রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে লফেয়ার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে কিনা বিচারবিভাগকেই ঠিক করতে হবে

প্রদীপ দত্ত

 



প্রাবন্ধিক, পরিবেশকর্মী

 

 

 

 

সুরাত আদালতের ওই রায় দেখায় যে রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে লফেয়ার স্বাভাবিক হয়ে আসছে। এটা খুবই চিন্তার বিষয়, কারণ আদালতের বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষতা। সাম্প্রতিক পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেই সুনাম হারাতে বেশি সময় লাগে না। এখন বিচারবিভাগই ঠিক করবে আমাদের দেশেও একইরকম ঘটবে কি না

 

অবশেষে সুরাতের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) রায়ের বিরুদ্ধে সেখানকার দায়রা আদালতে ৩ এপ্রিল রাহুল গান্ধি স্থগিতাদেশ পেলেন। দায়রা আদালত মামলার নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দণ্ডাজ্ঞায় স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। রাহুল সেই দণ্ডাজ্ঞা খারিজ করার আর্জি জানিয়ে দায়রা আদালতে মামলা করেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে আদালতের দোষী সাব্যস্ত করার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চেয়েছিলেন।

দুটো ইংরাজি শব্দ ‘ল’ এবং ‘ওয়ারফেয়ার’কে জুড়ে আজকাল একটা নতুন শব্দ চালু হয়েছে— ‘লফেয়ার’। আইনব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ভয় দেখানো, ক্ষতি করা অথবা বিরোধীকে (সাধারণত রাজনৈতিক বিরোধীকে) আইনের চোখে অপরাধী করে তোলা। অর্থাৎ বিরোধী দমনে আইনকে অস্ত্র করে তোলা। ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাঁদের বিরোধীদের ক্ষেত্রে লফেয়ার চালাচ্ছেন কি না সে ব্যাপারে বিচারব্যবস্থার সতর্ক নজর থাকবে আশা করা যায়। সাম্প্রতিক রাহুল গান্ধির ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটেনি। সুরাতের ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাহুলকে দু বছর কারাদণ্ড দিয়েছে বলে তাঁকে সাংসদ পদ খোয়াতে হয়েছে। বিষয়টা খতিয়ে দেখলে, ঘটনাপরম্পরা বিচার করলে কী করে এমন দণ্ড হয় ভাবতে অবাক লাগবে।

২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে রাহুল ভাষণ দিয়েছিলেন কর্নাটকের কোলারে, তাঁর নামে মানহানির ফৌজদারি মামলা হয়েছে গুজরাতের সুরাতে। মামলা করেছেন বিজেপির নেতা ও বিধায়ক পূর্ণেশ মোদি। রাহুল বলেছিলেন: “আচ্ছা, এক ছোটা সা সওয়াল, ইন সব চোরো কে নাম, মোদি মোদি মোদি ক্যায়সে হ্যায়? নীরব মোদি, ললিত মোদি, নরেন্দ্র মোদি। অউর আভি থোরা ঢুঁডেঙ্গে তো অউর বহত সারে মোদি নিকলেঙ্গে।” বিজেপির নেতা ও বিধায়ক পূর্ণেশ মোদি তাঁর পদবির দৌলতে অভিযোগ করেছিলেন যে, রাহুলের মন্তব্যে তিনি এবং অন্য যাদের পদবি মোদি তাঁদের মানহানি হয়েছে।

রাহুল বলেছিলেন, সব চোরের নাম মোদি কেন? বলেননি, যার পদবি মোদি সেই চোর। সুপ্রিম কোর্ট আগে স্পষ্ট জানিয়েছে, সরাসরি আপনাকে না বললে, কোনও বর্গ বা সম্প্রদায়ের অপমান হলেই বলা যায় না আপনাকে অপমান করা হয়েছে। তুচ্ছ কারণে যেন কাউকে আদালতে টেনে আনা না যায় সে বিষয়ে মানহানির আইন পরিষ্কার। আইন অনুযায়ী কোনও শ্রেণির মানুষের উল্লেখ করা হলেও সেই শ্রেণির অন্য কোনও ব্যক্তি দাবি করতে পারেন না যে, তাঁর মানহানি হয়েছে, কারণ তিনি ওই শ্রেণির সদস্য। কেউ যদি বলেন, “সমস্ত উকিলই চোর” তাহলেও আদালতে গিয়ে কেউ বলতে পারবেন না যে তিনি যেহেতু উকিল তাই তাঁর মানহানি হয়েছে। যাদের পদবি মোদি তারাও আইনের চোখে অনির্দিষ্ট, অনির্ধারিত গোষ্ঠী। তাহলে বিচারক পূর্ণেশ মোদির দাবি মানলেন কী করে?

