দেখার আয়না

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

সকালটায় একটু একটু করে রং ধরছিল। চায়ের আগমন উষ্ণতা এনে দিল।

নির্মাল্য আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, তাহলে? কখন বেরোচ্ছি আমরা? কী প্ল্যান ভাই সুপ্রিয়, তুমিই তো আমাদের ট্যুর গাইড।

নির্মাল্যর গলায় একটা হইহই জুড়ে থাকে সবসময়, যাতে খাদ নেই। শুধু অবিরাম আনন্দের নিঃসরণ। কাঁচাপাকা দাড়ি আর এলোমেলো চুলের মধ্যে থেকে ভেসে ওঠা সজীব চোখ দুটোয় বহমান নদীর উচ্ছলতা।

যদিও শুনে সুপ্রিয় একটু কাঁচুমাচু ভাব করল, কী যে বলো নির্মাল্যদা, আমি তো এখানে প্রথমবার। তুমি কতবার এসেছ শান্তিনিকেতনে।

–আরে সেইজন্যেই তো! আমাকে ছেড়ে দিলে আমি এই বাগানে গাছের তলায় বসে রবীন্দ্রনাথ পড়ব আর সুর ভাঁজব। তারপর খোঁজ নিতে বেরোব চেনাজানা দু-পাঁচজনার। তোমাদের আর শান্তিনিকেতন দেখাই হবে না। নির্মাল্যর অবাধ হাসিতে হাওয়ায় কাঁপন ধরল আবার।
–আমি কিন্তু সোনাঝুরির হাটে যাব। বারান্দার কোণায় উঁকি মারা স্বর্ণজবার গাছটাকে তারিফ করতে করতে মুখ ফেরাল বিদিশা। আর নির্মাল্যদা, তুমিই আমাদের আসল ট্যুর গাইড, এমন একটা ভাল জায়গায় যা এনে ফেলেছ।
–আর আমি যাব তেপান্তর, ওখানে একটা নাটকের গ্রাম করেছে। সেটা দেখতেই হবে। খবরের কাগজ থেকে চোখ না নামিয়েই বলেছিল প্রশান্ত।

এইভাবে যখন কথা বেশ জমে ওঠার জন্য তৈরি হচ্ছে, ঘরবাড়ি হোমস্টের বাগানের গেট ঠেলে এক ভদ্রমহিলাকে ঢুকতে দেখা গেল। ওরা নিজেদের মধ্যে কথায় ব্যস্ত ছিল, না হলে দেখতে পেত ভদ্রমহিলা গেটের বাইরে কিছুক্ষণ আগুপিছু করে, আসবেন কি আসবেন না এরকম একটা দ্বিধাগ্রস্ত ভাবকে পিছনে ফেলে, অবশেষে ঢুকেছিলেন। এই কারণেই হয়তো অস্বস্তি কাটাতে কিংবা এমনটাই উনি করেন সচরাচর, গলায় একটা গুনগুন সুর ভাঁজছিলেন।

–জোরে গান না, আমরাও শুনি।

নির্মাল্যর এই উদাত্ত আহ্বানে ভদ্রমহিলার চাপা গলার গান মাঝপথে থেমে গেল।

ভদ্রমহিলার বয়স অবশ্যই সত্তরের উপর। মাথার বেশি সাদা, কম কালো চুলে এলো খোঁপা, পরনে নাইটি, তার ওপরে হাউজকোট। লম্বা দোহারা চেহারা, মুখের চামড়ায় কিছু আঁকিবুঁকি, পোশাক অবিন্যস্ত। অথচ মুখের একচিলতে সলজ্জ হাসিটির বয়স বেশ কম।

–এই দেখুন আপনারা শুনতে চাইছেন, আর শান্তিনীড়ের বাসিন্দারা আমার গান শুনলেই অশান্তির গন্ধ পান। এক আছেন মিত্তিরবাবু, সদাশিব মিত্র, আমাকে জুতো তুলে দেখিয়েছিল গান গাওয়ার অপরাধে, ভাবতে পারেন?

