তারপরেও থেকে যায় অনেক কিন্তু… পরন্তু…

অনির্বাণ সরকার

 

পাড়ার সবচেয়ে চওড়া যে গলিটা সেটা আগে মাটির গলি ছিল। বর্ষা হলেই ধারে ধারে আগাছা আর বুনো ঘাস গজাত। আশেপাশের চুনসুরকির বাড়িগুলোর দেওয়াল বা ছাদের কার্নিশ থেকে মাঝেমাঝেই ধুলোবালি তো বটেই কখনও কখনও চাঙড়ও খসে পড়ত। তবুও আমরা খেলতাম। সমবয়সি, অসমবয়সি সবাই মিলে একসঙ্গে। কয়েকটি বাড়িতে বল পড়লে তারা নিজেরাই ফেরত দিত, কিছু বাড়ি আবার চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করত। তবুও খেলা চলত, চলতেই থাকত, বিরামহীন।

নানা সময়ে নানা খেলা। গ্রীষ্মে আর বর্ষায় ফুটবল, শীতে বিকেলে ক্রিকেট আর রাতে ব্যাডমিন্টন। অন্যান্য সময় ক্যারম, বড়দের তাস ইত্যাদি তো ছিলই। মাঝেমধ্যে আবার অন্য খেলাও হত। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে খেলাটা হত সেটা হল ক্রিকেট খেলার উইকেট দিয়ে হকি। কিন্তু উইকেটের সংখ্যা তো মাত্র ছটা। বাকিদের জন্য বরাদ্দ ছিল তক্তপোষ বা চেয়ার টেবিল থেকে খুলে যাওয়া কাঠের তক্তা, নারকেল গাছের ডাল। টেনিস বলে খেলা, তাই প্যাড, গ্লাভস, শিরস্ত্রাণ কোনও কিছুরই প্রয়োজন নেই। ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার সময় যেমন কখনও আমরা ভারতীয় প্লেয়ার হয়ে যাচ্ছি, কখনও বা ব্রাজিলের অথবা আর্জেন্টিনার কিংবা ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড সব সীমারেখা পেরিয়ে যাচ্ছি অনায়াসেই, হকি খেলার সময় কিন্তু সেটা নয়। খেলোয়াড়দের নাম সেখানে সীমিত। ওয়াগা বর্ডারের এপার আর ওপার। দুটো দেশের খেলোয়াড়দের নামই শুধু জানি। কারণ বিশ্ব-হকিতে তো শুধু ওরাই রাজ করছে তখন। তাই আমাদের গলিতেও এক দলে যখন শাহিদ, জাফর, সোমায়া, মহিন্দর পাল সিং, থৈবা ইত্যাদি, উল্টো দলের খেলোয়াড়দের নাম তখন হাসান সর্দার, সামিয়ুল্লা, কলিমুল্লা প্রভৃতি। এশিয়ান গেমস নিজেদের দেশে হওয়া সত্ত্বেও বিরাশির দিল্লি এশিয়াডে ফুটবল আর হকি প্লেয়ার ছাড়া কারও নাম জানতাম না। কারণ ওরাই ছিল তখন বহুল প্রচারিত আর বাকি ইভেন্টগুলো নিয়ে আমাদের মানসিকতা ছিল ঠিক ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মতই— অংশগ্রহণটাই বড় কথা, পদক এলে ভালো, না এলে আরও ভালো। তাই সাদা চামড়ার দেশের কালো মানুষ জেসি ওয়েন্সের গল্প শুনেছি, রোমানিয়ার ওয়ান্ডার জিমন্যাস্ট নাদিয়া কোমানেচির রূপকথা পড়েছি, নিজে হেদুয়ায় সাঁতরানো শিখে ভিনদেশি মার্ক স্পিৎজকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছি— কিন্তু লজ্জার হলেও সত্যি, নিজের দেশের কোনও অ্যাথলিট বা সাঁতারুর নাম জানতাম না। গোবর গোহোর পাড়ার ছেলে হয়েও চিনতাম না কোনও কুস্তিগিরকে। আর ক্যাসিয়েস ক্লে থেকে মহম্মদ আলিতে পরিণত হওয়ার কাহিনি শুনলেও ভারতীয়রাও যে ঐ বক্সিংটা লড়তে জানে সেই খবরটা রাখার প্রয়োজনও অনুভব করিনি।

ফুটবল আর হকির এই মৌরসিপাট্টাতে আঘাত হেনেছিল কয়েকটা ঘটনা এবং কয়েকজন মানুষ। ছিয়াশির মেক্সিকো বিশ্বকাপ এবং এক বেঁটেখাটো, গাঁট্টাগোট্টা আর্জেন্টাইন যেমন কলকাতা ফুটবল লিগের ঘেরা মাঠ, বড় ক্লাবের টিকিট কাউন্টারের সামনের লাইনটাকে ছোট করে দিয়েছিল, কেরলের কোনও এক ‘পায়োলি এক্সপ্রেস’ পি টি ঊষার উত্থান আমাদের আকর্ষিত করেছিল অ্যাথলেটিক্স সম্পর্কে। কিন্তু এসবের বাইরেও আরেকটা ব্যাপার ছিল। সেটা হচ্ছে বিভিন্ন খেলাধুলার সরাসরি টিভি সম্প্রচার। মানুষ সবকিছু নিজের চোখে দেখে যাচাই করে নিতে চায়। টিভি সম্প্রচার খেলাধূলার সেই দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছিল।