আদালত তিরিশ দিনের জন্য সাজা মুলতুবি রেখে তাঁকে জামিন দিয়েছিল, যেন সেই সময়ে তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করতে পারেন। কিন্তু পরের দিনই, ২৪ মার্চ লোকসভা সেক্রেটারিয়েট তাঁর বিরুদ্ধে সংসদের সদস্য হিসাবে অযোগ্যতার নোটিস প্রকাশ করে।

পূর্ণেশ মোদি গত বছর রাহুলের বিচারে হাইকোর্টে স্থগিতাদেশ চেয়েছিলেন। সেই কারণে বিচারপ্রক্রিয়া প্রায় বারো মাস থমকে ছিল। মামলাটি করা হয় ২০১৯ সালের ১৬ এপ্রিল। অভিযোগের ভিত্তি হল তিন দিন আগে, ২০১৯-এর ১৩ এপ্রিল কর্নাটকের কোলারে এক নির্বাচনী সমাবেশে রাহুলের মন্তব্য। অভিযোগকারী বলেছেন রাহুল তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে ভারতের তেরো কোটি মোদি পদবির মানুষকে অপমান করেছেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সুনামের ক্ষতি করতে চেয়েছেন। তাঁর নিজের সামাজিক সুনামের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। জবাবে রাহুল বলেছেন, ওই বক্তৃতায় ভারতের বর্তমান সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছিল।

সে বছর জুনের ২৪ তারিখে সুরাতের ম্যাজিস্ট্রেট এ এন দাভের কোর্টে রাহুল তাঁর বয়ান নথিভুক্ত করেন। টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ২০২২ সালের মার্চ মাসের প্রথমে দিকে অভিযোগকারী পূর্ণেশ মোদি দাবি করেন আদালতে জমা দেওয়া তিনটি সিডি রাহুলের উপস্থিতিতে চালিয়ে তাঁকে তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হবে। কোর্ট এই আবেদন বাতিল করে পূর্ণেশের অভিযোগ শুনতে চাইলে তিনি স্থগিতাদেশ নেওয়ার জন্য হাইকোর্টে যান। সে বছরের ৭ মার্চ হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়।

২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে গৌতম আদানির সম্পর্ক নিয়ে রাহুল গান্ধি সংসদে তীব্র বক্তব্য রেখেছিলেন। তার তিন দিন পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি পূর্ণেশ স্থগিতাদেশ তুলে নিতে ফের হাইকোর্টে আসেন (স্থগিতাদেশ পাওয়ার এক বছর পরে)। ততদিনে বিচারক বদল হয়েছে, সিজেএম হয়ে এসেছেন হরিশ হাসমুখ ভাই বর্মা। পূর্ণেশ হাইকোর্টে বলেন, সুরাত ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে যথেষ্ট প্রমাণ জমা হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চিতি বিচারে বিলম্ব ঘাটাচ্ছে। বাস্তবে স্থগিতাদেশ পাওয়ার পর থেকে কোনও নতুন প্রমাণ যোগ না হলেও, বিচারক বিপুল পাঞ্চোলি স্থগিতাদেশ তুলে নেন। ফের মামলাটি চালু হয় এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখে।

এরপর ৮ মার্চ সওয়াল জবাবে রাহুলের উকিল কিরীট পানওয়ালা বলেন, পূর্ণেশ মোদির মানহানি করার প্রশ্নই আসে না, কারণ রাহুলের বক্তৃতার লক্ষ্যই ছিল নরেন্দ্র মোদি। টাইমস অব ইন্ডিয়া লেখে, রাহুলের উকিল পানওয়ালা বলেছেন, গোটা বক্তৃতায় একবারই যা বলা হয়েছিল তা নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে নয়। এবং কথাটি হল, এইসব চোরেরই এক নাম মোদি হয় কী করে? এবং সে ক্ষেত্রেও কোনও জাতি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কিছু বলা হয়নি এবং মোদি যাদের পদবি তাদের সঙ্গেও তাঁর বক্তব্যের কোনও সম্পর্ক নেই।

