অফুরান মানুষের মুখ

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে, যখন বিদেশ যাওয়া, বিদেশ থেকে আসা এসব সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মত কঠিন ছিল। বিদেশের গন্ধমাখা বিশাল স্যুটকেস নিয়ে প্রবাসী বাঙালিরা দু বা তিন বছর অন্তর অন্তর দেশে আসতেন। সবার জন্য সোয়েটার পারফিউম আর চকোলেট আনতেন, বিরল স্কেচপেন বা রঙিন ইরেজার আনতেন। সেসব ৯০ দশকের অর্থনৈতিক উদারীকরণের আগের কথা, তাই সেসব উপহারের ওপর গোটা পরিবার হামলে পড়ত। সেসব বড় বড় চামড়ার স্যুটকেসের ভেতরে অবধারিতভাবে একটা পারফিউমের বোতল ভেঙে থাকত ফলে সমস্ত উপহারে অসাধারণ একটা বিদেশ বিদেশ গন্ধ ম ম করতে থাকত দিনের পর দিন। মায়েরা বাচ্চাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সেলুলয়েডের চোখবোজা পুতুল অথবা রঙিন সুগন্ধি রুমাল বা পেনসিল ইরেজার সব আলমারিবন্দি করে ফেলতেন, বাচ্চাদের ঘাঁটতে দিতে নারাজ ছিলেন তাঁরা। মহার্ঘ বিদেশি জিনিস আলমারিতে আটকে রাখার এ প্রবণতা বোধহয় ওই বিদেশ বিদেশ গন্ধটাকে বহুদিন ধরে বন্দি করে রাখার ইচ্ছা থেকেই আসত। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা, প্রতিবেশী বা বন্ধুরা এলে তাঁদের দেখানো, বিদেশে প্রবাসী আত্মীয় আছে, সেই গর্ব উথলে পড়া চোখে, মুখে— এসব খুব দেখা যেত।

এখন ছেলেমেয়েরা ঘন ঘন বিদেশ যায়। বিদেশি জিনিস বাজারে অঢেল তাই তার মহার্ঘতা আর দুষ্প্রাপ্যতা নেই। ফলে আকর্ষণও অনেক কমে গিয়েছে। তবু, বিদেশ যেতে মানুষ ভালোই বাসে। যারা ঘরের পাশের ছোটনাগপুরে ছুটি কাটাতে যেত এখন তারা ইতালি বা স্পেন যায়। হলিডে করতে হনলুলু-সিঙ্গাপুর বা ভেকেশনে ভ্যাঙ্কুভার, এমন শীর্ষক দিয়ে লালমোহনবাবুমার্কা কাহিনি সবাই এখন রচনা করে থাকেন।

বাঙালির চিরকালই পায়ের তলায় সর্ষে। এখন আরও বেশি। তবে কবি যদি বলেন, দেশে দেশে মোর ঘর আছে আমি সেই ঘর লব খুঁজিয়া, তবে একটু থেমে ভাবতে হয়, সত্যিই, অতই সোজা নাকি? দেশে দেশে আসলে আমরা ঘুরেই মরি, বিদেশ তবু বিদেশই থেকে যায়।

