আলো ক্রমে আসিতেছে

অনির্বাণ বিশ্বাস

 



সঙ্গীতপ্রেমী ও গবেষক, গদ্যকার

 

 

 

 

এমন অনেক দুঃখ থাকে, কাউকেই যা বলা যায় না। সে সময়ে চুপ থাকতে হয়, শব্দহীন হয়ে। তখনই দুঃখ জ্বাল দিয়ে রাত্রি বানায় লোকটা। সে রাত্রির রং জামের মত কালো। তেত্রিশ-পূর্ণ একের তিন পাক লং-প্লেয়িং রেকর্ডে তখন গেয়ে উঠেছে লোকটার ঈশ্বর। নাম তাঁর পল রোবসন। ব্ল্যাক হোলের মধ্য থেকে ভেসে আসা মহাজাগতিক শব্দের মত, সেই ভারি ব্যারিটোন গেয়ে যাচ্ছে:

নো বডি নোজ, দ্য ট্রাবল আই’ভ বিন থ্রু
নো বডি নোজ মাই সরো
নো বডি নোজ, দ্য ট্রাবল আই’ভ সিন…

আমার সঙ্গে সঙ্গে লোকটাও শুনে চলে। শুনতে-শুনতে সেই দুঃখগুলোকে ছেঁকে নেয়। তারপর উপুড় করে ঢেলে দেয় আকাশের বিপুল কটাহে। তখনই ম্যাজিকের মত আলো ফোটে দিগন্তে। বন্দরে-বন্দরে কাজ করা, মানুষের মত দেখতে চেহারাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে প্রসন্নতা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটা হাটুরে গলায় চেঁচিয়ে উঠবে:

ডে-ও! ডেএএএএ-ও!
ডে লাইট কম অ্যান’ আই মাস্ট গো হোওওওওম!
ডে ইজ আ ডে, ইজ আ ডে, ইজ আ ডে, ইজ আ ডে-ও!
ডে লাইট কম অ্যান’ আই মাস্ট গো হোম!

আশাবাদের দমকা হাওয়া উঠবে চরাচরে। ঠিক করে ভোর হবে তখনই!

 

হ্যারল্ড জর্জ বেলানফান্তির জন্ম ১৯২৭ সালে, নিউ ইয়র্কের হারলেমে। হারলেম সে সময় কৃষ্ণাঙ্গদের মেল্টিং পট। আফ্রিকা থেকে, আমেরিকান ডিপ সাউথ থেকে, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জগুলো থেকে কৃষ্ণাঙ্গরা ভিড় করেছেন সেখানে। সলতে পাকানোর কাজ চলছে, আর কিছুদিনের মধ্যেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সঙ্গীতজগতে বিস্ফোরণ ঘটবে এখানে, হবে হার্লেম রেনেসাঁ। কিন্তু হ্যারিকে তখন পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংস্টনে, দিদিমার কাছে। দিদিমা জেন-এর ছিল স্কটিশ উত্তরাধিকার (“হোয়াইট, উইথ পেল ব্লু আইজ”)। জামাইকার রং-রূপ-গন্ধে এ সময়ই ফুসফুস ভরে নেবে আট বছরের ছেলেটা। অন্য আত্মীয়দের সঙ্গে মাঝে-মধ্যেই কাছের হাটে যাবে, নুনে জারানো মাছ, চাল আর একি ফলের পসরা নিয়ে সেখানে বেচতে আসে মহিলারা। কিছু ছবি আঁকা হয়ে যাবে স্মৃতির গাঢ় এনামেলে, এর বহু বছর পর তাই শোনা যাবে:

ডাউন অ্যাট দ্য মার্কেট ইউ ক্যান হিয়ার
লেডিজ ক্রাই আউট হোয়াইল অন দেয়ার হেডস দে বিয়ার
একি, রাইস, সল্টফিস আর নাইস
অ্যান্ড রাম ইজ ফাইন এনি টাইম অফ ইয়ার…

