বৃষ্টির ফোঁটা আর চলে যাওয়ার শব্দে বাইশে শ্রাবণ?

বর্ণালী মৈত্র

 

আমি দিতে এসেছি…

না। গোটা শ্রাবণ মাসের গান নয়, শুধুমাত্র বাইশ তারিখটাকেই যদি তুলে নিই তুমুল বৃষ্টিতে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য? কেমন হবে সেই বাইশে শ্রাবণের গান? পঁচিশে বৈশাখের গান বলে আলাদা কয়েকখানা গানকে কিংবা কবিতাকে যদিও বা মানু্ষটার জীবৎকালে নির্দিষ্ট করা হয়েছে কখনও কখনও। কিন্তু বাইশে শ্রাবণ? সেদিনটা তো তাঁর অজ্ঞাত। সেদিনকে মনে রেখে যত স্মৃতিমালিকা, শ্রদ্ধার্ঘ্য— যা দশকের পর দশক পেরিয়ে প্রায় শতাব্দী ছুঁয়ে ফেলছে, তা তো তিনি দেখতেই পেলেন না। পেলেন না জা্নতে কত অপূর্ব নির্মমতায় ভেসে গেছে সেদিন কলকাতার পথ! পঁচিশে জুলাই, উনিশশো একচল্লিশে, যেদিন তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতার পথে চলেছেন অপারেশানের জন্য— সেটাই তাঁর শেষবারের মত ছেড়ে যাওয়া। জানা হল না তাঁর।

কে পারে জানতে কোনটা শেষবারের মত ছেড়ে যাওয়া? এ জগৎ বারবার বাসাবদলের পাঠ দেয়। দিয়েছে কবিকেও। তবু পায়ের ধ্বনি শুনতে পেতেন নীরব, নির্জনে। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার সময় ভুবনডাঙার রাস্তার ধারে নতুন পাওয়ার হাউস দেখে নাতনি নন্দিতাকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, “পুরনো আলো চলল, আসবে বুঝি এবার তোদের নতুন আলো।” বৃষ্টির জলের অক্ষরেও কি সেদিন কোথাও রাখেননি এই বাসাবদলের ইঙ্গিত? এই চিরবিদায়ের সুর? ১৩৩৯-এর শ্রাবণে আদরের নাতি নীতীন্দ্রনাথ, তারও পঁচিশ বছর আগে ১৩১৪-র কার্তিকে শমীন্দ্রনাথ, ভেঙে যাচ্ছে চুরচুর হয়ে ভেতরখানা— কিন্তু প্রাণপণ সোজা রাখছেন বাইরের আমিকে। সে তো আমরা জানি। এইসব মৃত্যু তো মনের দরজায় খানিক করাঘাত করছে, একটা বিশেষ তারিখের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার— সে স্বয়ং তাঁর নিজেরই চলে যাওয়ার তারিখ! সেই মৃত্যু-অনুষঙ্গ কি কোনওভাবে বৃষ্টির জলের গানে আমরা পেয়েছি?? তাকে কি বাইশে শ্রাবণের গান বলা যেতে পারে কোনওভাবে?

১৯৩৭-এর সেপ্টেম্বর প্রথমবার তাঁকে হেলিয়ে দিল। কানের সংক্রমণে জ্ঞান হারালেন। ‘প্রান্তিক’-এর কয়েকটি কবিতায় রাখলেন সেই অসুস্থতার দিনের ব্যথার খবর,

মৃত্যুদূত এসেছিল হে প্রলয়ঙ্কর, অকস্মাৎ
তব সভা হতে। নিয়ে গেল বিরাট প্রাঙ্গণে তব;
চক্ষে দেখিলাম অন্ধকার, দেখিনি অদৃশ্য আলো
আঁধারের স্তরে স্তরে অন্তরে অন্তরে, যে— আলোক
নিখিল জ্যোতির জ্যোতি’ দৃষ্টি মোর ছিল আচ্ছাদিয়া।
আমার আপন ছায়া।।……

১৯৩৮-এর মার্চ। শান্তিনিকেতন থেকে বসন্তোৎসব পালন শেষ করে ‘চণ্ডালিকা’ আভিনয়কারীর দল যখন কলকাতা রওনা হল তখন গভীর মন খারাপ কবির। কারণ কেউ তাঁকে কলকাতা যেতে দিতে চায় না তার শরীর খারাপ বলে। ইন্দিরা দেবীকে লিখছেন এক চিঠিতে,

