পশ্চিমবঙ্গ ২০২১: বামফ্রন্টের বিপর্যয়, বামপন্থার ভবিষ্যৎ

প্রসেনজিৎ বসু  

 



বামপন্থী অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মী

 

 

 

 

 

২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন অনেক কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দুই বছর আগের লোকসভা ভোটে রাজ্যে ১৮টি আসন এবং ৪০ শতাংশ ভোট পাওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যেভাবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে বাংলায় ক্ষমতা দখলের মরিয়া প্রয়াস চালিয়েছে, তা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার রাজনীতিতে অভূতপূর্ব। এই প্রেক্ষিতে, সাম্প্রদায়িক দেশভাগের ফলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এই রাজ্যে বিজেপির হার একদিকে যেমন বঙ্গবাসীর বৃহদংশকে স্বস্তি দিয়েছে, অন্যদিকে কেরল এবং তামিলনাড়ুর বিজেপি-বিরোধী জনাদেশের সঙ্গে মিলে জাতীয় রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনী ফলাফলের এটাই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।

কেন্দ্র-বিরোধী জনাদেশ

২০১৯-এর ভোটে বিজেপি-র কাছে বড়সড় ধাক্কা খাওয়া; তারপর ২০২০-র কোভিড-১৯ অতিমারি, লকডাউন, আমফান ঘূর্ণিঝড়, দেশজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার মতন উপর্যুপরি বিপর্যয়; এর উপর ২০২১-এ আক্রমণাত্মক কেন্দ্রীয় সরকার, পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন এবং তৃণমূল কংগ্রেসের দলত্যাগীদের সম্মিলিত শক্তির মোকাবিলা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দশ বছরের সরকারকে যে রক্ষা করতে পারবেন তা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। বহুমুখী সঙ্কটের মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের ভুলভ্রান্তি, গাফিলতি, দুর্নীতি অনেক কিছুই সামনে এসেছিল। কিন্তু জনগণ সঠিকভাবেই এই সমস্ত সঙ্কটের জন্য রাজ্য সরকারের থেকে বেশি, কেন্দ্রের প্রচার-সর্বস্ব মোদি সরকারের অপদার্থতা এবং জনবিরোধী কার্যকলাপকেই দায়ী করেছে।

একদিকে কৃষক-স্বার্থ বিরোধী তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন; এনআরসি-এনপিআর-সিএএ-র মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু এবং পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার অপচেষ্টা; ব্যাঙ্ক-বিমা থেকে রেল, কয়লা ইত্যাদি শিল্পের ঢালাও বেসরকারিকরণ, শ্রম আইনে পরিবর্তন; পেট্রল-ডিজেল-রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি; এই সবকিছুই মানুষকে মোদি শাসনের বিরুদ্ধে নাড়া দিয়েছে। অন্যদিকে সঙ্কটগ্রস্ত, বিপন্ন জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলির সুরাহা করতে না পারলেও রাজ্য সরকার বিনামূল্যে রেশন, দুয়ারে সরকার, স্বাস্থ্যসাথী ইত্যাদির মাধ্যমে প্রান্তিক, গরিব এবং শ্রমজীবী মানুষকে কিছু রিলিফ পৌঁছে দিয়েছে। এর ফলে শাসকদলের হৃত জনসমর্থন শুধু ফেরতই আসেনি, খানিকটা বেড়েছে।

তদুপরি, আট দফা নির্বাচনের মাঝপথে শীতলকুচির নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ায়, রাজ্য সরকার এবং শাসকদল সংক্রান্ত অনেক ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও হিন্দু-মুসলমান, মহিলা-পুরুষ, দলিত-আদিবাসী-ওবিসি, গ্রাম-শহর নির্বিশেষে মানুষ রাজ্যের নয়, কেন্দ্রের শাসকদলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। সপ্তম এবং অষ্টম দফার ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ২০১৯-এর তুলনায় ভোট ঘুরেছে যথাক্রমে ১৩.৫ শতাংশ এবং ১১ শতাংশ। সব দফা মিলিয়ে লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় তৃণমূলের ভোট বেড়েছে ৩৯.৮ লক্ষ (৫ শতাংশ), অন্যদিকে বিজেপি-র ভোট কমেছে ১.৭৭ লক্ষ (২ শতাংশ)।

