ছেঁড়া-ছেঁড়া আকাশলিখন

অনির্বাণ চন্দ

 

কোন্‌খানে আকাশের গায়ে রূঢ় মনুমেন্ট উঠিতেছে জেগে…

প্যারিস…!

২০১৬, নভেম্বর। সেখানে তখন ফ্রেমের বাইরে, সূর্য। বিকেল নয়, অথচ সন্ধেও কি? চর্যাপদের ভাষার মতো অসময়ে পায়ে-পায়ে কবে চলে এসেছি এইখানে? বাতাসে গিটার। কে গান গায়? নিকোটিন সুবাস। টুকরোটাকরা প্রেমিক-প্রেমিকা ইতিউতি। আর গুস্তাভ সাহেবের জাদুটোনায় ঝলমলে ইস্পাত মাথা উঁচিয়ে উঠে গেছে আকাশের দিকে…

এ তো কোনও স্কাইস্ক্র্যাপার নয়। তবুও তলে-তলে মানুষের ভিড়। এত ভিড়ে নির্জন লাগে। “To kinder skies, where gentler manners reign,/ I turn; and France displays her bright domain.” মনে পড়ে অ্যাপোলিনেয়ারের আইফেল। প্যারিসের পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা তীক্ষ্ণ জিভ-ভ্যাংচানি— জার্মানির উদ্দেশ্যে… অথচ আজ কত-শত জার্মান এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কোনটা কার দেশ, বলো? এখান থেকে অনেক দূর আমার বাড়ি। অথচ, এখন এই মুহূর্তে, এ শহরটা আমার। এই শহরের আনাচে-কানাচে কথার আড়ালে ফুটে ওঠে অন্যান্য কথারা।

…খানিক বাদেই তোমাকে মনে পড়ে। ভাবি, তোমার সঙ্গে ঘুরব সারা প্যারিস সিটি। কুলকুল সেইন নদীর মাছেদের দিকে ছুড়ে দেব অচল পয়সা। এ-মিউজ়িয়ামের উষ্ণতা নিয়ে চলে যাব অন্য বুলেভার্ডে; ক্লান্ত হলে ভিজে বাতাসে ভেসে আসবে সুর… তারপর— তারপর— তোমার হাতে প্যারিস তুলে দিয়ে বহুদূর— সালভাদর— চলে যাব একা…

অচিরেই ভুল ভেঙে যায়। হেসে উঠি। মনুমেন্টের পিছনে ফস্‌ করে জেগে ওঠে চাঁদ।

 

জার্নালের পাতা: ৪ ডিসেম্বর, ২০২২; বিকেল ৪টে ৫৫ মিনিট

ফুরোচ্ছে দিনটা। চুঁইয়ে চুঁইয়ে সন্ধে।

নির্জন কোয়ার্টারের ছাদে। স্তব্ধ সময় হাতে রবিবার এল, চলেও গেল দুদ্দাড়। আগামীকাল, ফের মান্‌ডে ব্লুজ়। কফিকাপ থেকে মৃদু ধোঁয়া। ব্ল্যাক কফি… একটু চিনি… ঠিক ততটাই, যাতে কফিতিক্ততাটুকু অটুট রয়ে যায় খানিকক্ষণ…

আকাশে চোখ। কী রং তোমার এখন, আকাশ?

এ কোন্‌ রং? জানা নেই। কালারব্লাইন্ড হই না কেন? স্বপ্নের কি এমনই হয় রং?

স্বপ্নবদল, সহসাই! ড্রিম উইদিন আ ড্রিম। এক গাঢ় পর্বতের পায়ের কাছে আমি বসে। আচ্ছা, পর্বত, না প্যাগোডা? আশ্চর্যরকম সাদৃশ্য, না? উঁচুতে উঠে যাওয়ার হাতছানি। উঠতে থাকি হাঁচোড়পাঁচোড়— দম ফুরিয়ে আসে, ফুরিয়ে আসে…

দ্য বটম ইজ় অলওয়েজ় ক্রাউডেড, বাট দেয়ার ইজ় অলওয়েজ় রুম অ্যাট দ্য টপ। কোনওক্রমে উঠে পড়েছি চূড়ায়। এখান থেকে নিচে তাকালে ক্ষুদ্র মনে হয় সবকিছুই। বসে পড়ি। পাতলা অক্সিজেনে শ্বাস ঘন-ঘন। এখানেই শেষ তবে? ভাবছি, ফিরে যাওয়াই ভাল…

এই উষ্ণ শীতল উচ্চতায়, রোজকার মতোই, মরে যাচ্ছে সন্ধেটা। কী নির্জন মৃত্যু! গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আরেকটা দিন— এবারে নামবে রাত। থাকে শুধু অন্ধকার। সন্ধেটা হাত বাড়িয়ে রাতকে ডাকে, আয় আয় আয়…

যখন বিকেল নামে ক্রমাগত নীরবতা সেজে— একা মানুষের বড় একা লাগে। সে যে খুব একা, এ-কথা হঠাৎ করে বুকে তার এসে বিঁধে যায়। অথচ ডিলান টমাস কানে ফিসফিস।

Do not go gentle into that good night.
Rage, rage against the dying of the light.