কথাটা এমন আচমকা, পরিচয়ের গণ্ডি টপকে সবাইকে হতচকিত করার জন্য যথেষ্ট।

–সে কী? এ কী কাণ্ড। নির্মাল্য গান বড় ভালবাসে, শুনে আঁতকে উঠল প্রায়। কিছুটা ব্যস্তও, গান তার জীবনের প্রিয় অনুষঙ্গ, সেটা যে কারও অপ্রিয় হতে পারে ভাবতেই পারে না। তাই সে যখন বলল, আপনি এখানে এসে বসে গান শোনান আমাদের, আমরা শুনব, সেই অনুরোধে কোনও খাদ ছিল না।
–না, না আমি বসে শোনানোর মত কিছু তো গাই না। আর কী জানেন? ভদ্রমহিলা কথা বলতে বলতে এগিয়ে এসেছেন, ওর গালের ঈষৎ শিথিল ত্বক ছাপিয়ে মেঘভাঙ্গা সূর্যের মত চাপল্য উঁকিঝুকি দিচ্ছিল। আসলে কী জানেন, এখানে তো সবাই রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া কিছু গাইবে না, আমার আবার সলিল চৌধুরীর গান খুব প্রিয়। তাই বোধহয় লোকে পছন্দ করে না।
–এখানে রবিঠাকুরের গান ছাড়া কেউ কিছু গায় না? শুনুন, আমি আগে একবার এসেছিলাম। কী একটা পুজো চলছিল, লোকে সারারাত ধরে বিড়ি জ্বালাইলে গাইল আর আমি ঘুমাতে না পেরে এই বারান্দায় বিড়ি জ্বালিয়ে বসে রইলাম।

চারপাশে মৃদু হাসির ব্যঞ্জনা তৈরি হল। ভদ্রমহিলার মুখের বিব্রত ভাবটা তবু ঝুলছিল ঠোঁটের কোনায়। আর আমার কি সেই বয়স আছে?

–আরে আপনার আর কী বয়স?
–কেন, বোঝা যায় না? আমার বয়স কিন্তু তিয়াত্তর।
–তাতে কী, আমার তো ঊনসত্তর। তবে আপনাকে আমার থেকে ছোটই লাগে।

এই ভদ্রমহিলা্কে বয়সের তুলনায় একটু বেশিই বুড়ি লাগছে, নাহলে আজকাল তিয়াত্তরটা আর কী। সুপ্রিয় আর বিদিশা সেটা ভেবেই একবার চোখ চাওয়াচাওয়ি করে নিল। মুখের হাসি চাপতেই বিদিশা আরও বেশি ঝুঁকে পড়ল গাছের তত্ত্বতালাশে। কিন্তু ভদ্রমহিলা এতক্ষণে যেন বিকশিত হলেন। একটা বাচ্চা মেয়ে বেরিয়ে এল জীর্ণ খোলস থেকে। ইশ, আপনি কি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতে পারেন। আমি বসব এখানে?

–অবশ্যই, হ্যাঁ রে সুপ্রিয় ওদের আর একটা চা দিতে বলে দে না। নির্মাল্য সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে ভদ্রমহিলার নাম জানা গেল।
–আমার নাম পায়েল, আমি যখন জন্মেছি তখন কিন্তু পায়েল নামটা খুব মডার্ন ছিল। আর কারও ছিল না। বাবার খুব আদরের ছিলাম তো।

সুপ্রিয়র ছোট মাসির নামও পায়েল, সেটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বিদিশা ততক্ষণে মোড়া টেনে পাশে বসেছে, কব্জিতে একটা চিমটি কেটে থামাল। গাও না পায়েলদি? কোন গানটা গাইবে?

পায়েলদি গুনগুন করে সুর ভাঁজতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে, কথা ভুলে গেলে ধরিয়ে দেবে কিন্তু— শোনো, কোনও একদিন, আকাশ বাতাস জুড়ে রিমঝিম বরষায়— গান শুরু করল পায়েলদি। গলাটি মোটেই ভাল নয়, সুর ধরে রাখতে পারেন না বলে শুধু নয়, গলাটাও খ্যানখ্যানে। সকালের মাধুর্যটুকু ধরে রাখতে নির্মাল্য গলা মেলাল।

–আমি একবার রেডিওর অডিশনে যাব ভেবেছিলাম, গান মাঝপথে থামিয়ে পায়েলদি বলে উঠল। সেই ছোটবেলায়। মণিমেলার আসরের জন্য।
–আপনি গাইতেন মণিমেলায়?
–আমার একটা গোলাপি ফ্রক ছিল— হ্যাঁ আমার বাবা খুব মডার্ন ছিল তো, সে যুগেও আমাকে অনেকদিন অব্দি ফ্রক কিনে দিয়েছে— এই এমনি ঝালর দেওয়া ছিল। আমি সেই ফ্রক পড়ে যাব বলে তৈরি। কিন্তু মা যেতে দিল না। বলল, এসব করতে হবে না তোমায়, পড়াশোনা করো মন দিয়ে। আমাকে গানও শিখতে দেয়নি জানেন?

