কর্তা, কর্তৃপক্ষ, কর্তৃত্ব: বিশ্বভারতী যে পথে

সোমজিৎ হালদার

 



সহকারী অধ্যাপক, বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র

 

 

 

ব্যক্তির অহং ব্যক্তিকে বেঁধে রাখে। মানুষ হওয়ার পথ অবরুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আর প্রতিষ্ঠানের অহং? আরও ভালো করে বললে, অহং যখন প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নেয় তার ফল হয় ধ্বংসাত্মক। সে আক্রমণ স্থানে স্থানে এমন নির্লজ্জ হয়ে পড়ে যে নখ দাঁত লুকোনোর চেষ্টাও থাকে না। তিন ছাত্রের বহিষ্কার এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের ভয়ঙ্কর চেহারাটাকে চিনিয়ে দিল আরেকবার।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কী করতে পারে? কেজো পাঠক্রম শেষ করা ছাড়াও পড়ুয়াদের চরিত্র নির্মাণ করতে পারে। সঞ্চারিত করতে পারে সহমর্মিতা। প্রয়োজনে আওয়াজ তোলার অভ্যেসে শান দিতে পারে। জীবনের আঙিনায় যেন সেই পড়ুয়া নিজেকে অবাঞ্ছিত আগন্তুক না ভাবেন, সেই মানসিক প্রস্তুতির ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়ার দায় থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। আইন আদালতের জটিলতায় ঢূকে বিশ্বভারতী এইটুকু অন্তত প্রমাণ করেছে যে, বর্তমান কর্তৃপক্ষ এই দায় স্বীকার করতে চান না। একটি অ-মানবিক সন্দেহের পরিবেশ গড়ে তুলে লড়িয়ে দেওয়ার খেলাতেই তাঁদের বিশেষ আগ্রহ। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং একইসঙ্গে আশ্রমিক বৃত্তের নিজস্ব রাজনীতি আছে— সেসবের মধ্যে নানারকম চাওয়াপাওয়ার বিষয় বরাবরই ছিল। সেই আদানপ্রদান বাধা পেলে শান্তিনিকেতনের পরিবেশ আগেও বহুবার বিষিয়ে উঠেছে। ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে প্রকাশিত অপ্রকাশিত উপাদান কিছু কম পাবেন না। তাও মনে হয়, সেখানে ব্যক্তির অহংবোধ ঘিরেই বাকি লেনদেন আবর্তিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিজের রাগ, নিজের প্রতিশোধস্পৃহা মেটাতে প্রতিষ্ঠানকে এখন যেমন ব্যবহার করে চলেছেন, তেমন উদাহরণ বোধহয় বিশ্বভারতীর ইতিহাসে বড় একটা পাওয়া যাবে না।

বিশ্বভারতী আদালতের দুয়ারে গেল। ছাত্রদের বিরুদ্ধে। রাস্টিকেশন প্রত্যাহার করার দাবিতে উপাচার্যের বাসস্থান ঘেরাও হল। বিশ্বভারতীর অন্য কোনও জায়গা আটকালেন না আন্দোলনরত ছাত্রেরা। কর্তৃপক্ষ মিথ্যাচারের আশ্রয় নিলেন এবার। বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দিয়েছেন ছাত্রেরা— এই মিথ্যে কথাটি প্রচারে লেগে পড়ল বিশ্বভারতী। বহিষ্কার সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট (যে কমিটির সদস্য আবার উপাচার্যমশাইয়ের পুতুলেরা) এবং বিশ্বভারতীর ভাংচুরের দাবির মধ্যেও দেখা গেল বিস্তর ফারাক। নির্দিষ্ট কোনও অভিযোগের কথা না বলে ভাসা ভাসা অস্পষ্ট কিছু কথা। উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শোনা যাচ্ছে, বিদ্যুৎবাবু বিভিন্ন মিটিং-এও তিন ছাত্র রূপা, ফাল্গুনী ও সোমনাথকে ‘তাড়ানোর’ কথা বলেছেন। ক্ষমতা অভ্যেস করতে তিনি ভালোবাসেন। স্যালারি আটকানো, মিটিং-এ অধ্যাপকদের চমকানো, প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন নির্দেশিকা সামনে এনে তিনি ক্ষমতার পরিধি বাড়িয়ে যান ক্রমাগত। বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে এই ভয় পাওয়ানোর ডিজাইন খুব একটা অবাক করবে না। ঘরোয়া কথাবার্তায় অধ্যাপক-কর্মীরা স্বীকার করছেন যে, উপাচার্য ঠিক করছেন না। তবু তাঁরা সামনে আসবেন না কারণ তাঁদের ‘পরিবার’ আছে। খুব সত্যি কথা। প্রকারান্তরে তাঁরা বলে দিচ্ছেন, ছাত্ররা তাঁদের বৃহত্তর পরিবারের অংশ নয় আর। এই দূরত্ব প্রকাশ্যে এনে দেওয়ার কৃতিত্ব উপাচার্যমশাইয়ের। ধন্যবাদ দেব কি?