নানা কাজে আমাকে নানা সময়ে বিদেশ যেতে হয়েছে। ২০০২ সালে আড়াই বছরের মেয়েকে দেশে রেখে এক নিষ্ঠুরা রমণীর মত ট্রেনিং করতে আমেরিকা যাওয়া। সে বেশ লম্বা সফর, চার মাস। তারপর থেকে আপিসের নানা কাজে যেতে হয়েছে বিদেশ। প্রতিবারই সপ্তাহ কয়েকের জন্য, কখনও বা মাসখানেক, টেনেটুনে মাস দুই। এই সময়টা আমার খুব দীর্ঘ লেগেছে প্রতিবারই। আমেরিকা বা ইউরোপ মহাদেশের নানা জায়গায় যেতে বাঙালির ভেতরে এক ধরনের ঔপনিবেশিকোত্তর হীনম্মন্য আহ্লাদেপনা জেগে ওঠে। তবে আমার কপালে আরও কিছু অন্যরকম দেশ দেখা ঘটে গেছে। আফ্রিকার দুই দেশ, লেবানন, এক্স-সোভিয়েৎ কয়েকটি দেশ, ইজরায়েল… ফিলিপিনস। এই সব। তবে, বিদেশের মাটিতে পা রাখলেই আমি কেন যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ি, অন্তত মগজ আমার কাজ করে না। দেশ থেকে বেরোলে কেন জানি নতুন জায়গার হাওয়াবাতাস, আলো, অক্সিজেনের তারতম্য, আকাশের রং, কফির গন্ধ, আর অনেক অচেনা মানুষ অসামাজিক ঘরকুনো আমাকে এত নড়িয়ে দেয়, যে, তা নিয়ে কিছু লিখতে পারি না। বাতাসের শুকনো স্পর্শ, উচ্চতাজনিত মাথাঘুরুনির মত আমাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তোলে। মানুষের খাদ্য, অভ্যাস, চেহারা, পোশাকের বিজাতীয়তায় কলম শুকায়ে যায়। গোঁ গোঁ করে চলা এয়ারকন্ডিশনিং-এর কর্মকুশলতায় অতীব শুকনো আর ঠান্ডা, এবং প্রচণ্ড কড়া চড়া আলোয় উজ্জ্বল হয় এয়ারপোর্টগুলো। সেখানে সুবেশ সুবেশা তরুণ তরুণীরা কাঠের পুতুলের মত মুখ করে জিনিস টেনে ঘুরে বেড়ায়। এসব দেখলে আমার প্রাণ শুকিয়ে যায়, হাঁকুপাঁকু করে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। তারপর আছে ভিসার লাইন, টিকিট দেখানো, সুটকেসের ওজনের ঝকমারি। একটু বেশি ওজন হলেই টাকা চাইবে এয়ারলাইন, কাঁধব্যাগের মাপ দেখবে, বারবার সব জিনিস বের করে ফেলতে হবে, জলের বোতল শ্যাম্পু বা পারফিউমের বোতল ফেলে দেবে… কত যে, কতরকমের যে সমস্যা বিদেশ যেতে। পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে এই ভয়েই আমার এক পরমাত্মীয় বিদেশ যাওয়ার নামটি করেন না। আমি তত খারাপ নই। তবু বিদেশ আমাকে কোথাও যেন অসাড় করে দেয়। অন্তত দিত।

প্রথম ২০০২ সালে ওয়াশিংটন ডি সি গিয়েছিলাম। চার মাসের ট্রেনিংকালে শিখেছিলাম সে দেশের আদবকায়দা নিয়মকানুন। ২০১৮তে যখন যাচ্ছি ততদিনে আমাদের দেশের কোণে কোণে মেঁ ঢুকে গিয়েছে পণ্যসংস্কৃতি। তাই নতুন নেই আর কিছু। ভুবনায়ন বা গোলোকায়নের অবদান, সারা পৃথিবী এখন একটিই গ্রাম। ভুবন গ্রাম। না আছে ম্যাকডোনাল্ডের স্যান্ডুইচের স্বাদে নতুনত্ব, না আছে ঝাঁ চকচকে দোকানের ভেতর ঢোকার আলাদা চনমনানি।  নানা ধরনের রুম ফ্রেশনার পারফিউমের সুরভিগুলিও বহুদিন হল ভারতেরই সুপারমার্কেটে পেয়ে আসছি আমরা। তাহলে আর নতুন কীই বা!

বিজাতীয়তা কমছে কি তাও? ভিনদেশিদের নিয়ে ভয় কি কমছে? যেন আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি সেইসব ছবির বইয়ের দেশ থেকে, কেননা জানি ও সমাজ আর আমার সমাজে কোথাও দুস্তর দূরত্ব। ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনের পর থেকে উগ্রপন্থীদের দৌরাত্ম্যের ভয়ে সারা পৃথিবী কম্পমান আর ২০২০-র পর থেকে তো অকাজে বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছেটাই চলে গেল প্যানডেমিকের ছোঁয়ায়। পারতপক্ষে এখন বিদেশ গমন নৈব নৈব চ। এক একটা বিশাল ধাক্কা আসে আর পৃথিবী নিজের মত করে মানিয়ে নেয়, কিছু অভ্যাস ছেঁটে ফেলে কিছু অভ্যাসকে বদলে নেয়।

