কাতালুনিয়া

রৌহিন ব্যানার্জী

 

সবুজ মাঠে একঝাঁক লাল নীল ডোরাকাটা জার্সি– পা’য়ে তাদের জাদু। এগারোজন জাদুকর– তাদের নেতৃত্বে এক অপেক্ষাকৃত খর্বদেহ ফুটবলার– যার পায়ে বল পড়লেই স্টেডিয়াম জুড়ে চিৎকার– “মেসি, মেসি”– আধুনিক ফুটবল ভক্তদের কাছে এ এক অতি পরিচিত দৃশ্য। ক্লাবের নাম এফ সি বার্সিলোনা। মেসি, সুয়ারেজ, ইনিয়েস্তা, জাভি, পিকে, জেরার– বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের চাঁদের হাট যে দলে। বার্সেলোনার খেলা মানেই ভরা স্টেডিয়াম– দর্শকের দুর্দান্ত আবেগের বিস্ফোরণ। ক্যাম্প ন্যু– বার্সেলোনার নিজস্ব মাঠ এবং স্টেডিয়াম– কমবেশী এক লক্ষ মানুষ একসাথে খেলা দেখতে পারেন সেখানে– এবং এই একলাখ মানুষের সমবেত গর্জন ক্যাম্প ন্যু-তে বার্সেলোনাকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।

অথচ এই ক্যাম্প ন্যু-তেই মাত্র কদিন আগে, ১লা অক্টোবর ২০১৭ তারিখে দেখা গেল এক অভূতপূর্ব এবং অভাবনীয় দৃশ্য– স্পেনের জাতীয় লীগ লা-লিগার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে লা পালমার বিরুদ্ধে বার্সেলোনার ম্যাচ হল একেবারে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে। এরকম কেন হল? বার্সেলোনা ক্লাবের তরফ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, কাতালুনিয়ার মানুষের প্রতি স্পেন সরকারের বিদ্বেষমূলক আচরণের প্রতিবাদেই এই দর্শকশূন্য ম্যাচ। আজ্ঞে হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন– স্পেন সরকার। বার্সেলোনা তো স্পেনেরই দল– তাই না? তবু স্পেন সরকারের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ? তা-ও কোনও ব্যক্তি বা বিপ্লবী সংগঠন হলে আলাদা কথা ছিল– একটা এত বড় প্রতিষ্ঠানের? শুধু স্পেন নয়, বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং অন্যতম সেরা ফুটবল ক্লাবের? অঙ্কটা সহজে মিলছে না– তাই না?

অঙ্ক মিলাতে বসার আগে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল একটু দেখে নেওয়া যাক। বার্সিলোনা শহর স্পেনের যে অঞ্চলে অবস্থিত, তাকে আমরা কাতালুনিয়া বলে চিনি। এই কাতালুনিয়ার মানুষ স্বাধীনতার দাবীতে একটি রেফারেন্ডাম ভোটের ডাক দিয়েছিলেন– যেটা সম্বন্ধে পরে আরেকটু গভীরে আলোচনা করা যাবে– স্প্যানিশ সরকার সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বে-আইনী এবং অ-সাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ভোট প্রক্রিয়াটি ম্যাচের দিনেই হবার কথা ছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সাধারণ নাগরিকের ওপর লাঠি এবং গুলি চালায় স্প্যানিশ পুলিশ, অসংখ্য মানুষ গ্রেপ্তার হন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন স্প্যানিশ লীগের খেলা মুলতুবি রাখার দাবী জানায় বার্সিলোনা এফ সি– কিন্তু স্প্যানিশ সরকার আইন শৃঙ্খলার কোনও সমস্যা হয়নি বলে প্রচার চালান এবং সেই অনুযায়ী লা-লিগা কর্তৃপক্ষ খেলা বাতিল করতে অসম্মত হন। এর প্রতিবাদে বার্সিলোনা ক্লাব কর্তৃপক্ষ ঠিক করেন তাঁরা খেলবেন কিন্তু কোনও দর্শক মাঠে আসবেন না। সমর্থকেরা ক্লাবের এই সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানান এবং ফল– দর্শকশূন্য ম্যাচ।

