ভেরোনিকা ও প্রাগের ঘোড়াগুলি

নিরুপম চক্রবর্তী

 

শহরে লুকানো আছে জাদুর অরণ্য এক, সেইখানে পদযাত্রী আমি।
সূর্যাস্তে ফুটেছে ফুল, শ্বেতশুভ্র, এ অরণ্যে বৃক্ষগুলি তাহার প্লাবনে
ভাসিতেছে। প্রাগের এই নিরালা অঞ্চল, সুখদল নাম তার, এইস্থানে
আমি বাস করি। ইতস্তত এই বিচরণ নৈমিত্তিক কাজ মাত্র:
বায়ু সেবনের তরে কলিকাতা শহরেতে বাবুরা যেমতি যায়
গড়ের মাঠেতে তথা ঢাকুরিয়া লেকে!

নির্জন চলার পথ। জনহীন দু’একটি কুটির। জানি না তা কাহাদের,
ইদানিং কোথায় তাহারা। পেরোই চড়াই উৎরাই।
ক্রমশ গভীরে যাই। নিস্তব্ধ অরণ্যপথ, জাদুকরী গহন নিবিড়ে ক্রমশ ঘিরিতে থাকে
অলৌকিক বৃক্ষগুলি— এর পরে কোন দিকে যাই?
বিপন্ন গুগুল বলে: ডান দিকে শার্প টার্ন, তারপরে স্লাইট রাইট।
মানি তাহা অসীম বিশ্বাসে।
সামনে বন্ধুর পথ: জাল দিয়ে বন্ধ করে ঘেরা,
চতুর্দিকে হ্রেষারব, একরাশ অলৌকিক ঘোড়া
আমাকে ঘিরিয়া ধরে, আর
আপনি বাঁচিলে পরে লইব পিতার নাম
বলিয়া গুগুলবন্ধু সচাপটে পলায়ন করে!

তখনই সে আসে।
অশ্বপৃষ্ঠে দৃপ্তা নারী, পরিধানে কৃষ্ণ বাস, মস্তক মুণ্ডিত নিম্নভাগে
আর ঊর্ধ্ব অংশে সুরক্তিম কেশ,
এ সূর্যাস্তে বহ্নিসম তাহা জ্বলিতেছে।
‘আমি হই ভেরোনিকা। হে পথিক, এ অরণ্যে কেমনে পশিলে?
কোথায় তোমার বাস? কোথায় যাইতে চাহ বলো।’
‘পথভ্রষ্ট’, বলি আমি, ‘ফিরিতে চাহিয়া জনপদে চতুর্দিকে ঘুরিতেছি,
চতুর্দিকে কাঁটাতার, চতুর্দিকে অশ্বগুলি ছুটিতেছে শুধু।
শ্বাসরোধী এই নির্জনতা— কে বট তুমিও বা? কোন কর্মে এইস্থানে বিচরণ করো?’

তখনই সে জানায়েছে, ভেরোনিকানাম্নী এই নারী, চেকিয়ার কোনও এক অজ পাড়াগাঁয়ে
জন্ম তার, কর্মসূত্রে বহুকাল প্রাগ নগরীতে। দিনের কাজের শেষে প্রত্যহ সে ফিরে আসে
জাদুকরী এই আস্তাবলে। তাহার নিজস্ব অশ্ব এটি, রক্তমাংসে প্রকৃত নির্মাণ।
পেগাস্যাস নয় মোটে, অথচ প্রদোষকালে, অলৌকিক এই আস্তাবলে,
তাহারই সন্ধানে তারা ছোটে!

ভেরোনিকা নেমে আসে অশ্বপৃষ্ঠ হতে। একগাছি ঘাস হাতে সযত্নে খাওয়ায়
পোষ্যটিকে। তারপরে বলে, ‘আইস আমার সঙ্গে; গুগুলের ভরসায় থাকিলে
এ বসন্তে এ অরণ্যে সারারাত্রি কাটিত তোমার!’