আপাতত, নানা ভ্রমণ থেকে রইল কয়েকটি মানুষ দেখার গল্প।

 

. সান্টা ফেতে অশীতিপর লাইব্রেরিয়ান

থমথমে নীরবতার ভেতরে প্রবেশ। সার সার বাদামি টেবিল, ওপরে নরম হলদেটে আলোজ্বলা নিচু নিচু আলোদান প্রতি টেবিলের পাঠকের তন্নিষ্ঠ পাঠের সহায়তা করছে। কী মনোরম দৃশ্য।

রিডিং রুমে পাঠরত নীরব নিবিষ্ট অসংখ্য মানুষ, অধিকাংশই বয়স্ক, সারির পর সারি বইঠাসা আলমারি র‍্যাক। সে সব দেখার পরই ছোট্ট এক ঘর, যে যার ব্যবহৃত বই এখানে দান করতে পারেন, আর সে বই বিক্রি হয় এক দু ডলারে। সেই টাকা যায় লাইব্রেরির ফান্ডে। সে ঘরেও তিন-চার আলমারি ভর্তি বই। আর কাউন্টারের মত এক টেবিলে, বসে এক শ্বেতাঙ্গিনী বৃদ্ধা সুখদুঃখের কথা শুনছেন সিকিউরিটির জামা পরা ছেলেটির কাছে, ছেলেটি হিস্পানিক, সে জানাচ্ছে তার বদলি হয়ে গেছে। দুজনেই বেশ সেন্টিমেন্টাল, অনেক ছেঁড়া ছেঁড়া বিদায়বাণী কানে আসছে।

সুতলিকাক্ষ একটি বই কিনবে। এক ডলারে পেপার ব্যাক বই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, মেরি শেলির। মহিলার কাছে এগিয়ে যেতেই এক গাল হেসে প্রশ্ন, কোথা থেকে আসছ তোমরা। ভারত শুনেই চোখের মণিতে চিকচিক। বললেন, আমি ষাটের দশকে ভারতে গেছি। দিল্লি। তোমাদের শহরের নাম কী? কলকাতা শুনে চেনা লাগল, ভারতীয়দের দেখে মনে পড়ে গেল তাঁর যৌবনের দিন। প্রেমিক ছিল টার্কিশ। তার সঙ্গে গেছিলেন তুর্কি, এবং ভারত। চিরায়তার নাম শুনে বারবার উচ্চারণ করে বললেন, চি-রা-ইয়-তা। নিজের তুর্কি প্রেমিকের নামটিও এমনই সুরেলা, ভিন্ন, অদ্ভুত ছিল, মনে করলেন। বার বার সে নামও উচ্চারণ করলেন। সু-লে-মা-ন। হাসিতে বুদবুদ ফুটছে মুখে, কত গল্প, থামছিলেন না… বিয়ে করেছিলেন অন্য কারওকে, তারপর সে স্বামীও নেই, একাই থাকেন। কিন্তু জীবনরসে এখনও টইটুম্বুর। মনে করলেন, আরও আগে, বাষট্টিতে, গেছিলেন কিউবা। কিউবায় তখন সমস্যা চলছে, আমেরিকা বেজায় তৎপর, হোটেলে পাশের ঘরে তল্লাশি চলছিল, মনে আছে। সেসব ভয়ের কাহিনি বলতে আঁখিতারা হয়ে উঠছিল বিস্ফারিত।

এখন, ৮৮ বছর বয়সেও, বহু মানুষ দেখার, সারা পৃথিবী ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ঔদার্য নিয়ে, সান্টা ফে পাবলিক লাইব্রেরিতে সেবামূলক কাজে আছেন এই মানুষটি। পৃথিবীটা এঁদের জন্যই এখনও এত এত সুন্দর।

 

