ছায়াপাখি, নীল হ্রদের তীরে — পর্ব ৭ (প্রথমাংশ)

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

তিনটে শালিখ

১.

জানালা পথে হু হু করে হাওয়া বইছে। শাড়ির আঁচল এদিক ওদিক লুটোপুটি খাচ্ছে। বাতাসে চুল উড়ে উড়ে এক্কেবারে কাকের বাসা। সঙ্গে ধুলো। তবু শেষবেলার মায়াবী আলোয় ধুয়ে দেওয়া জনপদ পেছনে ফেলে ছুটে চলা ট্রেনের জানালায় বসতে বেশ লাগে।

শেষ বিকেলের রোদে গালের ব্রণর দাগও নরম দেখায়। কিন্তু তার চাইতেও বেশি নরম হয় মন। ডোরাকাটা সবুজ আঁচলের বাহারি সুতোর ঝালর দুই আঙুলে জড়াতে জড়াতে শিউলি খানিক বাদে বাদেই আলুক শালুক চোখে চাইছিল স্বপনের দিকে। এইভাবে চাইলে তাকে নাকি পুনাম ধিলোর মতো দেখতে লাগে। চাপকী। স্বপন কাল বলেছে। বানানো কথা, ছেলেরা অমন বলে। সে বুঝি অমন দুধে আলতা? তবু শুনতে বেশ লেগেছিল। দুজনে মিলে নুরি বইটা দেখতে গেছিল। সিনেমা হলে স্বপন পায়ের উপর হাত রেখেছিল দুবার। আঙুলে আঙুল জড়িয়ে শাসনে রাখলেও ভালোবাসায় শিউরে উঠেছে সদ্য ফোঁটা শিউলি। হল থেকে বেরিয়েও ছাড়েনি হাত। গলির মুখে বাল্বভাঙা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে শিউলির পিঠে হাত ঘষতে ঘষতে লভ করছিল স্বপন। খুব ইচ্ছে শিউলিকে জড়িয়ে চকাস শব্দে একটা চুমু খায়। শিউলির শ্বাস বুকে ভরলে নাকি রেসের জন্য ওর দম বাড়বে। ইচ্ছে দ্যাখো? ষোল আনার উপর আঠেরো আনা! শুনলে বুকটা চুলবুল করে। তাই বলে বাড়ির এত কাছে এমন করে কখনও? শিউলির বাপু অত দম নেই। ঠোঁটের উপর আঙুল ছড়িয়ে বলেছিল, রেসে ফার্স্ট এলে ফটাফট চুমু পাবি। কালী মায়ের কিরা। এখন সেটা মনে করে তেরছা চোখে তাকাল স্বপনের দিকে। ও ছেলে ভুলবে? রেসের ফিতে ছুঁয়েই শিউলির দিকে ফিরে চোখের ইশারা করেছিল। ভাবটা যেন তখনই চকাত চকাত করে চুমু খাওয়ার জন্য হামলে পড়বে সবার সামনে। রাক্ষুসেপনা আছে ছেলেটার মধ্যে।

আজকের দিনটা স্বপনের জন্য একটা ঘ্যামা দিন। কালীদা অনেকদিন ধরে তাতাচ্ছে। বুঝলি স্বপন, শুধু সবার আগে ফিতে ছুঁলে হবে না। টাইমিংটা আসল। টাইম ভালো হলে একেবারে স্টেট মিট। তারপর ন্যাশানাল। এইভাবে চড়চড় করে এগিয়ে যাবি।

এইরকম এগিয়ে যাওয়ার ধাপ গোনাতে থাকে কালীপদ। জেলা, জেলা থেকে স্টেট, সেখানে থেকে ন্যাশানাল, তারপর— এর পরেরটা কালীপদও ভাবতে পারে না। এই ছেলেটা এস্পেশাল। এক বছর না পুরোতেই এমন টাইম দিচ্ছে, অনেকখানি আশা করতে ইচ্ছে হয় কালীপদর। মল্লিকে বলে, এ ছেলে একদম হীরে গো। যেন বাধা টপকে টপকে দৌড়ানোর জন্যেই জন্মেছে। ট্র্যাকে কীভাবে যায় বললে বিশ্বাস করবে না মল্লি, যেন হার্ডলসের উপর দিয়ে বাজ উড়ে যাচ্ছে একটা। উফ, পায়ের পাতাটা যখন কেটে বেরোয়, একেবারে মাখন।

মল্লি বরং কালীপদকে থামিয়ে দেয়। লোকটার বড্ড বেশি খেয়ালি পোলাওপনা। অত বেশি গদগদ হোয়ো না গো, জানো তো নজর লেগে যায়। যদি হওয়ার হয় হবে। এখন থেকে গোঁপ চুমরে কী লাভ?

কালীপদর এই স্বপ্ন দেখার মাঝখানে স্বপনও থামিয়ে দেয়।

–কালীদা, এর মধ্যে রেলের চাকরিটা কোনও ধাপে। ওটা না পেলে তো বাপ পিঠের চামরা তুলে নেবে। এবেলা ওবেলা দুইবার করে ছোটাচ্ছ, কিন্তু টাকার বন্দোবস্ত না হলে বাপের কাছে খোয়ার হবে।

এটা শুনে কালী এখন আর অত বিচলিত হয় না। বেলায় বেলায় বয়েস তো কম হল না তার। প্রথমে স্বপনকে ডিম দুধের লোভ দেখিয়ে গেঁথেছিল। কিন্তু এখন মাছ বড় জালে জড়িয়ে গেছে। না দৌড়াতে এলে শিউলিকে কোথায় পাবে? একটা রিক্সাওলার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে ওর বাপ? মুখে এটা বলে না কালী। স্কুল ফাইনালে অঙ্কে ব্যাক পেলি। একটাও পাশ না দিতে পারলে যতই তুমি দৌড়ে ন্যাশানালে যাও না কেন, রেলে চাকরি হওয়ার নয় বাপু।

দাঁত বের করে হেসেছে স্বপন। তাহলে তো মুশকিল কালীদা। ওখানে তো একেক ধাপে দুবার করে গোঁত্তা খাচ্ছি।

কিন্তু আজ কোনও গোঁত্তা খায়নি স্বপন। দৌড়ের রেস ছিল আসানসোলে। ডিস্ট্রিক্ট কমপিটিশান। তাকে কেউ ছুঁতেও পারেনি।

