অন্তর চক্রবর্তী

অভয়ের পাঁচালি

 

১)

লেখা আসছে না। লেখা আসছে না কিছুতেই। আখরোট-আলোর হতচ্ছাড়া খটখটে মাথা চানঘরের আয়নায় একনাগাড়ে ফিকফিক করছে। উস্কোখুস্কো একবগগা ঝোপজঙ্গলের মতো চুলগুলো রীতিমতো জাঁকিয়ে বসেছে কপালের সামনে। খিদেমাখা ছুরি দিয়ে ভুরুর মাঝখানটি খুঁড়ে, নরমসরম পৃথিবীতে ঢুকে পড়ারও জো নেই আজ। একেই পুড়ে কাঠ হওয়া বরাত, তার উপর ভয়। লেখা আসছে না। লেখা আসছে না কিছুতেই। রাগ হচ্ছে। ভীষণ রাগ হচ্ছে অভয় বিশ্বাসের। আয়না ঘোলা হয়ে এল। ফুরিয়ে এল চানঘরের জল। বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াচ্ছে অভয়। একমনে আকাশের দিকে চেয়ে হাঁটছে, হাঁটছে। চুলের শুকনো জঙ্গল সরিয়ে চোখের কোণায় ঝুলে পড়ছে শ্যামলা কান্নায় ভরা রাশিরাশি পোয়াতি মেঘ। সেদিকে হুঁশ নেই অভয় বিশ্বাসের। হেঁটে যাচ্ছে শুধুই। আরও, আরও দূরে …

 

২)

হলদে চারদেয়ালের মাঝে একখানা পেল্লায় লেখা লিখে, ভরপেট সাঁটিয়ে, এইমাত্র অভয় বিশ্বাস ঢুকে পড়ল ভাতঘুমে। চতুর্দিকে দক্ষযজ্ঞ। ঝড়। শিরশিরে হাওয়া। অথচ ঘুমের ভিতরটা মসৃণ। জোছনাভর্তি পুকুর। হালকা কাত হয়ে থাকা বকুলগাছে নিবিড় হ্যালান দিয়ে বসে আছে অভয়। হাতে খসখস করছে সেই তাজা লেখা। একটু পরেই বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে এসে পড়বেন উত্তম মাঝি। ছিপছিপে দোহারা গড়ন, ঝাপসা চশমা ছাপিয়ে তেমনই জ্বলজ্বলে চাউনি। অভয় ভাবে, উত্তমদাও পারেন মাইরি। বছরচল্লিশেক আগে দুম করে বেপাত্তা। সেই থেকে ঘুমের ভিতর এই পুকুরঘাট ছাড়া অন্য কোথাও তাঁর টিকিটি মেলা অসাধ্যি। আজ আসবেন উত্তমদা। প্রতিবারের মতো, ওঁকে লেখাটি দেখিয়ে নেবে অভয়। উত্তমদা পড়বেন, হাসবেন। স্নেহভরে দু-চারটে বকাঝকা ও তারিফ। তারপর বুকপকেট থেকে রোগাটে ডটপেন বের করে, লেখার ওপর খানিক হিজিবিজি কেটে তা তুলে দেবেন অভয়ের হাতে। তা পড়ে উত্তমের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবে বাকহারা অভয়। উত্তমদা হেসে বলবেন, “এবার চ, একডুব দিয়ে আসি।” তারপর ওরা দুজনেই জোছনা ঠেলে আলতো ঝাঁপ দেবে পুকুরে। একটু পর উঠে আসবে অভয় বিশ্বাস। তবে উঠবে না উত্তম মাঝি। ততক্ষণে ভাতঘুম ভেঙে অভয় ফের ঢুকে পড়বে হলদেটে চৌখুপির ভেতর। দরজা-জানালা হাট করে খোলা। শিরশিরে দক্ষযজ্ঞ রাতারাতি উধাও। কেবল লেখার উপর, উত্তমদার ম্যাড়মেড়ে ডটপেনের চকচকে হিজিবিজি নড়বে না একচুলও. …

 

৩)

স্বর্গ বনাম মর্ত্য। নক্ষত্র বনাম ভাঁটফুল। ছাত বনাম উঠোন। ঝিমোনো বৃষ্টির সন্ধে পার করে বেশ জমে উঠেছে তর্কের রকমফের। বেশ দরাজ গলায় একলাই, পরপর যুক্তি শানাচ্ছে অভয় বিশ্বাস। সুর চড়ছে। পাল্লা দিয়ে পাল্টা সুর। তর্ক ছাড়িয়ে তরজা। খিস্তিখেউড়। ক প্রস্থ হাতাহাতি। একটু রক্তের ছিটে। কয়েক মিনিট সব চুপ। তারপর একহাতে মর্ত্য, অন্যহাতে ভাঁটফুল ও দু পায়ে উঠোনটি নিয়ে আসর থেকে অদ্ভুত হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে অভয়। হঠাৎই বৃষ্টির জোর বেড়ে যাচ্ছে আরও …

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...