ফেরদৌস নাহার

সমাধি ভ্রমণ

 

ক.

সমাধির কাছে গিয়ে কী লাভ
মৃত মানুষ তো ফিরে আসে না!
ভালোবাসা মাটি হয়ে মিশে গেছে
মৃতের ফসিল, জেগে না ঘুমিয়ে
কিছুই জানি না!
না জেনেও ফিরে আসি তার কাছে
সমাধি আইল ধরে হাঁটি আর ভাবি—
কী লাভ! কী লাভ! তাও তো আসি

দুপুরের তীব্র রোদ মলিন হয়ে এলে
শুরু হয় সমাধি ভ্রমণ, একাকী বিজন
নির্জন, হুহু বাতাস, প্রাচীন গন্ধ মাতন
জড়িয়ে কুঁকিয়ে ওঠে, তাও তো ডাকে
সেখানে কেন যে ভালো লাগে
জানি না!

লোকাস্ট, মেপল, পাইনের ছায়ায় পরস্পর
কাছাকাছি থাকি, এপিটাফে লেখা আছে
আফ্রিকান দম্পতির পরিচয়, তার পাশে
সিংহল সমুদ্র বেয়ে আসা অভিবাসী
কারও কারও নামের সাথে ছবি
ভালো করে চেয়ে দেখি তাদের চোখে
অন্য এক মহাদেশ এখনও জেগে আছে
ফেলে আসা অন্য নামে, পরিচয় ভাঙে
এখানে নিবিড় ঘুমানোর আগে
একবারও কি মনে পড়ে সিলনের আকাশ!

 

খ.

এই কঠিন নিদাঘ দুপুরে কিছু পাখি
সমাধিতেও আসে। ঘুরে মরে আকাশের ঘাটে
সমস্ত আগুনের উপবাস শেষে গ্রহণ করে তারা
স্মৃতির আহার। আমাকেও সঙ্গে রাখে, একত্রে খাই
পাথরের থালায় সাজাই নৈঃশব্দ্যের তুমুলতা
মাখন গড়ন কিছু উড়ু উড়ু হাত
এখানে এসেছি দেখে ভালোলাগা ভালোবাসা
কেঁপে কেঁপে ওঠে, তার কোনও নাম নেই
পাখিদের জিজ্ঞেস করি, বল তো কেন আসি
কী এর নাম!
পাখি কেবল পাখা মেলে উড়ে উড়ে ঘুরে
বিরান বিষণ্ন এক চক্রাকার ঠোঁটে
বলে ওঠে, নাই নাই নাই ওরে কিছু নাই
পাবার আশায় ফিরে-আসা চিরকাল ডাকবেই
তবু
নাই নাই অবিশ্রাম ধুলো ওড়ায়

আমি দেখি
আমার ও সমাধির মিলিত যোগাসনে
নন্দন সভা বসেছে প্রকৃতির দেহ-অন্তরে
আলপনা চাদর গুটায় খুব ধীরে
সমাধি ভ্রামণিক একা খুঁজে বেড়াই
কতদূর চলে গেছে এই ছবি
আফ্রিকা, এশিয়ার বুকের ভেতর হাত দিলে
শুনতেও পারো সেই ধুক ধুক ধ্বনি

 

গ.

এইসব দূর দেশ, মাঝে মাঝে অসহ্য আত্মবিস্মরণ
মনে করি তাহার স্মরণ, ভুলে যাওয়া দিনলিপি
মুছে যাওয়া তারিখ বছরের পর বছর
খোঁটা দিয়ে বলে— এই কি তোমার স্মরণ!

পশ্চিমে সূর্যোদয়, পুবের সূর্যাস্ত
নিভু নিভু বাতাসের মৃদু আলাপন
কত দিন ও রাত্রির আলোছায়ায় এঁকে গেছে
শিলালিপি ছবি
তবু মনে পড়ার এ কোন প্রস্তুতি, এ কোন যাত্রা!
মাদল বাজিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে খুব একান্ত সমাধি

অবিশ্বাসী নিশ্বাসের ঘড়ি ঢং ঢং বাজে
চমকে ফিরে তাকাই, ঘনঘোর বিজনতা
আমাকে বিশ্বাস করো, আমি জানি—
তারও চেয়ে দামী এই প্রকৃতি যাপন এবং
শ্বেত রং পোশাকের মন্ত্র-উচ্চারণ

পাখিদের নিয়মিত খুদ দেই
পাখিরা এসে বসে কাছে, নিমেষের গল্প করি
ওরা এই সমাধির ইতিহাস জানে
কারা যায়, কারা আসে
কত কেউ একান্ত নির্জন অশ্রু সজল চোখে
বাইবেল থেকে বিদায়ের স্তোত্র পাঠ করে
বিবর্ণ স্বরে, বলে—
ভালো থেকো, ভালো থেকো হে আত্মার সাথী
উড়ে যাচ্ছ বহুদূরে, নিয়ে যাচ্ছ ঘুমন্ত মন্ত্রণা
শরবিদ্ধ কলিজার হাসি, তবু ভালো থেকো তুমি
সমাধি ভ্রমণ করি পাখি ও তাহাদেরই সাথে

 

ঘ.

যে তোমাকে মনে করে মেখেছে আলোর রেণু
তাকে দেখতে আসো না কেন? কেন ঘুম
এখানে প্রবল করে রাখে, আর তারা থেকে থেকে
হৃৎপিণ্ডের ধুক-ধুক একাগ্র দুপুরের ধ্বনি
মন্ত্রের মতো ধ্যানস্থ লেগে থাকে পোশাকের ভেতর
দিন শেষ একটানা বিচ্ছিন্ন অনুরোধ—
ভুলে যেও না আমাকে!
কে যে কাঁদে!
হেঁটে হেঁটে খুঁজে ফিরি, পাখিদের বাসা দূরে ভাসে
মেপলের দিনে নরম স্পর্শ নিয়ে এসেছে যে কাছে
বিভ্রম আনন্দে তার জল-জীবন কাঁপে

ও আমার সমাধি ভ্রমণ, দুপুর এবং একান্ত আবৃত্তি
তোমার এপিটাফে এক এক করে গান গায়
চিরকালের সেই পাখি
যার আত্মা ঘুরে ফেরে মৃতের নগরে
দেহ থাকে ভ্রমণের দিনলিপি লিখে
রেখে আসে নিঃশব্দে একান্ত টানে
যে সমাধি ভেসে গেছে এপিটাফ প্লাবনে
সেখানে আরেক জন্মে দেখা হবে ক্লাব বা সমিতি গ্রহণে

এই ঘাসের নিচে মাটির আলিঙ্গন, হেঁটে হেঁটে কথা বলে
যেতে যেতে মাঝে মাঝে ঊর্ধ্বশ্বাস পেরিস্কোপ মুডে
দৈব যোগাযোগের প্রো্পেলার ঘুরে ওঠে
সহসাই মনে হয়—
রেশমীর সমাধিতে আজও যাওয়া হল না আমার…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...