এবারে বার্সিলোনার অঙ্কটা একটু মিলিয়ে নিই আমরা। সারা বিশ্বে সেরা ফুটবল ক্লাবগুলির সঙ্গে বার্সিলোনা এফ সি-র একটা প্রধান পার্থক্যই হল, এই ক্লাব মূলতঃ একটা রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট। পাঠক সামান্য একটু আন্দাজ পাবেন, স্বাধীনতার আগে মোহনবাগান ক্লাব, বিশেষতঃ ১৯১১ সালের পর যে গুরুত্ব বহন করত আমাদের দেশে, কাতালুনিয়ায় বার্সিলোনা এফ সি-র গুরুত্ব তার বেশ কয়েকগুণ বেশি। স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে কাতালুনিয়ার মানুষের স্বাধীনতার দাবী প্রায় একশো বছর পুরনো– এবং বার্সিলোনা এফ সি, ফুটবল ক্লাব হিসাবে তাদের দাপট এবং স্পর্ধা সেই দাবীর অন্যতম মুখ দীর্ঘদিন ধরে। কাতালুনিয়ার বড় বড় শিল্পপতিরা অকাতরে পয়সা ঢালেন এই ক্লাবে– শুধু বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের নিয়ে আসার জন্যই নয়, নিজেদের আকাদেমিতে সর্বোচ্চ মানের সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে বিশ্বসেরা ফুটবলার তৈরি করার জন্যও। ইনিয়েস্তা, জাভি, পিকেরা যার জ্বলন্ত উদাহরণ। বার্সিলোনার ফুটবল দর্শনও তাদের এই নিজস্ব ঘরাণার সঙ্গে সঙ্ঘবদ্ধ– ২০১০ বিশ্বকাপে যে বিখ্যাত তিকিতাকা ফুটবল স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন করেছিল, তা এই বার্সিলোনা থেকেই উদ্ভূত। তাই এ হেন বার্সিলোনা যখন স্প্যানিশ পুলিশের অত্যাচারের প্রতিবাদে দর্শকশূন্য ম্যাচ করায়, তখনই বরং মিলে যায় অঙ্কটা।

রেফারেন্ডাম ভোটের প্রসঙ্গে আসার আগে একটু সংক্ষেপে ইতিহাসের ওপর নজর বোলানো যাক। পঞ্চদশ শতকে কাতালান সহ আরাগন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন রাজ্যগুলিকে নিয়ে স্পেন সাম্রাজ্য গঠিত হয়। এরপর সপ্তদশ শতকে স্পেন-ফ্রান্স যুদ্ধের সময় কাতালান স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং পরাজিত হয়। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সময় কাতালান নতুন করে স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়– তাদের ভাষাগত, সংস্কৃতিগত এবং ঐতিহ্যগত ফারাকের কারণে। এই সময় থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক দলগুলি বিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীন কাতালুনিয়ার দাবী তুললেও ১৯২২ সালে প্রথম ফ্রান্সিস্কো মেসিয়ার নেতৃত্বে এস্তাত কাতালা নামক রাজনৈতিক দলটি গড়ে ওঠে শুধুমাত্র স্বাধীন কাতালুনিয়ার দাবীকে সামনে রেখেই। তখন স্পেনে প্রাইমো দে রিভেরার একনায়কতন্ত্র চলছিল এবং এস্তাত ফ্রান্সে নির্বাসিত হতে বাধ্য হয়– যদিও রিভেরার পতনের পরে ১৯৩১ সালে তারা কাতালুনিয়ায় ফিরে আসে এবং সেখানকার পৌরভোটে অন্যান্য সমমনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে তাদের এস্কোয়েরা রিপাবলিকানা দে কাতালুনিয়া নামক জোট বিপুল সাফল্য লাভ করে। এরপরে নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে চললেও স্পেনে মোটামুটি স্থিতাবস্থা বজায় থাকে, অর্থাৎ কাতালুনিয়া স্পেনেরই অংশ হিসাবে রয়ে যায়– যদিও তাদের স্বাধীনতার দাবী কখনওই স্বর হারায়নি।

