জমিবিতর্কের প্রশ্ন তুলে কেন এই অসম্মান

কুন্তল রুদ্র

 



কবি, প্রাবন্ধিক, আবৃত্তিকার, প্রাক্তন অধ্যাপক

 

 

 

১৯৪৩ সালের ইজারাপ্রদানের মূল চুক্তিপত্রটি যদি বিশ্বভারতীর এস্টেট দপ্তরে সংরক্ষিত থেকে থাকে তবে তার ভিত্তিতে সরকারের ভূমি দপ্তরে রেকর্ড সংশোধনের জন্য তারা আবেদন জানাচ্ছে না কেন? সেটিই তো আইনের পথ। সেই আইনি পথে না হেঁটে গায়ের জোরে উচ্ছেদ করার জন্য বিশ্বভারতীর কর্তাদের যে হুমকি বারবার প্রচারমাধ্যমে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? বিশ্বভারতী কি তাদের নিজেদের জমি বুঝে নিতে চাইছে, নাকি জমিসংক্রান্ত প্রশ্ন গণমাধ্যমে বারবার তুলে এনে জনমানসে অধ্যাপক সেনকে অবৈধ দখলকারী প্রতিপন্ন করতে চাইছে?

 

নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নাকি অন্যায়ভাবে বিশ্বভারতীর ১৩ শতক জায়গা দখল করে নিয়েছেন, আর সেই জায়গা উদ্ধারের বাহানায় প্রচারমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে অধ্যাপক সেনের বিরুদ্ধে কুৎসার বন্যা বইয়ে দেওয়া হচ্ছে নিত্যদিন। মহাজ্ঞানীর মত একথাও বলা হচ্ছে অধ্যাপক সেন আসলে নোবেল পুরস্কার পাননি, যেন সেটা তাঁর ফুসলে নিয়ে নেওয়া। তাঁর নামে সমাজমাধ্যমে এই তথাকথিত বিতর্ক যাঁরা অনুসরণ করছেন তাঁরা লক্ষ করছেন যে কুৎসাপ্রচার কেবল বিশ্বভারতীর কর্তারাই করছেন এমন নয়, তাঁদের সঙ্গে পোঁ ধরেছেন বিজেপি-র কিছু নেতাও। আর বিশেষ একটি দলের সাইবার সেলের পক্ষ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে সেই সুযোগে ‘অমর্ত্য সেন ভারতবর্ষের জন্য কী করেছেন’ জাতীয় প্রশ্ন থেকে শুরু করে তাঁর দাম্পত্যজীবন নিয়ে কদর্য কটাক্ষ সহ রুচিবিকারের নানাবিধ নমুনা পরিবেশিত হয়ে চলেছে। কে তাদের বোঝাবে যে সারা বিশ্বের মানবকল্যাণে অধ্যাপক সেনের যে সকল কাজ তার সূদূরপ্রসারী সুফল ভারতবর্ষের মানুষও ইতিমধ্যেই পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই পাবেন। সঙ্কীর্ণমনা বিভেদকামী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির অধ্যাপক সেনের মত যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সম্পর্কে বিরূপতার কারণটি মূলত রাজনৈতিক তা বোঝা গেলেও প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিশ্বভারতীর এই অদ্ভুত গোঁড়া যুক্তিহীন অবস্থান এবং আচরণ আমাদের গভীরভাবে চিন্তান্বিত করে তোলে। বিশেষত সেটা যখন রবীন্দ্রনাথের আদর্শ এবং উত্তরাধিকারের নামে চালানোর চেষ্টা করা হয় তখন সেই কূট প্রয়াস আমাদের মনে সন্দিগ্ধ প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এই তথাকথিত জমিবিতর্কের সঙ্গে ঈশপের গল্পে পাহাড়ি ঝর্ণায় জলপানরত মেষশাবক ও সিংহের সেই বহুপ্রচলিত কাহিনিটির এক গভীর মিল আছে। সিংহের পানের জল ঘোলা করার অভিযোগ শুনে বিস্মিত মেষশাবক বলেছিল, ‘আমি তো তোমার থেকে নিচে রয়েছি, আমি কি করে তোমার জল ঘোলা করব!’ ধূর্ত হিংস্র সিংহ নধর মেষশাবকের মাংসের লোলুপতায় সেখানে অনুপস্থিত মেষশাবকের কল্পিত পিতাকে জল ঘোলা করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তার শাস্তির অজুহাতে শাবকের মাংস ভক্ষণ করে নিজের সিংহবিক্রমের পরিচয় দিয়েছিল। দিন বদলেছে, এখন পিতার দায়ে (সে দায় সত্য মিথ্যা যাই হোক না কেন) পুত্রকে ভক্ষণ যথেষ্ট শোভন হবে না মনে করেই বোধহয় তথাকথিত জমিবিতর্ক থেকে অধ্যাপক সেনের পিতা প্রয়াত আশুতোষ সেনকে কার্যত আড়ালে রেখে ‘বাপ নয় রে, তুই’-এর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় বিশ্বভারতীর চক্রবর্তী-সিংহ বিশেষ যত্নবান। আর পুত্রই যখন উদ্দিষ্ট তখন পিতাকে সামনে আনার প্রয়োজনই বা কী! বিশেষত, পুত্রকে অভিযুক্ত করে তুলতে পারলে যখন গল্পটাকে বেশ সমকালীন এবং টাটকা করে তোলাও যায়।