১৯৪৬ সালে বেলাফন্তে করছিলেন জ্যানিটরের কাজ। সঙ্গে অভিনয় করছিলেন আমেরিকান নিগ্রো থিয়েটারে। এখানেই উনিশ বছরের বেলাফন্তের সঙ্গে আলাপ হবে সমবয়সি আর এক অভিনেতার। দুজনের কেউই তখন বোঝেননি, সারা জীবনের মত পড়ে গেল বন্ধুত্বের সিলমোহর। হ্যারির এই প্রাণের বন্ধুও পরবর্তীকালে বিখ্যাত হবে। কয়েক বছর পরই পৃথিবী তাঁকে সিডনি পটিয়ে (Sidney Poitier) নামে চিনবে। থিয়েটারের ওই দিনগুলোই বেলাফন্তের মাথায় ঢুকিয়ে দিল অভিনয়ের ভূত। একটা টিকিট ভাগ করে একটার পর একটা নাটক দেখে যাচ্ছেন সিডনি আর তিনি। কিছুদিনের মধ্যে অভিনয় শিখতে হ্যারি ভর্তি হবে এরভিন পিসকেটর (Erwin Piscator)-এর ড্রামাটিক ওয়র্কশপে। মার্লন ব্র্যান্ডো আর টোনি কার্টিস নামে দুই ছোকরাও এখানে অভিনয় শিখতে আসে। এখানেই, জীবনে কখনও গান না-গাওয়া ছেলেটা প্রথম গান গাইবে মঞ্চের উপর।

পিসকেটর ছিলেন জার্মান। বিংশ শতকের দুইয়ের দশকে তিনি আর বের্টোল্ট ব্রেশট এপিক থিয়েটার মুভমেন্টের সূচনা করেন জার্মানিতে। হিটলার ক্ষমতায় এলে দুজনই পাড়ি জমান বার্লিন থেকে নিউ ইয়র্ক। স্থাপনা করেন ড্রামাটিক ওয়র্কশপের। একবার জন স্টেইনবেকের অফ মাইস অ্যান্ড মেন মঞ্চস্থ করলেন তাঁরা। সে প্রোডাকশনে বেলাফন্তে সেজেছিলেন ত্রবাদুর, গেয়েছিলেন উডি গাথরি আর লেড বেলি-র গান। নিয়তি মুচকি হেসেছিল শুধু, সে যেমন হেসে থাকে।

 

বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে জ্যাজ মিউজিকের গর্ভগৃহ ছিল হারলেম। সেখানকার রয়াল রুস্ট রেস্তরাঁ প্রতি সন্ধ্যায় সরগরম থাকে স্যাক্সোফোন আর ট্রাম্পেটের কলতানে। ফার্স্ট লেডি অফ জ্যাজ মিউজিক এলা ফিৎজেরাল্ড সেখানে গান গান, হ্যারি তা শুনতে যায়। এই রেস্তোরাঁতেই স্যাক্স বাজাতেন লেস্টার ইয়ং, হ্যারির অভিনয় দেখতে এসে একদিন তাঁর গান শুনে ফেলেন তিনি। সেটা ১৯৪৯ সাল। হ্যারির তখন কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই। মার্লন আর কার্টিস ততদিনে হলিউডে পৌঁছে গেছে, এমন কি আত্মার দোসর সিডনিও ব্রডওয়ের নিয়মিত। হ্যারি শুধু ঘুরে যাচ্ছে টাইপড রোলের গোল্লাপাকে। ওদিকে শেষ হয়ে আসছে জিআই মানি, অভিনয়ের ক্লাস আর কি সম্ভব হবে করা? হ্যারিকে তখনই রয়াল রুস্টে গাওয়ার প্রস্তাব দেন লেস্টার, শুনে আতঙ্কে শিউরে ওঠে হ্যারি। ছোটবেলায় একবার পিয়ানো শেখার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল সে— গান সম্পর্কে তাঁর প্রথাগত শিক্ষার ওখানেই ইতি। যে মঞ্চে মাইলস ডেভিস ফুঁ দিয়ে যান ট্রাম্পেটে এলা ফিৎজেরাল্ড গেয়ে ওঠেন “আই অ্যাম মেকিং’ বিলিভ”— সেখানে না কি হ্যারি গাইবে! পারবে সে?

