তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্দেশ্যে

ভগৎ সিং

 

২৩ মার্চ ফাঁসি হওয়ার আগে ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১ তারিখে ভগৎ সিং এই চিঠিটি লেখেন। চিঠিটি ‘দি ভগৎ সিং রিডার’-এ প্রকাশিত হয় (পৃঃ ২২৪-২৪৫)। MROnline.org পত্রিকায় গত ১৭ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রকাশিত চমন লালের একটি প্রবন্ধ Farmers In protest: Learning from the past and creating history with a real definition of nationalism-এ চিঠিটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত হয়। ইংরাজি থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন প্রবীর মুখোপাধ্যায়।

বিপ্লবের প্রকৃত সেনারা– কৃষকরা আর শ্রমিকেরা— আছে গ্রামে আর কারখানায়। কিন্তু আমাদের বুর্জোয়া নেতৃত্ব তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করেও না আর করার সাহসও করে না। আমাদের নেতারা যে সব লক্ষ্য হাসিল করার চেষ্টা করেছেন সেগুলো অর্জন করা গেলেও এই নিদ্রিত সিংহ একবার ঘুম থেকে জেগে উঠলে এদের আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। আমেদাবাদে শ্রমিকদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধির ১৯২০ সালে যে প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার পর তিনি ঘোষণা করেছিলেন: “শ্রমিকদের নিয়ে মাতব্বরি না করা আমাদের অবশ্যকর্তব্য। কারখানার প্রলেতারিয়েতদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা বিপজ্জনক।” (দি টাইমস, মে ১৯২১)। তখন থেকে এরা (বুর্জোয়া নেতৃত্ব) ওদের কাছে যাওয়ার সাহস কখনও দেখায়নি। এবার আসুন দেখি কৃষকদের বিষয়টা। শুধু বিদেশি শাসকদের প্রভুত্ব ছিঁড়ে ফেলে দিতে নয়, একই সঙ্গে কৃষকদের ওপর জমিদারদের চাপিয়ে দেওয়া দাসত্বের বোঝাকেও দূর করে দিতে বিশাল এই কৃষকশ্রেণি যে জেগে উঠেছে ১৯২২-এর বরদৌলি প্রস্তাবের মধ্যে সেই ছবি দেখে নেতারা কত যে ভয়ভীত হয়েছিল সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। যাই হোক, বিপ্লবের জন্য কোন কোন শক্তির ওপর নির্ভর করা যায় আমরা সেই কথা আলোচনা করছিলাম। কিন্তু তুমি যদি বলো যে তুমি সরাসরি কৃষক আর শ্রমিকদের কাছে গিয়ে তাদের সক্রিয় সমর্থন লাভের আশা করছ, তাহলে আমি তোমায় বলি শোনো যে কোনওরকম আবেগপ্রবণ কথা শুনে ওরা বোকা বনবে না। খোলা মনে ওরা তোমায় সরাসরি জিজ্ঞাসা করবে: তোমার যে বিপ্লবের জন্য ওদের আত্মত্যাগ দাবী করছ তার ফলে ওদের কী লাভ হতে চলেছে? ভারত সরকারের মাথায় লর্ড রিডিং থাকুন বা স্যার পুরুষোত্তমদাস ঠাকুরদাস (বোম্বাইয়ের এক শিল্পপতি কংগ্রেস নেতা) থাকুন তাতে কী আসছে যাচ্ছে? লর্ড আরউইনকে পাল্টে যদি স্যার তেজবাহাদুর সপ্রু (প্রথমসারির এক অ্যাডভোকেট এবং অর্থবান কংগ্রেস নেতা) আসেন তাতে কৃষকের কী আসে যায়? ওদের জাতীয় আবেগের প্রতি আবেদন করা নিষ্ফল। তোমার নিজের উদ্দেশ্যে ওদের তুমি “ব্যবহার” করতে পারো; তোমাকে আন্তরিকভাবে কিছু করতে চাইতে হবে, আর ওদের বোঝাতে হবে যে বিপ্লব হচ্ছে ওদের ভালোর জন্যেই।

দশ বছরের মধ্যে বিপ্লব করে ফেলব— যৌবনের এইসব স্বপ্ন বা এক বছরের মধ্যে গান্ধির স্বরাজ আনার অবাস্তব কল্পজগত ঝেড়ে ফেলো। বিপ্লবের জন্য আবেগ বা মৃত্যু কোনওটারই প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন অবিচলিত সংগ্রাম, যন্ত্রণাভোগ আর আত্মত্যাগ। নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে চূর্ণ করো প্রথমে। ব্যক্তিগত সুখভোগের স্বপ্নকে ছিঁড়ে ফেলো। এরপর কাজ করতে শুরু করো। এক এক ইঞ্চি করে তোমাকে এগোতে হবে। যা প্রয়োজন তা হল সাহস, অধ্যবসায় আর খুব দৃঢ় সঙ্কল্প। কোনও বাধা কোনও কষ্ট যেন তোমাকে নিরুৎসাহ করতে না পারে। কোনও পরাজয় বা কারও বেইমানি যেন তোমাকে হতোদ্যম করতে না পারে। তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনও বাধাই যেন তোমার অন্তরের বিপ্লবী চেতনাকে মেরে ফেলতে না পারে। কষ্টস্বীকার আর আত্মত্যাগের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তুমি বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে আসবে। আর এইসব ব্যক্তিগত বিজয় একজোট হয়ে তৈরি হবে বিপ্লবের মূল্যবান সম্পদ।

একদিক থেকে দেখতে গেলে অনাসক্তির প্রতিবিপ্লবী বিশ্বাস নিয়েও গান্ধিবাদ বিপ্লবী ধারণার কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। কারণ গান্ধিবাদ গণমুখী কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল, যদিও সেই কার্যক্রম শুধুমাত্র জনগণের জন্যই একান্তভাবে নয়। ওরা (গান্ধিবাদীরা) নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে, তা সে যতই অবিন্যস্ত আর স্বার্থপর হোক না কেন, প্রলেতারিয়েতদের একজোট করার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তার মধ্য দিয়ে প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের রাস্তা প্রস্তুত হচ্ছে। বিপ্লবীরা অহিংসবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে তার অবশ্যপ্রাপ্য সম্মান অবশ্যই দেখাবে।

উদ্দেশ্যহীন নিষ্ঠুর দৌরাত্ম আর ব্যক্তিগত আত্মবলিদান এই দুষ্টচক্রের আবর্তনের ফাঁদে যেন বিপ্লবীরা না পড়েন। যে কোনও একজন বা সকল সক্রিয় কর্মীরই যে আদর্শ অনুপ্রাণিত করবে সেটা ঐ লক্ষ্যপূরণের জন্য মৃত্যুবরণ নয়, বরং ঐ লক্ষ্যপূরণের কার্যসম্পাদনের উপযোগী হিসাবে আর কার্যসম্পাদনের যোগ্য এক কর্মী হিসাবে বেঁচে থাকা।

জাতীয়তাবাদীদের নিজেদের কাজে সাফল্য আনতে হলে দেশকে কাজে নামাতে হবে, বিপ্লবের পথে নামাতে হবে। আর দেশ তো কংগ্রেসের লাউডস্পিকার নয়— দেশ হল কৃষক আর শ্রমিকদের, যারা ভারতের শতকরা পঁচানব্বই শতাংশেরও বেশি। সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিপতিদের দাসত্ব থেকে মুক্তি অর্থাৎ জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতিতেই দেশ নিজের থেকে নড়েচড়ে উঠবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...