আমাদের অভিনয়ের দল কাল চলে যাবে রঙ্গশালার অভিমুখে, আমার পথ রোধ করেছে ডাক্তারের দল, যে কারণ দেখিয়ে, সেটা সম্পূর্ণ আজগুবি। … আসল কথা তারা কিছুই জানে না কী জন্যে আমার অকস্মাৎ এই ব্যাধির উপসর্গ— চিকিৎসাবিদ্যার মান রক্ষার জন্যে যা তা এমন একটা হেতু খাড়া করে দিলে যার স্বপক্ষে বিপক্ষে কোনও প্রমাণই নেই— একমাত্র প্রমাণ নামজাদা ডাক্তারদের নাম। পূর্ব যুগে পীড়িতের দল ডাইনির প্রভাব মেনে যেতে বাধ্য হয়েছিল— আমিও দশচক্রে মেনে গেছি, কিন্তু মূঢ়ের মত বিশ্বাস করতে পারিনি।

–চিঠিপত্র, পঞ্চম খণ্ড। পৃ ১১৫

সে বছরে বৃষ্টি এল, বৃষ্টি চলে যাওয়ার মুখে লিখলেন অসামান্য কখানা লাইন,

আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে, হায় হায়।
বৃষ্টি সজল বিষণ্ণ নিঃশ্বাসে, হায় হায়।
আমার প্রিয়া মেঘের ফাঁকে ফাঁকে
সন্ধ্যাতারায় লুকিয়ে দেখে কাকে
সন্ধ্যাদীপের লুপ্ত আলো স্মরণে তার আসে।।

জীবনের শেষ এই দু-তিনটে বছরে যখন আর গলায় তেমন সুরের কাঁপন খুঁজে পান না— কেবলই মন ভেঙে যায় বেসুরো, অসমর্থ শব্দ উচ্চারণে। তখনই ভেঙে পড়ে তার গান, তার প্রিয়া, বেদনা নিয়ে, হাহাকার নিয়ে। সেই প্রিয়ার ইপ্সিত রূপ আর নেই, বিষণ্ণ নিঃশ্বাসে সে মনের কথা হারিয়ে ফেলে— শুধু ভেসে বেড়ায় তার ছায়া আকাশের গায়ে।

পাশাপাশি আমরা রাখতে পারি আর একখানা গান। একেবারে পরের দিনই অর্থাৎ ৯ ভাদ্র, ১৩৪৫-এ লেখা।

যায় দিন শ্রাবণদিন যায়।
আঁধারিল মন মোর আশঙ্কায়,
মিলনের বৃথা প্রত্যাশায়
মায়াবিনী এই সন্ধ্যা ছলিছে।।

শঙ্খ ঘোষ ‘এ আমির আবরণ’-এ লিখছেন,

রবীন্দ্রসঙ্গীতের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে আমরা লক্ষ করব, পরিমিত কাব্যছন্দকে সরিয়ে নিছেন তিনি গানের শরীর থেকে, তাকে দিচ্ছেন মুক্তছন্দ বা গদ্যছন্দের স্বাধীনতা। এর চরণগুলি টলমল করছে ছন্দের কাছাকাছি এসে, একটি দুটি শব্দের বর্জন বা পুনর্বিন্যাসেই হয়তো হয়ে উঠতে পারে পুরোমাপের ছন্দ, কিন্তু সেই একটি-দুটিকে আলতোভাবে সরিয়ে রাখছেন কবি।

–একটি রক্তিম মরীচিকা, এ আমির আবরণ, পৃ ৮১

সেকি এইজন্য যে, ১৯৩৭–এ সদ্য ভায়ানক মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফিরে এসে আর পদ্যছন্দ, কাব্যছন্দকে রাখছেন না। এটু শিথিলতা, একটু টলোমলো অক্ষরই এখন স্বাভাবিকভাবেই শ্রেয়। সুষম ছন্দ যেন পরিচিত সংসার আর এই নির্ভার কখানা লাইন যেন সেই সংসার থেকে ছুটি চাওয়া এক মন!