পানওয়ালা আরও বলেন, অভিযোগকারী বলেছেন, ভারতে তেরো কোটি মোদি রয়েছে। নির্বাচনের সময় কোনও রাজনৈতিক দল তেরো কোটির কোনও সমাজের উদ্দেশ্যে বাজে কথা বলবে না। রাহুলের বক্তব্য শুধু নরেন্দ্র মোদি, নীরব মোদি ও ললিত মোদির পদবী নিয়ে, কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। মোদি নামে কোনও সম্প্রদায়ও নেই। অভিযোগকারী সুরাতের মোধবণিক সমাজকে মোদি সম্প্রদায় হিসাবে তুলে ধরেছেন। সুরাত মোধবণিক সমাজের কোনও নথিতে মোদি সম্প্রদায়ের উল্লেখ নেই। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, অভিযোগকারী কোনও আবেদন করলে তাঁকে শনাক্তযোগ্য সম্প্রদায়ের সদস্য হতে হবে। পূর্ণেশ তাঁর পদবি ভুতওয়ালা থেকে বদলে করেছেন মোদি, পদবির এই পরিবর্তন আদালতে প্রমাণও হয়নি। তিনি অভিযোগই করতে পারেন না। গোটা বক্তৃতাটা শোনা দরকার, শুধু তার কিছু অংশ নয়। বক্তৃতার একটা বাক্য মানহানির ভিত্তি হিসাবে বিবেচনাযোগ্য হতে পারে না। ভারতের নাগরিকদের সরকার এবং তার আধিকারিকদের  সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, যদি ধরে নেই যে সেইরকম কথাই বলা হয়েছিল, তাহলেও বলা যায় না যে তা মোদি সম্প্রদায় বা ব্যক্তির অপমান। যখন কোনও ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বক্তৃতা দেন, রাহুল যা করেছেন, সে ক্ষেত্রে ভূলের সম্ভাবনা থাকে।

এটা প্রমাণ করা খুবই মুশকিল যে মোদি নামে আদৌ কোনও সম্প্রদায় আছে কি না, যা অন্য ক্ষেত্র থেকে একেবারে আলাদা এবং রাহুল ওইরকম কোনও সম্প্রদায়ের মানহানি করতে চেয়েছেন। রাহুল যদি বলতেন সব চোরেরাই গাউন পরে কেন? আইন অনুযায়ী সেটাও দোষের হত না। আরও নির্দিষ্টভাবে না বললে, সব চোরের পদবিই মোদি কেন বলার পর তিনজনের নাম উল্লেখ করলে আইনের বিচারে মানহানি করা হয় না।

কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিওরের ২০২ ধারায় আঞ্চলিক এক্তিয়ারের বাইরের ব্যক্তি সম্বন্ধে কোর্টের কার্যক্রমে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত বলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মামলার প্রথম দিকে রাহুলের উকিলের যুক্তিতে জোর ছিল সেই বিষয়ে। ৭ মার্চ তিনি বলেন, রাহুল গান্ধি দিল্লির বাসিন্দা, যা সুরাত কোর্টের এক্তিয়ারের বাইরে। এইরকম অভিযুক্তের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সাক্ষীদের পরখ করে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তারপর অভিযুক্তকে তলব করা হবে কি না কোর্টকে তার কারণ দেখাতে হবে। কিন্তু রাহুলের ক্ষেত্রে এ সব কিছুই মানা হয়নি।

১৬৮ পাতার রায়ে বিচারক বলেছেন, অভিযোগ শুধু মোদি জাতি বা সমাজের মানহানিই নয়, অভিযোগকারীর যন্ত্রণারও বিষয়। রাহুল শুধু ভারতের অর্থনৈতিক অপরাধী নীরব মোদি, ললিত মোদি, মেহুল চোকসি এবং বিজয় মাল্যর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে চোর বলে থামতে পারতেন। তা না করে তিনি বলেছেন, “প্রত্যেক চোরেরই পদবি কেন মোদি?” একথা বলে তিনি ইচ্ছে করেই মোদি পদবির বা নামের সবাইকে অপমান করেছেন।