অতীতে জোট হিসেবে বামফ্রন্ট অনেকবারই ৫০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পেয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে। কিন্তু ১৯৭২-এর সেই কুখ্যাত নির্বাচন ব্যতীত পশ্চিমবঙ্গে এককভাবে কোনও দলের ৪৮ শতাংশের বেশি ভোট নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার নজির সম্ভবত আর নেই। এই বিপুল জয়ের প্রধান কারণ বাংলার মানুষ বিজেপি-র আগ্রাসনের মুখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেই আস্থা রেখেছে। অবশ্য এই জনাদেশের অপব্যাখ্যা করে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধীদের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ, প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ বজায় রাখলে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেই দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক ইতিহাসে আছে। রাজনৈতিক হিংসার বৃত্ত চলতে থাকলে খুব দ্রুতই সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

১৫ বছরের নিরবিচ্ছিন্ন শক্তিক্ষয়

এই বিধানসভা নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সিপিআইএম এবং বামফ্রন্টের শূন্য আসন প্রাপ্তি। স্বাধীন ভারতে ১৯৫২-র প্রথম বিধানসভা নির্বাচন থেকেই পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ছিল শাসক দল, কম্যুনিস্ট পার্টি প্রধান বিরোধী দল। তারপর ১৯৭৭ থেকে টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট জমানা। ২০১১-তে ক্ষমতা হারানোর দশ বছরের মধ্যে সিপিআইএম-সহ বামফ্রন্টের রাজ্য বিধানসভা থেকে মুছে যাওয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, যা গভীর বিশ্লেষণের দাবি করে।

সিপিআইএম এবং বামফ্রন্টের এই বিপর্যয় কিন্তু আচমকা ঘটেনি। বরং ২০০৬ সালের ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধের’ জয়ের পর থেকে আজ অবধি যতগুলি লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতে সিপিআইএম এবং বামফ্রন্টের ভোট শতাংশ আগের থেকে কমেছে (নিচের সারণী)। অর্থাৎ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে, প্রথমে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এবং গত এক দশক বিরোধী দল হিসেবে সিপিআইএমের শক্তিক্ষরণ হয়ে চলেছে ক্রমাগত। ২০০৬-এর নির্বাচনে গোটা রাজ্যে ভোট পড়েছিল ৩.৯৪ কোটি, বামফ্রন্ট ভোট পেয়েছিল ১.৯৯ কোটি, অর্থাৎ ৫০.৬ শতাংশ। ২০২১-এর নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫.৯৯ কোটি, বামফ্রন্টের ভোট এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৪ লক্ষে বা ৫.৭ শতাংশ।

১৫ বছরে সারা রাজ্যে মোট ইভিএমে পড়া ভোট বেড়েছে দুই কোটি, অথচ বামফ্রন্টের ভোট কমেছে ১.৬৫ কোটি। এর মধ্যে সব থেকে বড় ধস নেমেছিল ২০১৯-এ, যখন প্রায় ১ কোটি ভোট ‘বাম’ থেকে ‘রাম’-এর দিকে চলে যায়। ২০২১-এ সেই ভোট তো ফেরেইনি, বরং বামফ্রন্টের আরও শক্তিক্ষয় হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট এবং সিপিআইএম-এর নির্বাচনী ফলাফল

২০০৬ – ২০২১

২০০৬ ২০০৯ ২০১১ ২০১৪ ২০১৬ ২০১৯ ২০২১
বিধানসভা নির্বাচন লোকসভা নির্বাচন বিধানসভা নির্বাচন লোকসভা নির্বাচন বিধানসভা নির্বাচন লোকসভা নির্বাচন বিধানসভা নির্বাচন
প্রাপ্ত ভোট (কোটি)
বামফ্রন্ট ১.৯৯ ১.৮৫ ১.৯৫ ১.৫২ ১.৪০ ০.৪২ ০.৩৪
সিপিআইএম ১.৪৬ ১.৪১ ১.৪৩ ১.১৭ ১.০৮ ০.৩৫ ০.২৮
রাজ্যে মোট প্রদত্ত ভোট ৩.৯৪ ৪.২৭ ৪.৭৬ ৫.১০ ৫.৩৮ ৫.৭২ ৫.৯৯
প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ (%)
বামফ্রন্ট ৫০.৬ ৪৩.৩ ৪১.১ ২৯.৯ ২৫.৭ ৭.৫ ৫.৭
সিপিআইএম ৩৭.১ ৩৩.১ ৩০.১ ২৩.০ ১৯.৮ ৬.৩ ৪.৭
আসন সংখ্যা
২৯৪ ৪২ ২৯৪ ৪২ ২৯৪ ৪২ ২৯২
বামফ্রন্ট ২৩৩ ১৫ ৬২ ০২ ৩২ ০০ ০০
সিপিআইএম ১৭৬ ০৯ ৪০ ০২ ২৬ ০০ ০০