আমি কোথায় যাব?

 

জার্নালের পাতা: ১৮ জানুয়ারি ২০২৩, সকাল ৮টা ৪ মিনিট

কার পার্কিং লট। কোথাও কেউ, কেন জানি না, নেই। অথচ অফিসে, বুধবার সকাল-সকাল।

আমি যথারীতি নির্জন। অথচ সকলেই তো আর নির্জন না। আমি কেন বেপথু? কেন এই ম্যাজিক নির্জনতা ঘিরে ধরে আমাকে? কেন? প্রশ্নগুলো সহজ। উত্তরও তো…

এইসব অসুখ-অসুখ সময়ে কুয়াশা আসে, না?

ভেসে ভেসে আসে আবছায়া। অফিসটাইম, অথচ আন্‌হারিড। কুয়াশার ভারে নুয়ে পড়া গাছ— আচ্ছা, ওরা কি সত্যিই আছে? না এ-সবই আমার কল্পনা? সিগারেট জ্বলে ওঠে। আকাশে আলো তো— নেই; অথচ কোথায় অন্ধকার— আমি দেখতে পাচ্ছি না তো…

আমাকে ঘিরে ফেলে কার্ল স্যান্ডবার্গের কুয়াশা। মার্জারপায়ে হেঁটে আসা কুয়াশা…

The fog comes
on little cat feet.

It sits looking
over harbor and city
on silent haunches
and then moves on.

নদীর অস্ফুট ছলাৎছল কানে আসে। মনে আসে গান। ‘মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা…’

হে অনন্ত বিষণ্ণতা, তুমি অন্য কারও হবে না আর কিছুতেই…

 

সমস্ত পড়ন্ত রোদ চারিদিকে ছুটি পেয়ে জমিতেছে এইখানে এসে

মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ। ফুরিয়ে আসছে শহরের পিনকোড। কোথায় গেছিলাম বা কোথা থেকে কোথায় ফিরছি, জেনেও বলছি— মনে নেই। ফিরিবার পথ নাহি। ইতিমধ্যে সরাইঘাট ব্রিজের আশেপাশে গাড়ি।

ফের আকাশ। ফের সন্ধের মুখোমুখি। বন্ধু কী খবর বল্‌!

দুই অনির্দিষ্ট গন্তব্যের মাঝের ফাইনাইট দূরত্ব পেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। আকাশে চোখ মেলা। সেখানে এলিয়ট লিখে রেখেছেন ফুস্‌মন্তর:

Let us go then, you and I,
When the evening is spread out against the sky
Like a patient etherized upon a table;

কে ডাক্তার আর কে-ই বা রোগী? কে যে কাকে ছুঁয়ে ফেলে কোন্‌ সন্ধ্যায়, কে জানে? আমি তো জানি, আমি সেই জন্মবখাটে— যার কোনও ঘর নেই, নেই কোনও শীতের চাদর। তবুও, মনে পড়ে, তোমার তিলের কাছে গোপন রেখেছি আলুথালু ঠোঁট, মায়াবী পশম…

হাওয়া দুলে ওঠে। ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের নিচে। স্তব্ধতার একমুঠো পর্দা ওড়ে সেই জলজ হাওয়ায়। তুমি কী জানো আমার কথা? সব কথা বলে ফেলা যায়? সন্ধের বাতাসে শাঁখ তোমায় ঠিক ভুলিয়ে দেয় আমার শব্দের নাম— আমার নামের যত গ্লানি!

অথচ, এ কী বিষ! তুমি না মানলেও যে তোমারই আওয়াজখানি সুরের সুরেলা হয়ে বুকে এসে ঠিক বিঁধে যায়! মনে পড়ে, অলৌকিক আলোকিত মুখ তোমার— সারারাত শুধু টলোমলো চোখে জেগে আছ।

এই, তুমি জেগে আছ, বলো…

 

