প্রত্যাখ্যাত পদ্মপ্রতীক: কলকাতা পুরসভা ভোটের ইতিবাচকতা

শঙ্কর রায়

 



সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (কলকাতা পুরসভা) ভোটে তৃণমুল কংগ্রেস অর্থাৎ টিএমসির ১৩৪টি আসনে (১৪৪টির মধ্যে) জয়লাভ আদৌ অপ্রত্যাশিত নয়। ২০২১-এ রাজ্যের বঙ্গ বিধানসভা ভোটে ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে টিএমসি এগিয়ে ছিল ১৩২টিতে, বিজেপি ১১টিতে, কংগ্রেস একটি ওয়ার্ডে এবং বামেরা একটিতেও এগিয়ে ছিল না। প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ও বিস্ময়কর নয়। তবে এবার সবচেয়ে অভাবনীয় পদ্মপ্রতীকের প্রতি কলকাতাবাসীদের ঘৃণার প্রকাশ। মাত্র তিনটি আসনে জিতেছে তারা আর কোনওটিই বিরাট ব্যবধানে নয়— ২২, ২৩ এবং ৫০ নং ওয়ার্ডে। বিধানসভা ভোটে এগিয়ে থাকা আটটি আসন ধরে থাকতে পারেনি। বিজেপির ভোট কমেছেও ২০ শতাংশ। তবে বিজেপি-র নেতৃত্ব এই ফল আঁচ করতে পেরেছিল। তাই ভোটের প্রচারের চেয়ে সিঙ্গুরে গিয়ে অন্য কর্মসূচিতে নেতারা সামিল হয়েছিলেন।

এবার জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে দুজন বামফ্রন্ট প্রার্থীসহ ৬৪ জন মহিলা। এ এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত ইতিবাচক ঘটনা। টিএমসি (পড়ুন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) ১৬টি বরো চেয়ারম্যানের মধ্যে ১০টিতে মহিলাদের মনোনীত করেছে। পুরসভার চেয়ারম্যানও টিএমসি সাংসদ মালা রায়।

বরং বিধানসভা ভোটে একটিতেও এগিয়ে না থাকলেও বামফ্রন্টের প্রার্থীরা দুটি আসন জিতেছে ও আরও বেশ কয়েকটি আসনে টিএমসি-র সঙ্গে টক্কর দিয়েছে। বিধানসভার প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বামেদের সাত শতাংশ ভোট বৃদ্ধিও যথেষ্ট তাৎপর্যবাহী। কলকাতার পুনর্নিবাচিত মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিম এই প্রবণতাকে ইতিবাচক ও ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থবাহী বলেছেন। সত্যিই কলকাতার মানুষ ফ্যাসিবাদী সঙ্ঘীদের হিন্দুত্বমার্কা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ও রণকৌশলের ফাঁদে আর পা দেয়নি। অবশ্য আরএসএস-বিজেপি নেতারা তা কতটা বুঝেছেন তা জানি না। স্থূল মস্তিষ্ক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাপটীয়স গেরুয়া ঝটিকা বাহিনির কর্মীদের (হার্মাদ) মাথায় এসব নেই। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাটা অন্যভাবে লিখলে বোঝানো যায় এই চামুন্ডাদের মনোভাব। নেতা যদি বলে কালকে লড়াই/ কোনো তক্কো করব না/ ভোজালি হাতে কালই শামিল/ বেছে বেছে মোরা করব জবাই।

টিএমসি-র সর্বেসর্বা (সিপিআই-এম নেতা-কর্মীদের ভাষায় তৃণমূলেশ্বরী) পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই অভূতপূর্ব দলীয় সাফল্যকে ‘গণউৎসবে গণতন্ত্রের জয়’ আখ্যা দিয়েছেন ও কলকাতাবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত বোর্ড আরও উন্নততর পরিষেবা শহরের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।’