সুপ্রিম কোর্ট অতীতে জানিয়েছে, কোনও জাতির মানুষকে জাতি হিসাবে মানহানি করা যায় না। কোনও জাতির সাধারণ উল্লেখে সেই জাতির কোনও মানুষের মানহানি করা হয় না। দেড়শো বছর আগে ব্রিটেনের এক মামলার (ইস্টউড বনাম হোমস, ১৯৬০) রায়ে বলা হয়েছিল, যদি কেউ লেখেন যে সব উকিলই চোর, কোনও উকিল তাঁকে এই বলে আদালতে অভিযুক্ত করতে পারবেন না যে তাঁকে অপমান করা হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়ার আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বলেছেন। মামলাকারী হাইকোর্টে গিয়ে নিজের দায়ের করা মামলায় স্থগিতাদেশ চাইলেন। সব ক্ষেত্রেই যাঁকে দোষী বলে ভাবা হয় তিনি বা যাঁর বিরুদ্ধে মামলা তিনিই বিচার দীর্ঘায়িত করতে স্থগিতাদেশ চান, মামলাকারী নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো।  সংসদে মোদি-আদানি বিষয়ে রাহুলের ভাষণের তিনদিনের মধ্যেই ওই বিধায়ক স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে ফের মামলা চালু করার উদ্যোগ নিলেন। মামলাকারী যখন স্থগিতাদেশ চাইলেন হাইকোর্ট মামলা স্থগিত করে দিল, যখন আবার চালু করতে চাইলেন স্থগিতাদেশ তুলে নিল— যে কোনও মামলাতেই কি হাইকোর্ট এতটা উদার? প্রশ্ন ওঠে মামলাকারী কি জজ বদলানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন? ওদিকে মামলা চালু হওয়ার এক মাসের মধ্যে বিচারক রায় দিলেন। আদালতে এত দ্রুত বিচারের কথা আগে কেউ কখনও শুনেছি কী? নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রায় ঘোষণার তাড়া ছিল কী!

মানহানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি দু বছরের কারাবাস। কাউকে সাধারণত অতটা শাস্তিও দেওয়া হয় না। কারণ, বক্তৃতায় বা অন্য কোনও ক্ষেত্রে ভূল কথা বলার অপরাধে অতদিনের শাস্তি না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। মানহানির মামলায় এদেশে আজ পর্যন্ত একজন দোষীরও দু বছরের সাজা হয়নি। আবার দু বছরের সাজা না হলে  সাংসদ পদ বাতিল করা যায় না!

দু বছর বা তার বেশি সাজা ঘোষণার ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কারও সাংসদ পদ রায় বেরোবার একমাসের আগে বাতিল হয়নি। রাহুলের ক্ষেত্রে কিন্তু রায় ঘোষণার ঠিক পরেই লোকসভা সেক্রেটারিয়েট সাংসদ হিসাবে অযোগ্যতার আদেশ দিয়েছে। সুরাতের ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল যাতে স্থগিতাদেশের আবেদন করতে পারেন সেই উদ্দেশে দণ্ডাজ্ঞা একমাসের জন্য মুলতুবি রেখেছিলেন। অনেকে বলছেন, মামলা ফয়সালার অন্তত চব্বিশ ঘন্টা আগে তাঁর সাংসদ পদ বাতিলের তোড়জোর শুরু হয়েছিল। অত অল্প সময়ে আদালতের গুজরাতি ভাষায় রায়ের ভাষান্তর করে ওঠাও কঠিন। লোকসভা সেক্রেটারিয়েট রায়ের সার্টিফায়েড কপি পেয়েছিল কি না সন্দেহ। বিদ্যুৎ গতিতে সাংসদ হিসাবে তাঁর অযোগ্যতা ঘোষণার কারণ কি এই নয় যে তিনি যেন উচ্চ আদালতে গিয়ে ওই রায়ের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ না নিতে পারেন?

২০১৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে (লিলি থমাস বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া) বলা হয়েছিল দণ্ডাজ্ঞা আদেশের দিন থেকে তিন মাস পেরোলেও ওই অন্তর্বর্তী সময়কালে যদি সাংসদ বা বিধায়ক দণ্ডাজ্ঞার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে কোনও আবেদন না করেন তখনই অযোগ্যতা ঘোষণা কার্যকর হবে। যদি তিন মাসের মধ্যে কোর্ট ওই ধরনের কোনও আবেদনের নিষ্পত্তি না করে তাহলেও ৮(৪) ধারা অনুযায়ী অযোগ্যতা কার্যকর করা যাবে না।

