দেশের গর্ব ওই কুস্তিগিরেরাই, সেন্ট্রাল ভিস্তা নয়

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 



রাজনৈতিক ভাষ্যকার, প্রযুক্তিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর

 

 

 

 

গ্রেপ্তার হওয়ার সময় পুলিশের ধাক্কা খেতে খেতে বাসে উঠছিলেন যখন, সাশ্রুনয়নে ভিনেশ ফোগত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলে উঠেছিলেন, “ইস নয়া দেশ পে আপকা স্বাগত হ্যায়!”

 

২৮ মে ২০২৩,  হিন্দুবীর সাভারকরের জন্মদিনে ‘গণতন্ত্রের মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, যেমনটা হওয়া উচিত, বাস্তবেও ঘটল তেমনটাই। সকাল থেকে, বলা ভাল ২৭ মে-র রাত থেকেই নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠান-আড়ম্বরের তুমুল গর্জনে ‘মন্দির’ উদ্বোধনের বিষয়ে প্রচার জারি হয়েছিল। আমাদের দেশে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র যে সাধারণ ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য সংবিধানের পবিত্র গ্রন্থে আধারিত, মোটামুটিভাবে তার ভুষ্টিনাশ করে ফেলা গেল। একগুচ্ছ হিন্দু, উচ্চবর্ণের পুরোহিতকে আকাশপথে উড়িয়ে নিয়ে এসে কোনও এক ‘রাজদণ্ড’কে নতুন সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠা করা গেল। এতগুলি ব্রাহ্মণের মাঝে আদিবাসী, মহিলা, একাকিনী রাষ্ট্রপতি তাই কোনওভাবেই আর জায়গা পেলেন না। কাঁসর-ঘণ্টা-উলুধ্বনিটুকুই বোধহয় বাকি ছিল কেবল। তুমুল হট্টগোলের মধ্যে দিয়ে গণতন্ত্রের মন্দিরে রাজতন্ত্রের অভিষেক ঘটল। কর্নাটক নির্বাচনে যে শোচনীয় হার, তার থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে আইটি বাহিনিকে আগে থাকতেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রধানসেবক মশাই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সময় থেকে, সামান্য পরেপরেই সামাজিক মাধ্যমে একেকটি করে বার্তা দিতে থাকছিলেন। অনুগামী ভক্তবৃন্দেরাও মুহূর্তের মধ্যে হরির লুটের বাতাসা লোফার মতো সেগুলিকে লুফে নিয়ে ভাইরাল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু এরও মধ্যে বাধ সাধল কুস্তিগিরদের আন্দোলন।

