সহযাত্রিনী

অলোকপর্ণা

 

 

তাকে লাল রং মানায়, অথবা যেদিন সে লাল পোশাক পরে, মনে হয় পৃথিবীতে দুঃখশোক খানিক কম পড়ল। অন্যথায় ঘুম ঘুম পায়, কবি সুভাষ হতে নোয়াপাড়া। মেট্রো ট্রেনের কামরার ভিতরে আলো কমে আসে, স্টেশনের বার্তা দেয় যে যান্ত্রিক স্বর, যেন সেও গলা কাঁপিয়ে বলে ওঠে, “পরবর্তী স্টেশন চাঁদনি চক— প্ল্যাটফর্ম ডানদিকে”। চেয়ে দেখি পাতাদুটি অসম্ভব ভারি পাথরের মতো নেমে এসেছে দুচোখের উপর। দুহাত দিয়ে, কোমরে গামছা বেঁধে, প্রাণপন চেষ্টা করলেও ওদের টেনে তোলা যাবে না। বাবার অসুখ আজ একটু বেশি হল কি? অনূঢ়া পিসি কি ফের পড়ে গেলেন পিছল বাথরুমে? ভাঙল হাড় কোমরের? জানা নেই।

স্টেশন বেলগাছিয়া তাকে লুফে নেয়।

সোম থেকে শুক্র, মেট্রোর ভিতরে তার নাম দীপা। আলো জ্বলে ওঠে কামরায়। আলো আলো মহানায়ক হতে বেলগাছিয়া। দুই হাতে সে ভেজা চুল খুলে দেয়, আবার প্রয়োজন পড়লে মুঠি করে বাগ মানাতে জানে তাদের— চুলের কাঁটা ফুঁটিয়ে ফুঁটিয়ে, এখানে ওখানে। সন্ধেবেলা বাজার করতে গিয়ে, সাজসজ্জার দোকানের সামনে থমকে দাঁড়াই। মনে পড়ে মহানায়ক স্টেশনের দীপা। মাথায় গোঁজা চুলের কাঁটাটি সমেত হারিয়ে যায় রোজ বেলগাছিয়া স্টেশনে। ঝোঁকের বশে একখানি কাঁটা কিনে ফেলি। কোনওদিন, কোনও মেট্রোরেলের কামরায় গজিয়ে ওঠা অদ্ভুত কোনও সম্ভাবনার কথা ভেবে।

সকল ছেলেমানুষি নিয়ে কবি সুভাষ হতে ট্রেন চলে মহানায়কের দিকে। ব্যাগের মধ্যে চুলের কাঁটা পাশ ফিরে শোয়। দীপা আসে, অথবা দীপা আসে না। বোধহয় আজ দুধ কেটেছে। অথবা গ্যাস ফুরিয়েছে রান্নার মাঝখানে। বা এমনও হতে পারে আজকে মন ভালো নেই। বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলে একটি হিমালয় পর্বত পার হতে হবে। আলো কমে যায় মেট্রো রেলের। স্টেশনের বার্তা দেয় যে যান্ত্রিক স্বর, এত আস্তে কথা বলে যে, ফিসফিস মনে হয়, কানে কিছুই এসে পৌঁছোয় না, ট্রেনগুলি কারশেডে অবধি কোনওরকমে গিয়ে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

একেকদিন তার হাতে বই দেখি, রোগা পাতলা, কবিতা? ছোট পত্রিকা? শব্দেরা তার মুখ বদলে দেয়। তার নাকটা খুলে বসিয়ে দেয় ঠোঁটের জায়গায়। চোখের বদলে তার কান জেগে ওঠে। গাল তুবড়ে গিয়ে ঠোঁট হয়ে যায়। পিকাসোর “উইপিং ওম্যান” হয়ে ওঠে দীপা মেট্রোরেলের কামরায়। শব্দেরা তার চোখের রং বদলে দেয়। চোয়াল নরম হয়। বই থেকে মুখ তুলে জানালা দিয়ে সে পাতালের অন্ধকার দেখে কিছুক্ষণ, বুঝতে পারি কবিতাটি ভাবাচ্ছে তাকে। কবিতাটি জ্বালাচ্ছে, উত্যক্ত করছে তাকে গোটা একটা স্টেশন। মনে করাচ্ছে এমন কিছু যা বারবার মনে করে করে স্মৃতির চেয়েও বেশি কল্পনা হয়ে গেছে আজকাল। রবীন্দ্রসদনে অনেকে নেমে গেলে সে পাতা ওল্টায়।