একজন সাংসদকে অযোগ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে দুই হাউসেরই কোনও সদস্যকে অযোগ্য ঘোষণা করতে হলে রাষ্ট্রপতিকে জানাতে হবে এবং তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এই ধরনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি ইলেকশন কমিশনের মতামত নেবেন, তারপরই অযোগ্যতার নোটিসে স্বাক্ষর করবেন। রাহুলের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি মানা হয়নি। প্রশ্ন ওঠে রাহুল উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ পেলেন কি না তা না দেখে, লোকসভার স্পিকার সুরাত কোর্টের শাস্তি মুলতুবি রাখার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে সাততাড়াতাড়ি রাহুলকে যে অযোগ্য ঘোষণা করলেন তা কি অদৌ ঠিক কাজ?

রাহুল বলেছেন, তিনি যেন আদানিকে নিয়ে সংসদে আর কথা বলতে না পারেন সাংসদ পদ বাতিল করা তারই অপচেষ্টা। তিনি আরও বলেছেন, তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা, কারাদণ্ড এবং লোকসভার সদস্য পদ হারনো— সবই আদানি গোষ্ঠীর বিদেশে সাজানো কোম্পানির (শেল কোম্পানি) টাকা নিয়ে তিনি যেন লোকসভায় প্রশ্ন করতে না পারেন, সেই উদ্দেশে বিজেপির নাটক। বিজেপি বিষয়টি থেকে নজর ঘোরাতে চায়, তিনি যেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আদানির সম্পর্ক নিয়ে সংসদে আর প্রশ্ন করতে না পারেন।

সুরাত আদালতের ওই রায় দেখায় যে রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে লফেয়ার স্বাভাবিক হয়ে আসছে। এটা খুবই চিন্তার বিষয়, কারণ আদালতের বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষতা। সাম্প্রতিক পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেই সুনাম হারাতে বেশি সময় লাগে না। এখন বিচারবিভাগই ঠিক করবে আমাদের দেশেও একইরকম ঘটবে কি না।

এর আগে গুজরাতের আমরেলির সাংসদ নারানভাই ভিখাভাই কাছাড়িয়া জনৈক দলিত ডাক্তারকে মেরেছেন বলে ২০১৬ সালে ফৌজদারি মামলায় আদালত তাঁর তিন বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করে। কিন্তু লোকসভা সেক্রেটারিয়েট তাঁকে সাংসদ হিসাবে অযোগ্য ঘোষণা করছে না দেখে কিছুদিন পর কংগ্রেস দল স্পিকার, রাষ্ট্রপতি এবং ইলেকশন কমিশনকে তাঁকে যেন অযোগ্য ঘোষণা করা হয় সেই আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিল। কোনও সাড়া পায়নি। এরপর কাছাড়িয়া সেশন কোর্ট এবং হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ না পেলেও তার সাংসদ পদ রয়ে গেল। আবার তাঁকে সাংসদ পদের অযোগ্য ঘোষণার আর্জি জানিয়ে স্পিকার, রাষ্ট্রপতি ও ইলেকশন কমিশনকে কংগ্রেস চিঠি লেখে। এবারও কোনও সাড়া মেলেনি। শেষে কাছাড়িয়া সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলে কোর্ট তাঁকে ওই দলিত ডাক্তারকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে রায় দেয়। প্রথম দণ্ডাজ্ঞা ঘোষণার পর থেকে কখনওই তাঁর সাংসদ পদ বাতিল হয়নি। এদিকে কোর্টের রায় বেরোনোর ২৪ ঘন্টারও আগে রাহুলের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে, যদিও কোর্ট ওই শাস্তি তিরিশ দিনের আগে প্রযুক্ত হবে না বলে জানিয়েছিল। সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী আইন সবার জন্যই এক। তারপরও সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সাংসদদের জন্য একই নিয়ম মানা হয় না।

ওদিকে আরেকটি মামলার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের অতি সক্রিয়তা এবং লোকসভা সেক্রেটারিয়েটের গড়িমসির নিদর্শন দেখা গেছে। নিম্ন আদালতে লাক্ষাদ্বীপের সাংসদ পিপি মহম্মদ ফয়জলের শাস্তি ঘোষণার পর কেরল হাইকোর্টের দণ্ডাজ্ঞায় স্থগিতাদেশের ফয়সালা হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন লাক্ষাদ্বীপের আসনে উপনির্বাচন ঘোষণা করেছিল। উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দুদিন আগে হাইকোর্ট মামলাটিতে স্থগিতাদেশ দিলে নির্বাচনের দুদিন আগে নির্বাচন বাতিল করতে হয়। বিষয়টিতে আমাদের অনেকেরই চোখ যায়নি।