গণতন্ত্রের উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতি নেই, মহিলাদের তেমন একটা উপস্থিতি নেই, ধর্মনিরপেক্ষতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান চলছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তরফে একজনও প্রায় উপস্থিত নেই, অর্থাৎ কিনা গণতন্ত্রের পক্ষে, সংবিধানের পক্ষে যা যা পরিপন্থী, যা যা দৃষ্টিকটু, তার সবকিছুরই আয়োজন ছিল আজ। এমনই দিনে প্রকাশ্য রাজপথে ন্যায়বিচার চাইবার মানসিকতা যাঁদের, তাঁদের কপালে দেশদ্রোহী ভিন্ন আর কীইবা তকমা জুটবে? হোন না তাঁরা পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ, অলিম্পিকের মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসা মানুষ। যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে, বিজেপি সাংসদ ও জাতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের গ্রেপ্তারির দাবিতে, জানুয়ারি ২০২৩-এর পর, এপ্রিল ২০২৩, পদকজয়ী অলিম্পিয়ান কুস্তিগিরেরা আজ অবধিও দিল্লির রাজপথে ধরনায় অনড় ছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের তরফে কুস্তিগিরদের এই আন্দোলন প্রসঙ্গে দিল্লি পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নিয়ে একাধিক আলোচনা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। কিন্তু বেশ কিছুদিন আগেই আদালতের তরফে এই নির্দেশ দেওয়া হলেও ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে সামান্যতম ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও উদাহরণ চোখে পড়েনি। উলটে অভিযুক্ত ব্রিজভূষণ চওড়া বুকে সংবাদমাধ্যমের সামনে একাধিক বিবৃতির মাধ্যমে নিজের দায়সারা মনোভাব ব্যক্ত করেছেন, তদুপরি আন্দোলনরত কুস্তিগিরদেরও সম্মানহানি করেছেন ও তাঁদের উপর মানসিক চাপসৃষ্টির নিয়মিত চেষ্টা করে গিয়েছেন। উপায়ান্তর না দেখে ২৮ মে, ২০২৩, নয়া সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিন আন্দোলনরত কুস্তিগিরেরা সিদ্ধান্ত নেন যন্তরমন্তরের ধরনাস্থল থেকে তাঁরা মিছিল করে সংসদ ভবনের দিকে এগোবেন। ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের নেতারাও এই বিষয়ে আন্দোলনকারী কুস্তিগিরদের পাশে দাঁড়ান। কৃষক সংগঠনগুলির তরফে জানানো হয় একই দিনে তাঁরা দিল্লির বুকে আন্দোলনকারী কুস্তিগিরদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ‘মহিলা সম্মান’ মহাপঞ্চায়েতের আয়োজন করবেন। দিল্লি পুলিশের তরফে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষ কমিশনার দীপেন্দ্র পাঠক রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন “নয়া সংসদ ভবন উদ্বোধনের দিন কোনওরকম ‘দেশদ্রোহী’ কার্যকলাপ পুলিশ বরদাস্ত করবে না।” অচ্ছে দিনের ভারতবর্ষে, গণতন্ত্রের মন্দির উদ্বোধনের দিন যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়ার প্রচেষ্টা, আদতে যে দেশদ্রোহিতার সমতুল, একথা জানা ছিল না প্রতিবাদী পদকজয়ীদের।

কাজেই শিরদাঁড়া সোজা ছিল সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগত, বজরং পুনিয়া ও তাঁদের অন্যান্য সঙ্গীদের। সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ যন্তরমন্তর থেকে সংসদ ভবনের উদ্দেশ্যে মিছিল শুরু হয়। আন্দোলনের সদস্য গোপাল তিওয়ারির বক্তব্য অনুযায়ী এরপর পুলিশের কার্যকলাপ দেখেই বোঝা গিয়েছিল সমস্তটাই আগে থাকতে তাঁরা পরিকল্পনা করে এসেছিলেন। কিছুদূর এগোতেই পুলিশ বাধা দেয় তাঁদের। প্রতিবাদী কুস্তিগিরদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। সঙ্গীতা ফোগত ও ভিনেশ ফোগতকে মাটিতে ফেলে ঠেসে ধরা হয়। লজ্জাজনকভাবে হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে ভ্যানে তোলার চেষ্টা করা হয় সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়াকে। এর আগে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের পুলিশ সরিয়ে দিতে শুরু করে। ঢিলছোড়া দূরত্বে তখন মহামহিম প্রধানসেবক দামোদরদাস সংসদ উদ্বোধনের নামে চূড়ান্ত ও কদর্য নাটকীয়তার প্রদর্শনে ব্যস্ত। সেই একই সময়ে দিল্লির রাজপথে হিঁচড়ে ফেলে, ঠেসে ধরে, টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় অলিম্পিক পদকজয়ী ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান খেলরত্ন পুরস্কারে ভূষিত সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়া, ও ফোগত বোনেদের মতো একেকজন প্রতিবাদীকে। যাঁরা কিনা যৌন শোষণের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বিচার চাইতে এসেছিলেন। পরিহাসের সঙ্গে বলতে হয় কদর্য অপরাধে অভিযোগের আঙুল যার দিকে, সেই ব্রিজভূষণেরই সাংসদ হিসেবে দিল্লির যে বাসভবন, সেই ২১ অশোকা রোড, নয়াদিল্লি— তার থেকে সামান্যই দূরত্বে বিচার চাওয়া ক্রীড়াবিদদের এভাবে লাঞ্ছনা করা হয়। পরিকল্পনা যে আগে থাকতেই করা ছিল, পুলিশের পরবর্তী কার্যপদ্ধতিতেও তা প্রমাণিত হয়। আলাদা আলাদা ভ্যানে তুলে সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগত, ও বজরং পুনিয়াকে দিল্লির বিভিন্ন থানায় আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমকে তাঁদের অবস্থান জানাতেও পুলিশ অস্বীকার করে। দিল্লি শহর জুড়ে, ও শহরের প্রতিটি প্রবেশপথেও ব্যারিকেড ও নাকাবন্দির ব্যবস্থা করা হয়। দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্তে মহাপঞ্চায়েতে যোগ দিতে আসা একাধিক কৃষকনেতাকে আটক করা হয়। আরও জানা যাচ্ছে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও হঠাৎ করেই প্রচুর পুলিশ নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের তরফে অভিযোগ করা হয় গোটা ক্যাম্পাস চত্বর জুড়ে এক অঘোষিত ১৪৪ ধারার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, কৃষক ও কুস্তিগিরদের তরফে আয়োজিত মহাপঞ্চায়েতে যাতে তাঁরা যোগ দিতে না পারেন সেইজন্যই পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে এই তৎপরতা।