খ. আমাকে একটি ইউরো দাও গো, একটি ইউরো দাও

ঠান্ডা আর বিশাল একটা প্রান্তরের মত রেল স্টেশনে পাসপোর্ট পরীক্ষা হচ্ছিল। কালো ইউনিফর্মে সাঁটানো নানারকম সোনালি হলুদ ব্যাজ। দড়িদড়াও ঝুলছে। মেয়ে ও পুরুষ শ্বেতাঙ্গ পুলিশের দল। অসম্ভব রকমের ফিটফাট। ইউনিফর্ম পরিধান মাত্রেই প্রতিটি শরীর যেন চাবুক। প্রত্যেক উর্দিধারীর পকেটে নিদেনপক্ষে রিভলভার তো আছেই, যদিও অদৃশ্য। দেখা যাচ্ছে যে অস্ত্র, তা হাতের রুল। সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ তরঙ্গের মত খেলা করছে ক্ষমতা।

স্যালজবার্গ। ভিয়েনা থেকে মিউনিখ যাবার পথে প্রথম জার্মান বর্ডার এটাই। বর্ডার বলেই চেক পোস্ট।

ঠান্ডা পড়েছে বেশ, বাইরে সবার মাথায় টুপি। মেয়েদের মাথায় রুমাল। গায়ে ভারি কোট তো আছেই। এখন পাঁচ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, খুব শিগগিরি এক বা মাইনাস এক হতে চলেছে।

গত দশ বারো দিন ধরে কথা এমনিতেই চলছিল।সিরিয়ার শরণার্থী আছড়ে পড়েছে ইউরোপের ওপরে। বেশ কয়েকটা ট্রেন ক্যানসেল হয়ে গেছে, যেসব ট্রেন অস্ট্রিয়ার দিক থেকে জার্মানির দিকে যায়। আমি স্যালজবার্গ অব্দি এসেছি ভিয়েনা থেকে। এখানে এসে ট্রেন পাল্টাতে হয়। ম্যুনিখ যাব। ম্যুনিখ যাবার আগে কত না অনিশ্চিতি। আমার বন্ধুরা আছে ম্যুনিখে। সোফি রিখটার, জার্মানির মেয়ে। ভারতপ্রেমী। সে বারবার আমাকে ইমেইল লিখছে পরিস্থিতি জানিয়ে।

অস্ট্রিয়ান ওবিবি, মানে রেলকোম্পানির প্রচুর ট্রেন নাকি ক্যানসেল হচ্ছে, রিফিউজি সমস্যার জন্য। এটুকু জানা গেছে। ২০১৫ সালে নভেম্বর মাস।

রোজ হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা বাস, দুটো ইউ বান, মানে পাতালরেল পালটে, অফিসে পৌঁছতে হয় আমাকে। অডিট করতে এসেছি ভিয়েনার আন্তর্জাতিক সংস্থায়। এরা নিউক্লিয়ার এনার্জির ওপরে কাজ করে।

ম্যুনিখ যাব উইকেন্ডে। পথে এই সীমান্তশহর স্যালজ বার্গ। জার্মানি অস্ট্রিয়ার সীমা। এখানেই আমাকে ট্রেন বদল করে ম্যুনিখ যেতে হবে। আর সীমান্ত বলেই কড়াকড়ি, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার আগে কাগজপত্র চেকিং।

স্যালজবার্গে তো সাউন্ড অফ মিউজিকের শেষ দৃশ্যের সেই গানের সিকোয়েন্স শুটিং হয়েছিল। সেই দুর্গটা দেখতে যাব না? সোফি জানায়, যাব, যাব, ফেরার পথে আমিও তোমার সঙ্গে আসব স্যালজবার্গ, এসে দেখে-টেখে যাব।

সেই গানের শহর, স্বপ্নের শহর স্যালজবার্গ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতিমাখানোও বটে। এখন পুরোটাই দারুণ সাজানো ঐতিহাসিক শহর কিন্তু। ছোট ছোট কফি শপ, পাথর বাঁধানো মধ্যযুগের রাস্তা অবিকৃত রেখে, বাড়ির সামনের সুন্দর প্রাচীন সব পাথুরে, বা চুনকাম করা মাটি-সিমেন্ট-চুন-সুরকির ফিনিশ অক্ষত রেখেই গজিয়ে উঠেছে। ইতিহাসকে এরা রাখতে জানে। বেচতেও জানে।