হ্যারি পেরেছিলেন। প্রথম রাতে তাঁর সঙ্গে সঙ্গত করেছিলেন ম্যাক্স রোচ, টমি পটার আর চার্লি পার্কার— জ্যাজ মিউজিকের হুজ হু-রা। এখানেই এক রাতে হ্যারির গান শুনতে আসবেন হ্যারির ঈশ্বর। তাঁর লম্বা চওড়া শরীরটা হ্যারির কাঁধে হাত রাখবে।

বেলাফন্তে ধীরে ধীরে জ্যাজ শিল্পী হয়ে উঠছিলেন। ইতিমধ্যে দু-একটা রেকর্ড বেরিয়েছে, নিউ ইয়র্কের নাইটক্লাব সার্কিটে সে সময় তাঁর অবাধ যাতায়াত। কিন্তু জ্যাজে মন ভরছে না হ্যারির। রোবসন তাঁকে বলেছিলেন “গেট দেম টু সিং ইয়োর সং, দেন দে উইল ওয়ান্ট টু নো হু ইউ আর। অ্যান্ড ইফ ইউ হ্যাভ মেড দ্যাট ফার্স্ট স্টেপ, উই উইল ফাইন্ড অ্যান অ্যানসার টু দ্য হেট।” সে কথা মনে রেখেছে হ্যারি, ফার্স্ট স্টেপ নেওয়া হয়ে গেছে এইবার ঘৃণার উপযুক্ত উত্তর খোঁজার পালা। আর তা খুঁজতে গিয়ে কেবলই মনে হচ্ছে, এভাবে কিচ্ছু হওয়ার নয়। গান গাইতে হবে মানুষের মুখের ভাষায়। জ্যাজ নয়, তাঁকে গাইতে হবে লোকসঙ্গীত। এরকমই এক সময় গ্রিনিচ ভিলেজের ভিলেজ ভ্যানগার্ড পাবে তিনি লেড বেলি-কে গাইতে শোনেন:

জন হেনরি সেইড টু হিজ ক্যাপ্টেন,
ও আ ম্যান এইন’ট নাথিন’ বাট আ ম্যান
অ্যান’ বিফোর আই লেট দ্যাট স্টিম ড্রিল বিট মি,
আই’ল ডাই উইথ আ হ্যামার ইন মাই হ্যান্ড
ও লর্ড, ডাই উইথ আ হ্যামার ইন মাই হ্যান্ড…

হ্যারি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। এইই তো গান, মানুষের কলরবের সুর! “এ সব ছেড়ে কেনই বা আমি শৌখিন জ্যাজ গেয়ে বেড়াচ্ছি? ও সবে আমি আর ফিরব না!” ফেরেনওনি আর। তিনি তীর্থযাত্রা করলেন ওয়াশিংটন ডি সির লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে। সেইখানে লোকসঙ্গীতের আর্কাইভ বানিয়েছেন অ্যালান লোম্যাক্স। সেই আর্কাইভ খুঁজে বেলাফন্তে তুলে আনলেন ফোক মিউজিকের মণিমাণিক্য। এর কিছুদিনের মধ্যেই জ্যাজ ছেড়ে তিনি ভিলেজ ভ্যানগার্ডে গান গাওয়া শুরু করবেন। বেলাফন্তে-কে লোকসঙ্গীতশিল্পী বানিয়ে দিল ১৯৫১ সাল, পাকাপাকিভাবে।

 