 তথ্যসূত্রঃ https://eci.gov.in/ & https://lokdhaba.ashoka.edu.in/

কেন ২০১১-তে বাম সরকারের পতন ঘটল তা নিয়ে আজ অবধি সিপিআইএম কোনও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করে উঠতে পারেনি। তাই আজও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয় ‘বিরোধীদের চক্রান্ত’ হিসেবে; এটা ২০২১-এর নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার আগেও ঘটেছে। অথচ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সংঘাত কোনও দুর্ঘটনা ছিল না। ঔপনিবেশিক ১৮৯৪ আইনের মাধ্যমে জোর খাটিয়ে জমি অধিগ্রহণ, সালিম গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত স্পেশাল ইকনমিক জোন, এগুলো সবই ছিল উন্নয়নের নয়া উদারবাদী মডেলের বিভিন্ন অঙ্গ, যেগুলি অন্যান্য রাজ্যে সিপিআইএম-সহ সমস্ত বামপন্থীরা বিরোধিতা করে। বিকল্প নীতির রাস্তা ছেড়ে, ‘গুজরাট মডেল’-এর অনুসরণে, নয়া উদারবাদী উন্নয়নের পথে বামফ্রন্ট সরকারের চলার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত দ্বিচারিতা, সেটাই সিপিআইএমের মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক সঙ্কটকে ডেকে আনে।

চিন, ভিয়েতনামের দোহাই দিয়ে সেটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও তাতে সিপিআইএমের কর্মসূচিগত বিভ্রান্তি কাটার বদলে আরও ঘনীভূত হয়েছে। পার্টির উচিত ছিল এতদিনে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের বিপর্যয়ের জন্য রাজ্যবাসীর কাছে দ্ব্যর্থহীনভাবে ভুল স্বীকার করা এবং নয়া উদারবাদকে পরিত্যাগ করে যথার্থ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারি, জনমুখী শিল্পায়ন এবং মানবোন্নয়নের কর্মসূচি গ্রহণ করা— যেমন সারা রাজ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩০০-র বেশি কারখানায় আটকে থাকা ৪৮০০০ একর জমিতে অবিলম্বে নতুন, পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপন করার পরিকল্পনা। এইরকম শুদ্ধিকরণ তো হলই না, উপরন্তু সানন্দে ন্যানো গাড়ির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও সিপিআইএম-এর ছোট-বড় নেতাদের অরণ্যে ন্যানো-রোদন এখনও থামল না। সেই নাকিকান্না কি পূরণ করতে পারবে গ্রামবাংলার লক্ষ লক্ষ মইদুলদের কর্মসংস্থানের দাবি?

দ্বিতীয়ত, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রকে কতটা বিকশিত করা গেছিল তা নিয়ে সিপিআইএম নেতৃত্বের না আছে কোনওরকম আত্মসমালোচনা, না কোনও নতুন চিন্তাভাবনা। তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় রাজ্যের পঞ্চায়েত-পুরসভা ব্যবস্থা যেভাবে বাস্তুঘুঘুদের বাসায় পরিণত হয়েছে, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে স্থানীয় মাফিয়া-সিন্ডিকেট, সেই পচনের সূচনা তো বাম-জমানার প্রোমোটার-রাজের হাত ধরেই। তার বিকল্প হিসেবে বিকেন্দ্রীকৃত গণতন্ত্র, গ্রামাঞ্চলে সমবায়-ভিত্তিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ, দায়িত্বপূর্ণ প্রশাসন; এই সংক্রান্ত আধুনিক সংস্কার-ভাবনা কোথায়? স্থানীয় উন্নয়নের কোনও বিকল্প দিশা না দেখিয়ে, কেবল তৃণমূল কংগ্রেসের সিন্ডিকেট-কাটমানি-রাজের ফাঁকা সমালোচনায় সিপিআইএম নেতারা হুবহু বিজেপি-র সুরেই সুর মিলিয়েছেন। এর ফলে মানুষ ডান আর বামে কোনও ফারাক করতে পারেনি।

তৃতীয়ত, বাম জমানায় রাজ্যের দলিত, আদিবাসী এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্তদের সামাজিক ন্যায় সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকরী কর্মসূচির স্পষ্ট অভাব ছিল। আজ রাজবংশী, নমশূদ্র-সহ বাংলার সমগ্র দলিত সমাজ তৃণমূল আর বিজেপি-র মধ্যেই বিভক্ত। ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ নিয়ে অযৌক্তিক ছুৎমার্গিতার কারণে বামপন্থীরা তাঁদের কথা আলাদা করে ভাবেননি, তাই তাঁরাও মুখ ফিরিয়েছেন। এই গোঁড়ামি আসলে বাম রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের আধিপত্যেরই পরিণাম, যার ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলি, বিশেষত সিপিআইএম-এর পার্টি সংগঠন এবং গণসংগঠনগুলি এখনও বর্ণহিন্দু নেতৃত্বের হাতেই কুক্ষিগত। বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘদিনের শিক্ষামন্ত্রী, এবং দলিত উদ্বাস্তু নেতা কান্তি বিশ্বাস এই সমালোচনা অনেকদিন আগেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

