সোহম দাস

গুচ্ছ কবিতা

 

চলে যেতে চাও?
যাও তবে
আটকাব না
হাজার হোক, আজ স্বাধীনতার উদযাপন
রাস্তায় রাস্তায় ফুল ঝরে পড়বে গুটিয়ে রাখা পতাকার বাহুমূল হতে
সেসব দেখতে দেখতে তুমি যদি যেতে চাও যা
তবে যেতে পারো

আমিও যাব আজ
হাঁটতে
তুমি যাবে?
এ হাঁটার কিন্তু কোনও নিয়ম নেই, লক্ষ্য নেই, আড়ম্বর নেই
যদি সেসবকে মেনে নিয়ে হাঁটতে আসতে পারো
তবে এসো

নইলে যাও
যেমনটা চাইছিলে

 

কাল হেঁটে ফিরে এসেছি
হাঁটতে হাঁটতে তোমাকে দেখছিলাম গোল, সলজ্জ সূর্যটার চারপাশে
তুমি মেয়ের জন্য পেয়ারা কিনছিলে
মেয়ে একটু ডাঁসা পেয়ারা ভালোবাসে

তোমাকে অনেকবার ডাকব ভেবেও ডাকা হল না
পেয়ারা কেনার জন্য সারাদিন ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকার
তোমার আছে

 

তারপরে আজকের দিন এল
আজকের দিনটা মনে রেখে দিও
একদিন এ শহরের আকাশ বাতাস জুড়ে একটা গণহত্যার রং খেলা করেছিল
গঙ্গার মলিন হাওয়ায় প্রাতঃভ্রমণ করেছিল কাঠপোড়ার গন্ধ
সেখানে মানুষ পুড়ছিল কেবল
গঙ্গার পলিমাটিতে মিশে যাচ্ছিল অস্থি-মজ্জা-রক্ত
সেগুলোও মানুষেরই দেহাংশ ছিল

তারও আগের দিন অবধি
তারা কারও নাতি-ছেলে-বাবা-ভাই-কাকা-জ্যাঠা
কারও নাতনি-মেয়ে-মা-বোন-কাকিমা-জেঠিমা

পার্থক্য বলতে, তারও আগের দিন অবধি
তারা কেউ হিন্দু
কেউ মুসলমান
তারপর ওরা সকলে মানুষ হয়ে গেল

এখন ওদের মানুষ-পরিচয়ের বয়স ৭৫

 

আজকের দিনটা এখনও শেষ হয়নি
আমরা একে অপরকে আলিঙ্গন করতে ভুলে যাচ্ছি
মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি ঘৃণায়
আমরা দৌড়চ্ছি এক দেশ থেকে অন্য দেশ
আশ্রয় নেই

ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে গেলে
আমাদের ঘাড় ধরে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে

রাজপ্রাসাদের বিরাট জানলা থেকে ঝুলে থাকবে শরীরগুলো

বটের ঝুরির মতো ঝুলে থাকতে থাকতে
কবেই আমরা নিজেরাও বটের উপকাণ্ড হয়ে যাব

 

এই মুহূর্তে আমার ইচ্ছে করছে বায়ুমণ্ডল হতে,

ওই যে দুটো লোক নেমে আসছে ভারবাহী, বোকা প্লেনটা থেকে,
আমার সূক্ষ্ম শরীরকে সমকৌণিক অবস্থানে কাটছে তাদের সন্ত্রস্ত দেহ
তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতাম কিছু প্রশ্ন
তাদের নাম
তাদের দেশ
তাদের বাড়ি
আরও, আরও কিছু

জিজ্ঞাসা করতাম না
কেন নিজ দেশ ছেড়ে এসেছিল,
কিংবা কেনই বা পালাতে চাইছে

জিজ্ঞাসা করতাম হয়তো
কোন ভাষা পছন্দ ছিল তাদের— দারি না পশতু?
কোন ফল খেতে ভালোবাসত তারা— আখরোট নাকি পেস্তা?
কোন মাংসটা বেশি সুস্বাদু লাগত তাদের— ভেড়ার নাকি দুম্বার?

জানতেও চাইতাম বুঝি,
বাড়ির খবর
বিবি
ছেলেমেয়ে
মা-বাপ
ভাই
ভাতিজা

আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার আগেই ওদের মুক্ত দেহ ছুঁয়ে ফেলবে বধ্যভূমির ধূলি

সবকটা উত্তরকে বুকে নিয়ে ওরা কেমন ওই বোকা প্লেনটা থেকে পড়ে গেল
আমি কেবল বেবাক, শান্ত এক বায়ুমণ্ডল হতে চাইলাম

 

আজ জ্বর
আজ কাজ নেই
আজ পয়সা নেই
কিন্তু আজকেও হাঁটা আছে
না হাঁটলে বাড়ি নেই
বাড়ি না থাকলেও একমাত্র হাঁটা থেকে যায়

 

পড়ি-কি-মরি করে ছুটে এসে পড়ে গিয়েছিলাম আমি
তবু মরিনি
তারও আগে ছুটে এসেছি কয়েকশো মাইল
নইলে ওরা খুন করে দিত

এখন আর পারবে না
এবার আমি একটা না একটা কিছু গাড়ি ঠিক পেয়ে যাব
গাড়ির লেজ ধরে ঝুলতে ঝুলতে চলে যাব হাভেলিতে
সেখানে আবারও অন্য কেউ থাকবে খুন করার জন্য

তাকে দেখে আবার আমি ছুটব
কয়েকশো মাইল
আবারও বিকট শব্দ করে পড়ে যাব
কোনও একটা গাড়ি পাওয়ার আশায়

একটা কথা ভেবে নিশ্চিন্ত
এখন ওরা আর পারবে না
এখন খুন করবে অন্য কেউ
প্রতিটা পর্বে খুনের পদ্ধতি বদলে যায়

 

এখনও জেগে আছ?
ঘুমোওনি কেন?
সারারাত বৃষ্টি হয়েছে কাল
তোমার ঘরের ছাদে তো ফুটো নেই
সেখান দিয়ে জল পড়ার ভয় নেই
ফুটোর তলায় বসানো বালতি ভরে গেলে
মাঝরাতে উঠে তাকে খালি করার ভয় নেই

মনে রেখো, যাদের ঘরে ছাদ নেই, তাদের কখনও দুশ্চিন্তা করতে নেই
নিশ্চিন্ত হও
নিশ্চিন্ত হতে শেখো

 

তোমায় আমি গতকালই দেখেছিলাম মেয়ের জন্য পেয়ারা কিনতে
মেয়েটা ডাঁসা পেয়ারা ভালোবাসে
আজকেই তোমার ছবি কাগজে দেখলাম
আজও তুমি রাস্তায়
তুমি রাস্তায় বলেই আজ তোমার ছবি ছেপেছে কাগজে
ফাঁকা রাস্তায় তুমি সাহসিনী নিরন্তর
একটু পরেই হয়তো তোমার সুশ্রী দেহকে ছিঁড়ে খাবে কেউ,
সেটা ভেবেও তুমি রাস্তায়

কারণ, তোমার মেয়ের পেয়ারা কেনার জন্য আর কেউ নেই

 

১০

আমরা ভেবেছিলাম, বাঁচব
সকলকে নিয়েই বাঁচব
তারপর দেখলাম সকলকে নিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়
তাই আমরা ভুলে গেলাম

কীভাবে আমরা, প্রত্যেকে, বিকট শব্দ করে একদিন গাড়ি ধরেছিলাম

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...