সময় তখন ইতিহাসের এক জটিল বাঁকে দাঁড়িয়ে। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যেই মিত্রপক্ষের মিত্ররা ছিটকে গিয়েছে যতদূর দূরে যাওয়া যায়। আমেরিকার লেবার মুভমেন্ট স্তিমিত হয়েছে, শুরু হয়েছে কোল্ড ওয়ার। বামপন্থীদের খুঁজে বার করে হাউজ অফ আন-আমেরিকান অ্যাকটিভিটি কমিটি (HUAC)-এর সামনে করা হচ্ছে হাজির, এবং এই সুযোগে অবাধে চলছে উইচ হান্ট। এ সমস্ত কার্যক্রমের নাটের গুরু ছিলেন সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থি। এর আগে, ১৯৪৭ সালে তিনি ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন হলিউড। সেবার গ্রেফতার হয় হলিউড টেন। পাঁচের দশকে তাঁর দৃষ্টি পড়ল সঙ্গীতশিল্পীদের ওপর। পিট সিগারকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হল, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হল রোবসনের। তারই মধ্যে আমেরিকার পথে-প্রান্তরে ফোক-রিভাইভাল আসছে, কান পাতলে শোনা যাচ্ছে তার পদধ্বনি। সেই অস্থির সময়ে বেলাফন্তে উপলব্ধি করলেন, তাঁর কোনও অতীত নেই। ডাচ-জামাইকান পিতা আর স্কটিশ-জামাইকান মায়ের সন্তান তিনি, বড় হয়ে উঠেছেন আমেরিকায়। তিনি উডি গাথরির মত সান অফ দ্য সয়েল নন, ডাস্ট স্টর্ম চোখে দেখেননি কখনও। লেড বেলি-র মত মিসিসিপি চেইন গ্যাং-এ কাজ করেননি কোনওদিন। ব্ল্যাক আমেরিকান স্পিরিচুয়াল সং ট্র্যাডিশনকে আপন বলে ডাকতে পারবেন না— কোথায় সেই শিকড়, যার জোরে রিভাইভাল তাঁকে আপন করবে? তখনই মনে পড়ে গেল তাঁর ক্যারিবিয়ান ঐশ্বর্য, মনে পড়ে গেল সমুদ্রঝঞ্ঝা আর পাথরকোঁদা কালো মানুষদের গান। কোথায় বাড়ি ছিল তাদের, সেনেগাল, গিনি না আইভরি কোস্ট? পশ্চিম আফ্রিকা থেকে জাহাজের খোলে বন্দি হয়ে সেইসব মানুষ ক্রীতদাস হিসেবে এসেছিলেন না? তাঁদের মেন্টো, তাঁদের ক্যালিপসো তাঁরও কি নয়? পথের সন্ধান পেলেন বেলাফন্তে, দরজাটা যেন হাট করে খুলে দিল কেউ!

এরপর বাহান্নতে, বেলাফন্তে রেকর্ড করবেন “ম্যান স্মার্ট, ওম্যান স্মার্টার”, তিপ্পান্নতে “মাটিল্ডা”। সেই তাঁর প্রথম ক্যালিপসো রেকর্ড। গান দুটো তিনের দশকে তৈরি করেছিলেন ক্যালিপসোনিয়ান নর্মান স্প্যান ওরফে কিং রেডিও। তাঁর ক্যারিবিয়ান অ্যাকসেন্ট বদলে, অ্যারেঞ্জমেন্ট বদলে গানদুটোকে স্যানিটাইজ করলেন হ্যারি। স্প্যান-কে সংরাইটিং ক্রেডিট না দেয়ার জন্য সে সময় সমালোচনা হয়েছিল তাঁর। তা নস্যাৎ করে দিয়ে বেলাফন্তে গেয়ে উঠেছেন:

অ্যান্ড নট মি, বাট পিপল দে সে
দ্যাট দ্য ম্যান আর লিডিং দ্য ওম্যান অ্যাস্ট্রে
বাট আই সে, দ্যাট দ্য ওম্যান অফ টুডে
স্মার্টার দ্যান দ্য ম্যান ইন এভরিওয়ে…

