এই পৃথিবীর জন্য লড়ছেন তিরানব্বইয়ের মধুকান্তা

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

তিরানব্বই পেরোনো হায়দ্রাবাদের মধুকান্তা ভাট সেলাই করছেন। ভোর সাড়ে সাতটায় উঠছেন। একটু পুজো। তারপর সেলাই, সেলাই, সেলাই। একটা মেশিন। কয়েকটা ছেঁড়া প্লাস্টিক। ফেব্রিক। হায়দ্রাবাদের এ-ঘরে, ও-ঘরে পড়ে থাকা। মধুকান্তা ভাট সেসব জোগাড় করে এনে সেলাই করছেন। দিনে আটটা থেকে দশটা করে ব্যাগ বানাচ্ছেন। মেয়েদের ব্লাউজ, পেটিকোট বানাচ্ছেন। গত আটটা বছর। ৩৫,০০০ ব্যাগ। থ্রি ডিজিটের সাত বছর আগে মধুকান্তা ভাট বর্জ্য পদার্থ থেকে বানিয়ে ফেলেছেন ৩৫,০০০ ব্যাগ। অলৌকিক, জাস্ট অলৌকিক।

মধুকান্তার গল্পটা কবে থেকে? কেমন? কোথায় শুরু? শুরুর আগেও তো এক অন্য শুরু থাকে? তার চেহারাটা কেমন? সে গল্পে আসি বরং…

গুজরাটের জামনগরের এক পুরুষতান্ত্রিক কট্টর ভারত। ওখানে মেয়েদের পড়ানোর প্রথা নেই। ১৯৩০-এ সেই পরিবেশে জন্মানো মেয়ে মধুকান্তারও তাই পড়া হল না‌। শেখা হল না বড়সড় কিছু। সময় কেটে গেল, বয়স বাড়ল। এবং আঠারো বছর ছুঁয়েই বিয়ে। স্বামীর চাকরিসূত্রে চলে এলেন হায়দ্রাবাদে। ভাষা সমস্যা। গুজরাটি ছাড়া যে আর কিছু শেখেননি। একটাই বিষয়, সন্তান। ওরাই সব। চার-চারটি কন্যাসন্তান। এক পুত্র। মেয়েদের কনভেন্টে পড়ালেন। নিজের শৈশব চেনেন‌। নিজের মেয়েদের জীবনে যেন কোনওরকম অন্ধকার না আসে। ওরা যেন কিছু পায়, অনেকটা পায়। একসময় ছেলেমেয়ের পড়াশোনার, স্কুলের অবসরে সেলাই। শেখা, শেখানো, ঘরোয়া কাজ।

অবশ্য এটুকুর জন্যেও লড়াই কম নেই‌। এলাকার বাকি মেয়েরা সেলাই করছে। তিনি পারছেন না। ভাল সেলাই মেশিন কেনার টাকা কোথায়? স্বামীর সাধারণ চাকরি। মধুকান্তা হাতখরচ, সংসার খরচ থেকে জমাতে শুরু করলেন। এক, দুই, তিন। সঞ্চয় বাড়ল। ২০০ টাকা দিয়ে ১৯৫৫ সালে একটি ঊষা কোম্পানির সেলাই মেশিন কিনলেন। হাতে ছুঁলেন। যেন ঈশ্বরকে ছুঁচ্ছেন। আহ, আরাম। তাও, স্বপ্ন থেকে আরও কিছুটা দূরত্ব। কীভাবে চালাবেন এই মেশিন? প্রথাগত প্রশিক্ষণের পেছনেও তো অর্থ। সেসব নেই যে। উপায় হিসেবে সাধারণ একটি এক মাসের শর্ট ট্রেনিং করলেন। পড়শি এর-ওর বাড়ি গিয়ে যেচে শিখলেন কাজ। আলো ক্রমে এল। দক্ষতা এল। মেশিন হাতে সাধারণ মধুকান্তা ভাট ক্রমশ রানি হয়ে উঠলেন। নিজের, স্বামীর, ছেলেমেয়েদের, এমনকি প্রতিবেশীদের জামাকাপড়ের সেলাই চলতে থাকল। মধুকান্তা এই ভার হাসিমুখে সইলেন। এই তো চেয়েছিলেন বুঝি। এই…