এই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেল ২০০৩ সালে– যখন সেখানকার নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী কনভার্জেন্সিয়া ই উনো (CiU) দলকে পরাজিত করে বামপন্থী দলের জোট (সোশ্যালিস্ট পার্টি অফ কাতালুনিয়া (PSC), এস্কোয়েরা রিপাবলিকানা দে কাতালুনিয়া (ERC), অতি বামপন্থী ইউনাইটেড অ্যান্ড অল্টারনেটিভ লেফট (EUiA)এবং ইনিশিয়েটিভ ফর কাতালুনিয়ান গ্রীনস (ICV)) ক্ষমতায় আসে এবং কাতালুনিয়ার স্বশাসনের পক্ষে নতুন বিল আনে যা কাতালুনিয়া পার্লামেন্টে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে– কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য স্প্যানিশ পার্লামেন্টে গেলে সেখানে অর্থনীতি এবং ভাষার স্বাধীনতা অস্বীকৃত হয়। ২০০৬ সালে এই সংশোধিত বিলটি রেফারেন্ডাম (গণভোট)-এর জন্য পেশ করা হলে কাতালুনিয়া বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং ERC এই রেফারেন্ডামের প্রেক্ষিতে “নো ভোট” এর ডাক দেয়।

এই ইতিহাস দীর্ঘতর করাই যায়, কিন্তু আপাততঃ তা অপ্রয়োজনীয়– পাঠক প্রয়োজনে নিচের লিঙ্কগুলি থেকে এই ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়ে নিতে পারেন। আমরা আপাততঃ চলে আসব বর্তমানে– ২০১৭ সালের ১লা অক্টোবর তারিখে– যে গণভোট সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এই লেখার শুরু। “ন্যুমেরোনিম ওয়ান-ও” বা কাতালান ইন্ডিপেন্ডেন্স রেফারেন্ডাম ২০১৭ হল সেই বিল যেখানে স্বাধীন কাতালুনিয়ান রিপাবলিকের দাবীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তার আর্থিক, ভাষাগত এবং অন্য সব ক্ষেত্রের স্বাধীনতা সহ। বিলটি কাতালুনিয়া পার্লামেন্টে পাশ হয় ৯ইজুন ২০১৭ তারিখে কিন্তু ৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ স্প্যানিশ সংসদীয় আদালত বিলটিকে অসাংবিধানিক এবং বে-আইনী ঘোষনা করে কারণ এই বিল অনুযায়ী গণভোটের ফলাফলের ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট– কাতালান এবং স্প্যানিশ সংবিধান অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা জরুরী নয়। বে-আইনী ঘোষণা করার ফলে গণভোটের দিন মাত্র ৪৪.০৩% ভোট পড়ে– যার ৯২%ই স্বাধীন কাতালানকে সমর্থন জানায়– কিন্তু যেহেতু মোট ভোটের হিসাব দুই-তৃতীয়াংশের চেয়ে কম, তাই এই ভোটের ফলাফলকেও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে স্প্যানিশ সরকার।

এখন কথাটা হল, এসবে আমাদের কী? সত্যিই তো হাজার হাজার মাইল দূরে স্পেন নামক একটা ছোট দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তাতে আমাদের কি-বা আসে যায়? কিছুই যায় আসে না। আমার ঘরের একদম পাশে একটা দেশ ভাষার জন্য আন্দোলন করে স্বাধীনতা পেয়েছে– বিপুল রক্তক্ষরণের বিনিময়ে, আমাদের কিছুই আসে যায়নি। আমার নিজের দেশে কাশ্মীরী যুবক-যুবতীরা স্বাধীনতার জন্য লড়ে চলেছে– আমাদের কিচ্ছু যায় আসেনি। কেনই বা আসবে যাবে? অখণ্ড রাষ্ট্র স্থিতাবস্থার প্রতীক– আর স্থিতাবস্থার থেকে আরামদায়ক আর কী-বা আছে? “জেনে কী-বা প্রয়োজন / অনেক দূরের বন / রাঙা হল কুসুমে / না বহ্নিতাপে?”

তথ্যসূত্রঃ
১। http://www.goal.com/en/news/empty-camp-nou-a-show-of-solidarity-barca-president-claims/a3tsbtos78bv12bzqid1iue6m
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Catalan_independence
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/Catalan_independence_referendum,_2017

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...