জনপ্রিয় সঙ্গীতের জগতে ১৯৫৬ একটি উল্লেখযোগ্য বছর। সে বছরই বেরিয়েছিল জনি ক্যাশের “আই ওয়াক দ্য লাইন”, চাক বেরি-র “ব্লু সুয়েড শু” আর এলভিস প্রেসলির “হাউন্ড ডগ”। আমেরিকা স্তব্ধ হয়ে গেছিল যৌবনের এই উদযাপনে। ছাপ্পান্ন সালে রক অ্যান্ড রোল দিগ্বিজয় করতে বেরোয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, শুরুতে প্রবল প্রতিযোগিতায় পড়েছিল নতুন ধারার এই গান। কারণ সে বছরই বেলাফন্তে বের করেছিলেন ক্যালিপসো। এই রেকর্ড বিলবোর্ড চার্টে টানা ৩১ সপ্তাহ #১ ছিল। ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় ভাসা সুরগুলো এই রেকর্ডের মাধ্যমেই পৃথিবী শোনে। এই রেকর্ডটাই খ্যাতির মহাসড়কে নিয়ে এল হ্যারিকে। এলপি-র এগারোটা গানের মধ্যে আটটার সংগ্রাহক ছিলেন আরভিং বার্জি। বেলাফন্তে তখন নিউ ইয়র্কের ওয়ালডর্ফ হোটেলে আছেন। বন্ধু ও লেখক উইলিয়াম অ্যাটাওয়ে সেখানে তাঁর সঙ্গে আলাপ করান বার্জি-র। ১৯৫৫ সালের সেই সেপ্টেম্বর অপরাহ্ণে “আয়রন বার” নামে পুরনো এক মেন্টো গান ভেঙে বানানো হয়ে যায় “জামাইকা ফেয়ারওয়েল” আর এডরিক কোন্নর-এর “ডে-ডাহ লাইট” গানের অনুপ্রেরণায় “বানানা বোট সং”।

মেন্টোর সঙ্গে ক্যালিপসো মিউজিকের কিছু পার্থক্য আছে। মেন্টো জামাইকার লোকসঙ্গীত, ক্যালিপসো ত্রিনিদাদের। সম্পর্কে ক্যালিপসোর তুতো ভাই সে, সুদূর অতীতে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা দাসদের হাত ধরে সেও এসেছিল, পরে জামাইকার উষ্ণমণ্ডলীয় জলহাওয়ায় লালিত-পালিত হয়েছে, খুঁজে পেয়েছে নিজের পরিচয়। ক্যালিপসোর মতই বিষয়ভিত্তিক হয় মেন্টো, তবে ক্যালিপসোর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাষ্য কমই পাওয়া যায় এতে। “কাম ব্যাক লাইজা”, “দ্য বানানা বোট সং”, “জামাইকা ফেয়ারওয়েল” সহ ক্যালিপসো অ্যালবামের বেশিরভাগ গান আসলে মেন্টো, শুধু বেলাফন্তের জন্যই পৃথিবী তাকে ‘ক্যালিপসো’ বলে চেনে।

 

হারলেমের কালো জামাইকান ছেলেটা ততদিনে বিখ্যাত হয়েছে। আমেরিকার পশ রেস্তরাঁ আর নাইটক্লাবে আজ তাঁর অবাধ গতিবিধি। সে সব জায়গায় কৃষ্ণাঙ্গরা ঢুকতে সাহস করে না। ঘরভর্তি শ্বেতাঙ্গ শ্রোতার সামনে, সে-ই সেখানে একমাত্র কালো। তাঁর বর্ণের অনেকের মত তাতে সে কৃতার্থ নয়, বরং তাঁর উপস্থিতিই প্রতিবাদ সেখানে! রোবসনের কথা সে ভোলেনি, নিজের খ্যাতিকেই ব্যবহার করছে পুঁজিবাদ আর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে। এই পর্যায় থেকেই বেলাফন্তের গান সামাজিক আর রাজনৈতিক ইস্যুগুলো ছুঁতে শুরু করে। কিন্তু তা কখনও ম্যানিফেস্টো হয়নি। সাতান্ন সালের “মামা লুক অ্যাট বু বু” গানটার কথা ধরুন। এই গান লিখেছিলেন ক্যালিপসোনিয়ান লর্ড মেলোডি। বহুদিন পর বাড়ি ফেরায় বাবাকে চিনতে পারছে না সন্তানেরা। আর গানের মধ্যেই প্রকাশিত হচ্ছে নট-সো-ফানি একটা গল্প:

আই ওয়ান্ডার হোয়াই নো বডি ডোন্ট লাইক মি,
অর ইজ ইট দ্য ফ্যাক্ট দ্যাট আই’ম সো আগলি?…
‘মামা লুক অ্যাট বু বু’ দে শাউট
দেয়ার মাদার টেল দেম ‘শাট আপ ইয়োর মাউথ
দিস ইজ ইয়োর ড্যাডি’ ‘ও নো!
মাই ড্যাডি কান্ট বি আগলি সো…