সবকিছু দেখব, জানব সেটা ফেরার পথেই। কিন্তু আপাতত ম্যুনিখ গিয়ে পৌঁছই তো। সেখানে সোফি অপেক্ষা করছে। চাকরি করে মস্ত বড় গাড়ি কোম্পানিতে। ম্যুনিখ তো গাড়ির শহর। বিএমডবলিউ-এর শহর।

স্টেশনের চত্বরে ঠান্ডা আকাশের নিচে বিশাল এক দীর্ঘ সারি। মানুষের। এরাও ফর্সা, সুদর্শন। কিন্তু এরা রিফিউজি। গায়ে কোনওমতে চাপানো ভারি কোট, বা পাতলা পারকা জ্যাকেট। মাথায় হিজাব-রুমালে মেয়েরা। এক একটা দলের সঙ্গে একজন করে লিডার জাতীয় লোক আছে। দালালও বলা যায়। সম্পূর্ণ এলোমেলো, অসংগঠিত একটা দল নয়। সামান্য নিয়মের বাঁধন আছে। কিছুটা সিজিল মিছিল রাখার চেষ্টা হয়েছে। এই মানুষগুলো কত কত দূর থেকে এসেছে। সঙ্গে প্লাস্টিকের প্যাকেটে সামান্য জিনিস। কারও পিঠে ব্যাকপ্যাক। কিছু টাকা, কিছু কাগজপত্র, আর কিচ্ছু নেই। জামাকাপড় যৎসামান্য। আলমারি ভরা বাসন, বাড়িতে রাখা সারাজীবনের উপার্জনের অস্থাবর সম্পত্তি, ক্লোজেট ভরা জামাকাপড়, জুতো ছেড়ে দিয়ে এরা এক বস্ত্রে উঠে এসেছে। সুদূর সিরিয়া থেকে জলপথে আসতে আসতে এদের কারও ছেলে পড়ে গেছে জলে। কারও মেয়ে পাচার হয়ে গেছে দুষ্টচক্রের হাতে।

এরা জানেও না, চলে আসার পর বম্বিং হয়েছে কিনা, আইসিস অথবা সরকার, যে কারও আক্রমণে জীবনযাপনের সব চিহ্ন টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে কিনা। ধুলো হয়ে গিয়েছে কিনা, স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পত্তি।

সিরিয়ার শিশু জলে উপুড় হয়ে মৃত, পড়ে আছে। ছবিটা ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। সেই ছবি আমার মন থেকে মোছে না। শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাওয়া আড়াই বছরের আলান কুর্দি।

প্রচুর রাজনীতিক কূটনীতিক চর্চার পর, সিরিয়ান শরণার্থীদের এখন ভরসা ইউরোপ। ইউরোপের দেশগুলোও তো আসলে খুব একটা বড়লোক নেই আর। তবু, ইউরোপের দেশেরা নিজেদের মধ্যে যুক্তি করে, খানিক খানিক শরণার্থীকে নিজেদের এলাকায় নিয়ে নিচ্ছে। দলে দলে ভাগ হতে হতে হয়ত বাবা ছিটকে গেল ফ্রান্সে মা রয়ে গেল জার্মানিতে। ছেলেমেয়ে চলে গেল তুর্কিতে।

স্যালজবার্গে আমার পাসপোর্ট ইত্যাদি কাগজপত্র পরীক্ষা করে নেমে গেল পুলিশ। ওবিবি থেকে নেমে, এবার জার্মান ট্রেনে উঠেছি আমি। সেই ট্রেন আমাকে পৌঁছে দিল ম্যুনিখে ঠিকঠাক।

ফেরার সময়ে সেবার দেখা হয়েছিল স্যালজবার্গের বিখ্যাত সব মিউজিয়াম। মোৎসার্টের জন্মস্থান এটা। সেজন্যেই এর আরও কদর।