এ তো গেল ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গল্প। এখান থেকেই সমষ্টিগত উত্থান। সমষ্টিগত লড়াই। সামাজিক আলো। নিজের গল্প থেকে উঠে ক্রমশ দেশের কথা, পৃথিবীর কথা ভাবতে পারা। মধুকান্তা ভাটের মতো মানুষেরা এখানেই রানি। স্বতন্ত্র এক সাম্রাজ্যের দেবী।

এলাকার চারপাশে পড়ে থাকা অজস্র প্লাস্টিক। কাপড়। নাইলন, সুতি। একটাই গন্তব্য। ল্যান্ডফিল। মধুকান্তাদের প্রথাগত পরিবেশবাদ পড়ার প্রয়োজন হয় না। ওঁরা জানেন কীসে ক্ষতি, কীসে লাভ এই গ্রহের। তিনি এ-ঘর, ও-ঘর থেকে সংগ্রহ করতে থাকলেন বাতিল প্লাস্টিক, কাপড়। দর্জির দোকান, আসবাবপত্রের দোকান থেকে সংগ্রহ করলেন প্রায়-বাতিল সেইসব কাপড়, পলিথিন। আস্তাকুঁড়ে যাওয়ার হাত থেকে আটকালেন। তারপর সেলাই মেশিনে ফেললেন। যত বয়স বাড়ল, তত জোর পেলেন। অদ্ভুত এক আশ্চর্য। দিনে আটটা করে ব্যাগ বানালেন। ২০১৫ সাল থেকে প্রায় একদিনও যায়নি, যেদিন মধুকান্তা মেশিনে হাত দেননি। এভাবেই গত আট বছরে ৩৫,০০০ ব্যাগ। সমস্তই পরিবেশবান্ধব। এইসব ব্যাগ কোনও অর্থ ছাড়াই বিলি করে দিলেন চারপাশে। রিসাইক্লিংকে হাতেনাতে দেখিয়ে দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করলেন। এবং তার পাশাপাশি অতিমারির সময় থেকেই বানালেন অসংখ্য মাস্ক। ফেলে দেওয়া জামাকাপড় থেকে। আশ্চর্য, আশ্চর্য সে গল্প…

বয়স কখনও কি সমস্যা করে না? কোমরের অপারেশন। ঠিকঠাক বসতেও অসুবিধে। ছেলে নরেশ তুলনায় কম পরিশ্রম হয় এমন এক নতুন মেশিন কিনলেন। মাকে দিলেন। মধুকান্তা আবার আলো পেলেন। এই ছেলেমেয়েরাই মায়ের বানানো ব্যাগ বিলি করে আসেন রোজ। যে লড়াইয়ে কাছের মানুষদের পাশে পাওয়া যায়, সে লড়াই তুলনায় একটু হলেও সহজ লড়াই। কষ্ট হলেও মধুকান্তা এখন অনেক বেশি হাসেন। সেলাই করেন। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনির ভরপুর সংসারে রোজ সকালে পুজোর পরে সেলাইয়ের শব্দ হয়। খুট খুট খুট। ওই শব্দই শিল্পী, শ্রমিক এক বৃদ্ধার জীবনযুদ্ধ। তিনি জিতে গেছেন। এখন টার্গেট সেই জেতাটাকে ধরে রাখা, বাকিদের ভেতর ছড়িয়ে দেওয়া। জিতিয়ে দেওয়া এই হেরে যাওয়া সময়কে।

মধুকান্তা বলে দিয়েছেন এ কাজে অবসর নেই। তিনি কাজ না করে চুপচাপ বসতেই পারেন না। আরও বহু বছর সেলাইয়ের শব্দ হোক ঘরে। পৃথিবী আলো পাক সে শব্দে…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...