অথচ সমস্যাটি কিন্তু মোটেই সাম্প্রতিক নয়, এর সূত্রপাত ঘটেছিল আশি বছর আগে! বীরভূম জেলার বোলপুর থানার সুরুল মৌজার ১০৪ জে এল নম্বরের ১৯০০/২৪৮৭ নম্বরের প্লটের একাংশ, যার খতিয়ান নম্বর ২৭০, ১৯৪৩ সালের অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখে বিশ্বভারতী সোসাইটি আশুতোষ সেনকে যা ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয়। শান্তিনিকেতন শ্রীপল্লির ‘বিতর্কিত’ সেই জমির সমস্যাটিকে বুঝতে চাইলে আমাদের বিশ শতকের তিরিশ-চল্লিশ দশকের শান্তিনিকেতন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু কথা আমাদের জানতে হবে। আজকের যে শান্তিনিকেতন জনবিস্ফোরণে টালমাটাল, তার সঙ্গে আট দশক আগের শান্তিনিকেতনের কোনও তুলনাই চলে না। সে ছিল দিগন্তবিস্তৃত কাঁকুড়ে জমির মাঝখানে ছোট্ট এক জনপদ। সেখানে জনবসতি বলতে গুটিকয় হস্টেলে স্কুল-কলেজের কয়েকশো ছাত্রছাত্রী, আর বিশ্বভারতী নামক প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপকমণ্ডলী ও কর্মীবৃন্দের বসবাসের জন্য স্বল্প কয়েকটি ঘরবাড়ি। আশ্রম বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেখানে প্রতিষ্ঠানের পরিমণ্ডলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিদ্বান মানুষদের একটি বসতি গড়ে তোলার ভাবনা থেকেই স্বল্পসংখ্যক কিছু কিছু মানুষকে শান্তিনিকেতনে বসবাসের জন্য বাড়ি নির্মাণ করতে বিশ্বভারতীর সোসাইটির পক্ষ থেকে জমি ইজারা (লিজ) দেওয়া শুরু হয়। জমিপ্রদানের আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় বিশ্বভারতী সোসাইটি এবং নির্দিষ্ট জমিগ্রহীতার মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে। এই লিজ ছিল দীর্ঘমেয়াদি, যার সময়সীমা নির্দিষ্ট করা হয় ৯৯ বৎসর। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখনীয় অমর্ত্য সেনের পিতা আশুতোষ সেনের সঙ্গে বিশ্বভারতী সোসাইটির মূল চুক্তিপত্রটি এখনও জনসমক্ষে আসেনি। বিশ্বভারতীর পক্ষ থেকে যে চুক্তিপত্রটি গণমাধ্যমে সাম্প্রতিককালে উপস্থাপিত হয়েছে সেটি আশুতোষ সেনের উত্তরাধিকারী হিসাবে অমর্ত্য সেনের নামে উল্লিখিত প্লটের ইজারাদার পরিবর্তন সংক্রান্ত (মিউটেশন) একটি চিঠির প্রতিলিপি। সেখানে ইজারা-প্রদত্ত জমির পরিমাণ ১.২৫ একর উল্লেখ রয়েছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমষ্টি ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিকের করণ থেকে প্রদেয় তথ্যে বীরভূম জেলার বোলপুর ব্লকের সুরুল মৌজার ওই একই প্লটের বিশ্বভারতী কর্তৃক অধ্যাপক অমর্ত্য সেনকে ইজারাপ্রদত্ত জমির পরিমাণ ১.৩৮ একর স্পষ্ট উল্লিখিত রয়েছে। দুই নথিতে জমিটির পরিমাণের যে .১৩ একরের বৈষম্য সেটির আইনসম্মত সমাধানের পথে না গিয়ে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ যখন ফিতে দিয়ে জমি মেপে সমস্যাটির সমাধানের প্রস্তাব করেন তখন তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন জাগাই তো স্বাভাবিক। সরকারি ভূমি দপ্তরের নথির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই আলোচ্য প্লটটিতে ১.৩৮ একর জমি আছে এবং সেই জমির সবটুকুই যে স্বর্গত আশুতোষ সেন বিশ্বভারতী সোসাইটির থেকে ৯৯ বছরের জন্য ইজারাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন— অধ্যাপক সেনের এই বক্তব্যকে ফিতে দিয়ে জমি মেপে সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ১৯৪৩ সালের সেই ইজারাপ্রদানের মূল চুক্তিপত্রটি। প্রশ্ন হল, বিশ্বভারতী কি সেই চুক্তিপত্রটি হারিয়ে ফেলেছে? যদি তাদের এস্টেট দপ্তরে সেটি সংরক্ষিত থেকে থাকে তবে তার ভিত্তিতে সরকারের ভূমি দপ্তরে রেকর্ড সংশোধনের জন্য বিশ্বভারতী আবেদন জানাচ্ছে না কেন? সেটিই তো আইনের পথ। সেই আইনি পথে না হেঁটে গায়ের জোরে উচ্ছেদ করার জন্য বিশ্বভারতীর কর্তাদের যে হুমকি বারবার প্রচারমাধ্যমে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? বিশ্বভারতী কি তাদের নিজেদের জমি বুঝে নিতে চাইছে, নাকি জমিসংক্রান্ত প্রশ্ন গণমাধ্যমে বারবার তুলে এনে জনমানসে অধ্যাপক সেনকে অবৈধ দখলকারী প্রতিপন্ন করতে চাইছে?

