নিষ্ক্রমণ বা মহানিষ্ক্রমণ

নিষ্ক্রমণ বা মহানিষ্ক্রমণ -- শ্রেয়া ঘোষ

শ্রেয়া ঘোষ

 

সকালের নিজস্ব শব্দগুলি নরম একটা আরাম ছড়িয়ে দেয় শরীরে, মনে। যে জটিল দিন অপেক্ষা করে আছে সামনে তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্যে এই শব্দরাজি থেকে শেষ বিন্দুতক শান্তি আহরণ করে নেয় অনীতা। সময়সীমা খুব বেশি হলে পনেরো-কুড়ি মিনিট। পিছনের বাড়ির পাম্প চালানোর শব্দ, আবর্জনা সাফাইওয়ালার বাঁশির শব্দ বা স্কুলবাসের হর্ন। প্রতিটা শব্দ একটা প্রস্তুতির কথা বলে। সকালের খণ্ড সময়কালের সঙ্গে যথাযথ মানানসই। অনীতা তখন দুটো চন্দনগন্ধী ধূপকাঠি জ্বালায়। না, ঠাকুরের ছবি-পট কিছু নাই তার। দেওয়ালে গাঁথা তাকে সামান্য কিছু প্রসাধন দ্রব্য, চিরুনি, হাত আয়না। আর একখানি মাত্র ছবি। ঠাকুরের ছবি নয়। নেতাজির ছবি একখানি। যেমন ঘোড়ায় চড়া শ্যামবাজার পাঁচমাথায়, তেমন নয়। ধুতি-পাঞ্জাবি, গোল ফ্রেমের চশমা। নেতার মতো কম, ফ্যামিলিম্যানের ভাবটাই অধিক। স্নান করে এসে, হাতে পায়ে পন্ডস কোল্ড ক্রিম মেখে, মুখে পাউডারের পাফ বুলিয়ে অনীতা আয়নার সামনে জ্বালায় ধূপের কাঠিদুটো। দুটো কাঠি চারটে হয়ে যায়। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘন হয়ে ওঠে। গন্ধের ব্যাপারটা নিশ্চিত নয় সে। প্রতিবিম্বিত ধূপের আগুন পুড়ে সুগন্ধ নিঃসরণ হয় কিনা, তদ্বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নয় সে এখনও। আরও কিছু নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে সিদ্ধান্তে আসার আগে।

অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত এই সময়কাল। দ্রুত শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততার শব্দ যত। তাদের এই ব্যারাকের মতো সারি দেওয়া তিন কামরার বাংলো প্যাটার্নের পৃথক নিবাসস্থলগুলি গ্যাসের আগুনে বগবগ করে ফুটতে থাকা আতপ চালের মতো উত্তপ্ত ক্রমশ। অনীতার ঘরেও ব্যস্ততার বাষ্পে দ্রুত অদৃশ্য সকালের শীতলতা। দেওয়াল আলমারি খুলে বাক্স থেকে টাকা, খুচরো গুছিয়ে ডিউটিতে বেরিয়ে যায়। ঘরের সামনে গাড়ি। অনীতার প্রতীক্ষায় গাড়ির দরজার সামনে ড্রাইভার। বৃদ্ধ। সেলাম করতে গিয়েছিলেন প্রথমদিন। নিষেধ করে দিয়েছে ও। নমস্কার বিনিময়ের প্রথা চালু করেছে। প্রথমে একটু কুণ্ঠিত ছিলেন ভদ্রলোক। ক্রমশ সহজ। অনীতা হেসে বলেছে, সেলাম করবেন আমার বাবাকে দেখেন যদি কোনওদিন। জরুর দিদি। মেমসাব সম্বোধনটাও বন্ধ করেছে অনীতা।– সাহেব মেমসাবদের তাড়ানোর জন্যই তো যত কিছু।

কী বুঝেছেন বাংলার সীমিত জ্ঞান নিয়ে ভদ্রলোক, কে জানে।

চাকরিটাই এখন অনীতার জীবন। সবটুকু জীবন এই চাকরিটাই। তবে এ চাকরিতে থিতু হয়ে একখানে বসা নেই। ছুটে বেড়ানো এক শহর থেকে আর এক শহর। গ্রামগঞ্জ। ক্রমশ ওর নিজের মধ্যেও একটা স্থির বিশ্বাস পোক্ত হচ্ছে, এই ছুটে চলা যেন ওর রক্তে।