প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে ছাত্রদের বুকে আগলে রাখার দায়িত্ব উপাচার্যের। শাসনও তিনিই করবেন। উপাচার্যের দম্ভ তাঁকে নতুন নতুন গেট পেরিয়ে প্রতিবাদী ছাত্রদের মাঝে আসতে দিল না। তিনি সংলাপে বিশ্বাসী নন। ক্যাম্পাসের বিষয় ক্যাম্পাস পেরিয়ে আদালতে গেলে সে যে তারই প্রশাসনিক ব্যর্থতা— এই কথাটা সহজ বলেই বোধ হয় তিনি বুঝতে পারেননি। বিশ্বভারতীর নানা খাতে খরচের থেকে তাই মামলার খরচ বাড়তে থাকে। উপাচার্য-আশ্রিত অধ্যাপকেরা মধ্যস্থতার নামে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের মামলা করার ‘পরামর্শ’ দিয়ে যান। ক্ষমতার কাছে দণ্ডি কাটতে কাটতে আত্মসম্মান খুইয়েছেন তাঁরাও।

আদালতের পর্যবেক্ষণ নিয়ে এবার দু-চার কথা। বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত পাশে সরিয়ে রাখার কথা বলেছে আদালত। কর্তৃপক্ষকে নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। প্রশাসনের ঔদ্ধত্য যেখানে একের পর এক সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি করছে, সেখানে এই নমনীয় হওয়ার পরামর্শ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, সাসপেন্ড হওয়া কর্মী-অধ্যাপকদের বিষয় নিয়েও ভাবতে বলেছে আদালত। সেই নির্দেশ পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই এক সাসপেন্ড হওয়া অধ্যাপককে শো-কজ। অপরাধ, আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গ দেওয়া। অর্থাৎ, বিশ্বভারতী এতকিছুর পরেও শোকজ-সাসপেনশনের আবর্ত থেকে মুক্তি পেল না। ছাত্রদের ক্লাসে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনত আর কোনও বাধা না থাকলেও কর্তৃপক্ষ কোনও বাড়তি ভূমিকা নেননি। বিভাগীয় প্রধান বা অধ্যক্ষের কাছে নিয়মমাফিক চিঠিতেই কাজ সেরেছেন। সমাধানের পথে না হেঁটে সমস্যা তাহলে জিইয়ে রাখলেন। সদিচ্ছার অভাব এবারেও স্পষ্ট হল।

একইসঙ্গে আন্দোলনের অধিকার প্রসঙ্গেও আদালত জরুরি কিছু কথা বলেছে। ছাত্র আন্দোলন কোর্টের মতে ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলন নয়। তাহলে অধিকার কোন পথে আদায় হবে সে নিয়েও স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ছাত্রদের কাজ আন্দোলন করা নয়, পড়াশুনো করা। যেখানে পড়াশুনো করার সুযোগটুকুই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, সেখানে আন্দোলন ছাড়া উপায় তো আর কিছু নেই। আর একটি ভয়ের কথা বলেছে আদালত এবং সেই সম্ভাবনা যেকোনও আন্দোলনেরই থাকে। সেটা হল আন্দোলন ‘হাইজ্যাক’ করে নেওয়ার ভয়। বিভিন্ন দল বা সংগঠন আন্দোলনে সংহতি জানাতে পাশে এসেছেন। সভা মিছিল হয়েছে, দাবি জোরালো হয়েছে। তারপরেও আন্দোলনের রাশ যে ছাত্রদের হাতেই ছিল, সে কৃতিত্ব তাদেরই। আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের এই ভূমিকা সদর্থক এবং তা ছাত্র আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতাকেই প্রমাণ করে।

এখানেই শেষ নয়। আবার নতুন করে কোনও সংঘাতের প্রস্তুতি হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে চলছে। আশা রাখি, যে মাস্টারমশাইরা ক্লাসে আমাদের এত কিছু শিখিয়েছেন, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় তাঁরাও একদিন ক্লান্ত হবেন। ছাত্ররা তাঁদের পাশে না পেলেও ছাত্রদের তাঁরা পাশে পাবেন। জেলখানার পাহারাদারের জীবনটাও কয়েদিদের মতোই ছোট হয়ে আসে যে। জেলখানা নয়, পরিবার হয়ে উঠুক বিশ্বভারতী।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. ক্ষমতার প্রদর্শন করতে নেই। বিনয়ী হতে হয়।
    এই উপাচার্য মহাশয় অহংকার ও ক্ষমতা জাহির করতে সদাব্যস্ত। এর ফলে প্রতিষ্ঠান টির সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
    আপনার মতো অন্যান্য অধ্যাপক দের ও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলা উচিৎ।

আপনার মতামত...