একথা কেউই বলছেন না যে বর্তমান উপাচার্যের সময়কাল থেকে আরও পিছিয়ে, এমনকি বিগত আড়াই দশকে উল্লিখিত জমিটির সীমানারেখার কোনও পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। অধ্যাপক সেনের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ঘটে ১৯৯৮ সালে। ওই সময় থেকেই উল্লিখিত প্লট এবং সেখানে স্থাপিত সেন-পরিবারের বসতবাটি ‘প্রতীচী’ গৃহটি পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনি এবং সংবাদমাধ্যমের বিশেষ দৃষ্টির অধীন। একই কারণে ওই আড়াই দশক কাল ধরে ওই জমি ও গৃহ লক্ষ লক্ষ পর্যটকের দৃষ্টিতেও এসেছে প্রতিদিন। এই সময়কালের মধ্যে জমিটির সীমানা পরিবর্তন কারও দৃষ্টিতে আসেনি, অন্তত কেউই তেমন কোনও অভিযোগ উত্থাপন করেননি। এমনকি বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষও নয়। তবে কি ১৯৪৩ সালে আশুতোষ সেন মহাশয়ের ইজারাপ্রাপ্তির সময় থেকেই জমিটির সীমানা অপরিবর্তিত রয়েছে? এসব প্রশ্ন তোলার অন্যতম কারণ হল, বিশ্বভারতীর মালিকানাধীন জমিসংক্রান্ত দুয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সন্ধান। খুঁটিয়ে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সুদীর্ঘকাল ধরে বিশ্বভারতীর জমিজমা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাটি অত্যন্ত অবিন্যস্ত ছিল, দেখভালের যথাযথ ব্যবস্থাই ছিল না। দেশের স্বাধীনতার আগে শান্তিনিকেতনের জমিজমার প্রতি প্রলুব্ধ হওয়া দূরে থাক, সেই জমির প্রতি জনসাধারণের অনাগ্রহই স্বাভাবিক ছিল। কারণ শান্তিনিকেতনের রুক্ষ কাঁকুরে মাটি কৃষিকাজের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ছিল। আর অর্ধশতাব্দী পরে সে জমির বসতযোগ্যতার সম্ভাবনা এবং তার ভবিষ্যৎ মূল্যমান সম্পর্কে জনসাধারণের কোনও অস্পষ্ট ধারণাও ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বিশ্বভারতীর তৎকালীন অবস্থায় পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয় মানুষেরা সেখানে তাদের ‘করে-খাবার জায়গা’র ব্যাপারে তখনও আগ্রহী হয়ে ওঠেনি। সে-সব ঘটনার সূত্রপাত বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার এক দশক পর থেকে, ষাটের দশকে, যখন দিল্লির টাকা শান্তিনিকেতনে পৌঁছোতে শুরু করেছে এবং সেই সূত্রে পরিবর্তনের লক্ষণ ধরা পড়ছে একটু একটু করে। ওই সময়ের আর একটি সিদ্ধান্তে পরিবর্তনের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। সেটি হল, বিশ্বভারতীকে কেন্দ্রে রেখে শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন এলাকাটিকে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক সংস্থা পঞ্চায়েত ও পৌর ব্যবস্থার বাইরে আনতে ডি-নোটিফিকেশনের সিদ্ধান্ত।