টাইমিং খুব ভালো হয়েছে। কালীপদর খুশি আর ধরে না। এইটা যদি রাখতে পারে তাহলে স্টেট মিটে ওকে কে আটকায়। চারশো মিটার হার্ডলসে স্টেট চ্যাম্পিয়ান হাওড়ার কার্তিক সাহা। হাওড়া জেলার রেস ছিল পনেরো দিন আগে। কার্তিকের টাইম আটান্ন সেকেন্ডের বেশি, স্বপন পুরো এক সেকেন্ডের বেশিতে সেটা বিট করেছে। কার্তিকের ক্ষমতা নেই স্বপনকে আটকায়। কিন্তু কালী সে কথা বলেনি স্বপনকে। কে জানে গোকুলে অন্য কে বাড়ছে। তোর রেসটা বর্ধমানের ছেলেদের সঙ্গে না স্বপন। আসল হল কার্তিক। এর পরে অন্য কোনও নতুন ছেলে কী করছে কেউ জানে না। আরও খাটতে হবে। সামনের তিন মাস। একবার যদি ন্যাশানালে নিজের ক্যাপাকাইটি দেখাতে পারিস, তোকে আর কে পায়।

কালীদার খাটানো যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। মাঝে মাঝে স্বপন রুখে ওঠে। কোমরে হাত দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, আমি আর পারব না! এর চেয়ে সুবলের খিদমদগিরি করা ঢের সুখের।

–কেন রে? সেদিন যে বুক বাজিয়ে বললি তোকে চ্যাম্পিয়ান হওয়া থেকে কোনও বাপের সাধ্যি নেই আটকায়। আজ তোর সব মশলায় জল ঢেলে দিল কে? পিটপিট করে তাকায় কালী। গলার স্বরে টিটকিরি।
–তো? মাগনা খেটে মরছি। দু পয়সা আয় নেই। রোদ বৃষ্টি জল মানবে না, গাঁড়ফাটানো খাটনি। আমি আর পারব না কালীদা।

এমনি অনেক ফোঁসফোঁস করেছে স্বপন। তবে কালীর কোনও ব্যত্যয় নেই। বরং একটু কমবেশি হলে তেড়ে খিস্তি করে, বাপ মা তুলে গালি দিতেও ছাড়ে না।

তবে অভ্যাস! শুরু শুরুতে ঝাঁট গরম হয়ে যেত স্বপনের। এখন অতটা গায়ে মাখে না। তাছাড়া দৌড়াতে এখন ভালো লাগে স্বপনের। নিজেকে বোঝায়, জীবনে পথ খুঁজে পাওয়ার দৌড় এটা। এতদিন কাটা ঘুড়ির মতো বাতাসে লাট খাচ্ছিল। এখন লাটাই শিউলির হাতে। পত পত করে উড়ছে স্বপন।

কদিন আগেই সুবল ধরেছিল। সুবল আজকাল আরও ওস্তাদ হয়েছে। এখন আর খুচখাচ কয়লা চুরির ধান্দায় যায় না। একটা দল পাকিয়েছে। মাছের দোকানের কানাই, মুর্গিকাটা সাহেব— এছাড়াও বস্তির আরও বেশ কিছু ষণ্ডাকে নিয়ে নানান ধান্দায় জুটে গেছে। পয়সাও ভালো কামাচ্ছে। পার্টির ঝান্ডা মপেডে লাগিয়ে ঘোরে। সুবল বলে ওটা হল রক্ষাকবচ, কেউ বালের ডগা ছুঁতে পারবে না। মাঝেমাঝে পার্টির হয়ে লোকেদের কড়কে দিতে হয়। প্রয়োজনে আড়ংধোলাই। লোককে চমকাতে ভালোই লাগে। এই তো কাজ। এছাড়া মাঝেমাঝে মিটিংমিছিলে শির ফুলিয়ে স্লোগান ঝাড়া। ব্যস। তুই চলে আয়। সকালবিকেল মাঠেঘাটে না দৌড়ে আমার সঙ্গে লেগে যা। রোকরা মিলবে হাতেনাতে।

ভোটের আগে বোমা বাঁধে। দুটো মার্ডারও করিয়েছে সুবল। জমির দালালি করছে আবার। পকেটে চেম্বার রাখে। সেটা আর বলল না। আগের থেকে ভড়কিয়ে কী লাভ।

স্বপন কানে নেয়নি। আসলে সে এখন সত্যিই স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। শিউলির সঙ্গে দৌড়ের শেষে মাঠে বসে ঘাসের ডগা চিবোতে চিবোতে সেইসব গল্প হয়। সুবলের প্রস্তাব একবার শুনিয়েছিল শিউলিকে। শুনেই এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল শিউলি। হনহন করে মাঠের মাঝখান দিয়ে সটান হাঁটা মেরেছে। ওর ব্যাগ, টিফিনের ডাব্বা নিয়ে পিছন পিছন ছুট লাগিয়েছিল স্বপন। একি রে শিউলি, তুই মাইরি মুখের একটা কথায় বেমক্কা দৌড় দিলি কেন? সুবল যা বলেছে শুধু সেইটা বলেছি।

–হ্যাঁ হ্যাঁ আজ বলছিস, কাল একসঙ্গে বসে আটি বাঁধবি। আমি জানি না তোদের মতো খচ্চরদের। এতদিন আমাকে তুতিয়ে পাতিয়ে এখন সুবলের সঙ্গে খ্যামটা নাচতে চলেছিস।

রাগে শিউলির গাল লাল টকটকে, চোখে জল টলটল। স্বপনের কথায় কোনও সাড়া দেওয়া দূরে থাক, একবার ঘুরে পর্যন্ত দেখল না। এক ঝটকায় স্বপনের হাত থেকে ব্যাগ আর ডাব্বা ছিনিয়ে নিয়ে যেমন যাচ্ছিল চলতে থাকল।

–কালীমায়ের দিব্বি শিউলি, আমি আর যদি সুবলের ছায়া মারিয়েছি। শিউলির পাশে পাশে চলছিল স্বপন। কত আর জোরে যেতে পারে শিউলি। স্বপনকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়? তার উপর আবার শাড়ি পরে এসেছে। হাঁফাতে হাঁফাতে গাছতলায় দাঁড়িয়ে পড়ল। স্বপন দাঁত বের করে হাসল, জোরে জোরে শ্বাস নিলে তোর বুকটা মাইরি ক্যাম্বিস বলের মতো লাফাতে থাকে।