কেরল বা অন্যান্য দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে বামপন্থী রাজনীতি বা সংগঠনের চেহারা কিন্তু এইরকম নয়, কারণ তাঁরা বেশ কয়েক দশক আগের থেকেই মার্ক্সবাদের সঙ্গে জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রী ফুলে, বাবাসাহেব আম্বেদকর, রামস্বামী পেরিয়ার বা নারায়ণ গুরুর মতন ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী অথবা যুক্তিবাদী দেশজ চিন্তাধারাগুলোকে আত্মস্থ করতে পেরেছে। অথচ বাংলার বামপন্থীরা এখনও রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর-শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রগতিশীল, ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী চিন্তাভাবনাকেও গ্রহণ করার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।

বিজেপি নাগরিকত্বের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মতুয়া উদ্বাস্তুদের সমর্থন আদায় করেছে। হাতেগোনা কিছু ব্যতিক্রম বাদে একসময়ের উদ্বাস্তু আন্দোলনের অগ্রণী বামপন্থীরা বেশিরভাগই আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। জঙ্গলমহল থেকে উত্তরবঙ্গের চা বাগান, আদিবাসীরাও তাঁদের ভবিষ্যৎ আর লাল ঝাণ্ডার মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন না। লোকনীতি-সিএসডিএস-এর ২০২১-এর পোস্ট-পোল সার্ভে দেখাচ্ছে সারা রাজ্যের ৫০ শতাংশ মহিলা তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছেন, খুব গরিব এবং নিম্নবিত্ত মহিলাদের মধ্যে শতাংশ আরও বেশি। বাকিরা দিয়েছেন বিজেপিকে। আদিবাসী হোক বা মহিলারা, সামাজিক ন্যায় সংক্রান্ত ভ্রান্ত বোঝাপড়ার কারণেই আজ সিপিআইএম এবং বামফ্রন্ট এঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক পশ্চাৎপদতা তিন দশকের বামশাসনে যে কাটেনি সেটা সাচার কমিটির রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির সর্বস্তরে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করা এবং ব্যাপকহারে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায়নের জন্য লড়াই করার কঠিন পথে হাঁটার ধৈর্য সিপিআইএম দেখাতে পারেনি। গত দশ বছরে বিরোধী দল হিসেবে বামফ্রন্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তোষণের’ রাজনীতির সমালোচনা করেছে, কিন্তু সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের কোনও বিকল্প প্রগতিশীল পথ দেখাতে পারেনি। সাচার কমিটির রিপোর্টের সুপারিশগুলি পশ্চিমবঙ্গে আদৌ কার্যকর হল কিনা, সেই নিয়ে বামপন্থীদের কোনও হেলদোল লক্ষ করা যায়নি। অথচ ঠিক ২০২১-এর নির্বাচনের আগে দক্ষিণবঙ্গের মুসলিম প্রধান আসনগুলিতে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে তৃণমূলে কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোট কাটার লক্ষে পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সিপিআইএম আখেরে নিজেদের আরও ক্ষতি করেছে। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দ্বিচারিতা করার অভিযোগ উঠেছে।

২০২১-এ বামফ্রন্ট শূন্য

এই নির্বাচনে সিপিআইএম এবং বামফ্রন্টের মূল লাইন এবং স্লোগানটাই ছিল বিভ্রান্তিকর। ‘বিজেমূল’ তত্ত্বটা একেবারেই ভুল, কারণ বিজেপি কোনও সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়, ওরা আরএসএস-এর একটি শাখা সংগঠন। আরএসএস ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের বহুত্ববাদী মতাদর্শের ভিত্তিতে নির্মিত, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সংবিধানকে বদলে একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী, সাম্প্রদায়িক এবং স্বৈরাচারী হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়। বিজেপি থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, এভিবিপি, ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ, স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, সরস্বতী শিশু মন্দির ইত্যাদি সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন সদস্য সংগঠনের লক্ষ্য কিন্তু একটাই— হিন্দুরাষ্ট্র।

তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা অন্যান্য বুর্জোয়া দলগুলি যতই অনিষ্ট অথবা কুকীর্তি করুক তারা কেউই এই মারাত্মক ফ্যাসিবাদী অ্যাজেন্ডায় চালিত নয়; তাই এদের কাউকেই বিজেপির সঙ্গে এক পঙক্তিতে ফেলা যায় না। এর মানে অবশ্যই এই নয় যে বামপন্থীদের বিজেপি-র বিরোধিতা করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেস বা কংগ্রেসের লেজুড়বৃত্তি করতে হবে। তবে বাংলায় ক্ষমতার চৌকাঠে দাঁড়ানো বিজেপিকে মূল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারাটাই ২০২১-এর নির্বাচনে সিপিআইএমের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল।

দ্বিতীয়ত, অন্যান্য শরিকদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিপিআইএম চাপ দিয়ে একদিকে কংগ্রেস দল এবং অন্যদিকে আব্বাস সিদ্দিকীর আইএসএফ-এর সঙ্গে ‘সংযুক্ত মোর্চা’ নামে নির্বাচনী জোট করে। আইএসএফ-এর আবার নির্বাচন কমিশনে রেজিস্ট্রিকৃত নাম রাষ্ট্রীয় সেকুলার মজলিশ পার্টি, ওই ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’-এর কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই। এই সংযুক্ত মোর্চার না ছিল কোনও স্বচ্ছ, প্রগতিশীল কর্মসূচি, না হয়েছিল সঠিকভাবে আসন বণ্টন। ব্রিগেড সমাবেশের মঞ্চেই এই জগাখিচুড়ি জোটের অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে। ফলে নির্বাচনে এই জোটকে জনগণ প্রত্যাশিতভাবেই প্রত্যাখ্যান করে।

২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত শূন্য আসন বামফ্রন্ট এবং সিপিআইএমের ঐতিহাসিকভাবে সব থেকে খারাপ নির্বাচনী ফলাফল। বামফ্রন্টের লড়া ১৭৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৯টি আসনে জামানত রক্ষা হয়েছে, অর্থাৎ প্রাপ্ত ভোট মোট ভোটের ১৬.৬৭ শতাংশ। বাকি ১৬০টি আসনে বামফ্রন্টের জমানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বামেদের লড়া আসনগুলির মধ্যে একমাত্র সিপিআইএম চারটি সিটে দ্বিতীয় আসতে পেরেছে, যার তিনটি মুর্শিদাবাদ জেলায়— ডোমকল, ভগবানগোলা, জলঙ্গি; অন্যটি যাদবপুর। বাকি সমস্ত আসনে বামফ্রন্ট হয় তৃতীয় বা তারও নিচের স্থানে আছে। কংগ্রেসের অবস্থাও তথৈবচ, ৯১টি আসন লড়ে জেতা আসন শূন্য, জমানত রক্ষা ১২ টি আসনে, জামানত বাজেয়াপ্ত ৭৯ আসনে, ৫টি আসনে দ্বিতীয়, বাকি আসনে তৃতীয় বা তারও নিচে।

নতুন দল হিসেবে রাষ্ট্রীয় সেকুলার মজলিশ পার্টি ৩২টি আসনে লড়ে সংযুক্ত মোর্চার হয়ে একমাত্র ভাঙড় আসনটি জিততে পেরেছে, আরও ৮টি আসনে জামানত রক্ষা হয়েছে, ২৩টি আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এখানে যেটা উল্লেখযোগ্য, রাষ্ট্রীয় সেকুলার মজলিশ পার্টির জামানত রক্ষা পেয়েছে যে ৯টি আসনে, সেগুলি প্রত্যেকটি উত্তর বা দক্ষিণ ২৪ পরগণার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসন, তার মধ্যে ৭টিতেই সংখ্যালঘু প্রার্থী ছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার ভেক ধরে আইএসএফ-এর নামে প্রচার করে, দলিত-আদিবাসীদের সামিল করার কথা বলে, বহুজন রাজনীতির মোড়কে রাষ্ট্রীয় সেকুলার মজলিশ পার্টি নির্বাচন লড়লেও আদতে দুই ২৪ পরগণায় তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোট কাটাই যে আব্বাস সিদ্দিকি এবং তার জোটসঙ্গী সিপিআইএমের মূল লক্ষ্য ছিল সেটা ভোটের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।