দিকে দিকে কোথাও নাহি সাড়া,
ফিরে খ্যাপা হাওয়া গৃহছাড়া।
নিবিড় তমিস্র— বিলুপ্ত আশা, ব্যথিতা যামিনী খোঁজে ভাষা
বৃষ্টি মুখরিত মর্মর ছন্দে, মালতী মঞ্জরী গন্ধে।

এর মধ্যে অবশ্য ঘুরে এসেছেন কালিম্পং, মংপুতে। ফিরেছেন জুলাইতে। তারপর দীর্ঘদিন কবি শান্তিনিকেতনে। ‘সেঁজুতি’ ছাপা হল, ছাপা হল ‘প্রান্তিক’, ‘সানাই’— এরপর এল ‘খাপছাড়া’।

পরের বছরই ১৯৩৯। নববর্ষ কাটিয়ে কবি গেলেন পুরী— সেখান থেকে ফিরে মংপু। বিশ্রামে ভরপুর হয়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে এবার বেশ তরতাজা তিনি। তৎকালীন বিশ্বভারতীর প্রকাশন বিভাগের অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে ও সহকারী কর্মসচিব কিশোরীমোহন সাঁতরাকে লিখে দিচ্ছেন রবীন্দ্র রচনাবলীর ভূমিকা (৩০ জুন ১৯৩৯)। প্রতিনিয়ত চাইছেন নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়তে। নিজের শারীরিক শ্রান্তিকে মনের আড়ালে নিয়ে যেতে চাইছেন। বার্ধক্যের অবসাদ তাঁকে যেন গ্রাস না করে ফেলে, সেখানে নিজেই নিজের মনের প্রহরী হলেন, একটুকু স্খলনও সেখানে সইবে না…

নিজেকে ধিক্কার দিয়ে মন বলে ওঠে,
‘নহি নহি আমি নহি অপূর্ণ সষ্টির
সমুদ্রের পঙ্কলোকে অন্ধ তলচর
অর্বিস্ফুট শক্তি যার বিহ্বলতা— বিলাসী— মাতাল
তরলে নিমগ্ন অনুক্ষণ।
আমি কর্তা, আমি মুক্ত, দিবসের আলোকে দীক্ষিত,
কঠিন মাটির ’পরে
প্রতি পদক্ষেপ যার আপনারে জয় করে চলা।

–রাত্রি; নবজাতক

গানেও সেই নিজের থেকে জেগে উঠবার অক্ষর।

বনের গাছে গাছে জেগেছে ভাষা ভাষাহারা নাচে
মন ওদের কাছে চঞ্চলতার রাগিনী যাচে
সারাদিন বিরামহীন ফিরি যে তাই।
আমার অঙ্গে সুর তরঙ্গে ডেকেছে বান,
রসের প্লাবনে ডুবিয়া যাই……

এ গান ছাপা হচ্ছে ১৩৪৬-এর ভাদ্র মাসে। বেদনার সুর কেমন অলৌকিক উপায়ে হয়ে উঠছে মুক্তির সুর। প্রায় একই সময় লেখা হচ্ছে ‘কিছু বলব বলে এসেছিলেম’, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’, ‘মোর ভাবনারে’, ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল’, ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে’, ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’…। কখনও লিখছেন,

সময় পাবে না আর নামিছে আন্ধকার

কখনও ব্যথাভরা অক্ষর ফুটে উঠছে,

তার ছিঁড়ে গেছে কবে একদিন কোন হাহারবে
সুর হারায়ে গেল পলে পলে।

কখনও সঘন রাত্রির গায়ে চোখের জলের ধারা নামছে,

অন্ধবিভাবরী সঙ্গ পরশহারা

কখনও বাগেশ্রী, কখনও খাম্বাজ, কখনও মুলতান কিংবা হাম্বীর এসে দাঁড়িয়েছে ঠিকই ফাঁকে ফাঁকে, কিন্তু শ্রাবণের আঙিনা আলো করে আছে মল্লারের পিছুটান। সেই মল্লারের আবার কত রূপ! কখনও সে গৌড়মল্লার, কখনও সুরদাসী, কখনও সুরট আবার কখনও বা রামদাসী। বর্ষা জলধারায় সিক্ত হয়ে তারা ছাপা অক্ষরের রাজার আসনে এসে বসল ভাদ্রের কাঁচা রোদে। বছর ফুরোল। কবি আর একটু অশক্ত হলেন শরীরে।

