তু টিভি চ্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, খবরের চ্যানেলগুলি অর্থের বিনিময়ে নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছে। ‘ফেক নিউজ’ পরিবেশন করছে। রয়েছে রাষ্ট্রশক্তির অদৃশ্য ভীতিও। সরকারের সমালোচনা কিংবা সরকার-বিরোধী খবর পরিবেশন করলেই সঞ্চালকের চাকরি যাওয়া, ইডি বা সিবিআই-কে দিয়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে হেনস্থা করানো এখন রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকারের স্তুতি করতে গিয়ে সত্যিকারের খবর হারিয়ে যাচ্ছে। গোয়েবলসীয় কায়দায় একতরফা সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। বিপরীতে গেলেও জুটছে রাষ্ট্রদ্রোহীর তকমা।

এই অবস্থায়, এখনও বিশ্বাস করি, একমাত্র সাংবাদিকরাই পারেন সংবাদমাধ্যমকে তার পুরনো গৌরবের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে। এবং গৈরিক দেশপ্রেমকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করলেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র তার পূর্ণ মর্যাদায় আসীন হতে পারবে। একেবারে হাতে গোনা কেউ কেউ সে চেষ্টা করছেনও। আমাদের সামনে রয়েছে মনদীপ পুনিয়ার দৃষ্টান্ত। রয়েছেন রবীশ কুমার, অভিসার শর্মার মতো সাংবাদিকেরা, রয়েছেন আরও কেউ কেউ। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে, একা-একা এ কাজ হওয়ার নয়। মিডিয়ার ম্যানহোলে যে পাঁক জমেছে, তা সাফ করতে আমাদের মনদীপ পুনিয়ার মতো অসংখ্য ডরহীন স্ক্যাভেঞ্জার চাই। পারলে, ওঁরাই পারবেন। কিন্তু, মনে রাখতে হবে, গোদি মিডিয়া অস্তিত্বসঙ্কটের কারণেই তাঁদের হাত থেকে বুম কেড়ে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করবে। পুনিয়া ও তাঁর বন্ধুবান্ধবেরা যদি সে লড়াইটা জিততে পারেন, বাকিটা আটকানো যাবে না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...