গৌরী লঙ্কেশ, এক সত্যের নাম

বুবুন চট্টোপাধ্যায়

 

মৃত্যুর দু-দিন আগেও তাঁর স্বজনরা পেয়েছিলেন গৌরীকে ঘিরে আততায়ীদের আঁচ। তাঁকে সে কথা জানিয়েওছিলেন তারা। কিন্তু তিনি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কার্যত কোনও ভয়ের কাছে কোনওদিন হাঁটু গেঁড়ে বসেনি তাঁর ভয়। এই নির্ভয়ার জিন তিনি পেয়েছিলেন পিতৃসূত্রে। কবি, সাংবাদিক বাবা পি, লঙ্কেশ চিরটাকাল মেয়েকে শিখিয়েছিলেন মিথ্যের সঙ্গে কখনও আপোষ করতে নেই। জীবন-জীবিকার শর্তেও নয়। প্রবীণ সাংবাদিক গৌরীর বাবা পি, লঙ্কেশ সবসময় বলতেন, সাংবাদিকদের সবসময় সরকারের বিরোধিতায় থাকতে হয়। তাহলে গণতন্ত্র বাঁচে। গৌরী আমৃত্যু বাবার সেই আপ্তবাক্যকে ধ্রুবতারার মতো অনুসরণ করেছেন। কোনও ভয়, কোনও লোভের সঙ্গে কখনও আপোষ করেননি তিনি।

“গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকা”টি ট্যাবলয়েড আকারে তিনি যেদিন প্রথম প্রকাশ করলেন তখন তাঁর সাংবাদিকতার বয়স ১৬ বছর। সেইসময় টেলিভিশন এবং ডিজিটাল মিডিয়ার রমরমে বাজার। গৌরীর শুভার্থীরা অনেকেই তাঁকে নিষেধ করেছিলেন সেইসময় এই পত্রিকাটি প্রকাশ করার ব্যাপারে। কিন্তু তিনি শোনেননি। তিনি অনুভব করেছিলেন, তাঁর চারপাশে অবিরত ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আঙুল তোলার জন্য তাঁর একটি আধার চাই। একটি নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম চাই। বেশিরভাগ সরকারের কাছে বিকিয়ে যাওয়া মিডিয়া তাঁকে সত্যকে তুলে ধরার জন্য কোনও জায়গা দেবে না। তাঁর পত্রিকা কোনওদিন বাণিজ্যের মুখ দেখেনি। কারণ প্রতিনিয়ত সরকার বিরোধিতা করার কারণে সেইভাবে কোনও বিজ্ঞাপন আসত না। যে কোনও সম্পাদকই জানেন বিজ্ঞাপন ছাড়া একটি পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখা কী কষ্টকর। মাত্র পঞ্চাশ জন শুভার্থীর অনুদানে ‘গৌরী লঙ্কেশ পত্রিকা’কে গৌরী বাঁচিয়ে রেখেছিলেন প্রতিদিনের মিথ্যের ধুলোকে উড়িয়ে দিয়ে সত্যি কথাটা বলবেন বলে।

বর্তমান সরকারের হিন্দুত্ববাদী মনোভাবের বিরুদ্ধে গৌরী প্রতিদিন কলম ধরেছেন তাঁর সম্পাদকীয়তে। বর্ণাশ্রম প্রথার তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। দলিতদের প্রতিনিয়ত দলিত করার রাজনৈতিক কৌশলকে তিনি অন্তরাত্মা দিয়ে ঘৃণা করতেন। বিজেপি-আরএসএসের বিবিধ নীতি কৌশলের মধ্যে গৌরী ক্রমশ উগ্র ফ্যাসিবাদের গন্ধ পাচ্ছিলেন। যে কারণে প্রতিদিন তাঁর কলম আরও ক্ষুরধার হয়ে উঠছিল শাসকের বিরুদ্ধে। স্বভাবতই শাসকের রক্তচক্ষু গৌরীর এই বোরখা খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টাকে ভাল চোখে নেয়নি। শাসকের ধর্মই অন্ধ তাঁবেদার ছাড়া সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা। শাসকের ধর্মই অনুগতদের মধ্যে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখা। শাসকের ধর্মই এটা নিশ্চিত করা যে দেশের সম্পদ যেন পায় সেই লোকগুলো যারা অন্ধ সেজে থাকে। গৌরী শাসকের সেই সাধের মৌমাছির চাকেই ঢিল ছুঁড়তেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন কেউ কেউ জেগে আছেন। অনেকেই দু-চোখ দিয়ে দেখেন আজও। সেই চক্ষুষ্মান মানুষগুলোকে জাগিয়ে রাখাই তাঁর কাজ। যারা এখনও সোচ্চারে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে ভয় পান না। তিনি জানতেন সেই নির্ভীক মানুষগুলোই তাঁর আজীবনের সঙ্গী। যারা সত্যের জন্য কোনও অন্যায়ের সঙ্গেই আপোষ করতে অপারগ। সমাজে পুরুষদের হাতে প্রতিনিয়ত মার খাওয়া, খেয়ে সহ্য করা ওই অসহায় মহিলাদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন গৌরী। শাসকের সহ্য হয়নি। নিজেদের প্রচারের ক্যানেস্তারা ছাড়া কোনও শাসকই কোনও বাড়তি আওয়াজকে সহ্য করতে পারে না। গৌরী সেটা জেনেই অবিরাম চিৎকার করে গেছেন। রূপকথায় মোড়া শাসকের মিথ্যে প্রতিশ্রুতির শরীরে অবিরাম পাথর ছুঁড়েছেন তাঁর অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়ে।