বুকের উপর আঁচলটা বেশি করে টেনে নিল শিউলি। খুব লোভায় না? চোখদুটো গেলে দিতে হয়। তারপর যাস তোর সুবলের কাছে। আমি আর আসব না।

–আমাকে ফেলে পালাতে পারবি না রে শিউলি। যেখানে যাবি ছিনেজোঁকের মতো লেপ্টে থাকব।
–হ্যাঁ, ওই আশাতেই থাকো। আমি তোমাকে লেপ্টাতে দিচ্ছি! মুখ হাঁ করে দম নিচ্ছিল শিউলি।

খপ করে শিউলির কাঁধে থাবা রাখে স্বপন। এক ঝটকায় একেবারে বুকের মাঝখানে। শিউলির নরম বুক স্বপনের চ্যাটানো বুকে ঘষা খেয়ে শিউরে উঠতেই ফুঁসে উঠল মেয়েটা। ছাড় ছাড় ভালো হবে না বলে দিচ্ছি স্বপন! গলায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে যাব একেবারে।

–ওরে রক্ষেকালী মা আমার, এবারের মতো ক্ষ্যামাঘেন্না করে দ্যাও আমায়। বলে সটান শিউলির পায়ের তলায় বসে পড়ল হাঁটু মুড়ে। দে এবার আমার গলায় পা তুলে।

শিউলি খিলখিলিয়ে হেসে মরেছিল। তোর নাটুকেপনা আমার কাছে দেখাস না। আর কোনওদিন যদি সুবলের নাম তোর মুখে শুনেছি তাহলে সত্যি ছেড়ে চলে যাব।

–তাহলে সকালবিকাল খাবার কে নিয়ে আসবে কালীদার এখানে?
–আমার বয়ে গেছে আনতে। এমনিতেই আজকাল এত দেরি করে ফিরি, বাড়িতে সন্দ করছে কত। বাবা তো বলেছে এবার থেকে হোটেলের একটা ছেলেকে দিয়ে খাবার পাঠাবে। আসবই না আর, তখন বুঝবে ঠ্যালা। অনেক যাত্রাপালা হয়েছে, এবার ওঠো। হোটেলের কেউ যদি দেখে ফেলে না, আমার দফারফা হয়ে যাবে।

সত্যিই খুব ভয়ে ভয়ে থাকে শিউলি। মা একদিন চেপে ধরেছিল যে। হ্যাঁ রে শিউলি। তুই কোনও ছেলের সঙ্গে জুটে গেছিস না কী?

–কেন, কী করলাম আমি?
–দেখে মনে হচ্ছে তাই বললাম। রোজ রোজ কালীদের খেলার মাঠে খাবার দিতে যাস। যতসব হাঘরের ছেলেপিলে দৌড়াতে আসে। আজকাল তুই গেলে আর ফিরতে চাস না মোটেই। ব্যাপারটা কী? মার সন্ধানী দৃষ্টি আঁতিপাঁতি করে শিউলিকে মেপেছিল।
–মায়ের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সোজা না শিউলি। এমন কিছু করিস না, যাতে পরে পস্তাতে হয়। বাপকে তো চিনিস, রাগলে চণ্ডাল। সমাজে কোনও কথা উঠলে বঁটির এক কোপে দু ফাঁক করে দেবে।

শিউরে উঠেছিল শিউলি। ভয় কী তার লাগে না? লাগে। কিন্তু স্বপন যখন হার্ডলসের বেড়া টপকে টপকে দৌড়ায়, মাথার চুল ঘামে লেপ্টে থাকে কপালের উপর, দৌড়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সব কটা পেশি একসঙ্গে ওঠে নামে, শিউলির বুকের মধ্যে কেমন একটা হয়। ওর শরীরে লেপ্টে যাওয়ার জন্য শরীরটা হাঁকুপাঁকু করে। মনে হয় পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে যে লোকটা, সে ওর। সর্বাঙ্গে একটা ভালোবাসার নদী কুলকুল করে বইতে থাকে। শরীরটা আকাঙ্খায় টসটসায়।  তখন ভুলে যায় কীসের থেকে কী হতে পারে। বাপের রক্তচোখ মনে থাকে না, মার চাপা শাসানি মনের গহীনে ডুব দেয়। শুধু জেগে থাকে দৌড়বাজ স্বপন, যাকে টেনে নিতে ইচ্ছে করে বুকের মধ্যিখানে, সাধ হয় ওর চ্যাটালো বুকের ভিতরে নিজের শ্বাস ভরে দিতে।

কিন্তু মনের এই ইচ্ছাগুলো ঝাঁপির বাইরে বেরোতে দেয় না কোনওদিন। ট্রেন থেকে নেমে সবাই যখন যে যার দিকে চলল, আর স্বপন শিউলির সঙ্গে, বারবার স্বপনের হাত ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিল তাই।

স্বপনের হাতে আজকে জেতা মেডেল। জিতে তো গেলাম, এই মেডেলটাও তোর। কাল দেব বলে পিন করলি, আর আজ যত নখরা। তোর ফটাফট চুমু কোথায় গেল শিউলি?

–তোর লজ্জাশরম নেই? ঝাঁঝিয়ে উঠল শিউলি। স্টেশানবাজার দিয়ে সকলের চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। কোথায় আমি বলে হাতই ধরতে দিচ্ছি না, আর উনি কোথাকার নাগর এলেন চুমা খেতে।

স্বপন খুব আশাহত হল। তবে যে বললি কাল? এমন চপে চুল করিস কেন?

