দ্বীপ জেলে যাই— প্রসেনজিৎ মণ্ডল এবং বালি দ্বীপের গল্প

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

প্রসেনজিৎ মণ্ডলের গল্প। চট করে নাম বললে, দ্বীপের বাইরের পৃথিবী নাও চিনতে পারে। অবশ্য বালি দ্বীপ বা অবশিষ্ট সুন্দরবন প্রসেনজিৎকে চিনতে শিখেছে, আত্মীকরণ করতে শিখেছে বহুদিন। প্রসেনজিৎ যা দিয়েছেন, দ্বীপ হয়তো একদিন সেসব ফেরতও দেবে। করজোড়ে বলবে, কুর্নিশ…

যাই হোক। ওঁর গল্পে আসি। একেবারেই নিম্নবিত্ত আর পাঁচটা স্ট্রাগলিং পরিবারের অন্যতম প্রসেনজিতের পরিবারের বয়স্করা খাঁড়ির জল পেরিয়ে জঙ্গলে যেত, বাঘে, কুমিরে একাকার ভয়ঙ্কর অন্ধকার টিমটিম সুন্দরবনের এক ঘরে বুকে হাত দিয়ে বসে থাকত পরিবার। এবং এর সঙ্গে ছিল সাইক্লোনে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়। এইসব সাধারণ গল্পে অসাধারণ মোচড় দেওয়ার দিন অবশ্য অনেক পরে এসেছে। এর মধ্যে প্রসেনজিত লড়াই করেই পেরিয়েছেন স্কুলিং এবং পরে উচ্চশিক্ষা। সরকারি স্কুল পেরিয়ে কলেজের গণ্ডিতে এসেই বাদ সাধে আর্থিক সঙ্গতি। কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই কলকাতা চলে আসেন প্রসেনজিৎ। একটি কলেজে ঢোকেন। এদিকে ওদিকে কোনওমতে কাজ জুটিয়ে কিছুটা বাড়িতেও পাঠান। সিকিওরিটি গার্ডের কাজ পেয়ে মাইনে কিছুটা বাড়ে। কম্পিউটার কোর্স করে একসময় ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশনে কাজ পান। স্থিতাবস্থায় আসেন। এই অবস্থাতেই কাজের পরে রাতে পড়াশোনাও চালিয়ে জান। রবীন্দ্রভারতী থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর এবং কলকাতার আইটিআই থেকে কম্পিউটার অপারেটিং-এ ডিপ্লোমা করেন। আর্থিক সঙ্গতি বাড়ে। পরিচিতি বাড়ে। এবং পাশাপাশি অন্য এক সঙ্কল্পের কথাও মাথায় আসে।

২০১৬ সালে নিজের গ্রামে ফিরে আসেন প্রসেনজিৎ। স্থিতাবস্থা এলেও এই স্ট্যাটাস কুও চাননি প্রসেনজিত। তাঁর স্মৃতিতে আইলার বিভীষিকা, বাঘে টেনে নেওয়া পড়শি, সাপে কাটার দাগ, জল ঢুকে নষ্ট করে দেওয়া গ্রামের ক্ষেতখামার, চিকিৎসার অভাব— আরও কত কী। ফিরেই তৈরি করলেন ‘সুন্দরবন ফাউন্ডেশন’। একটি অলাভজনক সংস্থা।

বাকিটা ইতিহাস। সংস্থার প্রথম কাজ ছিল গোসাবা ব্লকে একটি ফ্রি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করা। গ্রামের যুবক-যুবতীদের ভেতর আরও অনেক প্রসেনজিৎ অপেক্ষা করে আছে। তাদের তৈরি করতে হবে যে। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সাহায্যে বেশ কিছু কৃষি ট্রেনিং ক্যাম্প করলেন প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরে। এই দ্বীপ যে মানুষটার নখদর্পণে! তাই, অসুবিধে হয়নি বিশেষ। বাড়ির বড়দের আশীর্বাদ ছিল, সেই পুরস্কার মাথায় পেতে নিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ। ‘সুন্দরবন ফাউন্ডেশন’ ২০১৭-য় রাজ্য সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি পেল। প্রসেনজিৎ অনেকটা শক্তি পেলেন, লড়ে যাওয়ার।