ভিয়েনা রেলস্টেশনে শুধু খুব ভয় পেয়েছিলাম, একটা বাদামি চামড়ার ছেলে ভাঙা ইংরেজিতে আমার পথরোধ করে দাঁড়িয়েছিল। একটা ইউরো চেয়েছিল। স্যান্ডুইচ খাবে বলে।

ভাঙা ইংরেজিতে, বলেছিল, গিভ মি ওয়ান ইউরো। আই হ্যাভ নাথিং টু ইট। আই উইল বাই আ স্যান্ডুইচ।

দিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর ভেবেছিলাম, ওই একটা স্যান্ডুইচে কী হবে। এখানে তো বাথরুমে যেতেও পঞ্চাশ সেন্ট লাগে। ছেলেটার যদি বাথরুম পায়? ও যাবে কীভাবে?

 

গ. ফিলিপিন্সের মেয়ে

একটি রাষ্ট্রপুঞ্জ-অনুগত সংস্থায় অডিটে গেছিলাম। জেনিভাতে তাদের হেড অফিস। আর ফিলিপিন্সে অ্যাকাউন্টসের ব্যাক অফিস।

ফিলিপিন্সের তরুণীদের কথা সত্যিই বলবার। আমাদের কেজো পাড়াটা গিজগিজ করছে বহুতলে। যেগুলো অধিকাংশ মাল্টিন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির আপিস। এখানে কাজ যারা করে, তাদের মধ্যে বিশাল একটা সংখ্যায় মেয়েরা। পাশ্চাত্য পোশাক। অধিকাংশ বড় বহুজাতিকের ব্যাক অফিস এখানে। ফিলিপিন্স বহুদিন স্পেনীয় ও মার্কিন অধিকারে ছিল তাই সংখ্যাগুরু খ্রিস্টান, পাশ্চাত্য গান পোশাকে অভ্যস্ত। সবাই ইংরেজি জানে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব, তাই অনেক কম মাইনেতে কাজ করানো যায়। পাশ্চাত্যের ব্যাক অফিস হওয়ার আদর্শ জায়গা।

রোজ নিজে যেখানে অডিটে যাই সেখানে, এবং রাস্তায়ঘাটে যে মেয়েদের দেখি তারা খুব ইন্টারেস্টিং। ছিপছিপে সেই তরুণীরা সকাল বিকেল জিপনি চড়ে লম্বা লম্বা বহুতলে কাজ করে। যাবতীয় মাল্টিন্যাশনাল ব্যাঙ্কগুলির ব্যাক অফিস ম্যানিলার মাকাটি সিটিতে। সন্ধেবেলা পিলপিল করে কর্মী পিঁপড়ের মত বেরিয়ে আসে ওরা, একইরকম দেখায়। টপ, জিন্স। কাঁধে স্লিং ব্যাগ বা ব্যাকপ্যাক, সঙ্গে আইফোন বা ল্যাপটপ… সন্ধেতে ভিড় উপচে পড়ে বিশাল বিশাল শপিং মলে ফুড কোর্টে। প্রতিটি মেয়ের তবু তো আছে নিজস্ব জীবন… নিজের স্বপ্ন আশা সুখ দুঃখ। সেরকম একজনকে কাছ থেকে দেখেছি আমরাও।

সুইজারল্যান্ডের কাজের সময় অনেকটা পেছিয়ে কিন্তু যখন ম্যানিলায় মধ্যরাত প্রায়, তখন জেনিভার বড়কর্তারা বিকেল সন্ধেতে কাজে বসেন। ম্যানিলার মেয়েরা (আশ্চর্যভাবে এই আইটি প্রফেশনালরা, আমাদের সঙ্গে যারা ইন্টারঅ্যাক্ট করেছিল, সবাই মেয়ে। অন্তত ৯০ শতাংশ মেয়ে তো বটেই!) সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ওই সংস্থার সব কটি ইউনিটের সমস্ত হিসেবনিকেশ অ্যাকাউন্টস সম্পর্কিত কাজের ভারপ্রাপ্ত। সাংঘাতিক কর্মপটু আর দায়িত্বশীল। সেরকম একজন, চার-পাঁচটি ইঞ্জিনিয়ার মহিলার ভারপ্রাপ্ত অ্যাকাউন্টস হেড এলেন। সাদা শার্ট, কালো প্যান্টস। কোনও সাজ নেই আর। চোখ পুবের মানুষের মত সরু সরু। চেহারা ছোটখাট। একেবারে কিশোরী মনে হয়।