কত বছর আগে ঘটেছিল সেসব? ষাট, বাষট্টি? সুপ্রিয়র মনে হল পায়েলদির মুখের কষ্টটা যেন গতরাতের, ঘুম থেকে উঠেও চোখের কোণায় রয়ে গেছে।

–আমাকে কেউ গান গাইতে দেয় না কেন? এই কথাগুলো পায়েলদি বলল অস্ফুটে, যেন নিজেকেই বলা। কোনওদিন দেয়নি।

পায়েলদির বলা আর না-বলার মধ্যে একটা ফাঁক তৈরি হয়েছিল। শিবানী স্নান করতে উঠে চলে গেল। সঙ্গে প্রশান্ত। হয়তো প্রভাতী আসরটা ভেঙে যেত, কিন্তু আর এক প্রস্থ চা এসে গিয়েছিল। সঙ্গে রাস্ক বিস্কুট।

–এই মিথিলা, জানিস না আমি রাস্ক বিস্কিট ভালবাসি না। সেই তেকোনা নোনতাটা নেই?

চা দিয়ে চলে যাচ্ছিল মিথিলা, সে এই হোমস্টের রাঁধুনি কাম কেয়ারটেকার। ঘাড় ফিরিয়ে যেভাবে খরখর করে উঠল, না নেইকো। তোমাদের শান্তিনীড়ে চা খেতে পারো না মাসি? তাতে বোঝা গেল পায়েলদি মাঝেমাঝেই এখানে চা খেয়ে থাকেন, এবং উনি এখানে অত আদরণীয় নন।

বলে তো মিথিলা চলে গেল, ভদ্রমহিলার মুখটা একটু কাঁচুমাচু হয়ে গেল খানিকের জন্য। বিদিশা অস্বস্তি কাটাতে বলে উঠল, আপনার আর কে আছে পায়েলদি?

কথাটার মধ্যে হয়তো আপনার আর কেউ নেই পায়েলদি, এই প্রশ্নটা লুকিয়েছিল। তাই উনি বোধহয় একটা কৈফিয়তের ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, আছে না? আমার ছেলে, সে থাকে বম্বে। আর মেয়ে লন্ডনে। উনি তো চলে গেলেন, এখানেই। তখন আমরা শান্তিনিকেতনে নিজেদের বাড়িতে থাকতাম, সে ওর রিটায়ারমেন্টের পর থেকেই। ও চলে যেতে ছেলে বলল, কেন একা থাকবে মা, তুমি গল্প করতে ভালবাসো এত। আরও অনেক লোকের সঙ্গে থাকলে ভাল লাগবে বেশ।

–ছেলেকে বলেন না এখানে আপনাকে হেনস্থা করছে?

পায়েলদির মুখটা ম্লান হয়েই আবার ঝকঝক করে উঠল। সেসব কি বলা যায়? ছেলে কত বড় চাকরি করে, সরকারের বড় অফিসার সে, তার কত কাজ, কতদিকে মাথা দিতে হয়। কেন খামোখা বিরক্ত করব?

–আপনাদের শান্তিনীড়ে কোনও অ্যাডমিনিস্ট্রেটার তো আছে, তাকে বলুন।
–লাভ নেই গো, বলেছিলাম। সে লোকটা আবার সদাশিব মিত্রের বন্ধু। আমাকে বরং বলল, শান্তিনীড়ে অশান্তি করলে আমাকে পুলিশে দেবে। হ্যাঁ, যেন এত সোজা! জানে না নাকি আমার ছেলে কত বড় চাকরি করে, একবার বললেই পুলিশ ওদের টিকি ধরে টেনে নিয়ে যাবে।