সকালের শুদ্ধ স্বর অনীতার কাছে বরাবরই দ্রুত ফুরিয়ে এসেছে। কী করে মা ওকে স্কুলে ভর্তি করেছে কে জানে। হাজারটা মিথ্যে। হাজারটা ফাঁকফোকর বুজিয়েছে মা একা। একেবারে একা। স্কুল থেকে স্কুলে ঘুরতে ঘুরতে মিথ্যে বলা ক্রমশ রপ্ত করেছে।

হোয়াট ইজ ইওর মাদার্স নেম, শুনলেই ছোট থেকে হাতপা কাঁপতে শুরু করত। কারণ তার পরের প্রশ্নটা কিছুতেই এড়ানো যাবে না।

–ভয় পাবে না অনি। এই স্কুলটা খুব ভালো। টিচাররা সন্ন্যাসিনীর মতো। আগের স্কুলের মতো নয়। পরিষ্কার উচ্চারণে বাবার নাম বলবে।
–ফণীন্দ্রমোহন দাস?
–ওটা তো দাদুর নাম।
–তুমি তো বলেছ, তোমার বাবাই আমারও বাবা।
–সেটা তো মনে মনে জানার কথা। বাইরের লোককে বলবে, সুভাষ রায়।
–মিস্টার বলতে হবে তো নামের আগে? মিস্টার সুভাষ রায়?
–খুব ভালো করে পড়াশুনো করতে হবে তোমাকে, অনি। তাহলেই দেখবে…
–তাহলে কী দেখব মা? বাবাকে?

ছোট্ট স্যুটকেস গুছিয়ে মায়ের সঙ্গে ট্রেনে করে দার্জিলিং।

 

(২)

–কোনওদিন দেখোনি ভদ্রলোককে?
–আমার জন্মের আগেই তিনি কেটে পড়েছিলেন, বলেছি তো।
–না, পরে কখনও?
–হয়তো দেখেছি। মনে নেই।
–শোনো অনীতা, এত কথা বলার তো দরকার নেই আমার মাবাবাকে। বলে দেবে, বাবা নেই। জন্মের আগেই গত হয়েছে।
–কী হয়েছিল? কোন হাসপাতাল? হাজারটা প্রশ্ন আসবে। মিথ্যের অত ধক নেই, ধ্রুব, আমি জানি। পাত্রপক্ষের জেরার মুখে কুঁকড়ে যাবে।
–বেশ, তোমাকে কিছু সামলাতে হবে না। যা করার আমার ওপর ছেড়ে দাও। যা বলব, সায় দিয়ে যেও শুধু।
–ধ্রুব, হারিয়ে যাওয়ার পর একটা মানুষ কতদিন বেঁচে থাকতে পারে, জানো তুমি? দাদুর বন্ধু শিবেনবাবু। টিবি হয়েছিল। উত্তর ভারতে কোনও স্যানিটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়ার পথে ট্রেনে একজনের সঙ্গে আলাপ হল দাদুর। এ-কথা সে-কথা। সব শুনে বললেন, লোকটাকে তো খরচের খাতাতেই তুলে দিয়েছ, একটা চেষ্টা করে দেখোই না। বেরিলিতে একটা শিবমন্দিরের সাধুর কাছে নিয়ে গেল। সারদানন্দজি। আশ্রমের সকলে মহারাজ বলে সম্বোধন করতেন ওঁকে। সেরে গিয়ে দাদুর বন্ধু ওখানেই থেকে গেলেন।
–সাধু কে ছিলেন, তোমার বাবা না ঠাকুরদা?
–শৌলমারির শ্রীমৎ সারদানন্দজি কে ছিলেন, জানো না?
–জানলেও তা দিয়ে তোমার পিতৃপরিচয়ের কোনও প্রমাণ দাখিল হয় না।
–সরকারি ছাপ্পামারা পিতৃপরিচয় আমার আছে, ধ্রুব। তোমাদের পারিবারিক ছাপ্পার পরোয়া করি না আমি।
–ওকে। তাহলে এটাই বোলো। তোমার বাবা সন্ন্যাস নিয়ে সংসারত্যাগী হয়েছিলেন। তোমার জন্মের আগে। শোনো, জন্মের আগে বলার দরকার নেই। ঠাকুমা অ্যাক্সেপ্ট করবে না হয়তো। আবছা স্মৃতি আছে তোমার। বেরিলি ইজ গুড। বেরিলিতে ছিলেন অনেকদিন তোমার বাবা।
–ধ্রুব, আমার বাবার নাম জানো তুমি? সুভাষচন্দ্র। আমাদের কনভেন্টের সিস্টার বলেছিলেন, একটু পালটে দিতে। মাধ্যমিকের ফর্ম ফিলাপের আগে। জাস্ট একটা-দুটো লেটার। চন্দ্রটা উড়িয়ে দিলাম। আর সুবাস। বি-এর পর এইচ-টা শুধু একটা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলাম, ব্যস। ভেবে দেখলে কোনও কাজই কিন্তু তেমন কঠিন নয়। আর বানানভুল তো এখন আকছার। কত লোক দেখো না, ভোটার কার্ড কি আধার কার্ডের ভুল নাম ঠিক করে নিচ্ছে? আমাদের তো ডিরেক্টিভ এসেছে আরও কিছু ক্যাম্প খুলতে হবে। ভিড় সামলানো যাচ্ছে না। আগের রাত থেকে লাইন দিচ্ছে সব। ক্যাজুয়াল্টিও রিপোর্টেড।