ভোটাররা এবার পরিষেবাগত কর্মসূচির রূপায়ণ বিচার করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। গত এক বছরের কিছু বেশি সময় মেয়র ববি হাকিমের সাপ্তাহিক ‘টক টু মেয়র’ অনুষ্ঠান গত পুরসভাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। এলাকার বাসিন্দাদের সমস্যাগুলি সমাধানে প্রশাসনিক তৎপরতা অভূতপূর্ব, এটা মানতেই হবে, তাতে পপুলিজম অর্থাৎ জনপ্রিয়তাবাদ থাকলেও মানুষ পুর-পরিষেবা পেয়েছে। শহরের মানুষজনের আস্থা অর্জন করেছে এই অভিনব পন্থা, যা বামফ্রন্টের পার্টিতন্ত্র যুগে ভাবাই যেত না। এর সঙ্গে ‘দুয়ারে সরকার’ ও ‘পাড়ায় সমাধান’ উদ্যোগ টিএমসির গ্রহণযোগ্যতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ববি হাকিমের সময় সাধারণভাবেই কলকাতা পুরসভার পরিষেবা অধিকতর উন্নত হয়েছে। এলিট বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের (বিষেষত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি দপ্তরে, ব্যাঙ্ক ও বিমা কোম্পানিতে কর্মরত এবং পেনশনভোগীরা, যারা বাস-মিনিবাস-হলুদ ট্যাক্সির চেয়ে উবের-ওলায় যাতায়াতে অধিকতর অভ্যস্ত হচ্ছেন ও যাদের অনেকে সান্ধ্যকালীন ‘ছোটা পেগ’-এর আড্ডায় উচ্চমধ্যবিত্ত স্তরে উড্ডীয়মান) কেউ কেউ বলছেন পরিষেবার জোরে নয় জিতল, রাজনীতির জয় তো হল না। এরা পশ্চিমি গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে মিউনিসিপ্যালিটির জীবন সম্পর্কে অনবহিত। স্বায়ত্তশাসিত ‘লোক্যাল বডি’গুলিতে মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলররা প্রতিবেশী কল্যাণ কর্মে (গুড নেবারহুড) নিজেদের নিয়োজিত করেন, সেখানে রাজনৈতিক-মতাদর্শগত প্রচার করা হয় না, কিন্তু তারা এভাবেই রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ায়, প্রছন্নভাবে।

এই ভুঁইফোড় ভোগবাদীরা ভেবে দেখুন ৯২ নং ওয়ার্ডে সিপিআই প্রার্থী মধুছন্দা দেবের ৩২৬৫ ভোটে জয়লাভের সম্ভাব্য কারণগুলি। এই নিয়ে তিনি পরপর চারবার জিতলেন। অথচ ঐ ওয়ার্ডে সিপিআই কেন, সিপিআই(এম)-এর প্রভাবও দ্রুত কমছে। মধুছন্দা জিতেছেন দুটি কারণে। মানুষের পাশে থাকা ও তাদের পরিষেবা দানে নিরলস প্রয়াস তাঁর জয়লাভের মূল কারণ। দ্বিতীয়ত, এটা ভাবার সময় হয়েছে যে, সংগঠনের জোরে ভোটে জেতা যায় না। কারণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ভোটাররা। স্বেচ্ছায় ও অবাধে। সংগঠনের জোরে ভোটে জেতা মানে অবাধ ভোটের অধিকার খর্ব করা। কারণ তাতে মানুষকে ভোট দেওয়ানো হয় ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মোট ৯৫০ জন। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন প্রার্থী ৮০ শতাংশের ওপর ভোট পেয়েছেন এবং ৭ জন আছেন যারা ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। আবার কেউ পেয়েছেন ৯৭ শতাংশ ভোট। জামানত খুইয়েছেন ৭৩১ জন প্রার্থী— তার মধ্যে বিজেপির ১১৬ জন, বামফ্রন্টের ৯৭ জন এবং কংগ্রেসের ১১২ জন প্রার্থী আছেন। তথাচ বামেরা ভোটে নৈরাশ্যের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ক্ষীণ হলেও এবার আলো দেখতে পেয়েছে। দুটি আসনে জয়লাভ বামফ্রন্ট প্রাথীদের, তিনটি আসনে টিএমসির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। আর ৬৫টি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় হয়েছে বামেরা, যদিও বেশিরভাগ আসনে টিএমসি প্রার্থীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থেকেছে। সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেসের দুটি আসন জয় ও অন্তত তিনটি আসনে টক্কর দেওয়া লক্ষণীয়। তারাও ১৬টি আসনে দ্বিতীয় ছিল। বিজেপি প্রার্থীরা ৪৮ আসনে দ্বিতীয় হয়েছে।

শ্যামপুকুরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মীরা হাজরার কাছে সিপিআই(এম) প্রার্থী সুজাতা সাহা মাত্র ৪৪ ভোটে হেরেছেন। এবারের সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। টিএমসি পেয়েছে ৩,৮৫১টি ভোট, বামেরা পেয়েছে ৩,৮০৭টি ভোট। আরেক সিপিআই(এম) প্রার্থী রীনা ভক্ত ১২৭ নম্বর ওয়ার্ডে টিএমসি-র মালবিকা বৈদ্যের কাছে ৯১৪ ভোটে হেরেছেন৷ টিএমসি প্রার্থী রীতা চক্রবর্তী ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী রাজীব কুমার সিনহার বিরুদ্ধে লড়াই করে ১,১১২ ভোটে জয়ী হয়েছেন। পাশে ৪২ নম্বর ওয়ার্ডেও লড়াই জোরদার ছিল। তৃণমূলপ্রার্থী মহেশ কুমার শর্মা ৭২৮ ভোটে বিজেপি প্রার্থী সুনীতা ঝাওয়ারকে পরাস্ত করেছেন। সিপিআই(এম)-এর একমাত্র জয়ী প্রাথী নন্দিতা রায়ও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাত্র ৯৮ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন।