সেটা কী আর শিউলি জানে না? অন্ধকার নেমে এসেছে রাস্তায়। বাজার ছাড়াতে পথে কোনও আলোও নেই। ঝপ করে ঘুরে বুড়ো আঙুলে ভর করে স্বপনের মাথাটা টেনে নিচে নামাল শিউলি। নিজের নরম ঠোঁটটা খুঁজে নিল আরেক জোড়া ঠোঁট স্বপনের ঘন গোঁফের নিচে। ব্যাস, হয়ে গেল তোমার চুমাচাটি। শোধবোধ ঘড়ার পোঁদ। এইবার শান্ত ছেলের মতো বাড়ি যাও দিকি।

স্বপন ওর এরকম আচমকা চুমুতে প্রথমে হকচকিয়ে গেছিল। কিন্তু এ কেমন ক্ষুধার্তের মুখে খাবারের গন্ধ শুঁকিয়ে সরিয়ে নেওয়া? বাঘের মতো দুহাতের থাবায় শিউলিকে প্রায় কোলে তুলে নিয়ে ঠোঁটের অধিকার নিয়ে নিল পুরোপুরি। শিউলির শরীর যেন বহুদিনের খরাজর্জরিত জমি, জল পেলে আরও জলের হাহাকার জেগে ওঠে। সেই আকণ্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে স্বপনের চুল দুমুঠিতে পাকিয়ে ওর মাথাটাকে কোথাও সরানোর সুযোগ রাখল না আর। টিংটিং করে একটা সাইকেল ঘণ্টা বাজিয়ে চলে গেল। অন্ধকারে বিলীন হওয়া দুটো শরীরে তখন কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। স্বপনের হাত ততক্ষণে শিউলির পায়রা বুকে বাসা খুঁজে পেয়েছে।

বাড়ি ফিরে শিউলির কপালে সেদিন দুঃখ লেখা ছিল। দূর থেকে দরজায় মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বুকটা গুড়গুড় করে উঠল শিউলির। মার পাশ দিয়ে হনহন করে ঢোকার চেষ্টা করতেই মিনতি এক থাবা মেরে পাকড়াল শিউলিকে।

–কোন চুলোর দোর থেকে আসা হল তোমার?

শিউলি মার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে বল, কেন জানো না যেন। ঝর্নার আইবুড়ো ভাত হচ্ছে, ওর মা আমাকে থাকতে বলেছিল।

ঠাস করে গালে এক চড়। হারামজাদি মেয়ে, বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে রাস্তায় রাস্তায় টো টো করতে বেরিয়েছ। সেই সকালে বেরিয়ে অন্ধকার করে বাড়ি ফিরছিস, আর পটপট করে মিথ্যে বলছিস? বল কোথায় গেছিলি? আবার একটা চড় তুলেই থমকে গেল মিনতি। তোর ঠোঁটে কী রে? লাল দাগ কিসের?

শিউলি হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁটের কষ মুছে দেখল রক্ত। স্বপনটা এমন রাক্ষসের মতো খেয়েছে!

মিনতি এক ঝটকায় চুলের মুঠি ধরে ঘরের মেঝেতে ফেলে দিল। ওঠ, উঠে দাঁড়া বেজন্মা কোথাকার! কচলাকচলি করে বাড়ি ফেরা হয়েছে উটকপালি মেয়ের, লাজলজ্জার মাথা খেয়েছিস নাকি তুই হারামজাদি?

ভয়ে কাঁপছিল শিউলি। শাড়ি গড়িয়ে পড়েছে, মাথা বনবন করছে। কিন্তু মার এই রুদ্রমূর্তির সামনে কাঁপতে কাঁপতে উঠেও দাঁড়াল। স্বপন ওর ব্লাউজের মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। উপরের দুটো বোতাম তখনই পট করে ছিঁড়েছে। ভেবেছিল শাড়ির তলায় ঢাকা থাকবে, কেউ জানবে না। শাড়ির আঁচল খসে যেতেই মিনতির চোখ সেদিকে। দপ করে জ্বলে উঠল মিনতি। এরকম ছেনাল হয়েছ তুমি? ব্লাউজের বোতাম ছিঁড়ল কী করে? এই বয়সেই নাং জুটিয়েছিস তুই ঢেউনাচানি? পাগলের মতো ঠাস ঠাস করে দুগালে চড় মারছিল মিনতি। মুখের আর আগল ছিল না। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি বাড়িতে। এমন মেয়ে জন্মাবার সময় কেন মুখে বিষ ঠুসে দিলাম না আমি।

শিউলি তখন মিনতির পায়ের কাছে আছারিপিছারি খাচ্ছে। আর মেরো না মা, ছেড়ে দাও। এবারটা ছেড়ে দাও।

–তাহলে বল কীভাবে হল এমন? কার কাছে চুসকি নিতে গেছিলি হারামজাদি!
–তাড়াতাড়ি আসতে গিয়ে রাস্তায় উলটে পড়ে গেলাম মা। হাউহাউ করে কাঁদছিল শিউলি।
–মিথ্যা কথা বেরোয় দেখছি খুব পটপট করে। পাগলের মতো শিউলির দুকাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছিল মিনতি। বাপের কাছে বললে তোর গলা দুফাঁক করে দেবে একেবারে। আজ থেকে বাড়ির বাইরে এক পাও যদি রেখেছিস। মেরে ঠ্যাঙ ভেঙে দেব একদম।

শিউলিকে টানতে টানতে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিল মিনতি। তারপর মাটিতে থেবড়ে বসে দুচোখে আঁচল চাপা দিল।

 

২.

কালীপদর মুখে হাসি আর ধরে না। সন্ধ্যাটা যেন হাজার ঝাড়বাতি জ্বেলেছে।

মল্লিকা হাতের কাছে চায়ের কাপটা নামিয়ে বলল, আজ দেখি একদম শাঁকালুর দোকান খুলে বসে আছ। স্বপন খুব ভালো করেছে বুঝি? শব্দে ঝাঁঝ থাকলেও, বলার মধ্যে ধার ছিল না। নেহাতই রঙ্গরসে ভরা টকঝাল আদানপ্রদান। তাই তার ঠেস মারা কথায় কালীপদর মুখের হাসি একটুও টসকাল না। মুখে কিছু না বলে হাসিটা মৃদুমন্দ উপস্থিতিতে ধরে রাখল।

–ভ্যাটকাচ্ছে দেখো? কথা নেই কেন মুখে? পাশের মোড়াটা টেনে বসেছিল মল্লিকা। কালীপদর বাক্যহীন চাহনিতে এবার হেসে গড়িয়ে পড়ল। নিজের মুখটা যদি এখন আয়নায় দেখতে একবার, সে একটা লাগছে বটে।
–কেন, কেমন লাগছে?
–ঠিক ডাঙায় তোলা ভেটকি মাছের মতো। মরণ!
–যাই বলো আর তাই বলো, কালী মাস্টার আজ কিছুতেই রাগবে না।
–কেন স্বপন ফার্স্ট এসেছে বুঝি আজ?