তাতে অবশ্যই সবচেয়ে লাভবান হয়েছিল ক্রিকেট নামক খেলাটি। কারণ ঐ তিরাশি থেকে পঁচাশি এই তিন বছরে একদিনের ক্রিকেটে উল্কাসদৃশ উত্থান ভারতের কোটি কোটি মানুষের মনে ঐ খেলাটা সম্পর্কে আলাদা আগ্রহ তৈরি করে। কথায় বলে সাফল্যের চেয়ে বড় সাফল্য আর কিছু নেই। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে কথাটা সর্বার্থেই সঠিক। তাই দর্শক আনুকূল্য পেয়ে যেতেই বিজ্ঞাপন সংস্থা থেকে দূরদর্শন সবার কাছেই ক্রিকেট হয়ে যায় সুয়োরানি আর বাকি খেলাগুলো দুয়োরানি।

তবুও পি টি ঊষার ছিয়াশির এশিয়ান গেমসে চোখধাঁধানো সাফল্য, ‘ট্র্যাকের রানি’র মুকুট মাথায় পরা ভারতীয়দের মধ্যে অন্যান্য খেলা সম্পর্কেও একটা আগ্রহ তৈরি করে দেয়। পি টি ঊষার আগেও যে ও এম নাম্বিয়ারের আরেক ছাত্রী এম ডি বালসাম্মা দেশের অন্যতম সেরা অ্যাথলিট ছিলেন সে কথা কেউ জানত না। ঊষার সাফল্য বালসাম্মা থেকে সাইনি আব্রাহাম সবাইকে নিয়ে আসে সাফল্যের আলোয়। এমনকি সাইনির সঙ্গে সাঁতারু উইলসন চেরিয়ানের প্রেম ও পরিণয়, সাইনির আব্রাহাম থেকে উইলসন হয়ে ওঠার গল্পও তখন মুখে মুখে ঘুরছে। তার আগে পর্যন্ত খাজান সিং ছাড়া অন্য কোনও সাঁতারুর নামই কেউ মনে রাখত না। ‘উড়ন্ত শিখ’ মিলখা সিং ছিলেন গল্পকথার নায়ক আর পি টি ঊষা ঘোর বাস্তব। তাই অ্যাথলেটিক্স তথা অলিম্পিক গেমসের অন্যান্য দুয়োরানি সদৃশ খেলাগুলোতে পি টি ঊষার উত্থান সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কিন্তু সে সবকিছুই এশিয়ান লেভেলে। সাফ গেমসে একের পর এক সাফল্য আর এশিয়ান গেমসে মোটামুটি কিছু, তার বাইরে অলিম্পিক অথবা বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের কোনও আসর মানেই আবার সেই আপ্তবাক্যটি নতুন করে আউড়ে চলা— অংশগ্রহণটাই বড় কথা…

তাই অভিনবের শ্যুটিং বা নীরজের জ্যাভলিন, বিজেন্দ্র বা মেরি কমের বক্সিং গ্লাভস, সুশীল-সাক্ষী-দীপক-বজরংদের রেসলিং ম্যাট, সাইনা-সিন্ধুদের শাটল ককগুলো উড়ে যেতে যেতে অনেক রঙিন স্বপ্ন দেখায়। জীবদ্দশায় ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থেকে অলিম্পিক পদক না পাওয়ার জ্বালা বুকে নিয়ে অচিনপুরে পাড়ি জমানো মিলখা সিংয়ের যোগ্য উত্তরসূরি পি টি ঊষা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নীরজ চোপড়ার সাফল্যে। আমাদের মত হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ানো মানুষ দেখতে পায় হকিতে অলিম্পিক পদক এল পুরুষ বিভাগে একচল্লিশ বছর পর, অস্ট্রেলীয় হকির কিংবদন্তি রিক চার্লসওয়ার্থের পরামর্শে আসা কোচ গ্রেহাম রিডের হাত ধরে হরমনপ্রীত, রূপিন্দরপাল, হার্দিক, অমিত, নীলকান্তদের স্টিক বেয়ে। আশার ফানুসটা ফুলতে ফুলতেই আবার চুপসে যায় যখন দেখি সর্বকালের সেরা পারফরম্যান্স করে চতুর্থ হওয়া ভারতীয় হকি দলের উত্তরাখণ্ড-নিবাসী বন্দনার বাড়ির সামনে সেমিফাইনালে হেরে যাওয়ার পর একদল পশুর পাশবিক উল্লাস। ভারতীয় মহিলা হকি দলের অনেক খেলোয়াড় নাকি নীচু জাতের মানুষ, তাই দেশের হারও কারও কারও কাছে আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে।