এটা নির্বাচনের আগেই বুঝতে পেরে সংখ্যালঘু ভোটারদের বহুলাংশ কোথাওই সংযুক্ত মোর্চা, বিশেষত রাষ্ট্রীয় সেকুলার মজলিশ পার্টিকে ভোট দেয়নি। বরং লোকনীতি-সিএসডিএস-এর পোস্ট-পোল সার্ভে দেখাচ্ছে সারা রাজ্যে মুসলমান ভোটারদের ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১৬-র তুলনায় কম সংখ্যায় সংখ্যালঘু প্রার্থী দেওয়া সত্ত্বেও বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলেই সংখ্যালঘুরা আস্থা রেখেছে।

পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু অধ্যুষিত উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়ার কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিজেপি-র বিরুদ্ধে, বামফ্রন্টের কিছু প্রগতিশীল প্রার্থীদের সমর্থনে প্রচার চালানো হয়েছিল। নাগরিকত্ব সুরক্ষা আন্দোলনের এই প্রচারের সব থেকে স্পষ্ট প্রভাব চোখে পড়ে হাবড়া আসনে। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপি এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর থেকে ১৯ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে ছিল। এবারে হাবড়ায় বিজেপি-র ভোট কমেছে ৫ শতাংশ, তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট বেড়েছে ৬ শতাংশ-র বেশি আর বামফ্রন্ট প্রার্থীও ভোট বাড়িয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। ফলস্বরূপ বিজেপি এই আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে ৩৮৪১ ভোটে হেরেছে।

গাইঘাটা সংরক্ষিত আসনেও লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির ভোট কমেছে, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট প্রার্থীর ভোট বেড়েছে, যদিও পর্যাপ্ত মাত্রায় এটা না বাড়ায় বিজেপি কম ব্যবধানে হলেও আসন জিতে গেছে। এই ভূমিকা যদি বামফ্রন্ট রাজ্যজুড়ে নিতে পারত তাহলে বিজেপির রাজ্যব্যাপী ভোট আরও কমত, বামফ্রন্টের ভোটের হারও হয়তো আরও বাড়ত।

প্রাপ্ত ভোটের বিশ্লেষণ

এই করুণ ফলাফলের পরেও সিপিআইএমের একটি অংশ দাবি করছে যে এই জোট করে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় নাকি বামেদের ভোট বেড়েছে। আবার উত্তর ২৪ পরগণার একজন প্রাক্তন বিধায়ক-সহ সিপিআইএমের আরেকটি অংশের দাবি ২০১৬-য় কংগ্রেসের সঙ্গে জোটটা ঠিকই ছিল, আইএসএফ-কে সঙ্গে নেওয়ার ফলেই গোলমাল হয়েছে। ভোটের তথ্য কী বলছে?

২০১৯-এ বামফ্রন্টের মোট প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪২.৬৯ লক্ষ, শতাংশের হিসেবে ৭.৫ শতাংশ। সিপিআইএমের এককভাবে ছিল ৩৫.৯৪ লক্ষ বা ৬.৩ শতাংশ। ২০২১-এ বামফ্রন্টের মোট প্রাপ্ত ভোট ৩৪ লক্ষ, শতাংশে ৫.৭ শতাংশ। সিপিআইএমের এককভাবে ২৮.৩৭ লক্ষ বা বা ৪.৭ শতাংশ। সারা রাজ্যের মোট ভোটের হিসেবে বামফ্রন্টের ভোট ২০১৯-এর তুলনায় কমেছে ৮ লক্ষেরও বেশি, অর্থাৎ ১.৮ শতাংশ। ২০১৯-এ বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসের জোট ছিল না। ফলে বামফ্রন্ট ৪১ লোকসভা আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, অর্থাৎ ২৮৭টি বিধানসভা কেন্দ্রে। রাজ্যের মোট প্রাপ্ত ভোট নয়, বামফ্রন্টের লড়া শুধু এই আসনগুলিতে বাম প্রার্থীদের গড় ভোটের হিসেবে ২০১৯ থেকে ২০২১-এ খুব অল্প কয়েক শতাংশ ভোট বেড়েছে।

উদাহরণস্বরূপ সিপিআইএম ২০১৯-এ ৩১ লোকসভা আসনে, অর্থাৎ ২১৭ বিধানসভা কেন্দ্রে লড়েছিল; প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কেন্দ্রে গড় ভোট পেয়েছিল ৮.৫ শতাংশ; ২০২১ সিপিআইএম লড়েছে ১৩৮ আসনে, গড় ভোট ৯.৯ শতাংশ। এখানে উল্লেখযোগ্য যে তৃণমূলের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কেন্দ্রে গড় ভোট ২০১৯ থেকে ২০২১-এ বেড়েছে ৪৩.৩ থেকে ৪৮.৫, বিজেপি-র কমেছে ৪০.৩ শতাংশ থেকে ৩৮.৩ শতাংশ, কংগ্রেসের বেড়েছে ৫.৯ শতাংশ থেকে ৯.৭৩ শতাংশ, ফরওয়ার্ড ব্লকের বেড়েছে ৫.৬ শতাংশ থেকে ৭.৪ শতাংশ, আরএসপি-র বেড়েছে ৪ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ; অর্থাৎ বিজেপি ছাড়া এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কেন্দ্রে গড় ভোট সকলেরই অল্প মাত্রায় বেড়েছে। কিন্তু হারজিত নির্ণয়ে এই সামান্য বৃদ্ধির কোনও প্রভাব নেই।

