বিদ্বেষই যাদের একমাত্র রাজনীতি, তাদের কাছে সংবিধান, গণতন্ত্র মূল্যহীন

তপোধীর ভট্টাচার্য

 



লেখক ও প্রাবন্ধিক, অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য

 

 

 

অসমে বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ শেষ হয়ে গেছে। আগামী মাসের দুই তারিখ নির্বাচনের ফল ঘোষণা হবে। অর্থাৎ কোনও নতুন সরকার এখনও ক্ষমতায় আসীন নয়, তা সত্ত্বেও বেশ কয়েকবছর আগে থেকে অসমে প্রশাসনের তরফ থেকে যে তীব্র বাঙালি-বিরোধী মনোবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল, অতি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তা আবার আমাদের সামনে চলে এসেছে। করোনার প্রকোপ যখন ধীরে ধীরে তুঙ্গে উঠছে, সেই সুযোগে মানুষের বিপন্নতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে, বিশেষ করে আমরা যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি ও বহু প্রজন্ম ধরে এই অসমেই বসবাস করছি, তাদের প্রতি আবার একটা তীব্র বিদ্বেষ দেখা যাচ্ছে। এখানকার একটা অংশের মানুষ মনে করে যে বাঙালিদের বাঁচার অধিকার নেই, বাংলা ভাষায় কথা বলবার কোনও অধিকার নেই।

আমরা বাঙালিরা মূলত অসমের অসমের দক্ষিণ প্রান্তে বাস করি, যাকে আগে কাছাড় এলাকা বলা হত, এখন বরাক উপত্যকা বলা হয়। বরাক নদীর বিস্তীর্ণ উপত্যকায় আমাদের বহুযুগের বসবাস। ১৯৬১ সালের ১৯ মে এখানকার বাঙালিরা বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করে শহিদ হয়েছিল। এই বছর সেই পবিত্র ভাষা শহিদ দিবসের ষাট বছর পূর্তি আমরা পালন করব। সেই দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ঘোষণা হয়েছিল বরাক উপত্যকায় স্কুলে কলেজে সমস্ত সরকারি কাজে বাংলাভাষাই ব্যবহার করা যাবে এবং আমাদের উপর আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ অহমিয়া ভাষা চাপিয়ে দিতে পারবে না। এরকমটাই হয়ে আসছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বাঙালিমাত্রেই বহিরাগত বানিয়ে তার নাগরিক অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার, জমি-বাড়ি কেনাবেচার অধিকার এমনকি তার শিক্ষাদীক্ষা-চাকরিবাকরির অধিকার কেড়ে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। অসম সরকার অতি তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গে একটি কমিটি তৈরি করেছে, যার মাথায় রয়েছেন হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি টি কে শর্মা। তিনি কুখ্যাত এই কারণে যে তাঁর নিজের কার্যকালে তাঁর এজলাসে যত মামলা যেত, তাতে তিনি একতরফাভাবে বাঙালি-বিরোধী রায় দিতেন। এ হেন লোকটি এই কমিটির চেয়ারম্যান। সে বরাক উপত্যকায় এসেছিল। প্রসঙ্গত, আমরা নাগরিক অধিকার রক্ষা সমন্বয় সমিতি তৈরি করেছি, আমি যার সভাপতি। আমরা সমিতির কয়েকজন ও অন্য অনেকে গিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম এই মর্মে যে অসম চুক্তির এই ছয় নম্বর ধারাটি সম্পূর্ণভাবে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। আমরা সেই হিসেবেই আমাদের বক্তব্য পেশ করেছিলাম। ঐতিহাসিকভাবে বরাক উপত্যকার অংশটি কখনই অসমের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটা এখন তারা জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইছে। বরাক উপত্যকায় আমাদের ছেলেমেয়েরা বাংলাভাষায় পড়াশুনো করে, অনেকে ইচ্ছানুযায়ী ইংরেজি বা হিন্দিতেও পড়াশুনো করে, মণিপুরি ছেলেমেয়েরা যাতে মণিপুরি ভাষাতে পড়াশুনো করতে পারে, তার ব্যবস্থাও রয়েছে। এখন আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এসব কিছু পড়া যাবে না, শুধুমাত্র অ্হমিয়া ভাষাতেই পড়াশুনো করতে হবে। এটা নিয়ে জোরালো আপত্তি জানানোর পরে তারা বেশ কিছুদিন গাঁইগুঁই করে জানিয়েছিল যে কাছাড়ের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হবে। এমন একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি মাসখানেক আগে বিভিন্ন সংবাদপত্রেও বেরিয়েছিল। কিন্তু আসু বা অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন যা অসমে বাঙালি বিদ্বেষের আসল শক্তি এবং অন্য আরেকটি বাঙালি-বিরোধী নতুন শক্তি অসম জাতীয়তাবাদী যুব ছাত্র পরিষদ একজোট হয়ে এই সংশোধনীর বিরোধিতা করায় সরকারপক্ষ তড়িঘড়ি সংশোধনীটি ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম।