 

(৩)

–থার্ড ডিগ্রি বার্ন ইঞ্জুরি নিয়ে হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন আমার বাবা। ভয়াবহ প্লেন দুর্ঘটনায়। যে টিমটা জাপান গিয়েছিল, দুজন ফিরেছিলেন। হাতে, মুখে পোড়া দাগগুলো দেখেছি আমি। কী বিভৎস! না, বাবাকে দেখিনি আমরা। মা সারাজীবন বিশ্বাস করে এসেছে, বাবা ফিরবেন।

এই গল্পটা কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই উনিশশো অষ্টআশি সালের অগস্ট মাসে ফিজিক্স ল্যাবের অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলেছিল অনীতা। পরদিন স্টাফরুমে ডাক পড়েছিল ওর। জানতই, এই ডাকটা আসবে। হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্টের প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক ট্যাক্‌ল করতে অসুবিধে হয়নি তেমন। বাবা এঞ্জিনিয়ার ছিলেন ম্যাম। ইলেকট্রিক্যাল। শিবপুর, সিক্সটিফাইভ। একটা পাওয়ার স্টেশন ভিজিটে গিয়ে…। মাস্কটা সামলাতে পারেনি।

–ভেরি স্যাড। কোনও প্রয়োজনে আমাদের হেল্প লাগলে, বোলো। প্রণাম করে বেরিয়ে এসেছিল স্টাফরুম থেকে। ধরা পড়ে যাওয়ার একটা ভয় কিন্তু তাড়িয়ে নিয়ে গেছে বরাবর। চোখধাঁধানো রেজাল্ট রাখাটা একমাত্র রক্ষাকবচ হিসেবে যত্নে রেখেছে তিনবছর। এই গল্প ততদিনে ঝাপসা।

একটা গল্প পেরিয়ে আর একটা গল্প। এই নির্মাণই জীবন। কাহিনিগুলো লুকিয়ে থাকে। কখন জন্ম নেয়, কখন বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম, কখন জলবাতাসের সংস্থান, কে করে, কিচ্ছু জানে না কেউ। নিজেই বড় হয়, যেমন অনীতা। জন্মদাতার সন্ধান নাই, তবু বেড়ে ওঠে নিজের শক্তিতেই। একদিন আত্মপ্রকাশ একদম আচমকা।

–ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলেন আমার বাবা। তাঁর মেধার সহস্রভাগের একভাগও পাইনি আমি। তাঁর দৃঢ় চরিত্রের সামান্য এক ভগ্নাংশের বেশি যেমন পেলাম না। যদি অকালে না হারিয়ে যেতেন… ওরকম বাবার সাহচর্য, স্নেহ পাওয়ার ভাগ্যই আমার নয়। চোখটা যে ভিজে উঠত, সেটা কিন্তু মিথ্যে ছিল না। সত্যি, মিথ্যে, জীবন আর গল্প একাকার হয়ে গেছে কবে।