অথবা ধরুন, “জমবি জাম্বোরি” গানটা। নিউ ইয়র্কের এক কবরখানায় কবর ফুঁড়ে উঠে কার্নিভাল করছে ভূতেরা:

ইট ওয়াজ আ জমবি জাম্বোরি
টুক প্লেস ইন আ নিউ ইয়র্ক সেমিটারি…
ব্যাক টু ব্যাক, বেলি টু বেলি
আই ডোন্ট গিভ ডেম আ ড্যাম
আই অ্যাম ডেড অলরেডি…

লর্ড ইন্ট্রুডার এই গান লিখেছিলেন ১৯৫৩ সালে। বাষট্টিতে যখন প্রবল হয়েছে সিভিল রাইটস আন্দোলন, তখন এই গান রেকর্ড করে কী বোঝাতে চাইলেন হ্যারি? জমবি এখানে কারা, হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট ক্লু-ক্লুক্স-ক্লান নয় তো?

 

এরপর ১৯৫৯ সালে বেরোবে বেলাফন্তে অ্যাট কার্নেগি হল। হ্যারিকে বিখ্যাত করেছিল ক্যালিপসো, কিন্তু ঘরে ঘরে তাঁকে পৌঁছে দিল এই লাইভ অ্যালবাম। পূর্বজন্মের সুকৃতির ফলে এই টু-ক্যাসেট প্যাকটা আমি কিনেছিলাম, এই অ্যালবামটাই বেলাফন্তেকে হাট করে ঢুকিয়ে দিয়েছিল আমার ঘরে। এই রেকর্ডেই ছিল ইডিশ বিয়ের গান “হাভা নাগিলা”, তার অর্থ যে “লেট আস রিজয়েস” বহুদিন জানতাম না আমি। তবে তাঁর স্টেজ পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় নিদর্শন সম্ভবত এই রেকর্ডে গাওয়া “মাটিল্ডা”। তিপ্পান্নর সিঙ্গলে এই গান ছিল ২ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের, পঞ্চান্ন-র বেলাফন্তে অ্যালবামে তা হল ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ড, সেখানে কার্নেগি হল কনসার্টে এই গানটাকেই বেলাফন্তে গাইলেন ১১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড ধরে। গাইতে-গাইতে ‘মাটিল্ডা’ নামটা নানাভাবে উচ্চারণ করলেন, “সিং আ লিটল সফটার” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন বহুবার, থেমে গেলেন হঠাৎ করে। শ্রোতা কিন্তু জানেন না বেলাফন্তে থামবেন, ওদিকে গেয়ে চলেছেন তাঁরা। ফলে মুহূর্তে তৈরি হল সিং-অ্যালং, শ্রোতা বুঝলেন লাইভ পারফরম্যান্সে একটা গান যতটা গায়কের ততটা তার নিজেরও। সিং-অ্যালং-এর সম্রাট বলা হয় পিট সিগার-কে, “মাটিল্ডা”-র এই রেকর্ডিংয়ে সিগারকে অতিক্রম করতে না পারলেও, খুব কাছাকাছি গেছেন বেলাফন্তে। আবার, “ম্যান স্মার্ট, ওম্যান স্মার্টার” বা “ম্যান পিয়াবা” গাওয়ার সময় তাঁর অসাধারণ ভোকাল অ্যাক্টিং-এর কথা ভাবুন! বেলাফন্তের ঋজু স্বর-প্রক্ষেপণ, গাঢ় অ্যাকসেন্ট এর মধ্যেও তাই কুল-কুল করে বয়ে গেছে প্রচ্ছন্ন পরিহাসের সুর।

উনষাট সালেই ক্রিসমাসের আগে টুনাইট উইথ বেলাফন্তে টিভি স্পেশালে “হোল ইন দ্য বাকেট” গাইলেন হ্যারি। এক জার্মান নার্সারি রাইমের ইংরেজি ভার্সান ছিল গানটা। জার্মানে চরিত্র দুটোর নাম ছিল হাইনরিশ আর লিজল, ইংরেজি ভার্সানে এসে তা হয়ে গেল হেনরি আর লাইজা। হেনরির ভূমিকায় হ্যারি ছিলেন, লাইজার ভূমিকায় ছিলেন ওডেটা। অলসস্বভাব হেনরি-কে জল ভরতে বলা হলে, কোন অজুহাতে সে কাজ এড়ায়— তাইই ছিল গানের বিষয়বস্তু। তাঁদের এই টিভি পারফরম্যান্স ইতিহাস হয়ে আছে। এত বছর পরও যা দেখা যায় বেলাফন্তে আর ওডেটার অপূর্ব কমিক সেন্সের জন্য। এই অনুষ্ঠানের জন্য বেলাফন্তে সেবার এমি জেতেন।