কিছুদিন আগে এক সরকারি আমলা পরপর দুবার বিজেপির হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, একবার লোকসভা নির্বাচনে ও গতবার অর্থাৎ পাঁচ বছর আগে অসমের বিধানসভা নির্বাচনে। দুবারই সে তৃতীয় স্থানে ছিল। এই ভদ্রলোকটি এখন অসমে হায়ার সেকেন্ডারি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের প্রধান হয়ে উঠেছে। ওই পদে বসেই কথা নেই বার্তা নেই সে হঠাৎ ঘোষণা করে দিল যে যদি বাঙালিরা অহমিয়া না শেখে, তাহলে তাদের অসমে থাকার কোনও কারণ নেই। সেক্ষেত্রে তোমরা যেখানে খুশি যাও, থাকো, কিন্তু অসম থেকে বেরিয়ে যাও। এটা যে কী ভয়ঙ্কর একটা কথা তা আশা করি আমরা সকলে বুঝতে পারছি।

১৯৪৭ সালে অসমের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, যাঁকে ভারত সরকার পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কারণে ভারতরত্ন উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেছিল, গুয়াহাটি বিমানবন্দর যাঁর নামে, সে গোপীনাথ বরদলই ছিলেন বাঙালি বিদ্বেষের পাণ্ডা। তাঁর আমল থেকেই অসমে বাঙালি বিদ্বেষের ধারা বয়ে চলেছে, কখনও কম, কখনও বেশি। কিন্তু ২০১৪ সালের পর সমস্ত পুঞ্জিভূত ঘৃণা ও বিদ্বেষ নিয়ে অসমের বাঙালির ওপর শাসকশ্রেণি ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অসমের বাঙালিকে এই সুযোগে তারা চিরতরে ধ্বংস করতে চায়। এই হল বিদ্বেষের পরিপ্রেক্ষিত। এখন এই বিদ্বেষ তীব্রতর হচ্ছে, এমনকি নির্বাচনে কে হারল, কে জিতল তারও এরা পরোয়া করে না। এখন এমন একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে আমরা বাঙালিরা বাস করছি।

তার পাশাপাশি এদের হাতে আরেকটি অস্ত্র হল, কোনও কারণ ছাড়াই যাকে-তাকে ডি-ভোটার করে দেওয়া৷ ডি-ভোটার কথাটার অর্থ কোনও পরিচয়পত্র কোনও ব্যক্তির নামের আগে ডি অক্ষরটি থাকবে, এর অর্থ তিনি ডাউটফুল বা সন্দেহজনক ভোটার। বেশ কিছুদিন এ নিয়ে কাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি আবার ডি-ভোটার সংক্রান্ত নোটিস দেওয়া শুরু হয়েছে। অসমে আবার একটু একটু করে করোনা বাড়ছে, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আবার প্রতিদিন দুহাজার-বাইশশো করে সংক্রমণের খবর আসছে, সেই সময় আবার ডি-ভোটার এনআরসি এইসব নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। এবারের নির্বাচনে যদি বিজেপি সরকারের পতন হয়, তাহলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু বিজেপিই যদি পুনরায় ফিরে আসে, তাহলে আমাদের সঙ্কট আরও তীব্রতর হবে। একটি রাজনৈতিক দল রাজ্যের নাগরিক সমাজকে বৈধ ধরে নিয়ে ভোটে জিতে সেই রাজ্যে ক্ষমতায় এসে সেই একই নাগরিক সমাজের একাংশকেই অবৈধ ঘোষণা করছে, এর চেয়ে বড় অন্যায় এবং জাতিবিদ্বেষের নিদর্শন আর কী হতে পারে? তবে বিদ্বেষই যাদের একমাত্র রাজনীতি, তাদের কাছে সংবিধান, গণতন্ত্র এইসব শব্দের কোনও মূল্য নেই।

দুঃখের কথা, আমরা বাঙালিরা এখনও এই সঙ্কটের মুহূর্তে দ্বিধাবিভক্ত। বিজেপি মুসলিমবিদ্বেষী হলেও অসমের বিশেষ ভূ-রাজনীতির কারণে তা আপামর বাঙালির বিরুদ্ধে প্রসারিত হয়েছে। উগ্র জাতিবিদ্বেষী রাজনীতির সামনে হিন্দু কি মুসলমান কোনও বাঙালির নিস্তার নেই। তা না হলে এনআরসির তালিকায় অত বারো লক্ষের অধিক হিন্দু থাকে কেমন করে? এই সমূহ সঙ্কটের সামনে দাঁড়িয়ে এখনও বাঙালি হিন্দু মুসলমান করে চলেছে। তা না হলে গত নির্বাচনে হিন্দু বাঙালিরা এইভাবে ঢেলে বিজেপিকে ভোট দিল কেন? এইবার অবশ্য কী হয় দেখা যাক।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...