আমাদের মত আইটি বিষয়ে ঈষৎ তালকানা কিন্তু প্রচণ্ড জিজ্ঞাসু অডিটরদের ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে নিজেদের কাজ বুঝিয়েছেন, নানা প্রশ্নের খুঁটিনাটি উত্তর দিয়েছেন। নিজেদের কাজের সমস্ত দায়দায়িত্ব পালন করেও, এসব করেছেন হাসিমুখেই।

তারপর ক্যাফেতে লাঞ্চ করতে গিয়ে দু-তিন কাপ ভাত সহ মাংসের ঝোল খেতে খেতে বলেছেন, আমার বাড়িতে আমার মেয়ে আছে। স্বামী নেই। ছেড়ে চলে গেছে।

ফ্যাকাশে একটু হাসি। মেয়ে একাই স্কুল থেকে ফিরে খাবার নিয়ে মাইক্রোওয়েভে গরম করে খায়। রাতে দেখা হয় আমাদের। ওর বয়স তেরো।

ওকে ইউরোপ পাঠাব ভাবছি পড়াশুনোর জন্য। একটু কেশে বলল সে। ইউরোপেই তো হর্তাকর্তাবিধাতারা থাকে এলেনের। স্বাভাবিক যে বছরে দুবার ওকে টানা চোদ্দ ঘন্টার ফ্লাইটে জেনিভা যেতেও হয় যেহেতু, ওইপানেই ও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা রঙিন স্বপ্ন এঁকে রাখবে।

 

ঘ. আমরা এমনি হেসে ভেসে যাই

তেল আভিভ-এ ভারতীয় দূতাবাস থেকে আয়োজন করা একটি নৌযাত্রায় গিয়ে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সমুদ্রের খানিক দূর অব্দি স্টিমারে করে ভ্রমণের এক বিকেলে, আমাদের পাঁচজন গোমড়ামুখো ভারতীয়ের সৌভাগ্য হয়েছিল এক ঝাঁক অপরূপ সুন্দরী তন্বী তরুণীর সঙ্গে নৌভ্রমণ করার।

এই মেয়েরা সবাই দীর্ঘ পোশাকে অঙ্গ ঢেকে, মাথায় হিজাব পরে উঠলেন। শুধুই মেয়ে নয় কয়েকটি বালক আছে। বা কিশোর। বড় কেউ নেই। শুধুই কচি ছেলে আর তরুণী মেয়েদের দল।

সি অফ গালিলেই-এর জলে স্টিমার চলতে শুরু করা মাত্রই মেয়েদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেল। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখলাম স্টিমার চলতে শুরু করার খানিক পরেই কেউ কেউ ওপরের ওই দীর্ঘ পোশাক খুলে ফেলল। দেখা গেল তারা রীতিমত স্মার্ট জিন্স টপ পরিহিতা, হিজাব বোরখার তলায় তা ঢাকা পড়েছিল এতক্ষণ। সুনীল জলধির ওপর দুলতে দুলতে স্টিমার চলছে আর ক্রমশ মেয়েদের চোখ মুখে যেন উথলে উঠছে মুক্তির আনন্দ। একেবারে খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া পাখির দল যেন। কলকাকলি করছে অজানা ভাষায়। গান গাইছে, গলাজড়াজড়ি করে নাচছেও।

তেল আভিভে সবাই হিব্রু বলে, প্রথমে সেই ভাষা ভেবেছিলাম। পরে বুঝলাম আরবি ভাষা।

এর পর যা জানলাম তা অবাক করা। এটা ইজরায়েল সরকারের দ্বারা শুধু আয়োজিতই নয়, রীতিমত মনিটরড একটা ট্রিপ। যা আয়োজন করার উদ্দেশ্য খুব মহৎ, গাজা স্ট্রিপে বসবাসকারী প্যালেস্তিনীয় মেয়েদের ঘুরিয়ে আনা। বাইরের জগতে খানিক মুক্ত বাতাস ভক্ষণ করানো। একটি ছেলে তো খুলে ধরল পালেস্তাইনের পতাকাও। চোখে মুখে হাসির উদ্ভাস।