মনে পড়ছে হিটলারের কালো ছায়া যখন দীর্ঘতর হচ্ছে জার্মানির ভেতরে, তখনও এইভাবেই গণতন্ত্রের স্বপক্ষে একের পর এক লেখক-শিল্পীর কলম কেড়ে নিতে কী পৈশাচিক হত্যালীলা শুরু করেছিলেন হিটলার। তথাকথিত সোশালিস্ট বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখবার জন্য বুর্জোয়া ডেমোক্রেসি কীভাবে ফ্যাসিজমকে লেলিয়ে দিচ্ছিল শ্রমিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে। জার্মানির শিক্ষিত, মধ্যবিত্তরা তখন ভেসে গিয়েছিল নাৎসিজমের বেনো জলের টানে। গ্যোয়েটের জার্মানি, হেগেলের জার্মানি, হায়নের জার্মানি তখন প্রতিদিন ডুবে যাচ্ছে শাসকের অবৈজ্ঞানিক বর্বরতার চোরাবালিতে। এই চোরাবালির অবয়ব কেউ কেউ দূর থেকেই দেখত পান। হাওয়ার গন্ধ শুঁকে টের পান অতল আসলে কোনদিকে। গৌরী পেয়েছিলেন। আর ছেলেবেলা থেকে রপ্ত করেছিলেন যা বিশ্বাস করেন তার সঙ্গে আপোষ না করার ব্রত। এমন এলিমেন্ট তো গণতন্ত্র বিরোধী। যে কোনও শাসকের কাছেই মাথাব্যথার কারণ হবেন। শাসক চাইবে যত দ্রুত সম্ভব এইসব চক্ষুষ্মানদের সরিয়ে দিতে। কারণ তত তাঁর শোষণের প্রতিভা আরও প্রসারিত হয়। কারণ ক্ষমতার অহঙ্কার যখন অন্ধ হয়ে যায় তখন রক্তচোষা হয়ে যায়। আরও আরও মানুষের রক্তে ঝলসে উঠতে চায় তাদের তরবারি। যেমন হিটলার চেয়েছিলেন, যেমন মুসোলিনি চেয়েছিলেন, যেমন স্ট্যালিন চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের মুঠোবন্দি করতে। করেও ছিলেন। সবাই জানেন প্রতিদিন তাদের স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রে কীভাবে পিষে ফেলেছিলেন গোটা দেশের সাধারণ মানুষকে। সেই পেষণের ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন গৌরী। ফ্যাসিজম চারিয়ে দেওয়ার একটি প্রধানতম লক্ষণ হল ধর্মকে আশ্রয় করা। ধর্ম দিয়ে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইওরোপের প্রধান দেশগুলোতে যা হয়েছিল। সেই সময় জার্মানি, পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোতে ক্যাথলিক চার্চগুলো হয়ে উঠেছিল অন্যতম নিয়ন্ত্রক। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাদের নাক গলানো একটি সামাজিক ব্যাধির জন্ম দিয়েছিল। সেইসময় ইওরোপ থেকে বহু শিল্পী, সাহিত্যিক দেশ থেকে পালিয়েছিলেন। কারণ ওই দমবন্ধকার পরিস্থিতি, চার্চের ধর্ম শৃঙ্খল তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। এই পরিস্থিতি খুব দূরে নয়। গৌরী দেখতে পেয়েছিলেন বলেই নিজের কাছে শপথ নিয়েছিলেন আমৃত্যু আওয়াজ তুলে যাবেন ওই চক্রান্তকারীদের উল্লাসের বিরুদ্ধে। গৌরী সোচ্চার হয়েছিলেন দলিতদের অধিকারের স্বপক্ষে। প্রতিদিন তাদের দারিদ্র, নিষ্পেষণ, এবং অশিক্ষার অজুহাত দিয়ে তাদের গর্তে ফেলে রাখার বৈষম্য গৌরী মেনে নিতে পারেননি। তাই নিয়মিত সোশাল মিডিয়ায় পক্ষপাতদুষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। সম্প্রতি এই সরকারের মদতপুষ্ট আততায়ীদের হাতে খুন হওয়া বামপন্থী মনোভাবযুক্ত সমাজবাদী নরেন্দ্র দাভোদকার, গোবিন্দ পানসেরে এবং কালবুর্গির মৃত্যুও তাঁকে নিজের আপোষহীন সত্যের থেকে একচুলও সরাতে পারেনি।

মৃত্যুর দু-দিন আগে তাঁর এক সতীর্থ সাংবাদিক তাঁকে তাঁর টুইটার পোস্ট প্রসঙ্গে সতর্ক করে কিঞ্চিৎ নরম হতে বলেছিলেন। গৌরী তার উত্তরে বলেছিলেন, “We can’t be so dead. It is human to express and react what we feel impulsively is usually our most honest response.”

গৌরীরা মারা যান না। বর্বরদের শুঁড়িখানার মাটি আলগা করে দেন। সেই মাটিতে যেন আর নতুন কোনও বর্বরতার ফসল না ফলে। গৌরীরা বেঁচে থাকেন আততায়ীদের বুকে চোরাবালি হয়ে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. এক নিশ্বাসে হিটলার, মুসোলিনী, স্ট্যালিন… বেশ বেশ!! তা শেষ জনের স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র তার দেশের মানুষকে পিষে ফেলেছিল! এবং তারই আবার একটা ছোট্ট ভাষণে সেই পিষে যাওয়া মানুষগুলোই উঠে পড়ে পৃথিবীর ইতিহাসের এক মহান বীরত্বপূর্ণ এবং বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধটাও লড়তে নেমে গেছিল এবং জিতেও গেছিল!! আবার সেই যুদ্ধটা ছিল প্রথম জনের বিরুদ্ধে!!! মজার খেলা মাইরি….

    হ্যাঁ, লেখার মূল বক্তব্য সমর্থন করলাম…

আপনার মতামত...