এল ১৯৪০।

এ বছর আগস্ট মাসের সাত তারিখে পেলেন অক্সফোর্ডের ডিগ্রি। দু-মাস পর কালিম্পং গেলেন, কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়লেন ভয়ঙ্কররকম। শান্তিনিকেতন নয়, কবিকে আনা হল জোড়াসাঁকোয়। কিন্তু মন ছুটছে। একটু সুস্থ হয়েই তাই ফিরলেন উদয়নের ঘরে— সেখান থেকে জাপানি ঘরে। এইসময়েই অবনীন্দ্রনাথের বলা গল্প পড়ছেন, শুনছেন, রানী চন্দকে নির্দেশ দিচ্ছেন সেগুলোর অনুলিখনের। যেগুলো ‘ঘরোয়া’ বই হবে পরে। নভেম্বর মাস, লেখা হচ্ছে ‘রোগশয্যায়’, ‘আরোগ্য’— শুশ্রূষাকারিণীদের লালন পেতে পেতে পেরিয়ে যাচ্ছে আর একখানা বছর।

আজ যারা কাছে আছ এ নিঃস্ব প্রহরে,
পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তেজ আলোয়
তোমরা আপন দীপ আনিয়াছ হাতে,
খেয়া ছাড়িবার আগে তীরের বিদায়স্পর্শ দিতে।
তোমরা পথিকবন্ধু।
যেমন রাত্রির তারা
অন্ধকারে লুপ্তপথ যাত্রীর শেষের ক্লিষ্ট ক্ষণে।

–ভূমিকা; আরোগ্য

১৯৪১।

প্রথমবার, জীবনে প্রথমবার কবি সাতই পৌষের উৎসবের দিন মন্দিরে উপস্থিত হতে পারলেন না। এসময় ‘জন্মদিনে’, ‘গল্পসল্প’ হয়ে উঠছে ঠিকই— কিন্তু গান হয়ে উঠছে না আর। চিকিৎসকেরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাঁর শরীর বিষয়ে, তাকে মানতে পারছেন না। বেদনায়, মুহ্যমান হয়ে পড়ছেন। মৃত্যুকে সহ্য করতে পারার বেদনা নয় ঠিক, মৃত্যু বিষয়ে উদাসীন তিনি নন, কিন্তু চাইছেন না সেইমুহূর্তে কোনও কাটাছেঁড়া। আকুল মিনতি তাঁর অস্তিত্ব জুড়ে। শুধু তাঁর শরীর অক্ষত থাকুক। যেন সেই শরীরে কেউ হস্তক্ষেপ করলে ‘মরণ রসে অলখঝোরায় প্রাণের কলস’ ভরা যাবে না! যেন ‘বৃন্ত হতে ছিন্ন’ ‘শুভ্র কমল’-এ পরিণত হবে তাঁর এই দেহ, যদি অস্ত্রোপচার করা হয়। এইসময় গ্রীষ্মের ছুটিতে শান্তিনিকেতনে এলেন অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু। অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, শীর্ণ, রোগযন্ত্রণাবিহ্বল শরীরেও কত অপূর্ব আলো! নিঃসংশয়, নিঃসঙ্কোচ! লিখলেন ‘সব পেয়েছির দেশে’-তে।

কে বলবে তাঁকে দেখে যে তাঁর অসুখ! আমরা যাওয়ামাত্রই আরম্ভ হল তাঁর কথা। কন্ঠস্বর ঈষৎ ক্ষীণ, মাঝে মাঝে একটু থামেন, কিন্তু কথার জন্য কক্ষনও হাতড়াতে হয় না, ঠিক জায়গায় ঠিক কথাটি আপনিই মুখে এসে বসে। সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, মাঝে মাঝে আড়চোখে শ্রোতাদের দেখে নেন, কথার স্রোত তাতে বাধা পায় না। সেদিন এক ঘন্টার উপরে প্রায় অনর্গল কথা বললেন, সাহিত্য সঙ্গীত চিত্রকলা জীবন দর্শন হাস্যপরিহাস মেশানো এক আশ্চর্য অবিশ্বাস্য ঝরনায় নেয়ে উঠলুম। এঁর অসুখ! ভাবা যায় না! এই প্রদীপ্ত মনীষা, জীবনের ছোটবড় সমস্ত ব্যাপারে এই জ্বলন্ত উৎসাহ, ভাষার উপর এই রাজকীয় কর্তৃত্ব, এর সঙ্গে কোনওরকম রোগ কি বৈকল্যকে সংশ্লিষ্ট করতে আমাদের মন একেবারেই বিমুখ হয়।

