সম্পর্ক মণ্ডল

পাঁচটি কবিতা

 

আমার জন্মের সময়

লগ্ন তুলায় অশ্বিনী নক্ষত্রে এইক্ষণে শুক্লা চতুর্থী আজ
মা তোমায় গর্ভের হ্রদে এই স্রোত আর ভাল লাগছে না
মনে হচ্ছে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে একটা সার্চলাইট বারবার
আমার মুখে আলো ফেলে চলে যাচ্ছে দূরে
মৃত্যু মানে কী নীরব আঁধার!
এই আঁধার আজ আমার নাড়ীর ভেতর ঢুকে গ্যাছে
ভৌমজলের মতো আমায় সে
চাপে চাপে
ছিটকে আনছে
বাইরে
এই সন্ধ্যা-রাত
ডাক্তার সীমা মুখার্জির হাতে সিজার নিডল
তুলে নিয়ে
তাকিয়ে আছেন
অক্ষক্রীড়া থেকে ফেরা আধঘুমন্ত শিশুর দিকে
এত আলো এত আলো!
মা, তোমার ব্রহ্ম আঁধার থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে
মায়ামুগ্ধ এই জগৎ দেখছি
আর কান্নার প্রস্ফুটিত অক্ষর দিয়ে লিখতে চলেছি
জায়মান জন্মরাগ এই রাত্রি….

 

দশ অবতার চরিত

মৎস্যের উৎস সন্ধানে গিয়ে, মহাপ্লাবনের দিনে যার হাত ধরে রক্ষা পেয়েছিলাম তিনিই কি সমুদ্রমন্থনের কুম্ভ ধরে অমৃত দিয়েছিলেন আমার সুধাকণ্ঠে? তিনিই কি হিরণ্যাক্ষের হত্যার পর আমায় বলেছিলেন এই মর্তধামের কথা? যেখানে আমি প্রহ্লাদ রূপে জন্ম নিয়ে পিতার মৃত্যুকে দেখেছি স্বচক্ষে। দেখেছি সমগ্র এই বিশ্বলোকে মাত্র তিন পদক্ষেপ গেলে তিনি বামনদেব হয়ে পথ দেখান, তিনি ক্ষত্রিয়দের যম হয়ে পরশু হাতে মর্তলোকে ঘুরে ঘুরে, কখনওবা দূর্বাদলশ্যাম-নৃপতি হয়ে রাবণের মৃত্যু শেষে, বুদ্ধের প্রণতির প্রতি জীব-প্রাণের আকণ্ঠে জলে নামেন।

এখন তিনিই ডান হাতে তলোয়ার নিয়ে সাদা ঘোড়ায় চড়ে আসছেন, যার পদকম্পন-আয়ুরেখার বিস্তার হয়েছে যেখানে

এই পাঠক, যিনি, শেষ লাইনটি এখন পড়ছেন।

 

কাটোয়ার হাজার বছরের ইতিহাস

বনতুলসি-ঘন বনে দাঁড়িয়ে, মেগাস্থিনিস ভাবলেন— এ নগরী তবে কটদুপা? এখানে সারি সারি গণিকা-দুহিতা অক্লেশে চুমু খাচ্ছে দেবশিশু কার্তিকের গালে। বিনুনি দুলিয়ে তারা কথা বলছে বিদেশি বণিকের সাথে। এই তো হরগৌরীপাড়া, এখানে মহাফাল্গুন বাবুদের মেলা, তারা ধুতি ধরে লড়াইয়ে নেমেছে প্রশস্ত পথ জুড়ে। তবে এ লড়াইয়ের ভেতরে এ কোন গৌরাঙ্গ যুবক, যে সারাপথ কৃষ্ণপ্রেমে মাতাল হয়ে মুর্ছা যাচ্ছে বারবার। ভাঙা আশ্রমের গায়ে সে দৃশ্য দেখে কেশবভারতী কী ভাবছে মনে মনে? এ নগরঘণ্ট কি পাপের? এ নগরে বিদেশি বণিকের টাকায় গণিকার ঘাম লেগে আছে। এই নদীসঙ্গমস্থল তবে পূর্ণবারিধারায় আর্দ্র হোক। আজ বনতুলসি বনে বনে বেজে উঠুক অক্লান্ত শ্রীখোল, করতাল। যার সুর সঙ্কীর্তনের সহজ ধর্মে সিক্ত হোক মাটি, নতুন প্রভাতের নগরপরিক্রমায়, সম্মুখে গৌরাঙ্গ যুবক, পশ্চাতে অগণিত কাটোয়াবাসীগণ।

 

বসন্তের ভোরাই

এই বসন্তরাত শেষে আরও মাথুর হয়ে উঠেছে গাছ
যেন সমস্ত বিষাদ ফেলে সে সুদূর প্রেমের কাছে যাবে
জানি না কী অভিলাষে কেঁপে কেঁপে উঠছে সব ছায়া
সব গাছে প্রেম প্রেম গন্ধ
ভোরের শিশিরস্নাত পাতার কাছে কান পেতে চেয়ে রই
দূরে কোথাও কোনও মন্দিরদ্বার থেকে বৃন্দগান শেষে হয়ে এল
আশ্চর্য ভোর জুড়ে রাই রাই মৌতাত উড়ছে আজ

 

৪৫,৬০০০০,৩৪৫৬৭ বছর পর, একদিন

বাইশ হাজার টন সূর্যতাপ গলে তপ্ত হল পৃথিবীর মাটি
উদ্ভিদ নেই
অক্সিজেনহীন বাতাস
চারদিকে ধূসর আকাশ
চারদিকে পুরু মেঘমালা
অ্যাসিড বৃষ্টির আশায়
দুদণ্ড গানের মতো
শুকিয়ে কাঠ হওয়া নদীতট
আজ কোনও প্রাণীর পদচিহ্ন নেই

আজ কোনও বিরুৎ প্রাণের স্তব নেই
শুধু বিষাক্ত বাতাসে বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে
স্মৃতিলোপকারী কিছু পাখিদের গান
আর মানুষের হারিয়ে যাওয়া পদধ্বনি

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...