পেটের মধ্যে কথা তো গুড়গুড় করছে। কত আর চাপা যায়? কালীপদ মনের কথা উগড়াতে শুরু করল। তার থেকেও ভালো মল্লি। ছেলেটা যে কী ভালো দৌড়েছে না, ভাবতে পারবে না। এদের শালার না আছে যন্তরপাতি, না কিছু। ভাবো একবার, ছেলেটা ন্যাশানাল রেকর্ড ধুলোয় মিশিয়ে দিল, কিন্তু তার কোনও খবর হবে না?

–সে আবার কী? কালীপদর সঙ্গে থাকতে থাকতে একটু আধটু বুঝতে শিখেছে মল্লিকা। কিন্তু পুরো ব্যাপারস্যাপার ঠিক ধরতে পারে না তবুও।  তুমি বাপু বাড়িয়ে বলো খুব। গেল তোমাদের জেলার কমপিটিশানে, সেখানে ন্যাশানাল রেকর্ড কীভাবে ভাঙবে? ন্যাশানাল মানে তো সারা দেশের মধ্যেকার দৌড়। তা ন্যাশানালে যাক আগে।
–আহা মল্লি, এমন এমন প্রশ্ন করো না! মুখে বিরক্তি প্রকাশ করলেও বোঝানোর সুযোগ পেয়ে মনে মনে খুশি হয় কালীপদ। রেকর্ড তো হয় টাইমিং-এর উপর। বুঝলে না? দৌড়াক যেখানেই তার একটা টাইম হচ্ছে কি না? সেটা যদি এই দেশের আর সবার সময়ের থেকে বেশি হয়, তাহলে ন্যাশানাল রেকর্ড হল না? কালীপদ জুলজুল চোখে তাকাল মল্লির দিকে। খুব একটা সাড়া না পেয়ে বলল, আচ্ছা ধরোই না, কে এখন জাতীয় চ্যাম্পিয়ান? রবীন চাড্ডা। চারশো মিটার হার্ডলসে ন্যাশানাল রেকর্ড এখন তার। সেটা কত? বলে এমনভাবে তাকাল যেন মল্লিকার এটা জানা উচিত।
–কত?
–কেন দেখোনি ওই দরজার বাইরে আমি লিখে রেখেছি? ৫৭.৪৮ সেকেন্ড। ওইটা হল রবীন চাড্ডার সেরা সময়। গতবার ন্যাশানালে এই সময় করে শুধু গোল্ড পেল না, বারো বছর আগেকার রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিল।
–আচ্ছা একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করব করব ভাবি। এই যে গোল্ড মেডেল দেয়, ওটা কী পুরো খাঁটি সোনা? অতটা?
–ধ্যাত তাই কখনও দেয় নাকি? কত ভরি সোনা লাগবে বলো তো একেকটা মেডেলে। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। ওই মেডেল তোমার ওই সোনার চেয়ে দামী। সেসব ছাড়ো দিকিন। স্বপনের কী টাইমিং হল আজ সেটা বলো? ৫৭.৩২ সেকেন্ড। রেকর্ড ভাঙল তো?

আকাশ পাতাল বোঝে না মল্লিকা। খুব কিছু কি কম হল?

–কী বলছ তুমি মল্লি? তড়বড় করে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কালীপদ। চোখ জ্বলজ্বল করছে। বেশ উত্তেজিত। হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল, ওই এক এক মিলিসেকেন্ড ছাড়াতে না, লোকের প্যান্ট হলুদ হয়ে যায়। তাছাড়া স্বপন প্র্যাকটিসে এত ভালো করেনি কখনও। হয় এমন একেকজনের, অন্যের সঙ্গে কমপিটিশানে থাকলে অনেক ভালো করে। আজ একদম ফাটিয়ে দিয়েছে। বলতে বলতেই দপ করে মুখের আলো নিভে গেল কালীপদর।
–আবার কী হল? তোমার ছাত্তর ভালো করেছে, এই তো লাফাচ্ছিলে। এখন আবার মুখ এমন হনুমানের পোঁদের মতো হল কেন? হেসে মুখে আঁচল চাপা দিল মল্লিকা।
–এদের ব্যবস্থা এত খারাপ ছিল মল্লি, শুনলে বিশ্বাস যাবে না তোমার। এত বড় একটা কমপিটিশান, তার রেকর্ড রাখার সঠিক একটা লোক নেই। না আছে নিউজ পেপারের একটা মানুষ। কেউ জানতেও পারল না বর্ধমানের একটা ছেলে আজ জাতীয় রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আমি ভাগ্যিস আমার স্টপওয়াচটা চালিয়েছিলাম। এরা এমন গাড়ল, এদের টাইমিং দেখার ভালো লোক নেই। স্বপনের টাইম দেখাল ৫৮.৫। বোঝো? কত নিকম্মা লোক হলে এমন করে? ওই সময় হলেও অবশ্য হাওড়ার কার্তিক সাহার উপর দিয়ে যায়। কিন্তু ভাবো, যদি ওরা ঠিকঠাক সময় নিতে পারত আর একটা দুটো কাগজের লোক থাকত, খবর হত কী না?
–আচ্ছা বাবা, আর কেউ না জানুক, তুমি তো জানো! তাছাড়া বেশি লোক এখন থেকে না জানাই তো ভালো।
–অ, বলছ? কেন? বুঝতে না পেরে মাথা চুলকায় কালীপদ।
–ন্যাকা নাকি তুমি? গেলবার সুবীরকে যখন রেলে নিয়ে নিল নিজেই তো দুঃখের সমুদ্দুরে গোঁত্তা খাচ্ছিলে। যত কম জানাজানি হয় সেটা তো তোমার জন্য মঙ্গল।
–সেটা কীভাবে?
–সুবীর রেলে চাকরি নিল। ওদের কোচের সঙ্গে ন্যাশানালে গেল, তখন তো চোখে জল ঠোঁটে হাসি। আবার সেইরকম হলে ভালো হত? নিতে পারতে সেই ধাক্কা?
–সেটাও সত্যি। মল্লি তোমার মাথাটা খেলে ভালো। কালীপদ বড় স্নিগ্ধ চোখে তাকাল মল্লিকার দিকে। সাদামাটা শাড়ি। পেতে কাটা চুল, মাঝখানে আলগা সিঁদুরের ছোঁয়া। অভিযোগহীন দীঘল চোখে বড় ভরসা তার। দৌড়ের কিছুই হয়তো বোঝে না এই মেয়ে। কিন্তু ও না থাকলে কী করত কালীপদ?
–এসে থেকে শুধু স্বপন স্বপন হাঁক পাড়ছ, আর ছেলেগুলো কী করল সেটা বললে না তো?