এসব ছোট বড় ঘটনাগুলোই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কেন আমরা পারি না, কেন অনেকানেক নাম না-জানা ছোট দেশ পারে। ওড়িশা সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করব না, ভারতীয় হকির চরম দুর্দিনে পুরুষ ও মহিলা দুটো দলকেই সমানভাবে অর্থ এবং পরিকাঠামো জুগিয়ে যাওয়ার জন্য। ভবিষ্যতেও এই কাজ যে তারা করবে একথা ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাকি খেলাগুলো? সেখানে তো সবই ব্যক্তিগত উদ্যোগ। কখনও অভিনব বিন্দ্রা, কোথাও পুলেল্লা গোপীচাঁদ কিংবা ছত্রশালের কুস্তির আখড়া। সরকারি উদ্যোগ কোথায়? কোথায়ই বা উক্ত খেলাগুলোর ফেডারেশনের ভূমিকা? এভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কতদিন আর চলবে? যে খেলাগুলো পদক আনছে সেই খেলায় আসছে অর্থ, বিজ্ঞাপন, প্রতিষ্ঠা। সেই দেখে অনেকে এগিয়ে আসছে, কিন্তু যে খেলায় সাফল্য নেই সেসব খেলা পড়ে থাকছে বিস্মৃতির অন্তরালে।

তাই নীরজ চোপড়ার ছুড়ে দেওয়া বর্শায় ভর করে আকাশ ছুঁতে চায় অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত অনেকগুলো খেলার খেলোয়াড়রা। তাই ভীষণভাবে চেয়েছিলাম হকিতে একটা পদক আসুক। সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে যে খেলাটার সেটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতে পারে না। কিন্তু…

তারপরও থেকে যায় অনেক কিন্তু, পরন্তু। আমরা যারা দর্শক তারা কতদূর খবর রাখি এই খেলাগুলোর? অলিম্পিক অথবা এশিয়ান গেমস এলে আমাদের আবেগ উপচে পড়ে। তারপর আবার যে কে সেই!! ‘মন চল নিজ নিকেতনে’ (পড়তে হবে ক্রিকেটের অঙ্গনে)। আর কে না জানে যে মানুষ যেটা খেতে চায় মিডিয়া সেটাই গেলায়। তাই ভবিষ্যতে এই খেলাগুলো কতটা জেগে উঠবে, কত আলো ছড়াবে সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। আসলে ক্রীড়া একটা সংস্কৃতি। আমরা, আম ভারতীয়রা সেই সংস্কৃতির ধারেকাছেও নেই। আর আমরা যেমন, আমাদের রাজ্যের বা দেশের সরকারও তো তেমনই হবে, এ আর বিচিত্র কী?

পাড়ার সবথেকে চওড়া সেই গলিটা এখন আর মাটির গলি নেই। ওর ওপর উন্নয়নের সিমেন্টের প্রলেপ পড়েছে। আশেপাশের বাড়িগুলোর পুরনো লোকজনও আর বিশেষ কেউ নেই, সেখানে এসেছে নতুন নতুন মানুষজন। এলাকার ছেলেপুলেরাও আর কেউ ফুটবল, ক্রিকেট বা উইকেট আর কাঠের তক্তা দিয়ে হকি স্টিক বানিয়ে হকি আর খেলে না, বরং সাইকেল বা বাইকে হেলান দিয়ে কিংবা রোয়াকে বসে মোবাইলে ভিডিওগেম খেলে। শুধু স্মৃতি বুকে নিয়ে আমার মত আরও কেউ কেউ বসে থাকে, একটার পর একটা অলিম্পিক, এশিয়ান গেমস আসে, যায়…. কিছু আশা জাগে, বেশিরভাগটাই এখনও হতাশা। নীরজ চোপড়ার কিংবদন্তি কোচ উয়ে হান বলেন, ভারতের অলিম্পিক প্রস্তুতি অপরিণত, অবৈজ্ঞানিক। ‘অংশগ্রহণটাই বড় কথা’র হেঁয়ালি ছেড়ে বেরিয়ে পদকের সন্ধানে অলিম্পিক পৌঁছতেই জীবনের সায়াহ্নে পৌঁছে গেলাম। বড় সাফল্য, একটানা সাফল্য, দেশের মানুষের ক্রীড়াসংস্কৃতিতে বদল, দেশের বিভিন্ন খেলার ফেডারেশনের পরিকাঠামো ও পরিকল্পনায় উন্নয়ন, দেশের সরকারের ক্রীড়াচর্চায় ন্যূনতম অর্থসাহায্য, ইত্যাদি প্রভৃতি দেখতে আদৌ পাব কিনা তা জানা নেই।

তবু আশা জাগে…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...