সদ্যোল্লিখিত এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হতে পারত। অথচ সেটিই পাকেচক্রে তার মরণফাঁদ হয়ে গেল। এই পাকচক্র একদিকে যেমন রাজনৈতিক, অন্যদিকে তেমনই স্বার্থান্বেষী। পঞ্চায়েত ও পৌরব্যবস্থার বাইরে থাকা শান্তিনিকেতনে পরবর্তী তিন দশকে বিশ্বভারতীর জমি এবং সংলগ্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি নিয়ে চলেছে একশ্রেণির মানুষের রমরমা কারবার। প্রথমদিকে সেই কারবার ডাঙাজমিতে সীমাবদ্ধ ছিল, পরে আশির দশক থেকে চারপাশের কৃষিজমিতেও সেই কারবার ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। এই কারবারের প্রধানরা ছিলেন সংলগ্ন তালতোড় এবং সুরুলের জমিদারদের নায়েব-গোমস্তার দলবল। তাদের কারবারের কেন্দ্রে ছিল বিশ্বভারতীর জমিসংলগ্ন খাস ও বেনাম জমি এবং বিপুল পরিমাণ দেবোত্তর জমি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সুরুল মৌজার সাঁওতালদের থেকে নানা কায়দায় হাতিয়ে নেওয়া জমি। তিন দশক ধরে বিশ্বভারতীর জমি ঘিরে ফেলা এই জমি-কারবারের ব্যাপারে বিশ্বভারতীর তৎকালীন কর্তাব্যক্তিরা ছিলেন নির্লিপ্ত, আর রাজ্য এবং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবহেলা করে সে কারবার চলতে দিয়ে বিশ্বভারতীর চারপাশে সর্বনাশের মেঘ ঘনিয়ে আসতে সাহায্যই করেছেন। ওই তিরিশ বছরে বৈধ ও অবৈধভাবে শান্তিনিকেতনে বসতজমি হস্তান্তরের ঘটনাধারা পৃথক এক কৌতূহলোদ্দীপক সামাজিক-অর্থনৈতিক গবেষণার বিষয়। কেমন করে জমিদার এবং তাদের দালালচক্র রাজনৈতিক শক্তিকে অবলম্বন করে বিশ্বভারতীর প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে তাদের অনুকূলে ব্যবহার করে নিয়েছিল তা বুঝতে গেলে শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ গঠনের ইতিহাস খুঁজে দেখতে হবে। ১৯৬১ সালে ডি-নোটিফাই করা শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন এলাকায় বিশ্বভারতীর পরিবেশরক্ষা ও বিকাশের উপযুক্ত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা দ্রুত গড়ে উঠলে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর ইতিহাস আজ অন্য পথে চালিত হত। ওই তিন দশক ধরে নিশ্চুপ এবং উদ্যোগহীন থেকে শান্তিনিকেতনের চারপাশে যথেচ্ছ হোটেল-লজ এবং পরিকল্পনাহীন মধ্যবিত্ত বসতি গড়ে উঠতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি, আর বিশ্বভারতীর কর্তৃপক্ষ তাদের অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানের সর্বনাশ অনিবার্য হতে দিয়েছেন। বিশ্বভারতীর জমির পাশেই গড়ে উঠেছে হোটেল ও জনবসতি— যেখানে প্রবেশের পথ কাটা হয়েছে বিশ্বভারতীর জমির উপর দিয়ে। কেউ বাধা দেয়নি। বাধা দেওয়ার কোনও প্রশাসনই ছিল না সেখানে। আজ শুনলে অনেকে অবাক হবেন, ওই তিন দশক ধরে শান্তিনিকেতনে ঘরবাড়ি তৈরি করতে কোনও প্ল্যান অনুমোদন করতে হত না, তেমন কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। শান্তিনিকেতনের প্রাইভেট জমিতে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক-কর্মীদের গৃহঋণ দেওয়ার জন্য বিশ্বভারতীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নিজেরাই প্ল্যানে সইসাবুদ করে দিতেন। এই তথ্যই প্রমাণ করে বিশ্বভারতীর জমিকে রাস্তা ধরে নিয়ে বসতি গড়ে তুলতে খোদ বিশ্বভারতীই সাহায্য করেছে। আর, ১৯৮৯ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার কর্তৃক শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ গঠনের পরে আরও দুই দশক সময় ধরে সেই পর্ষদে অংশগ্রহণ না করে, এবং পর্ষদের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগিতা করে বিশ্বভারতীর কর্তারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তাঁদের কাছে বিশ্বভারতীর স্বার্থের চেয়ে এলাকার জমিব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উন্নয়ন পর্ষদ বিশ্বভারতীর এলাকায় সার্বিক উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করলেও বহু ক্ষেত্রেই তাকে পিছু হঠতে হয়।