খুব লজ্জা পেল কালীপদ। নিজেকে গুটাতে গুটাতে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ সে তো বটেই।

–দেখো, তুমি ওদের মাস্টার। তোমার কাছে পাঁচটা আঙুল যেন সমান থাকে। পরান, কল্যাণ ওই ছেলেগুলোর কথাও তোমাকে ভাবতে হবে। ওরা দৌড়ায়নি জেলা রেসে?
–হ্যাঁ, দৌড়াবে না কেন? পরান তো দুশো মিটারে থার্ড এসেছে। কল্যাণ এখনও নতুন, আমি এবার ওর কাছ থেকে কিছু আশাও করিনি। তবে হরেন বলে ছেলেটা, ওই যে একটু চোয়ারে মতো চেহারা, চুলে বাহারি টেরি। একশো মিটারে ওর উপর আমার শুরু শুরুতে খুব আশা ছিল। কিন্তু বুঝলে দৌড়ে ওর আর মন নেই। তাই পোডিয়ামে আসতে পারল না। অথচ একটু যদি চেষ্টা করে, ওর হবে।
–মন নেই তো মন বসাও। এই বয়সের ছেলেপিলের এরকম হয়। ওর বাড়িতে আর কে কে আছে?
–মা-টা তো ভেগেছে শুনেছি কোনও একটা লোকের সঙ্গে। বাপ আর একটা মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে ঘরে এনে তুলেছে। ওর দাদা বরেনটা আবার উঠতি মস্তান, কাটা সুবলের দলে ভিড়ে গোলাগুলিতে হাত পাকাচ্ছে। একে কদিন আর রাখা যাবে দৌড়ের মাঠে জানি না। শুনেছি দাদার সঙ্গে এদিক ওদিক তোলা তুলতে বেরোয়।
–বয়েস কত হল ওর?
–সবে পনেরো, কিন্তু কচি বয়সেই পাক ধরেছে।
–তুমি একদিন বাড়িতে ডাকো তো। এই বয়সের ছেলেকে একটু মা-বৌদিদের শাসনে রাখতে পারলে, ওরা বয়ে যায় না।
–তুমি ওর সঙ্গে কথা বলবে?
–হ্যাঁ, কেন নয়? তুমি যদি ওদের গুরু হও, আমি তো গুরুমা হলাম। না কি? মল্লিকা একটা সহজ হিসেব দেখায়। আমাদের যদি বয়সে ছেলেপিলে হত এমনি তো হত বয়েস এখন। হরেনকে নয় ছেলে বলে মানলাম, তাতে যদি ওকে দৌড়ের মাঠে রাখতে পারি। দেখো যদি এতে তোমার ভালো হয়।
–তুমি সত্যি বলছ মল্লি? কালীপদ হাঁটু মুড়ে মোড়ার ধারে মেঝেতে মল্লির পা ঘেঁসে বসে পড়ল। মল্লির হাঁটুতে হাতের চাপ দিয়ে বলল, আমি মনে মনে এসব ভাবি না তা নয়। কিন্তু সাহস করে বলতে পারি না গো। এমনিতেই তোমাকে কিছু দিতে পারি না, তারপর আবার এসব চাপানো।
–কী গো তুমি? বিশটা বছর হয়ে গেল, এখনও নিজের বউকে চিনলে না? দৌড়ের মাঠে কি মুখে ঘাস দিয়ে বসে থাকো? কথায় ঝাঁঝ থাকলেও কালীপদর মাথার চুলে বিলি কাটা আঙুলগুলোর স্পর্শ ছিল নরম। ভালোবাসার, চেনা পরিচিতির, কাছের মানুষের গন্ধে ভরা।
–তাহলে একটা কাজ করি মল্লি? সবাই তো দৌড়ে এল। যে যেমন করেছে। ওদের তো রোজ ওই অন্নপূর্ণা হোটেলের খাবার খাওয়াই। তুমি একদিন নিজের হাতে খাওয়াও ছেলেগুলোকে। কালীপদ বড় আবেগাপ্লুত মানুষ। ভালোবাসার কথা বলতে থাকলে চোখ এমনিতেই ঝাপসা হয়ে যায়। ডাকি ওদের একদিন দুপুর দুপুর করে?

মল্লিকা কিছু বলার আগেই দরজায় ঘনঘন খটখট। কালী! কালীপদ!

–নটা বেজে গেছে, এখন আবার কে এল? মল্লিকার গলায় ত্রাস।

কালীপদ গলা শুনেই চিনেছে। এ তো বংশী মিত্তিরের গলা, অন্নপূর্ণা হোটেলের মালিক। আমি তো ওর সব টাকা চুকিয়ে দিয়ে এসেছি। সে কেন আমার বাড়ি? বলতে বলতেই ঘর পেরিয়ে বারান্দার দরজার ছিটকিনি নামায়।

বংশী মিত্তিরের চেহারাটা কালীপদর তুলনায় ছোটখাটো। কিন্তু সাফল্য মানুষকে উচ্চতা দেয়। হোটেল রম রম করে চলছে। একসময় ঘাড় ঝুঁকিয়ে কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো বংশী মিত্তির সে নয়। জামাকাপড়ে তেমন কিছু চেকনাই নেই। কিন্তু চলনেবলনে একটু দেমাক এসেই যায়।

–কী হল কালী? তোমরা কী শুরু করেছ বলো তো? দরজা খুলতেই খাঁই খাঁই করে উঠল বংশী।
–ভিতরে আসুন বংশীদা, বাইরে থেকে চেঁচালে তো ভালো কথা নয়। কালীপদ নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টায় থাকে।
–ভালো? ভালোখারাপের কোনও জ্ঞানগম্যি আছে তোমার? আমার এত বড় সর্বনাশ করে তুমি আবার ভালোখারাপ মারাচ্ছ?

গোলমাল শুনে মল্লিকা দ্রুতপায়ে দরজায় চলে এসেছিল। লোকটাকে আগে শুধু একবারই দেখেছিল। কালীপদর সঙ্গে একদিন অন্নপূর্ণা হোটেলে খেতে গেছিল বছরখানেক আগে। বংশী তখন ওদের দেখে ক্যাশবাক্স ছেড়ে দু মিনিটের জন্য উঠে এসেছিল খাতির দেখাতে। সেদিন তো গলায় মধু ঝরছিল, তবে আজ কেন এমন তেলেবেগুনে জ্বলছে?