সেখানে ছিলাম আমি— কবেকার ভুলোমন— করবেট ন্যাশনাল পার্কে…

সকাল ছটার টিক্‌টিক্‌ ঘড়ি। চোখজ্বলা; জেগে ওঠা। ধুয়েমুছে ঘুম, বাসে চড়ে বসা। উইন্ডো সিটের কো-ট্রাভেলারের সঙ্গে কোথায় গল্প, কোথায় কী— তার আর তার ফেলে আসা ঘুমের বড় জোরালো রঁদ্যেভু। অগত্যা একাকীই, যেমন প্রত্যহই… কখন যে বেঁকে গেছে পথ পথের থেকেই, মনে করতে পারি না।

ইলেকট্রিক বাসের ভেতর। নিয়ন্ত্রিত শীতাতপ। জানলার বাইরে দিয়ে হু হু ধু ধু হাইওয়ে। মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ। ৪০০ কিলোমিটার এফোঁড়ওফোঁড় রাস্তা এখানে আসার পথ জুড়ে। সকাল থেকে সন্ধে। রাস্তা মানেই নদী। আর নদী মানে… নদী মানে… নদী মানে… এখান থেকে ঠিক কতটা দূরে তোমার বাড়ি…?

…এসে পৌঁছানোর পর হাসিমুখ পাহাড়িবালক। টেকিং কেয়ার, কেয়ারটেকার। সাহাব, গরম পানি চাহিয়ে তো ইস নব কো ঘুমাইয়ে। সাহাব, অরেঞ্জ জুস চাহিয়ে ক্যা? সাহাব, সাম কো ঠন্ড গিরেগি খুব…

কটেজগুলোর দরজায় বনজ হাওয়ার ঘ্রাণ। সেই ছেলেটা, যার নাম— এখন মনে পড়ছে না কিছুতেই— তাকে জিজ্ঞেস করি, “নদী আছে নাকি কাছাকাছি?”

সে মাথা নাড়ে। হ্যাঁ, আছে তো। ফের শুধাই, “কোথায়? কতদূর যেতে হবে নদী পেতে?” প্রশ্নে হেসে ফেলে সে। এক কাপ চা হাতে তুলে দেয় আগে। তারপর কটেজের পিছনের দরজাটা খুলে দিয়ে আঙুল তুলে দেখায় একটা পায়েহাঁটা পথ।

এই পথই নদীর কাছে চলে যাবে? পথের এত কাছে এসেও চিনতে পারিনি তবে? হেসে ফেলি। চায়ের কাপে চুমুক। লেমন টি-র স্বাদে জিভ খুশি হয়ে ওঠে। নেমে পড়ি সেই পথে। একাকী। সন্ধে হয়ে আসছে ক্রমে। কিন্তু আসন্ন পাহাড়ি রাতের আলো ক্রমে আসিতেছে। মিয়েন্ডারিং, মিয়েন্ডারিং। পথের কাঁখে পড়ে থাকা অজস্র অচেনা ফুলের হাসিমুখ প্রায়ান্ধকারে জেগে আছে। তাদের দিকে তাকাই। হাসিমুখ ভুলে গেছি, যেমন ভুলে গেছি ডাকনাম…

এই তো, এসে গেছি। নদী… সে-নদীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে আকাশ…

সন্ধে সাতটা। কিন্তু এখনও খানিক আশ্চর্য আলো। আলো পছন্দ হয় না আমার। থাকে শুধু অন্ধকার। কিন্তু এ-আলোর রং, আশ্চর্য, নীলাভ! ডিসপার্সন? হয়তো তাই-ই। কী বা যায় আসে। পায়ে পায়ে আরও কাছাকাছি। আমার আর নদীর মাঝের দূরত্ব এখন আর অনন্তকালের নয় বোধহয়…

এখানে নদীর বুকে ঝুঁকে পড়ে বেখেয়াল আলো। পাথুরে জলের তোড়ে ভেসে গেছে আমাদের বাড়ি। মেঘেদের আনাগোনা সব ভুলিয়ে দেওয়ার ছলে যেন হাতছানি দেয়, কাছে এসে চোখের ভিতর রাখে হাসিমুখ চোখ। বলে, “সেরে ওঠো, সেরে যাও…” আমি তো জানি না কাকে সেরে ওঠা বলে ফেলা যায়। নিশ্চুপ নদীর কাছে এসে বসি। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি নদীর চোখের কালো জল। ফিসফিস করে বলি, “সেরে ওঠো…”

কিছুই না বলে নদী বয়ে চলে যায়। ক্রমে ঘন হয়ে আসে জলজ আলোর ফিকে রং। আমি চেয়ে থাকি স্থির; বাতাসে জলের ঘ্রাণ এসে হাত রাখে ঝুঁকে পড়া কাঁধে। অশান্ত মনের মাঝে টুপটাপ ঝরে পড়ে জল। কেঁদে ওঠে অন্ধকার;

জলের পাথুরে তোড়ে ভেসে গেছে আমাদের ঘর…


*ছবি: লেখক

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...