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, রাত্রি আটটার কিছু আগে গ্রেপ্তার হওয়া আন্দোলনকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশের তরফে তাঁদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাঁধানো (আইপিসি ধারা ১৪৭), বেআইনি জমায়েত (আইপিসি ধারা ১৪৯), সরকারি আধিকারিকের কাজে বাধাসৃষ্টি (আইপিসি ধারা ১৮৬), সরকারি আধিকারিকের উপর হামলা (আইপিসি ধারা ৩৩২) প্রভৃতি একগুচ্ছ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআরের পরবর্তীতে অবশ্য সেই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেই নিয়ে কোনও বক্তব্য মেলেনি। দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারম্যান স্বাতী মালিওয়ালের তরফে অবিলম্বে ব্রিজভূষণের গ্রেপ্তারির দাবি জানানো হয়েছে। যদিও পুলিশ ইতিমধ্যেই বলপূর্বক যন্তরমন্তরের ধরনাস্থল খালি করে দিয়েছে। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে তা বলবে সময়। যদিও, কুস্তিগিরদের তরফে ও কৃষক সংগঠনগুলিরও তরফে আন্দোলন জারি রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে।

সংবিধানের পাতায় সোনার অক্ষরে উৎকীর্ণ সেই শব্দগুলি (যেমন কিনা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, যেমন কিনা ‘গণতান্ত্রিক’, যেমন কিনা ‘সার্বভৌম’, যেমন কিনা ‘প্রজাতন্ত্র’), সেগুলির সবকটিকেই আজ কেমন যেন ফিকে হয়ে আসতে দেখছি। একদিকে ‘গণতন্ত্র’ উদযাপনের নামে কদর্য হিন্দুত্ব, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও কার্যত রাজতন্ত্রের প্রকাশ, অন্যদিকে লাজলজ্জা, সম্ভ্রম, সম্মান সমস্তকিছুকে বিসর্জন দিয়ে দেশের গৌরব পদকজয়ীদের প্রকাশ্য রাজপথে এমন পদ্ধতিতে শারীরিক ও মানসিক হেনস্থা— কোন পথে আমাদের দেশ, সত্যিই বুঝে উঠতে পারি না। তার চেয়েও বেশি করে কানে বাজে সামাজিক মাধ্যমগুলিতে তথাকথিত ‘ভদ্দরলোকেদের’ তরফেও এই বিষয়ে পৈশাচিক উল্লাস ও দেশের আইকন ‘মহারাজ’ সৌরভ, ‘ঈশ্বর’ শচীন, অথবা ‘গৌরব’ ঊষার তরফে কানফাটানো নিস্তব্ধতার নিরবচ্ছিন্ন উদযাপন। গ্রেপ্তার হওয়ার সময় পুলিশের ধাক্কা খেতে খেতে বাসে উঠছিলেন যখন, সাশ্রুনয়নে ভিনেশ ফোগত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলে উঠেছিলেন, “ইস নয়া দেশ পে আপকা স্বাগত হ্যায়!” ঠিকই বলেছিলেন।

উলঙ্গের চেয়েও উলঙ্গ রাজার এই নয়া ‘গণতান্ত্রিক’ উৎসবে আজ সকলকে অভিবাদন!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...