মুখে যতটা পারে হাসি এনে মল্লিকা বলল, আসুন বংশীদা ঘরের ভেতর এসে কথা বলুন আপনারা। আজ আমাদের বাড়ি প্রথম এলেন।

খুব একটা নরম হল না বংশীর গলা। সারাদিন খেটেখুটে আমি এখন পাড়া বেড়াতে আসিনি। কালী আমার এত বড় সর্বনাশটা কেন করল, সেটাই জানতে এসেছি।

কালীপদর মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। কীসের সর্বনাশ? কী করেছে সে? কিন্তু মল্লিকা চট করে ব্যাপারটা আঁচ করতে পারছিল। আগেও এই ব্যাপারে কালীপদকে সাবধান করেছিল একবার। নিশ্চয় ওর মেয়েকে নিয়ে কিছু।

খপ করে বংশীর ডান হাতটা ধরল মল্লিকা। একটু মাথা ঠান্ডা করে বসুন বংশীদা। যদি ওর দিক থেকে কিছু আন্টসান্ট হয়ে থাকে, কথা বলে তার নিষ্পত্তি করা যায় না কি?

মল্লিকার শীতল হাতের স্পর্শেই হোক কিংবা কথার জাদুতেই হোক বংশী ভিতরে ঢুকল, গলার স্বরও আগের থেকে নরম। আমার যে সর্বনাশ হয়ে গেল কালী।

–কী হয়েছে একটু বলবেন আমাদের? শিউলিকে নিয়ে কিছু? মল্লিকার মন বলছে ওই মেয়েকে নিয়েই কিছু হয়েছে নির্ঘাৎ।
–আমার মেয়েটা যে বিপথে চলে গেল কালী, শুধু তোমার এখানে এসে। কোথাকার কোনও বস্তির ছেলেদের এনে দৌড় শেখাও। আমি তোমার কথা ভেবে সস্তায় খাবার পাঠাতাম। শিউলিকে দিলাম খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
–কিন্তু বংশীদা, আমি কী বলেছিলাম শিউলির হাতে খাবার পাঠাতে?

খেঁকিয়ে উঠল বংশী। অত সকালে আর কাকে পাব বলো তো কালী? তাই নিজের মেয়েকেই পাঠালাম। ভাবলাম শিখুক একটু কাজকর্ম। বড় মেয়ে, ছেলেদুটো এখনও ছোট ছোট। আমার কিছু হলে কাউকে হাল ধরতে হবে তো।

–তাহলেই বুঝুন, আমি কিছু বলিনি। এখন বলুন হয়েছেটা কী?
–নিজের মুখে মেয়ের কথা আর কী বলি বলো। তোমার এখানে স্বপন বলে একটা ছেলে আছে, তার সঙ্গে ভিড়ে গেছে। ভাবো একবার বংশী হোটেলওয়ালার মেয়ে এক রিক্সাওলার ছেলের সঙ্গে পিরিত করছে। ঘরের মধ্যে বসে না থাকলে, বংশীর এখন একদলা থুতু ফেলতে ইচ্ছে করছিল।
–কীভাবে জানলেন সেটা বংশীদা? আমরা তো এসব কিছু জানি না। কালীপদকে কিছু বলতে না দিয়ে মল্লিকাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন শুরু করেছে। জানে এসব মামলা সামলানোর হিম্মত কালীপদর নেই, সোজাসাপটা মানুষ। ওর জন্যে দৌড়ের মাঠই ঠিক আছে।

বংশী মিত্তিরের গলা ঘড়ঘড় করছিল। বংশীর কাছে কারও কোনও ছাড় নেই। সে নিজের মেয়ে হোক, কী বাইরের লোক। মেয়ে আজ মার কাছে ধরা পড়ে গেছে। বাড়ি ফিরে দু ঘা দিতেই সব উগড়ে ফেলেছে।

শিউলিকে দেখেনি কখনও মল্লিকা। কিন্তু শুনেই কেঁপে উঠল মেয়েটার জন্য। অত বড় মেয়েকে মারলেন বংশীদা?

–তাহলে কি মাথায় নিয়ে কেত্তন করব? না কি ঢোলসহরত করে হাভাতের ছেলের সঙ্গে বিয়ের বন্দোবস্ত করব? মেরে পাট পাট করে দিইচি। বলতে বলতে ঠোঁটের কষ দিয়ে ফেনা বেরোয় বংশীর।

কালী এতক্ষণ কিছু বলেনি। স্বপনের সঙ্গে শিউলির লভের সম্পর্ক তার একদম অজানা নেই। এই বয়সের সোমত্ত ছেলেমেয়ে, অমন একটু গা ঘেঁষাঘেঁষি তো হয়েই থাকে। আজ শিউলি যখন আসানসোলে ওদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য স্টেশানে এসে উপস্থিত হয়েছিল, তখনই তার মনে একটু সন্দেহ জেগেছিল, ব্যাপারটা বোধহয় একটু বেশি দূরই গড়াচ্ছে। কিন্তু শিউলি থাকলে স্বপনের দৌড়ে যে একটা তেজ বাড়ে সেটা তো আর চোখ এড়ায়নি তার। তাই বুঝলেও মুখ খোলেনি।

কালী উঠে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা কাগজের কাটিং নিয়ে এল হাতে। এইটা একবার দেখুন বংশীদা।

বংশী হাতে কাগজটা নিয়ে কূলকিনারা পায় না। কী এসব? এই দেখে আমি কী করব?