বরং ২০১৬-র সঙ্গে তুলনা করলেই এই হিসেবের আসল চিত্রটা বেরিয়ে পড়ে। ২০১৯-এ জোট হয়নি, ২০১৬-তে হয়েছিল, আবার ২০২১-এ হয়েছে। ২০১৬-তে সিপিআইএম ১৪৮ কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে গড় ভোট পেয়েছিল ৩৮.৬ শতাংশ। ২০২১-এ ১৩৮ কেন্দ্রে লড়ে সিপিআইএমের গড় ভোট ৯.৯ শতাংশ। অর্থাৎ এই হিসেবেও সিপিআইএমের জনসমর্থনের ধসটা পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।

২০১৬-তে বাম-কংগ্রেস জোট হয়েছিল, বামফ্রন্ট ২০৭টি আসনে লড়ে পেয়েছিল ১.৪০ কোটি ভোট, কংগ্রেস ৯২ সিট লড়ে পেয়েছিল ৬৭ লক্ষ ভোট। ২০১৬-তে জোটের সম্মিলিত ভোট ছিল ২.০৭ কোটি। ২০২১-এ বামফ্রন্ট ১৭৯ আসনে লড়ে পেয়েছে মাত্র ৩৪ লক্ষ ভোট, কংগ্রেস ৯১ সিট লড়ে ১৭.৬ লক্ষ আর আব্বাস সিদ্দিকির আইএসএফ ৩২ আসন লড়ে ৮.১৩ লক্ষ ভোট পেয়েছে। ২০২১-এর ‘সংযুক্ত মোর্চা’-র মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই মাত্র ১০ আসনে হয়েছে; তুলনায় ২০১৬-তে ১৪টি বিধানসভা আসনে বাম-কংগ্রেস বন্ধুত্বপূর্ণ লড়াই হয়েছিল। বাম-কংগ্রেস জোটে আইএসএফ-কে সামিল করা সত্ত্বেও ২০১৬-র জোটের সম্মিলিত ভোট ২.০৭ কোটি থেকে কমে ২০২১-এ মাত্র ৫৯.৭ লক্ষতে এসে ঠেকেছে, অর্থাৎ ৩৮ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১০ শতাংশে।

২০২১-এ এসেই যে এই জোটের ভরাডুবি হয়েছে, তা কিন্তু নয়। ২০১৬-তে জোট করা সত্ত্বেও তার আগের তুলনায় বামফ্রন্ট এবং সিপিআইএমের ভোট কমেছিল, আর বামফ্রন্ট কংগ্রেসের দ্বিগুণ সিট লড়লেও শেষপর্যন্ত কংগ্রেসের থেকে ১২ সিট কম জিতে বিধানসভায় তৃতীয় স্থানে চলে যায়, বিরোধী দলনেতা হয়ে যায় কংগ্রেস থেকে। আসলে কংগ্রেসের সঙ্গে হোক বা আইএসএফের, বিগত দুটি বিধানসভা নির্বাচনেই বামফ্রন্ট সুবিধাবাদী, নীতিহীন জোট করেছে যেটা জনগণ বারংবার প্রত্যাখ্যান করেছে।