পথে গান শোনার অভ্যাস নেই তার, নাহলে ভাবা যেত কে তার প্রিয় গায়ক, কোন গান তাকে আলুথালু করে— ভাবা যেত। তুলি বললে, “এসব অবসেশন বন্ধ কর। মেট্রোর বদলে লোকাল ট্রেন নে।”

মেট্রোর বদলে ছিপ ফেলে লোকাল ট্রেন ধরি এক হপ্তা। শিয়ালদায় এসে হাতে তরোয়াল নিয়ে সাউথ থেকে নর্থে ঝাঁপিয়ে পড়ি। দমদম স্টেশনের বাঁশিওয়ালা দীপাকে চেনে না। সাউথ ট্রেনের সোডার বোতল দীপাকে চেনে না। শিয়ালদা ঢোকার মুখে লাল দেওয়ালে সাদা রঙে আঁকা অশ্লীল গ্রাফিত্তি দীপার নাম শোনেনি কোনওদিন।

আমি ভুলে যাই, ভিড়ের মধ্যে বসে বসে ঘুমিয়ে পড়লে দীপাকে কেমন দেখায়।

আমি ভুলে যাই, বসার জায়গা নিয়ে তর্ক করার সময় দীপা উত্তেজিত হচ্ছে কি না।

আমি ভুলে যাই, সহযাত্রিনীর সঙ্গে শাড়ির বিষয়ে গল্প করার সময় তার অকারণ হেসে ফেলা।

আমি ভুলে যাই, বৃষ্টিতে ভিজে ছুটতে ছুটতে মেট্রো ধরে ফেলা দীপা যখন ফোন করে তার মাকে জানায় “ছাতাটা… আনতে ভুলে গেছি”, কেন সে প্রায়শই ছাতা আনতে ভুলে যায়।

 

সাত দিনের মধ্যে এইসব ভুলে যাওয়ার ভয় আমায় পেড়ে ফেলে। ব্যাগের ভিতর থেকে চুলের কাঁটা খোঁচা মেরে মেরে রক্তাক্ত করে হাতের আঙুল। এক ছুটে মেট্রোরেলের কামরায় একটা জায়গা দখল করে ফেলি। কবি সুভাষ হতে মহানায়ক। দীপা আসে। আশ্বস্ত হই। কোনও কারণে তাকে চঞ্চল লাগে। আজ হল কী? ছুটি বাতিল হতে চলেছে? শোকজ করেছে উপরমহলের কেউ? দীপা বারবার ঘড়ি দেখে, বারবার মুখ তুলে চায়, শোভাবাজার সুতানুটি। বেলগাছিয়া আসার আগেই সটান উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, কোথায় যেন যাওয়ার তাড়া। দীপা হারিয়ে যায়।

আর কোনওদিন সে ফেরেনা কলকাতা মেট্রোরেলের কামরায়। অস্থির হই। সময়ের আগে মেট্রো স্টেশনে এসে দাঁড়াই। ইচ্ছে হয় বেলগাছিয়ায় নেমে পুলিশকে জিজ্ঞেস করি, দীপাকে সে দেখেছে কি না। বৃষ্টির দিনে ইচ্ছে হয়, মহানায়কে নেমে পড়ি, ছাতার জলের পিছু পিছু গিয়ে দাঁড়াই দীপাদের বাড়ির সামনে। কলিংবেল বাজিয়ে চমকে দিই। ভাবি কী পরিচয় দেওয়া যায় তাকে, যখন সে বলবে— “আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না…।” পাতালে ঢুকে যায় ট্রেন। শীতে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে পড়ে। তুলি বলে, “এসব প্রেম টেম নয়, সহমর্মিতা, ওর ভারি চোখের পাতা দেখে তোর দুখ হয়েছিল। ভেবেছিলি মাথায় হাত রাখবি। বেঁটে মানুষ কোথাকার!”