তবে মূলত মেয়েদের দিকেই আমাদের চোখ তখন। গাজা স্ট্রিপের মুসলিম মেয়েরা। মনে হয়, ইসলামের বিধানে, পরিবারের ভেতরেই ওঁরা অবরোধে থাকেন। তার ওপর থাকে তাঁদের সমগ্র গোষ্ঠীর ওঠা-বসা-চলা-ফেরার ওপরে খবরদারি করা ইজরায়েলের সুবিপুল সেনাবাহিনির রক্তচক্ষু। দম বন্ধ করা পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে সামান্য সময়ের জন্য আজ বেরুতে পেরেছে তারা, তাদের ওপর খর নজর রাখা যে সরকার, যেন তারই দাক্ষিণ্যে। সঙ্গে দু-একজন সাদা পোশাকের পুলিশও যে নেই তা নয়।

কিন্তু এই মেয়েদের যেসব ভাই বা দাদা আজ এসেছে, অন্য কোনও ভাই যে প্যালেস্তাইনের হয়ে কোমরে বোমা বেঁধে আত্মঘাতী উগ্রপন্থী নয়, বা ইজরায়েলের জেলে বসে পচছে না, তা কে জানে? এদের সবার চোখের দিকে চাইলে বিষাদের ছিটেফোঁটা নিশ্চিতভাবেই দেখা যাবে। কিন্তু তার পাশাপাশি দেখা যাবে সাময়িক উচ্ছলতাও। মুক্তির অদ্ভুত অমূল্য আলো।

গলা জড়াজড়ি করে গান গেয়ে, নেচে তারা যেভাবে নিজেদের মেল ধরল তা তো আমাদের দুলিয়ে দিয়েইছিল। আরও অবাক লেগেছিল, নিজেদের যাবতীয় ঢেকে রাখা সুঠাম পা দৃশ্যমান করা আঁট পোশাক কিছুক্ষণের জন্য বুরখা হিজাবের ভেতর থেকে উন্মুক্ত করার মধ্যে যে স্বাধীনতা, যে আনন্দ আছে তা দেখে। আমরা যা অনায়াসে পাই, তা তাদের জীবনে একটা ঘন্টার জন্যই আসে হয়ত! তারা সেই মুক্তি উদযাপন করল বহুক্ষণ। আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে রইলাম। ফোনে ভিডিও তুললাম। বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল কেমন যেন!

অজানা ভাষার সেই গান, তাদের অচেনা কলকাকলি আজও কানে বাজে।

 

ঙ. দাদু, কানের দুল বানিয়ে দাও না!

দেখা হল বেইরুটের পাথরবাঁধানো রাস্তার পাশে, পুরনো পাড়ায় এক কিউরিও শপের মালিক, ৯৫ বছরের বৃদ্ধকে, যিনি ফুটপাথের ওপরে টেবিল পেতে বিক্রি করেন পাতলা ধাতুর পাত বেঁকিয়ে চুরিয়ে নানারকমের গয়না। অদম্য স্পিরিট। হাসি মুখ। চালাক চতুর। ব্যবসাবুদ্ধি খুব। আজও আশা রাখেন কবে আবার নতুন দোকান করবেন। ভারতীয় দেখলেই আনন্দে টইটুম্বুর। প্রতিদিন আপিস যাওয়ার পথে দেখা হয়। বলেন “আই লাভ ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া!” খুব তৎপর, খুব আগ্রহ জীবন সম্পর্কে। নিজের স্ত্রী পুত্র অন্যত্র অন্য ব্যবসা সামলায়। কিন্তু কিউরিওর দোকানটি বৃদ্ধের নিজস্ব। সে কিউরিও শপে কত কী যে আছে। একটি ফরাসিতে অনূদিত লাও ৎসে-র তাও তে চিং-ও পেয়ে গেলাম।


*লেখার ভেতরের সব ছবি লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...