মৌমাছি পালনকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখলেন তিনি। ওরা যাতে বিপদসঙ্কুল অরণ্যে গিয়ে মধু না সংগ্রহ করে, তার জন্য ঘরের পাশেই এপিকালচারের ব্যবস্থা করলেন। ভারত সরকারের খাদি অ্যান্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রিস কমিশনের সাহায্যে এই মৌমাছি পালন শুরু করে সাড়া জাগানো সাফল্য এল। মৌমাছি পালন এবং মধু আহরণ ও বিক্রির ট্রেনিং দেওয়া হল, পাশাপাশি যারা বাঘের আক্রমণে ঘরের মানুষকে হারিয়েছেন, তাঁদের বিনামূল্যে মৌমাছি পালনের জন্য ১০-১২টি করে বাক্স দেওয়া হল। গোসাবার বালি দ্বীপের ৫০তি পরিবারের অন্তত ৫০০ জন এই প্রকল্পে উপকার পেল। পরিবার পিছু ৫০০০-৬০০০ টাকা আয় হল খুব সহজেই।

এর পাশাপাশি আশেপাশের মানুষের সহায়তায় তৈরি হল ইকো-ট্যুরিজম অঞ্চল সুন্দরবন রয়্যাল ইকো-রেসর্ট। ২০১৯ সালে ফাউন্ডেশন থেকে বালি দ্বীপে ‘চ্যারিটেবল মেডিকেল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হল, যেখানে এই মুহূর্তে মাসে অন্তত ৬০০ জন করে গ্রামবাসী আসছেন নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও জরুরি পরিষেবার জন্য। কলকাতার রুরাল হেলথ কেয়ার ফাউন্ডেশন এবং রোটারি ক্লাবের সাহায্যে বহু খ্যাতনামা চিকিৎসক ওই সেন্টারে গিয়ে নিয়মিত চিকিৎসা ছাড়াও করছেন মেডিকেল ক্যাম্প। সাপে কাটা বা অন্যান্য জরুরি সময়ে কুসংস্কার দূর করে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণ বাঁচানো যাবে, সেই ব্যাপারে চলছে নিয়মিত সচেতনতা শিবির। চলছে রোগ সম্পর্কে, শরীর সম্পর্কে, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সাধারণ গ্রামবাসীকে ধারণা দেওয়াও। আছে ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে চিকিৎসা, অক্সিজেন সাপ্লাই, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের জোগান এবং টেলিমেডিসিন। ফার্স্ট এইড সংক্রান্ত পড়াশোনা করে নিয়েছিলেন প্রসেনজিৎ নিজেও। এলাকার আরও কিছু তরুণ-তরুণীর সহায়তায় চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় সাহায্যটুকু করলেন তাঁরা নিজেরাই। এমনকি করোনা অতিমারির সময় বিনামূল্যে স্যানিটাইজার এবং মাস্ক বিলি করা, করোনা আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, চাকরি হারানো বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়া— প্রায় ১০০০টি পরিবার এভাবে উপকার পেয়েছে প্রসেনজিৎ এবং তাঁর ফাউন্ডেশনের কাছে।

আরও আছে, আরও। গল্পের শেষ নেই। ২০১৭ থেকে আজ অবধি মূলত গ্রামের মহিলাদের নেতৃত্বে এবং রোটারি ক্লাবের আর্থিক আনুকূল্যে প্রসেনজিতের ফাউন্ডেশন লাগিয়েছে ১ লাখের উপর ম্যানগ্রোভ চারা। বিরাজনগর, বালি, সোনাগড়, বিজয়নগর, রানিপুর— গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে গেছে মহিলাদের দল। চারা লাগানো থেকে ১-২ বছরে সেই চারা বড় করে তাদের দেখভাল— এসবের জন্যেও তৈরি হয়েছে আরও অনেক দল। আইলার দাপট থেকে বাঁচাতে এই গাছ, গাছের শেকড় যে কত বড় অস্ত্র সেসব এই মানুষগুলোর চেয়ে বেশি কে জানে!

এলাকায় দুটি স্থানীয় ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম তৈরি করে যেকোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ছুটে যাচ্ছেন প্রসেনজিৎরা। এই বছরেই ‘সুন্দরবন আদর্শ স্কুল’ নামে ৬০টি বাচ্চাকে নিয়ে একটি ফ্রি-স্কুল স্থাপিত হয়েছে। সেখানে পড়াশুনোর খরচ সহ সমস্ত সরঞ্জাম, এমনকী জামাকাপড়ও বিনামুল্যেই দেওয়া হচ্ছে। আলো পাচ্ছে ভবিষ্যতের প্রসেনজিতরা। বড়দের জন্যেও করা হচ্ছে স্কিল-ট্রেনিং ওয়ার্কশপ। কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ হয়ে ওদেরকেই তো আবার ফিরে আসতে হবে গ্রামে, তৈরি করতে হবে বৃহত্তর বালি, বৃহত্তর লড়াকু ভারতবর্ষ।

প্রসেনজিৎ মণ্ডল, আপনার নেতৃত্ব, পথ, আরও দীর্ঘ হোক, আলোকিত হোক…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5395 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.