 

চার বছর পর দীপাকে আবার মেট্রোয় দেখি, তাকে দীপা বলে চিনতে সময় লাগে আমার। সেই একই জ্যামিতিক চোখ নাক মুখ, পিকাসোর উইপিং ওম্যান, মহানায়ক হতে উঠে এসেছে। ব্যাগ হাতড়াই, মনে পড়ে চুলের কাঁটাটি পাড়াতুতো মেয়েটিকে দিয়ে ফেলেছি, ঝোঁকের বশে।

ঝোঁকের বশে উঠে পড়ি নিজের আসন ছেড়ে, গিয়ে বসি দীপার পাশটিতে। না, আমি শাড়ির গল্প জানি না, তেষ্টা পেলে এগিয়ে দেওয়ার মতো জলের বোতল আমার ব্যাগে থাকে না কোনওদিন। খালিহাতে অফিসে যাতায়াত করি। তবু আজ এসে বসেছি, উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। তুলিকে কী বলব জানি না। দীপাও তো বেলগাছিয়া অবধিই যাবে। মহানায়কের আগে, বেলগাছিয়ার পরে কী লেখা আছে তা জানার প্রয়োজন নেই তার। তবু বসি পাশাপাশি। মেট্রোরেল পাতাল বেয়ে চলে। অন্ধকার ভেঙেচুরে। মহানায়ক থেকে রবীন্দ্র সরোবর থেকে কালিঘাট থেকে যতীন দাস পার্ক থেকে নেতাজি ভবন থেকে রবীন্দ্র সদন হয়ে ময়দান পার্ক স্ট্রিট এস্প্ল্যানেড… বেলগাছিয়া এগিয়ে আসছে। বেলগাছিয়া ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে। কোন উপায়ে মেট্রোরেল থামানো যায়, চেন টানার ব্যবস্থা আছে কি না— আমি এসব কিচ্ছু জানি না। চেন টানবই বা কেন, দীপারও তো দেরি হয়ে যাবে অফিসের। কোন পরিচয় দেব যখন সে জিজ্ঞেস করবে, “ট্রেন থামালেন কেন, দিব্বি তো যাচ্ছিল…”

হাত নিশপিশ করে। পাশে বসে দীপা নিঃশ্বাস নিচ্ছে টের পাই। মনে হয় কিছু বলি, মনে হয় আজ ছাতা এনেছে কিনা জিজ্ঞেস করি, বাইরে মেঘ। অথবা এই মাসের সায়েন্স পত্রিকাটি সে পড়েছে কিনা, সেখানে আলোর গতিবেগ, সময়ের তাচ্ছিল্য নিয়ে দু-একটা কথা লেখা আছে। আমাদের পেটে ভরে তীব্র বেগে পিছলে যায় মেট্রোরেল, পাতাল থেকে পাতালে প্রবেশ করে। “আজ খুব গরম” নিজের মনে বলি। দীপা তা শুনতে পেল কি না জানতে পারি না। আর কী বলার থাকতে পারে সহযাত্রিনীকে? শব্দরা বেইমানি করে। হাত পা আলগা হয়ে আসে। দাঁতগুলি মুখের ভিতর পাতলা হয়ে যায়। চোখ ওঠে না।

এসব কথা দীপার না জানাই ভালো।

সে যে মেট্রোরেলের দীপা, তাও তার না জানলে চলে।

বেলগাছিয়া এগিয়ে আসছে তীব্র গতিতে। দীপা পাশ ছেড়ে উঠে দাঁড়াবে। নেমেও যাবে একটু পরে। আবার কাল সে মহানায়ক হতে বেলগাছিয়া। মহানায়ক হতে বেলগাছিয়াই। একটুও এসপার ওসপার নেই।

আমি চুপ করে বাকিটা কাটিয়ে দেব। অল্পখানিই তো। দুটো মাত্র স্টেশন। দমদম আর নোয়াপাড়া, ও দেখতে দেখতে কেটে যাবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...