–দৌড়টাকে ছোট করে দেখছেন কিনা, তাই এটা দিলাম। এই যে এশিয়ান গেমসে শ্রীরাম সিং সোনা জিতেছে। তার ছবি আর খবর এটা। প্রধানমন্ত্রী তার জন্য বার্তা পাঠিয়েছে। দেখছেন?
–কে শ্রীরাম সিং? তার সঙ্গে আমার মেয়ের কী সম্পর্ক?
–আছে। এই যাকে আজ হাভাতে বলছেন, এই যে স্বপন, এও এমনি ধারা কিছু করতে চলেছে। জানেন আজ দৌড়ের মাঠে কী করেছে? ন্যাশানাল রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে ওই ছেলে? কদিন শিখছে আমার কাছে? বেশি হলে এক বছর। এইটুকু সময়ে কোথার থেকে কোথায় পৌঁছে যাচ্ছে ওই ছেলে।
–কী বলতে চাইছ কালী?
–যাকে আপনি আজ হাঘরে বলছেন, আর কটা মাস যেতে দিন কাগজে ওর নাম বেরোবে। সবাই মাথায় তুলে নাচবে। মেয়ের বিয়ে দেবেন তো? কার সঙ্গে দেবেন সেটা আপনার ভাবনা হবে। কিন্তু যখন স্বপন ন্যাশানালে জিতবে আর বড় কোথাও চাকরি পেয়ে যাবে, বুড়ো আঙুল চুষতে হবে আপনাদেরই।

বংশী মিত্তির আবার একবার কাগজটার দিকে তাকায়। গল্প তোমার ভালোই আসে কালী। কটা মেডেল জিতেছে তোমার ছেলেরা আজ অবধি?

–জিতেছে বংশীদা। ওই যে সুবীর ন্যাশানালে সোনা জিতল, এখন রেলে চাকরি দিয়েছে ওকে, আমার কাছেই তো শিখেছে নাকি? কিন্তু স্বপনের জাত আরও উঁচুর দিকে। ওর দৌড়ের মধ্যে যে কী আছে না বংশীদা, আমি দেখি আর ভাবি। এই ছেলে শুধু দুর্গাপুর না, সারা দেশের কাছে নাম কামাবে একদিন।

বংশী জুলজুল করে তাকিয়েছিল কালীপদর দিকে। ব্যবসায়ী মানুষ, মাথায় হিসেবকিতাব চলতে থাকে। লাভলোকসান কড়ায় গণ্ডায় না বুঝে এক পাও এগোয় না বংশী। নিজেও একদিন দিন-আনা দিন-খাওয়া লোক ছিল, কাজের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরেছে। মিনতিকে বাড়ি থেকে ভাগিয়ে শেষে এই দুর্গাপুরে এসে তার ভাগ্য ফেরে। ওর চোখে ঘোড়ায় বাজি রাখার আগের দোনামনা ভাব।

মল্লিকা নরম গলায় বলল, আপনার চিন্তাটা বুঝছি বংশীদা। এই বয়সের ছেলেমেয়ে, শরীরে আগুন নিয়ে ঘোরে। আমাদেরই একটু সামলে রাখতে হয়। কিন্তু বেশি চাপ দিলে কী করতে কী করে বসে তার কি কোনও ঠিক আছে?

বংশী মন দিয়ে শুনছিল। মেয়ে কিছু করে বসতে পারে সেই ভয়টাও তার ষোল আনা।

–আমি বলি কি শিউলিকে একটু আমার কাছে পাঠান। ওর সঙ্গে আমি একটু কথা বলি। মেয়েলি কথা আর কী, যেটা আপনি বলতে পারবেন না। অনেক সময় মা আর মেয়েতেও অমন কথা বলা যায় না। ঘরে আটকে না রেখে এমন করুন যে খোঁটায় বাঁধা থাকল। আপনার চোখের আড়ালে কিছু হওয়ার জো নেই, এদিকে মেয়ের জন্য একটা ভালো জামাইয়ের ব্যবস্থাও হয়ে থাকল।
–আমি হোটেল চালাই। মেয়ে আমার কোথায় কী করছে, তার খোঁজ আমি রাখব কী করে?
–সেই জন্যেই তো বলছি। আমার কাছে পাঠিয়ে দিন একবার। দুটো কথা বলি ওর সঙ্গে। সোমত্থ মেয়ে, মনে এখন কত রং, কত আশা। ওর মনের কথা টেনে বের করি, ভরসা জোগাই। তারপর খাবার নিয়ে যেমন আসছিল আসুক। মাঠে ওদের মাস্টার চোখ রাখবে যেন কোনও অনর্থ না হয়।
–দেখবে, স্বপন একবার রেসে জিতুক, চাকরি একটা পেয়েই যাবে। তখন সময়সুযোগ মতো মেয়ের বিয়ে দিতে পারবে বংশীদা।

বংশী হাতের কাগজটার দিকে আর একবার তাকায়। এখনও মনে একটু ইতস্তত ভাব। শত হলেও মেয়ের কিছু হলে সমাজে মাথাটা হেঁট হয়ে যাবে একেবারে। গলাখাঁকারি দিয়ে বংশী নিজের মনে কথাটা সাজায়। তোমাদের ভরসা করতে পারি বলছ?

–মেয়েকে ভরসা করুন বংশীদা। আপনার মেয়ে তো, বুদ্ধিভাবনা কিছু কম থাকার কথা নয়। আমরাও দেখব। ওর সব ছাত্ররা তো আমাদের ছেলের মতোই। শিউলি নয় আমার মেয়ে হল।

মল্লিকার কথার জাদুতেই হোক, কিংবা ভালোখারাপের হিসেবনিকেশ করে পাল্লাটা কোনদিকে ঝুঁকেছে তার ভরসাতেই হোক, বংশী মেনে নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াল। ঠিক হল শিউলিই খাবার নিয়ে আসবে এখন, হয়তো কাল হবে না, কিন্তু তার পর আবার। স্বপনের জন্য কিছু করতে হলে সেটাও করবে বংশী। বিকেলের দিকে হোটেলে এসে কাজ করুক, পয়সা পাবে। হবু জামাইকে একটু বাজিয়ে দেখাও হবে। এমন কথাও বলে গেল যাওয়ার আগে।

দরজাটা বন্ধ করে কালী দুহাতে জড়িয়ে ধরল মল্লিকাকে। তুমিই পারলে মল্লি, না হলে এমন সুরাহা করা যেত না ব্যাপারটার।

–আমি বলেছিলাম আগেই। বলো বলিনি? এই বয়েসের ছেলেমেয়ে মানে চকমকি পাথর। বেশি ঘষাঘষি খেলেই আগুন।

মল্লিকার বুকে মুখ গুঁজে দিল কালীপদ। আর আমরা ঘষাঘষি খেলে?

–কী হচ্ছে কী? বুড়ো বয়সে ধ্যাড়ার নাচ। হাসি চাপতে চাপতে না বলে পারল না মল্লিকা। এই মানুষটা ছাড়া তার আর আছে কী!

 

(আবার আগামী সংখ্যায়)

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. ছায়াপাখি, নীল হ্রদের তীরে — পর্ব ৭ (শেষাংশ) – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...