এবার এক উল্লেখযোগ্য লড়াই হয়েছে ৪৫ নং ওয়ার্ডে। সেখানে টিএমসি যেনতেনপ্রকারেন কংগ্রেসের সন্তোষ পাঠককে হারিয়ে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করেছিল, সেকাজে নির্লজ্জভাবে পুলিশ-প্রশাসনকে কাজে লাগিয়েছিল। পোলিং বুথের মধ্যে পুলিশের সামনেই কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের ফেলে কিল-চড়-ঘুষি-লাথি মারা হয়েছিল। প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অমিতাভ চক্রবর্তীকে হেনস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু কংগ্রেস প্রার্থী ও পরপর তিনবার জেতা কাউন্সিলর ৩০০০-এর বেশি ভোটে জিতে টিএমসি-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে কালি লেপে দিয়েছেন। অভিষেকবাবু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের। তাঁর মুখরক্ষা হতে পারে যদি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দোষী ব্যক্তি ও দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সেই সৎসাহস বা সংস্কৃতি টিএমসি-র কি আছে? অবশ্য বাম জমানায় সিপিআই(এম) নেতৃত্বেরও সে সাহস ছিল না।

সিপিআই(এম) নেতা ও পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য ডঃ সুজন চক্রবর্তী এবিপি আনন্দ সহ একাধিক টিভি চ্যানেলে বারবার বলেছেন, বেশিরভাগ কেন্দ্রে ৩২/৩৩ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিতে পারেনি, দুই ২৪ পরগণা ও হাওড়া জেলা থেকে বাসে করে এসে টিএমসি-র কর্মীরা ভূয়া ও ছাপ্পা ভোট দিয়েছে। সুজনবাবুর মতো সিপিআই(এম) আমলারা এমন একটা ধারণা তুলে ধরতে চাইছেন যে ছাপ্পা ভোট ও ভূয়া ভোট এবং সন্ত্রাস করেই টিএমসি জিতেছে। অবাস্তব ও হাস্যকর এমন কথা রাজনৈতিক ভাঁড়দের মুখে সাজে। অবশ্য ছদ্ম-বাম নেতাদের কথা আলাদা। তবে ছাপ্পা ভোট ও ভূয়া ভোট যে পড়েছে, এ নিয়ে সংশয় অন্তত এই কলমচির নেই। টালিগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্ভুক্ত একাধিক ওয়ার্ডে কয়েকজন ছাপ্পা ভোট দিয়েছে, কিন্তু তারা কেউ টিএমসি-র কর্মী/সদস্য নয়। তারা সব ‘দিদিভক্ত’ বলে থাকে। এতদসত্ত্বেও সুজনবাবু বলছেন টিএমসির এক প্রার্থীর ৯৭ শতাংশ ভোট পাওয়া অস্বাভাবিক, ইঙ্গিত ভোট লুঠে। ঠিকই যে এঁদের মধ্যে সাতজন ৯০ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছেন। এটা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক। কিন্তু একবার সিপিআই(এম) প্রার্থী নন্দরানি দল কেশপুর বিধানসভা নির্বাচনে ৯০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। সেবার ভোট লুঠ হয় ও সেই প্রথম বিধানসভা ভোটে কোনও প্রার্থী ৯০ শতাংশ ভোট পান। যে রেকর্ড বিধানসভা নির্বাচনে এখনও অক্ষুণ্ণ। তখন কিন্তু সে ব্যাপারে রাশভারী ও জননেতা জ্যোতি বসু, বিমান বসু থেকে অনিল বিশ্বাসও (সবাই পলিটব্যুরো সদস্য) হিপোক্রিটের মতো নীরব ছিলেন।

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3779 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. ইতিবাচক হয়ত হল, হয়ত আদৌ নয়…। কিন্তু গগনচুম্বী দানবীয় দুর্নীতি ! ডাহা ফেল করে যাওয়া এই আমি, আপনি, আমাদের
    হাতে তো রইল শুধু পেন্সিল ।
    যোগ্যতমের উদ্বর্তন হল কী ?
    হীরক সেনগুপ্ত

আপনার মতামত...