বেঙ্গল লাইনেই বিপর্যয়

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঘটনার পরবর্তী সময়ে যত বামফ্রন্ট এবং সিপিআইএমের জনসমর্থন এবং ভোট কমেছে, ততই পশ্চিমবঙ্গের পার্টি নেতৃত্ব আরও বেশি জেদ ধরেছেন এবং ‘বেঙ্গল লাইন’-এর নামে পার্টির কেন্দ্রীয় লাইনকে ইচ্ছাকৃতভাবে বারংবার ভেঙেছেন। ২০১২-র রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের মধ্যে ‘ফাটল’ ধরাতে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে সমর্থন করার থেকে ২০১৬-র নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে সুবিধাবাদী জোট, এবং সর্বশেষ ২০২১-এ বাংলায় বিজেপি-র চূড়ান্ত আগ্রাসনের মুখে ‘বিজেমূলের’ দেউলিয়া তত্ত্ব নামিয়ে কংগ্রেস এবং আইএসএফের সঙ্গে ফের জোটের ঘোঁট, এই সবই সেই কুখ্যাত ‘বেঙ্গল লাইন’-এর পরিণতি। এই ভুল লাইনে চলার জন্যেই পার্টি এবং বামফ্রন্টটা উঠে যাচ্ছে, যেটা ১৯৬০-৭০-এর দশকে সিপিআই-এর সঙ্গে হয়েছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা সিপিআইএম-এর  অভ্যন্তরে আন্তঃপার্টি সংগ্রামও আজ আর সেভাবে নেই। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে নানারকম মতাদর্শগত আপস করতে করতে রাজ্য নেতৃত্বও আজ লড়াই করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ক্ষমতা হারানোর পরেও বিরোধী পরিসরে গত দশ বছরে কোনও ইস্যুতেই বড়সড় গণআন্দোলন গড়ে তুলতে সিপিআইএম-এর নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে। বামফ্রন্টের আন্দোলনের মানে দাঁড়িয়েছে বছরে একদিন ধর্মীয় আচারের মতন সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া, যেগুলোতে আজকাল শ্রমজীবীদের বৃহদংশই অংশগ্রহণ করেন না। আর নির্বাচনের আগে একটা করে নবান্ন অভিযান। নির্বাচন এসে গেলে আজ এই অফিসে, কাল ওই অফিসে দৌড়াদৌড়ি করে সেই জোট-জোট খেলা। সবটাই চলছে একটা যান্ত্রিক রুটিনে।

১৯৬০-৭০-এর দশকে গণ-আন্দোলনের ঢেউ তুলে রাজ্যব্যাপী প্রভাব এবং সংগঠন বিস্তার করেছিল যে সিপিআইএম এবং বামফ্রন্ট, আজ তার নেতৃত্ব ভুগছে চূড়ান্ত আন্দোলন বিমুখতায়।

এনআরসি-এনপিআর-সিএএ ২০০৩-সিএএ ২০১৯-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল বাংলা থেকেই, যা পরবর্তীকালে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফরওয়ার্ড ব্লক বা সিপিআই-এর নেতৃত্বের একাংশ যদিও বা এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে, সিপিআইএম-এর রাজ্য নেতৃত্ব এই আন্দোলনের প্রতি দেখিয়েছে চরম ঔদাসীন্য এবং সঙ্কীর্ণমনস্কতা। জনগণের থেকে পার্টির বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণগুলি খুঁজতে বেশি দূরে যাওয়ার তাই আর দরকার পড়ে না।  ২০২১-এর ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পরেও কি পশ্চিমবঙ্গের সিপিআইএম নেতৃত্বের হুঁশ ফিরবে? এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ।

অন্যদিকে বিজেপি এই নির্বাচনে হেরেছে ঠিকই, কিন্তু ওরা ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে, জিতেছে ৭৭টি আসন। এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বাংলায় পুনরায় কোণঠাসা করতে, প্রগতিশীল গণ-আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন জরুরি, যা এই ‘বেঙ্গল লাইন’-এর নাগপাশ থেকে বামপন্থাকে মুক্তি দিতে পারে। সেই পুনরুজ্জীবন যেমন ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের হাত ধরে হওয়া মুশকিল, তেমনি তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃর লেজুড়বৃত্তি করেও তা হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বামপন্থার মতাদর্শগত নবীকরণ এবং স্বাধীন, বলিষ্ঠ রাজনৈতিক উদ্যোগের। জনগণের বড় অংশই আজ এইরকম প্রচেষ্টার জন্য অপেক্ষারত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. সিপিএমের লোকগুলো যে আদৌ কিছু বোঝে না, সত্যি সত্যিই সেটাই এরা ‘বোঝে না’ বলবো না, বলবো ‘বুঝতে ছয় না’ !
    কথায় বলে না, “আমাকে বোঝায় কোন্ শালা !”– এদের হয়েছে এই দশা !
    এদের কাছে বোধের উদয় আশা করা আর মরুভূমিতে হিসি করা একই ব্যাপার !
    ছাগল কি আর গাছে ফলে !?!!?

  2. সংগঠন কে পাড়া স্তর থেকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে , পলিটবুৰে এর গোড়ামি দূর করতে হবে সর্ব অগ্রে নতুন দের হাতে দায়িত্ব দিয়ে বুড়ো দের সরে যেতে হবে

Leave a Reply to Anonymous Cancel reply