পায়েলদির কণ্ঠস্বর পাখিলতাগাছের পাতার মত তিরতির করে কাঁপছিল।

এসব শুনতে শুনতে সুপ্রিয়র খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। কষ্টও। তার মায়ের বয়স এখন ঊনআশি। কখনও দাদার কাছে থাকে, আবার কখনও তার কাছে। হাঁটাচলার শক্তি ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। বিদিশা একবার বলেছিল, মানুষটা সারাদিন একা একা থাকে, আজকাল তো কত ভাল ভাল বৃদ্ধাশ্রম হয়েছে, মাকে ওখানে রাখতে পারো তো।

–নিজের বাড়ি ছেড়ে মা অন্য কোথাও থাকবে? দেখো না দাদার ওখান থেকেও কেমন পালিয়ে পালিয়ে আসে।

বিদিশা রাগ করে বলেছিল, পালিয়ে আসে বলে বেশিরভাগ সময়টাতে তো আমার ঘাড়ে থাকে।

সুপ্রিয় চুপ করে গিয়েছিল, তবু বিদিশা মাঝে মাঝে বলে। ধীরে ধীরে ভাবনাটা সুপ্রিয়র মনেও জায়গা নিচ্ছিল। কিন্তু আজ মনে হল, কক্ষনও না। মা বিছানায় পড়ে যাক, তবু নিজের বিছানায় থাকুক। সেই ভাবনাটা চোখে মেলে ধরে বিদিশার দিকে তাকাল সুপ্রিয়। কথাটা চোখেই হল, কিন্তু তা বিদিশার মোড়া ছেড়ে বাগানে নেমে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

বিদিশা বাগান থেকে ডাক দিল। এই শোনো না, আমার একটা ছবি নাও না এখানে। এই কাঞ্চনগাছটার তলায়।

বিদিশার ছবি নিল। শিবানীর স্নান হয়ে গেছিল। শিবানীও চলে এল। একা, দুজনে বিভিন্ন ভঙ্গিতে। ছবি তুলে বিদিশা গেল স্নানে।

সুপ্রিয় ভাবল সবার ছবি তোলা হচ্ছে, হয়তো পায়েলদিরও ইচ্ছা হচ্ছে একটা ছবি নিতে। নির্মাল্য ছবি তোলার ব্যাপারে তেমন উৎসাহ দেখায় না, কিন্তু পায়েলদি— সে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁক দিল, পায়েলদি, একটা ছবি তুলি আপনার। আসুন।

–আমার? এই যাহ্‌! এই বুড়ির ছবি তুলে আর কী হবে।
–ছবির কি আর বয়স আছে নাকি? আসুন তো।
–এ মা এই নাইটি পড়ে? ছি ছি লোকে কী ভাববে?
–যান, যান। হাউজকোট আছে তো। ছবিতে মনে হবে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে বাগানে ফুল দেখছেন। একদম ন্যাচারাল।

নির্মাল্যর উৎসাহ পেয়ে মোড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন পায়েলদি। কী লজ্জা করছে, কত বছর বাদে ছবি তুলব। দেখো চুলটাও তো আঁচড়াইনি। ও বাড়ির আয়নাটা এমন, মুখ দেখতেই ইচ্ছে করে না। তোমাদের আয়না আছে, একটু দেখে নিই?

শিবানী পায়েলদিকে নিয়ে গেল আয়নায় মুখ দেখাতে। শিবানীর চিরুনি দিয়ে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে ঘর থেকে যখন বেরোল, পায়েলদির মুখে সলজ্জ হাসি। তোমাদের এখানের আয়নাটা কী ভাল, ও বাড়িরটা— আমার বাবা-মার আয়নাটা, সেসব আগের যুগের— কিন্তু বেলজিয়ান কাচের তো, কী উজ্জ্বল দেখাত সবাইকে!

–একদম ঠিক বলেছেন, সব আয়নায় মুখ দেখতে নেই। নির্মাল্য বলেই হা হা করে হেসে উঠতে গিয়েও থমকে গেল, কথাটা খেলাল দু-চারবার মাথার মধ্যে, দাড়ির গোছাটা হাতের মুঠোয় পাকিয়ে আর একটা ভাবনা জুড়ে দিল। বাস্তবিকই, একটা ভাল আয়না বেঁচে থাকার জন্য খুব জরুরি।

পায়েলদি ততক্ষণে বাগানে নেমে গেছে, হয়তো শেষ কথাটা শোনেনি। এই অপরাজিতাটার পাশে দাঁড়াই? আপনারা আসবেন না?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...