ফাইনাল ইন্টারভিউতে নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এভাবেই শেষ করেছে অনীতা। টেবিলের উলটোদিকের মানুষটির প্রৌঢ়ত্ব আর অভিভাবকসুলভ ভঙ্গি হয়তো এরকম ঘুঁটি সাজানোর সাহস দিয়েছিল অনীতাকে। খানিকটা জুয়া খেলেছিল। চাকরিটা হয়ে যাবে, নিজেও ভাবতে পারেনি। ট্রেনিংয়ের শেষের দিকে একটা সেশনেই শুধু একবার মুখোমুখি। জানতে চেয়েছিলেন পারিবারিক কথা। ততদিনে পায়ের নীচে জমি। বাবার শৈশব কলকাতার বাইরে। মামাবাড়িতে থেকেই স্কুল, তারপর কলকাতায় প্রেসিডেন্সি, স্কটিশ। এমনকী অধ্যাপকও যদি অন্যায্য কথা বলেছেন কিছু, তো প্রতিবাদ করতে ভয় পাননি। আর তখনই হঠাৎ বড় জরুরি ব্যক্তিগত দরকারে অনীতাকে চলে যেতেই হচ্ছে। তাই পরে বিশদে বলবে সব পিতৃতুল্য মানুষটিকে। সময় নিয়ে কখনও।

 

(৪)

–সত্যি বলো মা, অপেক্ষা তো ছিল তোমার। কতদিন? আশা করতে করতে কবে শুকিয়ে গেছে শেষ বিন্দু তক, বুঝতে পেরেছিলে? আচ্ছা প্রথমে খোঁজও তো করেছ?
–যে কোনও লোক সম্ভব-অসম্ভব যা বলেছে, ছুটে গেছি। সেবার ফৈজাবাদ থেকে ফিরল ছোটকাকারা। কোন আশ্রম। একা মেয়ে ট্রেন ধরে চলে গেলাম।
–খুঁজে পেলে?
–জানি না। ততদিনে মুখচোখ ঝাপসা। দাড়িগোঁফজটার আড়ালে, কী করে বুঝব। হিন্দিতে বলল, হারিয়ে গেছে যা তাকে আর পিছুটানের বাঁধনে আটকিও না। মুক্ত করে দাও।
–আর তুমিও মুক্ত করে দিয়ে ফিরে এলে! আমার কথা ভাবলে না! কেউ ভাবোনি আমার কথা। না তুমি, না সেই লোকটা। জন্ম কেন দিয়েছিলে ? মা, আমার বাজে কথা মুখে এসে যায়। নিজেদের বাসনা মেটালে। আমি জানি, কেউ চাওনি আমাকে। আমার জন্মটা দুর্ঘটনা ছিল ইন ইওর লাইফ। ওয়েল। অ্যাবর্ট করে দিলে না কেন। মিথ্যের বোঝা আর টানতে পারছি না আমি। টূ টায়ার্ড আই অ্যাম। সামটাইমস ফিল লাইক এন্ডিং মাই লাইফ। … লোকটা চলে যাওয়ার পর নিজের নামটাও পালটে ফেললে। নীলিমা থেকে মিলি হলে কেন, পরে বুঝেছি।
–তোর জন্ম রেজিস্ট্রির সময়ে। তুই অনীতা আর আমি মিলি। একটা নামকে একটু ছোট করে।

চুপচাপ বসেছিল ওরা। বয়স বেড়েছে দুজনেরই। একজনের একটু শ্লথ। একজনের বড় দ্রুত। ফলত, বয়সের তফাৎ কমে মা মেয়ে প্রায় সমবয়স্ক আজ।

–ট্রেনে থার্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে দেখেছিল আমাদের প্রিন্সিপাল। বলিনি তোকে কোনওদিন।
–মা, তুমি গুলাগের কথা শুনেছ? এ-দেশেও কিন্তু ঠিক সেরকমই। অ্যারেস্ট হয়েছিল। তারপর একদিন ছাড়া পেল। ভোরবেলা দূরে কোথাও কালো ভ্যান থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল, পালা। পরদিন কাগজে বলল, জেল পালাতে গিয়ে এনকাউন্টারে শেষ কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী।

অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের কাঁটাতারে আটকে গেল একটা মানুষ। না, একটা নয়, দুটো। একজনের মধ্যে আরেকজনকে মিলিয়ে দিতে অবিরাম এক নির্মাণপ্রক্রিয়া আরও দুটো মানুষের। দুটো মেয়েমানুষের। একজন হয়তো ভীতু বা ধূর্ত। একটা পলায়ন মিশিয়ে দিয়েছে আর এক গ্রেট এস্কেপের সঙ্গে। এভাবেও শান্তি আসে, সন্ধেতারা ফোটে যখন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...