অভিযোগ ছিল, লাক্ষাদ্বীপের সাংসদ পি পি মহম্মদ ফয়জল ২০০৯ সালের ভোটের সময় কয়েকজনকে নিয়ে কংগ্রেসের নেতা মহম্মদ সালিহকে আক্রমণ করেছিলেন। ফয়জলের কথায়, তাঁকে ছ বছরের আগের ঘটনার অজুহাতে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছিল। লাক্ষাদ্বীপের কাভারত্তিতে মামলা চলাকালীন, ২০১৯ সালে তিনি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির পক্ষে ভোটে জিতে সাংসদ হন। এ বছরের জানুয়ারি মাসের এগারো তারিখে ওই মামলায় তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হলে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড সহ এক লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। কাভারত্তি জেলা সেশন জজের কাছ থেকে দণ্ডাজ্ঞার সংবাদ পৌঁছলে লোকসভার এথিক্স কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, শাস্তি ঘোষণার দিন থেকে তাঁর লোকসভার সদস্য পদ বাতিল করা হবে। দুদিন পর লোকসভা সেক্রেটারিয়েট সাংসদ হিসাবে তাঁকে অযোগ্যতার নোটিস দেয়।

ফয়জল সেশন কোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে কেরল হাইকোর্টে আবেদন করেন। হাইকোর্ট সেশন কোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয়। লোকসভার স্পিকার কিন্তু তারপরও তাঁর অযোগ্যতার নোটিস তুলে নেননি। অথচ ২০১৮ সালের এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট সুস্পষ্টভাবে বলেছিল, দণ্ডাজ্ঞা একবার স্থগিত হলে দণ্ডাজ্ঞার জন্য অযোগ্যতাও আর বজায় থাকে না (লোক পাহাড়ি বনাম ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া)। এরপর লাক্ষাদ্বীপের প্রশাসন হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। ওদিকে অনেকদিন ধরে সাংসদ পদ ফিরে না পেয়ে ফয়জলও সুপ্রিম কোর্টে যান। শেষে মার্চের ২৮ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট কেরল হাইকোর্টের রায় বজায় রাখে। উপরন্তু ২০১৮ সালের রায়ের মতো সুপ্রিম কোর্ট আবারও বলে, কোনও আবেদনের ভিত্তিতে দণ্ডাজ্ঞা যদি স্থগিত করা হয় তাহলে দণ্ডাজ্ঞার জন্য অযোগ্যতাও আর বজায় থাকে না।

এইসব ঘটনায় বোঝা যায় সরকারি দল বিরোধী সাংসদদের অধিকার হরণে বেশ সক্রিয়।

 

সূত্র:

  1. Rahul Gandhi’s Defamation Conviction, Disqualification as MP Pushes the Limits of Indian Law. The Wire. 24 March, 2023.
  2. Mandhani, Apoorva & Dave, Janki. Insult intentional, reduced sentence will send wrong message — Surat court on Rahul’s ‘Modis’ speech. The Print. 23 March, 2023.
  3. Lahiri, Ishadrita. ‘Lack of jurisdiction, malicious intent’ — how Congress plans to challenge Rahul Gandhi’s defamation conviction. The Print. 23 March, 2023.
  4. Lahiri, Ishadrita. ‘Won’t apologise as I’m Gandhi, not Savarkar,’ says Rahul in 1st press conference after disqualification from LS. The Print. 25 March, 2023.
  5. Final arguments in defamation case against Rahul in Surat court today. Indian Express. March 17,
  6. Khan, Khadija. Why Lakshadweep MP Mohammed Faizal has challenged his disqualification in the Supreme Court. Indian Express. March 28, 2023.
  7. Gujarat HC lifts stay on defamation case against Rahul Gandhi in Surat. Times of India. February 22, 2023.
  8. Bhatia, Gautam. A disturbing example of the normalisation of lawfare. The Hindu. 28 March, 2023.
  9. Double standards in conviction of politicians under Modi rule: Congress. The Hindustan Times. March 30, 2023.
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4643 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...