–সব পেয়েছির দেশে; বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ সমগ্র ২; পৃ ১৬৭-১৬৮

মনখারাপ! সব্বার মনখারাপ! কথায় কথায় তাঁর চোখে জল এসে যাচ্ছে— শিশুর মতো আবদারে আবদারে ভরিয়ে দিছেন শুশ্রূষাকারীদের। শরীর কোনওদিন অল্প একটু ভাল থাকলেও মনখারাপ এসে চেহারা মলিন করে দিচ্ছে। রথীন্দ্রনাথের সুযুক্তি দিয়ে অপারেশনের সপক্ষে প্রস্তুতি তাঁকে ম্লান করছে, আবার সেই ম্লানিমাকে ম্লান করে দিয়ে অবনীন্দ্রনাথের সত্তর বছরের জন্মদিন পালনের উদ্যোগ করছেন স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সমস্ত ডাক্তারেরা সমবেতভাবেই কবিকে জানিয়ে দিলেন যে, অপারেশন অবশ্যকর্তব্য। এছাড়া আর কোনও পথ নেই মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ করবার।

অতএব!

ঠিক এই সময়ের বর্ণনাতেই নির্মলকুমারী মহলানবীশ ‘বাইশে শ্রাবণ’ বইটিতে একখানা গানের হদিশ দিলেন আমাদের। না, তখন তা গান হয়ে ওঠেনি— ‘সানাই’ বইতে সে লেখার নাম ‘দ্বিধা’।

এসেছিলে তুমি আসো নাই তবু
জানায়ে গেলে।
সমুখের পথে পলাতকা তব
ছায়াটি ফেলে।
তোমার সে উদাসীনতা, জানাল কি মোর দীনতা
সে কি ছল করা অবহেলা জানি না সে
পায়ে পায়ে উপেক্ষা তব ঘাসে ঘাসে
গেল কি বেদনা মেলে।
পাতায় পাতায় ফোঁটা ফোঁটা ঝরে জল
ছল ছল করে শ্যামবনান্ততল
তুমি গেলে চলে নিকুঞ্জভবনে
মর্মর কল মুখরিত পবনে
পিছে পিছে তব নীপবীথিকায়
ছায়া রোদ যায় খেলে।

কবিতা পড়তে পড়তে গানখানাই গেয়ে উঠি না আমরা কজন? চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে কয়েকটি লেখা পাঠিয়ে একবার লিখে দিয়েছিলেন, “কিন্তু এগুলো গান সে কথা মনে রেখো— সুর না থাকলে এ যেন নেবানো প্রদীপের মতো”— সত্যিই! ‘ফোঁটা ফোঁটা’ ঝরে পড়ত যে জল সে জল যখন ‘বিন্দু বিন্দু ঝরল, তখনই যেন তাতে এসে লাগল সুর— যোগ হল সুরতরঙ্গ। ‘তুমি’ চলে যাওয়ার পরও খেলে যায় ‘ছায়া রোদ’— প্রথম স্তবকে যা ছিল শুধুই ‘ছায়া’— শেষ লাইনে এসে তা ‘ছায়ারোদ’। ‘অবহেলা’ কিন্তু তা যেন ঠিক অবহেলাও নয়, ‘ছল করা অবহেলা’। অন্তত এমনই তো ভাবতে চাইছেন জীবনের উপান্তে পৌঁছনো মানুষটি। আসা অথচ না-আসা, যাওয়া তবু না-যাওয়া— নানা দোলাচল যেন সঙ্গীহীন, অতৃপ্ত অনন্ত এক বিরহী মনকে পৌঁছে দিচ্ছে সেই শেষ করে দেওয়া আপনার দিকে। শান্ত হয়ে এবার চাইছেন জগতপারাবার থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিতে। উপেক্ষা জন্ম দিয়েছে যে বেদনার, তা যেন এখন আর, এবার আর দুঃখে ভরে ওঠে না— ভরে ওঠে পূর্ণতায়। মৃত্যু যেন এবার হবে প্রশমন, প্রশান্তিযাত্রা।

এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতি স্রোতের প্লাবনে
ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান।

মৃত্যু এবার এক অস্তিময় উচ্চারণ, বাইশে শ্রাবণ আর এক অনন্তযাত্রা।

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...