তবে শুধু ওডেটা কেন, উদীয়মান গ্রিক গায়িকা নানা মুসকুরি বা দক্ষিণ আফ্রিকান আফ্রোপপ শিল্পী মিরিয়ম মাকেবা-কেও তো আমেরিকান শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন হ্যারিই। কে ভুলতে পারে মুসকুরির সঙ্গে “ইরিন” আর মাকেবা-র সঙ্গে “মালাইকা” ডুয়েটের কথা? দ্বিতীয় গানটা লিখেছিলেন তাঞ্জানিয়ান সংরাইটার আদম সেলিম। সোয়াহিলি ভাষায় “মালাইকা” শব্দটার অর্থ “প্রিয়তমা”, আদম এ গান লিখেছিলেন প্রেমাষ্পদ বান্ধবীরই বিরহে:

মালাইকা, নাকুপেন্দা মালাইকা
নিঙ্গেকুওয়া মালি ওয়ে
নিঙ্গেকুওয়া ডাডা
নাশিন্দাওয়া না মালি সিনা ওয়ে
নিঙ্গেকুওয়া মালাইকা…

১৯৯৩ সালে এই গানের নতুন এক ইন্টারপ্রিটেশন শোনা গেল। দামিনি ছবির জন্য এই সুর ব্যবহার করলেন নদিম-শ্রবণ। কুমার শানু আর অলকা ইয়াগ্নিক গাইলেন “গবা হৈ, চাঁদ তারেঁ গবা হৈ”। এক প্রেমিকার জন্য তৈরি গান, উৎসর্গ করা হল অন্যজনের প্রতি। প্রেমের গান এরকমই হয়, হয়ত বা।

 

বাঙালি অবশ্য বেলাফন্তেতে মজে রয়েছে আরও আগে থেকে। ১৯৬৫ সালে বিশ্বজিৎ আর বাসবী নন্দী রেকর্ড করেছিলেন “সঙ্গীতা, না যেও না”, শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের সুরে সে গানে “মাটিল্ডা” নাম্নী মেয়েটি হয়েছিল “সঙ্গীতা”। তারপর বেলাফন্তেকে বাঙালির ঘরের লোক বানালেন রঞ্জন প্রসাদ (প্রসাদ রঞ্জন দাশ, মহীনের ঘোড়াগুলি-র রঞ্জন ঘোষালের সঙ্গে অসম্পর্কিত)। ১৯৭৮ সালে তিনিই প্রথম “জামাইকা ফেয়ারওয়েল”-এর বাংলা করেন “পথের প্রান্তে ওই সুদূর গাঁয়ে”, এইচএমভি থেকে পথে প্রান্তরে ইপি-তে প্রকাশিত হয়েছিল সেই গান। বেলাফন্তের গানের প্রধান সুরটিকেই মোটামুটি রঞ্জন অনুসরণ করেছিলেন এই ভার্সানে। স্বপ্নজাল বোনা মেয়েটির কথা এই গানেও আছে, আর আছে ফেলে আসা স্মৃতির পাহাড়:

আহা মেলার রাস্তা ধরে মেয়ের দল
যেত কাঁকন বাজিয়ে পায়ে রূপোর মল
আজ তাদের গান করে ব্যাকুল প্রাণ
কেন স্মৃতির পাতায় ঝরে অশ্রুজল?