বিতর্কিত জমির পরচা

বর্তমান বিশ্বভারতীর কোনও কর্তা যখন প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর সঙ্কটের কথা আড়াল করে বিশ্বভারতীর জমিজায়গা উদ্ধারের জন্য পালোয়ানসুলভ হুঙ্কার ছাড়েন এবং তার জন্য বিশেষভাবে অধ্যাপক অমর্ত্য সেনকেই তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য করে তোলেন তখন তাঁকে মনে করিয়ে দিতেই হয় বিশ্বভারতীর জমি বেদখলের দায়  দখলকারীর চেয়ে বিশ্বভারতীর কিছুমাত্র কম নয়। আজকের কর্তা যদি বিশ্বভারতীর জমি উদ্ধার করতে আন্তরিক আগ্রহী থাকেন তবে উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যর্থতার দায়ভার মেনে নিয়ে জমি উদ্ধারের জন্য আইনি পথেই সেই প্রয়াস চালাতে হবে। সেই প্রয়াস সফল করে তুলতে বিশ্বভারতীকে রাজ্য সরকারের সহযোগিতা প্রার্থনা করতে হবে। অমর্ত্য সেনের বাড়ির সীমানায় ইজারার অতিরিক্ত বিশ্বভারতীর জমি রয়েছে আইনের কাঠামোয় সেটি প্রমাণিত হলে অধ্যাপক সেন যে সে জমি ছেড়ে দেবেন সে ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। একই সঙ্গে পাঠকদের একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে উল্লিখিত ইজারাপ্রাপ্ত প্লটের সংলগ্ন আরও কিছু জমি স্বর্গত আশুতোষ সেন কিনেছিলেন। সেই জমির সঙ্গে ইজারার জমিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না।

দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দুই শাসক দলের যে ছায়াযুদ্ধ চলছে অধ্যাপক সেন তার মাঝখানে পড়ে গেছেন। সেটিকে আরও তীব্র করে তুলতেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জমির পরচা দিতে সশরীরে অধ্যাপক সেনের শান্তিনিকেতনের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন কিনা, অথবা দুর্নীতির অভিযোগে আকণ্ঠ-নিমজ্জিত হয়ে অধ্যাপক সেনকে অবলম্বন করে মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছেন কিনা আমরা জানি না। তবে সাম্প্রতিক দুই-তিন বছরে কেন্দ্র এবং রাজ্যের সরকারের ছায়াযুদ্ধের ফলে বিশ্বভারতীর অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মঙ্গলের কথা বিবেচনা করে উভয় পক্ষেরই নিজেদের সংবরণ করা উচিত ছিল। বিশ্বভারতী তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থের দড়ি টানাটানির ক্ষেত্র নয় এটুকু তাঁরা বোঝেননি বলেই সমস্যা জটিলতর হয়েছে। একই সঙ্গে অধ্যাপক সেনের মত সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন চিন্তাবিদ যখন শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদের একজন যোগ্য দাবিদার হিসাবে উল্লেখ করেন তখন আমরা চিন্তিত না হয়ে পারি না। আমাদের মনেও প্রশ্ন জাগে, সাম্প্রদায়িক শক্তির মোকাবিলায় দুর্নীতি এবং নীতিহীন আদর্শহীন সুবিধাবাদ কি বিকল্প যোগ্য নেতৃত্ব হতে পারে? তাই কি হওয়া সম্ভব? দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে উৎসুক ও বিকল্পের সন্ধানী অধ্যাপক সেনকেও অনিবার্যভাবেই সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, মানুষকে সে উত্তর জানাতে হবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4647 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...