আমরা চলিতে থাকি। কাঁটাতারে ঘেরা মাঠে লুক্কায়িত পথগুলি
একমাত্র ভেরোনিকা জানে। কাঁটাতার, আরও কাঁটাতার, আরও কিছু
চোরাপথ: আমরা হাঁটিতে থাকি। কৃষ্ণঘন অন্ধকারে নক্ষত্রেরা অগ্নিসম
উষ্ণ আলো জ্বালে।

আমরা পৌঁছই শেষে শ্যামলিম তেপান্তর মাঠে; তার প্রান্তে
শহরের আলো। করমর্দন করে ভেরোনিকা— এবার ফিরিতে হবে তাকে।
আমি বলি ‘এই চেক দেশে বাস করে, আমি জানি,
তোমার মতন বহু বিশুদ্ধ মানব।’
অন্ধকারে হাসে ভেরোনিকা। ‘হয়ত মানব নই, কদাপি বিশুদ্ধ নই আমি।
তবু, মানুষ বিপন্ন হলে তাহাদের পাশে থাকি: পুরনো স্বভাব!
ভাল করে ঘুরে দ্যাখো এ শহর, হে বিদেশি,
আমাদের কথাগুলি গ্রাফিতিতে ধরা আছে। দেখো।’

আমি জানি। ভেরোনিকা জানে না তো খুঁজে খুঁজে দেখিয়াছি আমি তার সাথী
কেমিসের আঁকা ছবি প্রাগের দেওয়ালে: ইউক্রেনে ধ্বংসস্তূপে
দাঁড়ায়ে রয়েছে সেই দৃপ্তা বালিকাটি। তাহারেই দেখি আকস্মিক।

ভেরোনিকা জানে না তো আমি তারে চিনিয়াছি ঠিক!

 

প্রাগ শহরের আশ্চর্য রিক্সা

‘বিশ্বাসে মিলয়ে রিক্সা, তর্কে বহুদূর’
এত বলি
মহাগুরু নিত্যানন্দ
দাঁড়ায়েছে করজোড়ে
ভাল্তভা নদীর তীরে
ভক্তগণ নাচিতেছে খুব:
গুরুবাক্য! জয় গুরু!
তুরুত্তুরু, তুরুত্তুরু
তুরুত্তুরু তুরুতুরু তুর্!

একদা গভীর রাতে প্রাগ-দুর্গে আলো নিভে গেলে
ভাল্তভা নদীর ধারে গহন নির্জনে
আমার প্রশ্রয়ে হাঁটে গুটিকয় আলোময় যুবক যুবতী।
মধ্যরাত্রির ঘণ্টা সে কখন বেজে গেছে শহরের জাদু ঘড়িটিতে
অন্ধকার চার্লস ব্রিজ, স্ট্যাচুগুলি নিদ্রামগ্ন
বহুদূরে পেত্রিন টাওয়ারে আলো জ্বলে।

আমরা জানি না ঠিক কোনদিকে কতদূরে যাব,
লেসার টাউন থেকে পুরোনো চত্বরে ফিরে হাঁটি ইতস্তত,
আমাদের প্রত্নস্মৃতি বঙ্গভূমে গাঙ্গেয় বাতাস
এতদূরে বয়ে যাবে করিনি বিশ্বাস
সেই রাতে, হেঁটে গেছি, তবু খুঁজে গেছি
সুপ্রাচীন এ শহরে আঁকাবাঁকা গলিঘুঁজি ঘুরে:
অবিশ্বাসে কদাপি মিলিতে পারে কিছু?

আমরা পেরিয়ে যাই স্থান কিংবা কাল সীমারেখা।
একটি গলির কোণে হরিৎ আলোকে দেখি আলোকিত রিক্সা এক
নিদ্রামগ্ন অপার্থিব চালক তাহার!
সে কি সত্য? নাকি মায়া? নাকি গণসম্মোহনে গড়ে ওঠা প্রবল বিভ্রম ছিল কিনা
কখনও যাবে না জানা
ঠিক কত ভাড়া লাগে রিক্সা চড়ে প্রাগ থেকে বর্ধমানে যেতে।
আমি আর গুটিকয় অত্যুজ্বল যুবক যুবতী
তথাপি তো দেখিয়াছি মধ্যরাত্রে আমাদের সমবেত স্মৃতির নির্মাণে
সবুজ আলোয় ভরা রিক্সা এক অলৌকিক প্রাগ শহরেতে।


*ছবিগুলি কবির তোলা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4718 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. খুব ভালো লাগছে প্রাগ শহরের ইতিহাস আর ভুগোলের রাজপথ আর অলিগলিতে আপনার পরিভ্রমণ কবিতাগুলি। পাঠককেও পরিক্রমা সঙ্গী করে নিয়েছেন যেন কবি…

  2. ভাষাটা সাধু, স্থান ইউরোপের প্রাগ, আপাত অচেনা দৃশ্য কল্প, (কেননা আমি ওখানে যাইনি) ঘোড়ায় চড়া সাহসী পরোপকারী সতেজ মেয়েটি, কিছু নিতান্তই বাঙালি আবেগ!
    মন তুরুত্তুরু তুরুতুরু তুর্!
    একরাশ ভালোলাগা রইলো!

আপনার মতামত...