প্রায় একই সময় শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন “সাগর নদী কত দেখেছি দেশ”। সত্তর-আশির সে সব অশান্ত সময়ে, আন্ডারগ্রাউন্ডে গাওয়াও হত তা। রঞ্জন প্রসাদের গানের থেকে এ গান বেশ আলাদা। রঞ্জন যখন সচেতনভাবে বাংলা ভার্সান বানাতে চেয়েছেন, শিবদাসবাবু চেয়েছেন গানটাকে অন্য খাতে বইয়ে দিতে। আসল গানের লিটল গার্ল-টির চাইতেও এই গানে তাই প্রধান হয়ে পড়ে দেশ, জন্মভূমি:

তবু ভরে না মন, হায় ভরে না মন
কী করে বোঝাব যা দেখে নয়ন?
সব সেরা দেশ, আনে হৃদয়ে রেশ
আহা জন্মভূমি এই আমার দেশ।

১৯৮১ সালে গানটাকে রেকর্ড করেছিল ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার। রঞ্জন প্রসাদ তাতে প্রসন্ন হননি, অভিযোগ করেছিলেন তাঁর গান “আগ্রাসনের কবলে” পড়েছে।

এরপর নয়ের দশকে বারবার তাঁদের বেলাফন্তে ‘প্রীতি’-র সাক্ষ্য রেখেছে চন্দ্রবিন্দু। “অ্যাঞ্জেলিক-ও” অবলম্বনে বানিয়েছে “কেউ ভালবেসে জয় করে গোটা বিশ্ব”, “জন হেনরি” সুরে “বাথরুম”। “কোয়েলা” থেকে হয়েছে “জুজু” তো “কাম ব্যাক লাইজা” থেকে “পাশবালিশ”। প্রসঙ্গত, “জামাইকা ফেয়ারওয়েল” ছাড়া “কাম ব্যাক লাইজা”-রও একটি ভার্সান বানিয়েছিলেন রঞ্জন। প্রথমটার মত বিখ্যাত হয়নি তা, কিন্তু ভাল গান হয়েছিল অবশ্যই:

এসো হে প্রিয় সাথী আমার, বেলা যে যায় বয়ে যায়
গোপন স্বপ্নসাথী আমার, শূন্য দিন বয়ে যায়।

ভোরের সূর্যে দেখি লাল নিশান, তোমার সিঁদুরেও তাই
মিছিলে ঢল নামা দেয় তোমার খোলা চুলের ভরসাই…

সাতের দশকে তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য নচিকেতা ঘোষ বেঁধেছিলেন “এল না, সে এল না”, “বানানা বোট সং”-এর ছায়া ছিল তাতে। “ডে লাইট কম অ্যান’ মি ওয়ান’ গো হোম” সেখানে হয়েছিল “ডুবুরি ডুবুরি মন/ খুঁজেও মুক্তা পেল না”। অনুপ্রাণিত হলেও, অপূর্ব অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছিলেন নচিকেতা সেখানে। এই সুরেই কবীর সুমন বানালেন “কিছু কিছু রূপকথা সত্যি হোক/ তোমার আমার রূপকথা”। শঙ্কর-জয়কিষেন আবার হিন্দি ছবিতে ব্যবহার করলেন এই সুর। দিল অপনা ঔর প্রীত পরায়ে ছবিতে আশা ভোঁসলে গাইলেন ‘ইতনি বড়ি মেহফিল ঔর দিল এক/ কিসকো দুঁ’, সে গানের সঙ্গে পর্দায় নেচেছিলেন হেলেন।

ষাট বছর পর, যখন সময়ের নোনা লেগে গেছে অন্যসব গানের গায়ে, তখন এই গান শুনলে বেলাফন্তেকেই বোঝায়। এই গান শুনলেই বোঝায় বন্দরে কলার স্তূপ, মানুষেরা আছে বসে ভোরের প্রতীক্ষায়। দূরে আকাশ তখন “মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আলো ক্রমে আসিতেছে”।

 


তথ্যসূত্র:

১। Belafonte, Harry. w. Shnayerson, Michael. My Song: A Memoir. Alfred A. Knopf. New York. 2011.
২। Petrusich, Amanda. ‘Harry Belafonte and the Social Power of Songs’, The New Yorker. 22 February 2017.
৩। Harry Belafonte. Discogs.com.

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. খুব ভালো লেখা ।banana boat song প্রসঙ্গে অন্তর্জলি যাত্রা এক কথায় অনবদ্য। ধন্যবাদ ।

আপনার মতামত...